রাতের ঢাকায় সক্রিয় দুষ্কৃতকারীরা
jugantor
রাতের ঢাকায় সক্রিয় দুষ্কৃতকারীরা

  আল ফাতাহ মামুন  

০৩ মার্চ ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আসিফ ইসলাম। একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। গত মাসের ২৪ তারিখ এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন মধ্যবয়স্ক এ মানুষটি। রাত আনুমানিক সাড়ে দশটায় রিকশায় চড়ে পোস্তগোলা থেকে শ্যামপুর যাচ্ছিলেন। দুই পকেটে পঞ্চাশ হাজার টাকার দুটি বান্ডিল। হাতে ছিল বেশ দামি স্মার্টফোন। পোস্তগোলা থেকে একটু সামনে এগিয়ে আলী বহর এলে রিকশাওয়ালা বলল, চেইন পড়ে গেছে, ঠিক করতে হবে।

রিকশা থামার সঙ্গে সঙ্গে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিন বখাটে যুবক ঘিরে ফেলে আসিফকে। একজন বলল, চিল্লাচিল্লি করলে ভালো হবে না, সঙ্গে যা আছে দিয়ে দে। এ সময় ওদের হাতে দেশীয় ধারালো অস্ত্র দেখে ভয় পেয়ে যায় আসিফ। প্রথমে কিছু দিতে না চাইলে তাকে চড়-থাপ্পড় মারতে শুরু করে। জানে মারারও হুমকিও দিচ্ছিল। পরিস্থিতি খারাপ বুঝতে পেরে সঙ্গে থাকা টাকা পয়সা, মোবাইল, ঘড়ি, স্বর্ণের আংটি ও চেইন দিয়ে দেন ছিনতাইকারীদের।

কিন্তু এতেও রক্ষা হয়নি। যাওয়ার সময় বেধড়ক পিটিয়ে যায় তাকে। তবে এ ঘটনায় রিকশাওয়ালা জড়িত থাকতে পারে বলে সন্দেহ আসিফের। পরের দিন ঘটনার বিবরণ দিয়ে কদমতলী থানায় একটি ডায়েরি লিখেন আসিফ।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ত ঢাকাও ঝিমিয়ে পড়ে। তখন সজাগ হয়ে ওঠে রাতের অপরাধীরা। খুব জরুরি না হলে মানুষ গভীর রাতে বের হয় না। দেখা গেছে, হাসপাতালে রোগী আছে অথবা এ ধরনের জরুরি কারণেই রাতে বের হন রাজধানীর মানুষ। বিপদে পড়ে রাতে চলাচল করা মানুষজনই ডাকাতদের শিকারে পরিণত হন। যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা আমির খসরু পেশায় একজন রিকশা চালক। তিনি বলেন, রাতে গাড়িঘোড়া কম থাকে। এসময় রিকশা নিয়ে বের হলে বেশ ভালো পয়সা পাওয়া যায়। বিশ টাকার ভাড়া একশ টাকায়ও যায় মানুষ। যাবে না কেন, তখন তো গাড়িই পাওয়া যায় না।

রাতের ঢাকায় রিকশা চালিয়ে বেড়ানো আমির খসরু বলেন, সারা রাত রিকশা চালিয়ে যা কামাই, ভোর রাতে দুই তিনজন এসে ছোঁ মেরে সব নিয়ে যায়। মাসে দু-চার দিন এমন ঘটনা সব রিকশাচালকদেরই ঘটে। তবে যাত্রীদের সর্বস্ব লুট করার ঘটনা বেশি ঘটে। আমির খসরু বলেন, ডাকাত দল যাত্রীদের সঙ্গে টাকা-পয়সা, মালপত্র যা পায় তা তো নেয়ই, আবার যাদের সঙ্গে এটিএম কার্ড, ভিসা কার্ড থাকে তাদের বুথে নিয়েও টাকা বের করে নেয়। যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, দয়াগঞ্জ এবং শনিরআখড়া, রায়েরবাগ এ এলাকাগুলোতে প্রতিদিনই কোনো না কোনো ছিনতাই, ডাকাতির ঘটনা ঘটে।

গেণ্ডারিয়া রেলস্টেশন, জুরাইন নতুন রাস্তায় প্রায় রাতেই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। গেণ্ডারিয়া স্টেশনে সামনের মাসখানেক আগে ছিনতাইয়ের শিকার হন মীরহাজীরবাগের বাসিন্দা রাসেল আহমেদ। তিনি বলেন, অনেকটা পুলিশের সামনেই ছিনতাইকারীরা আমার সঙ্গে থাকা মোবাইল, মানিব্যাগ নিয়ে যায়। টহল পুলিশদের বিষয়টি জানালে তারা অবজ্ঞার সুরে বলেন, থানায় মামলা করেন। আসামি ধরা পড়লে বিচার হবে। তবে এ অঞ্চল থেকে বস্তি উঠিয়ে দেয়ার পর থেকে এ ধরনের ঘটনা কম ঘটছে।

ছিনতাইয়ের শিকার ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই থানায় জিডি বা মামলা করতে চান না। এর কারণ হিসেবে একাধিক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, এদেশের পুলিশ এখনও জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। এটা এলে পুলিশ প্রশাসনেরই ব্যর্থতা। ভুক্তভোগীরা বলেন, সন্দেহ নেই পুলিশ প্রশাসনের অধিকাংশ লোকই সৎ। গুটিকয়েক অসৎ মানুষ পুরো সেক্টরের বদনাম করে যাচ্ছে। খোঁজ নিয়ে দেখেন, মানুষ বিপদে পড়লে পুলিশকে জানানোর আগে একবার হলেও ভাবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় রাতের অপরাধ প্রসঙ্গে ডেমরা জোনের সিনিয়র পুলিশ কমিশনার মো. রাকিবুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আমাদের এ অঞ্চলটি একটু বেশি অপরাধ প্রবণ। রাতে চারদিক নীরব হয়ে গেলে অপরাধের সুযোগ বেড়ে যায়। আমরা চেষ্টা করছি একটু পরপর টহল পুলিশের মাধ্যমে রাতের অপরাধের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনতে।

গেণ্ডারিয়া থানার ওসি মো. সাজু মিয়া যুগান্তরকে বলেন, গেণ্ডারিয়া এলাকার বিপজ্জনক জোন আমরা চিহ্নিত করেছি। রাতে ওইসব এরিয়ায় আমাদের টহল পুলিশ থাকে। তারপরও মাঝে মধ্যে এক-দুটি দুর্ঘটনা ঘটে যায়। আমরা খবর পেলে সঙ্গে সঙ্গে ফোর্স পাঠাই নতুবা ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিই।

কদমতলী থানার সাব ইন্সপেক্টর নিজাম উদ্দিন জানান, রাতে আমরাই মাঠ পর্যায়ে কাজ করি। আমাদের অভিজ্ঞতায় যেটা দেখা গেছে, যেখানে আমাদের অবস্থান থাকে, অপরাধীরা এর চেয়ে একটু নিরাপদ দূরত্বে অপরাধ সংঘটিত করে। পুলিশ ওই জায়গায় পৌঁছতেই ছিনতাইকারী পালিয়ে যায়। এক্ষেত্রে আমরাও নানা কৌশল অবলম্বন করি। যেমন ধরেন, একই জায়গায় বেশিক্ষণ অবস্থান না করে টহলের মধ্যে থাকি। এ ছাড়া আরও কিছু টেকনিক অবলম্বন করে অপরাধীদের আটক করি।

রাতের ঢাকায় সক্রিয় দুষ্কৃতকারীরা

 আল ফাতাহ মামুন 
০৩ মার্চ ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আসিফ ইসলাম। একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। গত মাসের ২৪ তারিখ এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন মধ্যবয়স্ক এ মানুষটি। রাত আনুমানিক সাড়ে দশটায় রিকশায় চড়ে পোস্তগোলা থেকে শ্যামপুর যাচ্ছিলেন। দুই পকেটে পঞ্চাশ হাজার টাকার দুটি বান্ডিল। হাতে ছিল বেশ দামি স্মার্টফোন। পোস্তগোলা থেকে একটু সামনে এগিয়ে আলী বহর এলে রিকশাওয়ালা বলল, চেইন পড়ে গেছে, ঠিক করতে হবে।

রিকশা থামার সঙ্গে সঙ্গে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিন বখাটে যুবক ঘিরে ফেলে আসিফকে। একজন বলল, চিল্লাচিল্লি করলে ভালো হবে না, সঙ্গে যা আছে দিয়ে দে। এ সময় ওদের হাতে দেশীয় ধারালো অস্ত্র দেখে ভয় পেয়ে যায় আসিফ। প্রথমে কিছু দিতে না চাইলে তাকে চড়-থাপ্পড় মারতে শুরু করে। জানে মারারও হুমকিও দিচ্ছিল। পরিস্থিতি খারাপ বুঝতে পেরে সঙ্গে থাকা টাকা পয়সা, মোবাইল, ঘড়ি, স্বর্ণের আংটি ও চেইন দিয়ে দেন ছিনতাইকারীদের।

কিন্তু এতেও রক্ষা হয়নি। যাওয়ার সময় বেধড়ক পিটিয়ে যায় তাকে। তবে এ ঘটনায় রিকশাওয়ালা জড়িত থাকতে পারে বলে সন্দেহ আসিফের। পরের দিন ঘটনার বিবরণ দিয়ে কদমতলী থানায় একটি ডায়েরি লিখেন আসিফ।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ত ঢাকাও ঝিমিয়ে পড়ে। তখন সজাগ হয়ে ওঠে রাতের অপরাধীরা। খুব জরুরি না হলে মানুষ গভীর রাতে বের হয় না। দেখা গেছে, হাসপাতালে রোগী আছে অথবা এ ধরনের জরুরি কারণেই রাতে বের হন রাজধানীর মানুষ। বিপদে পড়ে রাতে চলাচল করা মানুষজনই ডাকাতদের শিকারে পরিণত হন। যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা আমির খসরু পেশায় একজন রিকশা চালক। তিনি বলেন, রাতে গাড়িঘোড়া কম থাকে। এসময় রিকশা নিয়ে বের হলে বেশ ভালো পয়সা পাওয়া যায়। বিশ টাকার ভাড়া একশ টাকায়ও যায় মানুষ। যাবে না কেন, তখন তো গাড়িই পাওয়া যায় না।

রাতের ঢাকায় রিকশা চালিয়ে বেড়ানো আমির খসরু বলেন, সারা রাত রিকশা চালিয়ে যা কামাই, ভোর রাতে দুই তিনজন এসে ছোঁ মেরে সব নিয়ে যায়। মাসে দু-চার দিন এমন ঘটনা সব রিকশাচালকদেরই ঘটে। তবে যাত্রীদের সর্বস্ব লুট করার ঘটনা বেশি ঘটে। আমির খসরু বলেন, ডাকাত দল যাত্রীদের সঙ্গে টাকা-পয়সা, মালপত্র যা পায় তা তো নেয়ই, আবার যাদের সঙ্গে এটিএম কার্ড, ভিসা কার্ড থাকে তাদের বুথে নিয়েও টাকা বের করে নেয়। যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, দয়াগঞ্জ এবং শনিরআখড়া, রায়েরবাগ এ এলাকাগুলোতে প্রতিদিনই কোনো না কোনো ছিনতাই, ডাকাতির ঘটনা ঘটে।

গেণ্ডারিয়া রেলস্টেশন, জুরাইন নতুন রাস্তায় প্রায় রাতেই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। গেণ্ডারিয়া স্টেশনে সামনের মাসখানেক আগে ছিনতাইয়ের শিকার হন মীরহাজীরবাগের বাসিন্দা রাসেল আহমেদ। তিনি বলেন, অনেকটা পুলিশের সামনেই ছিনতাইকারীরা আমার সঙ্গে থাকা মোবাইল, মানিব্যাগ নিয়ে যায়। টহল পুলিশদের বিষয়টি জানালে তারা অবজ্ঞার সুরে বলেন, থানায় মামলা করেন। আসামি ধরা পড়লে বিচার হবে। তবে এ অঞ্চল থেকে বস্তি উঠিয়ে দেয়ার পর থেকে এ ধরনের ঘটনা কম ঘটছে।

ছিনতাইয়ের শিকার ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই থানায় জিডি বা মামলা করতে চান না। এর কারণ হিসেবে একাধিক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, এদেশের পুলিশ এখনও জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। এটা এলে পুলিশ প্রশাসনেরই ব্যর্থতা। ভুক্তভোগীরা বলেন, সন্দেহ নেই পুলিশ প্রশাসনের অধিকাংশ লোকই সৎ। গুটিকয়েক অসৎ মানুষ পুরো সেক্টরের বদনাম করে যাচ্ছে। খোঁজ নিয়ে দেখেন, মানুষ বিপদে পড়লে পুলিশকে জানানোর আগে একবার হলেও ভাবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় রাতের অপরাধ প্রসঙ্গে ডেমরা জোনের সিনিয়র পুলিশ কমিশনার মো. রাকিবুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আমাদের এ অঞ্চলটি একটু বেশি অপরাধ প্রবণ। রাতে চারদিক নীরব হয়ে গেলে অপরাধের সুযোগ বেড়ে যায়। আমরা চেষ্টা করছি একটু পরপর টহল পুলিশের মাধ্যমে রাতের অপরাধের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনতে।

গেণ্ডারিয়া থানার ওসি মো. সাজু মিয়া যুগান্তরকে বলেন, গেণ্ডারিয়া এলাকার বিপজ্জনক জোন আমরা চিহ্নিত করেছি। রাতে ওইসব এরিয়ায় আমাদের টহল পুলিশ থাকে। তারপরও মাঝে মধ্যে এক-দুটি দুর্ঘটনা ঘটে যায়। আমরা খবর পেলে সঙ্গে সঙ্গে ফোর্স পাঠাই নতুবা ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিই।

কদমতলী থানার সাব ইন্সপেক্টর নিজাম উদ্দিন জানান, রাতে আমরাই মাঠ পর্যায়ে কাজ করি। আমাদের অভিজ্ঞতায় যেটা দেখা গেছে, যেখানে আমাদের অবস্থান থাকে, অপরাধীরা এর চেয়ে একটু নিরাপদ দূরত্বে অপরাধ সংঘটিত করে। পুলিশ ওই জায়গায় পৌঁছতেই ছিনতাইকারী পালিয়ে যায়। এক্ষেত্রে আমরাও নানা কৌশল অবলম্বন করি। যেমন ধরেন, একই জায়গায় বেশিক্ষণ অবস্থান না করে টহলের মধ্যে থাকি। এ ছাড়া আরও কিছু টেকনিক অবলম্বন করে অপরাধীদের আটক করি।