আত্মত্যাগী দুই নারীযোদ্ধা

মুক্তিযুদ্ধে অনেকেই পাকিস্তানি সেনাদের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। দেশের জন্য আত্মত্যাগী নারীরা কেমন আছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন-

  রীতা ভৌমিক ২৩ মার্চ ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কানন গোমেজ

বরিশালের গৌরনদীর মেয়ে কানন গোমেজ। গ্রামের স্কুলে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। বাবা গ্রামের একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। দশ বছর বয়সে মাকে হারান তিনি। বাবা ঘরে নতুন মা নিয়ে আসেন। তিন ভাই, তিন বোন ও বাবা-মা মিলে আট সদস্যের সংসার। বাবার একার আয়ে সংসার চলে না। এক বেলা খাবার জুটলে আরেক বেলা অনাহারে কাটে। ভাইবোনদের কষ্ট দেখে কানন গোমেজ ফরিদপুরে নারিকেলবাড়ি গ্রামের এক বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ নেন। সেখান থেকে আরেক বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ নেন। এর বছরদুয়েক পরই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। কানন গোমেজের বয়স তখন ১৮ কি ১৯।

এ প্রসঙ্গে কানন গোমেজ বলেন, গৃহকর্তার একটি রেডিও ছিল। রেডিওতে শুনতে পেলাম বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকার পুলিশবাহিনীর ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। নিরীহ মানুষদের হত্যা করছে। হিন্দুদের মারছে। ভাবলাম, আমি খ্রিস্টান আমাকে মারবে না। হিন্দুদের মারছে দেখে এলাকার অনেক হিন্দু রাতের আঁধারে ভারতে পালিয়ে যেতে থাকেন। ঢাকা থেকে লোকজন প্রাণভয়ে গ্রামের দিকে ছুটছেন। একজন ফাদার তাদের আশ্রয়ের জন্য নারিকেলবাড়ি বিদ্যালয়ে লঙ্গরখানা খোলেন। আমি যাদের বাড়িতে কাজ করতাম তারা আমাকে না বলেই চলে যান। আমি ওই লঙ্গরখানায় আশ্রয় নিলাম। এ লঙ্গরখানায় প্রায় ৩০০-এর বেশি মেয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এখানে দু-তিনমাস রইলাম। এরই মধ্যে ফরিদপুরের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হেমায়েত ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এলেন। খবর পেলাম ভাঙ্গারহাটের একজন রাজাকার স’মিলের মালিককে গুলি করেছে। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হেমায়েত মুক্তিযোদ্ধা আশালতা বৈদ্যকে ছেলেমেয়ে উভয়কে অস্ত্র প্রশিক্ষণ প্রদানের নির্দেশ দেন। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে আট-দশজনের পাকিস্তানি সেনাদের একটি দল লঞ্চে চড়ে নারিকেলবাড়িতে আসে। তিনদিন তারা এলাকাটি ঘুরে দেখে। ফাদারের লঙ্গরখানায়ও তারা আসে। এরপর তারা ফিরে যায়। এর সপ্তাহখানেক পর দুই রাজাকারসহ দুই পাকিস্তানি সেনা সন্ধ্যায় আবার নারিকেলবাড়ি আসে। আমি, নাজমা, স্বর্ণলতা খাবার নিয়ে লঙ্গরখানায় ফিরছিলাম। তারা আমাকে দেখামাত্র থামতে বলে। এক মাসের ছেলে কোলে নিয়ে বসেছিলেন এক মা। পাকিস্তানি সেনারা মায়ের কোল থেকে বাচ্চাটিকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে মাকে ধরে নিয়ে যায়। শিশুটি সেখানেই মারা যায়। পাশবিক নির্যাতনের কারণে মা অজ্ঞান হয়ে গেলে সেখানেই তাকে লাথি মেরে ফেলে দেয়। সাতমাসের গর্ভবতী তাদের হাতে-পায়ে ধরেও রেহাই পাননি। পেটে বুটের জুতা দিয়ে পারা দেয়। এরপর লাথি মেরে ফেলে দেয়। সেখানেই গর্ভের সন্তানসহ তিনি মারা যান। আমাদের তিনজনকে জোরজবরদস্তি করে স্কুল ঘরে নিয়ে যায়। আমি খ্রিস্টান পরিচয় দিয়েও সেদিন ওদের পাশবিক নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই পাইনি। চিৎকার করায় মুখ চেপে ধরে। লাঠি দিয়ে বারি মারে। অজ্ঞান হয়ে যাই। সেই অবস্থায় কে নৌকায় তুলেছে, বলতে পারি না। জ্ঞান ফিরে দেখি নৌকায় পড়ে আছি। কান্নাকাটি করি। দশ-পনেরো দিন পর সুস্থ হই। এরপর অন্যের বাড়িতে বাড়িতে থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করি। মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার পৌঁছে দিই। মানুষের কাছ থেকে খাবার চেয়ে এনে মুক্তিযোদ্ধাদের দিতাম। কেউ পানতা দিলেও খেতাম। ক্ষুধার জ্বালায় শাপলার ডেপ খেয়েছি। পানি খেয়েও দিন যেত। ভাতের মাড় খেতাম। খাবারের খুব আকাল যাচ্ছিল। এভাবেই খেয়ে না খেয়ে দিন পার করি। দেশ স্বাধীন হল। অনেকেই আর কাজে নিতে চাইতেন না। অনেক খারাপ কথা বলত। বিয়ে হয়। স্বামী-সন্তান নিয়ে দিন কাটাই কোনোরকমে।

মোসাম্মৎ আনোয়ারা বেগম

একাত্তরে মোসাম্মৎ আনোয়ারা বেগমের বয়স ২৪ বছর। নরসিংদী জেলার বেলাব উপজেলার নেহাব গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে স্বামী, শাশুড়ি ও ছেলে নিয়ে সংসার করছেন।

ছেলের বয়স ৩ বছর। দ্বিতীয় সন্তান ৫ মাসের গর্ভে। স্বামী মুসলিম কটন মিলের শ্রমিক। ১৪ জুলাই বেলা ১২-১টার দিকে উনুনে ভাত বসিয়েছেন। এমন সময় হট্টগোল শুনতে পেলেন- পাকিস্তানি সেনা গ্রামে ঢুকেছে।

এ প্রসঙ্গে মোসাম্মৎ আনোয়ারা বেগম জানান, একাত্তরের ১৪ জুলাই পাকিস্তানি সেনা গ্রামে ঢুকেছে- এ খবর শোনামাত্র আশপাশের বৌ-ঝিরা যে যেভাবে পারে পালাতে থাকেন। তাদের পালাতে দেখে আমিও পালাতে যাই। কিন্তু ভাত নষ্ট হলে শাশুড়ির অনেক বকাঝকা শুনতে হবে। এ ভয়ে আবার ফিরে এসে কুয়া পাড়ে যাই পানি তুলতে। কুয়া থেকে পানি তুলে ভাতের হাঁড়িতে দিব। কুয়ায় ঘটিটা নামাতেই ১০ থেকে ১২ পাকিস্তানি সেনা আমার কাছাকাছি চলে আসে। ৪-৫ পাকিস্তানি সেনা দু’পাশ থেকে আমার দু’হাত চেপে ধরে। অনেক চেষ্টা করেও ওদের থেকে ছুটতে পারি না। ওরা আমাকে টানতে টানতে বিলের কাছে নিয়ে যায়। ওরা আমাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। এক পর্যায়ে জ্ঞান হারাই। ওই অবস্থায় ওরা আমাকে ঝোপের কাছে ফেলে রেখে যায়। পরের দিন আসরের আজানের শব্দে আমার জ্ঞান ফিরে। এক লোক গামছা ভিজিয়ে আমাকে পানি খাওয়ায়। পানি খাওয়ার পর জ্ঞান ফিরে। তিনি আমাকে বলেন, ‘মা তোর বাড়ি কই?’ অসুস্থ শরীর নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে এলাম। শাশুড়ি আমাকে আর বাড়িতে জায়গা দেয় না। স্বামীও মায়ের কথায় বাড়িতে উঠতে দেয় না। মামাশ্বশুরের বাড়িতে রইলাম। মামাশ্বশুর আমার বাবারে নিয়ে যেতে খবর দিলেন। বাবা পরদিন এলেন। আমার শরীর খুব খারাপ। হাঁটতে পারি না। বাবা আমাকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে রওনা হলেন। ছেলেটারে তারা রেখে দিল। লঞ্চ, মালগাড়িতে চড়ে ঢাকা মেডিকেলে এলাম। আড়াই মাস ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসায় রইলাম। পেটেই বাচ্চা মারা গেল। চিকিৎসার পর বাবা আমাকে নিয়ে রূপগঞ্জ লঙ্গরখানায় নিয়ে এলেন। কয়েকদিন এখানে রইলাম। দেশ স্বাধীন হল। বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরলেন। আমার মতো অনেক সম্ভ্রম হারানো নারীদের সঙ্গে তিনি এখানে দেখা করলেন। আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ‘মা তোর আর কিছু করা লাগবে না।’ জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী আমাকে একটি সার্টিফিকেট দেন। সেখান থেকে গাজীপুরের কালীগঞ্জে বাবার বাড়ি নোয়াপাড়া এলাম। বাবা আমাকে আবার বিয়ে দিলেন। এ ঘরে এক ছেলে হয়। এই স্বামী পাকিস্তানি সেনাদের দ্বারা নির্যাতনের ঘটনা জেনে ফেলে। আমাকে তালাক দেয়। ভাইয়ের বাড়িতে এলাম। ভাই জায়গা দেয় না। আবার বিয়ে দেয়। সেই ঘরে দু’ছেলে ও এক মেয়ে হয়। স্বামী মারা গেলেন। আরেক জায়গায় বিয়ে হলো। এই স্বামী তার বাড়িতে নেয় না। সংসারের খরচ দেয় না। ছেলেমেয়েদের নিয়ে কই যাবো। অন্যের বাড়িতে কাজ করে যা প্ইা তাই দিয়ে চলি। এখন মাঝে মাঝে বড় ছেলে আমাকে দেখতে আসে। কিন্তু যখন সেই ছোট্ট ছেলেটিকে দেখার জন্য আমার প্রাণ কাঁদত, একটু চোখের দেখাও দেখতে পাইনি তাকে। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাইতে অনেক টাকা পয়সা খরচ করতে হইছে। অনেক ঋণ করছি। মাসে বারো হাজার টাকা ভাতা পাই। ঋন আগে শোধ করতাছি। এরপর যদি বাঁইচা থাকি তাহলে এই টাকা চোখে দেখব। আমাগো এমপি মেহের আফরোজ চুমকী আপা আমারে একটা ঘর দিছে। কিন্তু কন্ট্রাক্টররা ঘর ঠিকমতো বানাইতে পারে নাই। ঘরের উচ্চতা বেশি না। টিনের চাল দিয়ে পানি পড়ে। কাঁচা কাঠের দরজা-জানালা। ফাঁক হয়ে গেছে। মেঝের সিমেন্ট উঠে যাচ্ছে।

আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত