Logo
Logo
×
   

তারাঝিলমিল

মা নিয়ে জনপ্রিয় গান

মাকে উৎসর্গ করে তৈরি হয়েছে অনেক গান। নানারকম গানে মাকে নিয়ে থাকা বিভিন্ন কথার মালা দর্শক শ্রোতাদের আপ্লুত করে। বারবার মাকে মনে করিয়ে দেয়। শ্রোতানন্দিত সেসব গানগুলো সৃষ্টির পেছনের গল্পও যেমন অতুলনীয় তেমনই হৃদয়ঘনিষ্ঠ। মাকে নিয়ে এমন শ্রোতাপ্রিয় কিছু গানের কথা, সুর সঙ্গীত এবং শিল্পীদের নিয়ে এ আয়োজন। লিখেছেন এইচ সাইদুল

Icon

প্রকাশ: ১০ মে ২০১৮, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

* মায়ের একধার দুধের দাম, কাটিয়া গায়ের চাম

মাকে নিয়ে এ পর্যন্ত যত গান হয়েছে তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ গান ধরা যেতে পারে ফকির আলমগীরের এ গানটিকে। গানটি প্রসঙ্গে ফকির আলমগীর বলেন, একবার তিনি মাকে নিয়ে ফরিদপুরে যাচ্ছেন। আরিচাঘাটে যাওয়ার পথে অন্ধ এক বাউলের সঙ্গে দেখা হয়। দোতারা বাজিয়ে দেহতত্ত্বের গান গাইছেন। গানটা শুনেই তার কানে লেগে যায়। সঙ্গে সঙ্গে রেকর্ডার বের করে গানটা ধারণ করে নেন। পরে গানটি বিটিভির একটি অনুষ্ঠানে নিজের মতো তৈরি করে গেয়ে শোনান। এটি ১৯৭৭ সালের কথা। নব্বইয়ের দশকে অজিত রায় বিটিভির জন্য গানটি আবার রেকর্ড করান। এ গানটিই ফকির আলমগীরের ‘সখিনা-২’ অ্যালবামে সংযোজন করা হয়। এরপর গানটি আরও দুইবার রেকর্ড হয়েছে। আলাউদ্দিন আলীর সঙ্গীতায়োজনে ‘অবরোধ’ চলচ্চিত্রের জন্য এবং ফরিদ আহমেদের সঙ্গীতায়োজনে দ্বিতীয়বার। আমার ‘সখীপুরের সখিনা’ অ্যালবামে গানটি অন্তর্ভুক্ত হয়। বর্তমানে এ গানটিই সব জায়গায় শোনা যায়।

* মাগো মা, ওগো মা, আমারে বানাইলি তুই দিওয়ানা

খুরশিদ আলমের গাওয়া প্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতা দিলীপ বিশ্বাসের ‘সমাধি’ (১৯৭৮) সিনেমার গান এটি। এর গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার। পর্দায় এ গানে ঠোঁট মেলান নায়করাজ রাজ্জাক। গানটি প্রসঙ্গে খুরশিদ আলম বলেন, ‘এ গানের কথা ও সুর তৈরি হতে দুই তিন দিন লেগে যায়। এরপর রেকর্ডিং হয় কাকরাইলের ইপসা রেকর্ডিং স্টুডিওতে। সাধারণত ছবি মুক্তি পাওয়ার পরই গান হিট হয়। কিন্তু সত্যদা যেন আগেই বুঝে গিয়েছিলেন, গানটি হিট হবে। তিনি আমাকে বললেন, ‘যত দিন তুই বেঁচে থাকবি, ততদিন তোকে এই গানটা গাইতে হবে।’ আমি যেখানে গান গাইতে যাই, এ গানটি গাইতে হয়। আসলে গানের কথা ও সুর অনেক সহজ-সরল ছিল। সব মিলিয়েই গানটি জনপ্রিয় হয়।’

* মায়ের মতো আপন কেহ নাই রে

মাকে নিয়ে প্রকাশিত অন্যতম সেরা গানের মাঝে ‘মায়ের মতো আপন কেহ নাই রে’ অন্যতম। রুমানা ইসলামের গাওয়া এ গানটি লিখেছেন এবং সুর করেছেন খান আতাউর রহমান। ‘দিন যায় কথা থাকে’ অ্যালবামের এ গানটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৯ সালে।

* এমন একটা মা দে না

১৯৭৪ সাল। ফেরদৌস ওয়াহিদ তখন কলেজে পড়েন। প্রয়াত শিল্পী ফিরোজ সাঁই ওয়াহিদকে একদিন ডেকে বললেন, একটা গান গাইতে হবে। গানটি লিখেছেন ও সুর করেছেন ডা. নাসির আহমেদ। গানটা শোনেন তিনি। খুবই পছন্দ হল। ফিরোজ সাঁই বললেন, ‘গানটি তোমার গলায় খুব মানাবে। আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি, তুমি শুধু টাকা জোগাড় করো।’ গানটি রেকর্ড করতে মোট খরচ হবে ৩৩০ টাকা। এত টাকা আমার কাছে নেই, বলেন ফেরদৌস ওয়াহিদ। এগিয়ে এলো আমার চার বন্ধু সাইফ, রুমী, শামীম ও এনায়েতুল্লাহ। নিজের টিফিনের টাকা এবং বন্ধুদের টাকায় কাকরাইলের ইপসা রেকর্ডিং স্টুডিওতে গানটি রেকর্ড করি- বলেন ফেরদৌস ওয়াহিদ। এরপর ১৯৭৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর বিটিভির বিশেষ সঙ্গীতানুষ্ঠানে গানটি প্রচারিত হয়। চারদিকে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়।

* ১০ মাস ১০ দিন ধরে গর্ভধারণ

১৯৯৭ সালে প্রিন্স মাহমুদের মা মারা যান। চারদিকে কেবল মাকে খুঁজে বেড়াতেন তিনি। এ রকম একটা মানসিক কষ্টের ভেতরই ‘মা’ গানটি লিখেছেন প্রিন্স মাহমুদ। গানটি সুর করতেও খুব বেশি সময় লাগেনি। অনেক ভেবে প্রিন্স ঠিক করল, জেমসকে দিয়ে গানটি গাওয়াবেন। জেমসের মাও বেঁচে নেই। প্রয়াত শব্দ প্রকৌশলী মবিন তখন প্রিন্সের স্টুডিওতে ছিলেন। রেকর্ডিংয়ের সময় জেমসের কণ্ঠে মা গানটি শুনে বলেছিলেন, এই গান মানুষের ভালো না লেগে পারে না।’ ১৯৯৯ সালে ‘এখনও দু’চোখে বন্যা’ মিশ্র অ্যালবামে গানটি প্রকাশ হয়। এরপর বাকিটা সবার জানা।

* আম্মাজান

কিছু গান কখনও ভোলা যায় না। দু-একটা গান কখনই পুরনো হয় না। যে গান হৃদয়ের তৃষ্ণা মেটায় সে গানের দুটি চরণ হল ‘আম্মাজান, চোখের মণি আম্মাজান, প্রাণের খীি আম্মাজান, আম্মাজান, আম্মাজান; বুকের ধ্বনি আম্মাজান। ১৯৯৯ সালে আম্মাজান চলচ্চিত্রের জন্য আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সুর করা এবং আইয়ুব বাচ্চুর গাওয়া গান আম্মাজান। দেশীয় সঙ্গীতে মা নিয়ে যত গান আছে তার মধ্যে অন্যতম সেরা গান এটি।

* একটা চাঁদ ছাড়া রাত আঁধার কালো

কবির বকুলের লেখা এবং কুমার বিশ্বজিতের সুর ও কণ্ঠে এ গানটি শ্রোতামহলে বেশ জনপ্রিয়তা এনেছে। পিএ কাজল পরিচালিত ‘স্বামী স্ত্রীর ওয়াদা’ ছবিতে গানটি ব্যবহার করা হয়। এ গানের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায় বিশ্বজিৎ এবং কবির বকুল। এটি একাধারে বিজ্ঞাপনচিত্র, চলচ্চিত্র ও অডিও অ্যালবামে ব্যবহার করা হয়েছে।

* ওই আকাশের তারায় তারায়

২০০৬ সালের রমজান মাস। ভোরবেলা সেহরি খেয়ে মাত্র বসেছে ইমন। এমন সময় গীতিকার আসিফ ইকবালের ফোন এলো। কান্নাভেজা কণ্ঠ। ভয় পেয়ে গেল ইমন। কী হয়েছে- জিজ্ঞেস করতেই বলে উঠলেন, ‘১৪ বছর আগে এই দিনে মাকে হারিয়েছি। আজ প্রথমবার আমি মাকে স্বপ্নে দেখেছি। খুব খারাপ লাগছে।’ ‘মাকে ভেবে চারটা লাইন লেখা শোনান ইমনকে। শুনেই বলে ওঠেন- ভাই, আমি আপনার গানটা সুর করতে চাই। গানটা রাশেদকে দিয়ে গাওয়ান ইমন। ইমন বলেন, ক্লোজআপের ওই রাউন্ডটি যেদিন প্রচার হল, সেদিন মা আমার সামনে ছিলেন। গানটা শেষ হলে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘তুই অনেক বড় হবি বাবা।’ মায়ের সেই দোয়া পাওয়ার পর আমার আর কিছু পাওয়ার আছে বলে মনে হয় না। এই একটি গান গেয়ে রাশেদও বেশ পরিচিতি পান।

* মা যে দশ মাস দশ দিন

গানটি ২০০৪ সালে লেখা। আমিরুল মোমেনীন মানিক নিজে লিখেন, সুর করেন এবং গেয়ে শ্রোতা মহলে প্রশংসা কুড়ান। এটি প্রকাশিত হয় তার একক অ্যালবাম ‘সাড়া’তে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় হলে বসে গানটি লেখা ও সুর করা হয় বলে মানিক জানান। তিনি বলেন, ‘সে সময় গ্রামের বাড়িতে অবস্থানরত মায়ের প্রতি দরদ ও ভালোবাসা অনুভব করেই গানটি লেখা। লেখার সঙ্গে সঙ্গেই সুর হয়ে যায়। ২০০৫ সালে অ্যালবাম প্রকাশিত হওয়ার পর বিপুল জনপ্রিয় হয় গানটি।

মাকে নিয়ে আরও বিখ্যাত গান রয়েছে। মনির খানের গাওয়া ‘কোন মাটিতে তৈরি রে তুই মা?’ সালমান শাহ’র ঠোঁট মিলানো আগুনের কণ্ঠে ‘একাত্তরের মা জননী’, মান্না’র ঠোঁটে এন্ড্রু কিশোরের গাওয়া ‘জন্ম দিয়েছ আমাকে ও মা তুমি প্রিয় মা’, পলাশের গাওয়া ‘মা, তুমি আমার আগে যেও না গো মরে’ এখনও মানুষে মুখে মুখে উচ্চারিত হয়।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম