Logo
Logo
×
   

প্রথম পাতা

নরসিংদীতে দুই নারী ‘জঙ্গি’র আত্মসমর্পণ

Icon

সিরাজুল ইসলাম, নরসিংদী থেকে ফিরে

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নরসিংদীতে দুই নারী ‘জঙ্গি’র আত্মসমর্পণ

ছবি-যুগান্তর

নরসিংদীর মাধবদীতে ঘিরে রাখা ‘নিলুফা ভিলা’য় অবস্থান নেয়া সন্দেহভাজন দুই নারী জঙ্গি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।

বুধবার বেলা পৌনে ৩টার দিকে কালো বোরকা পরা ওই দুই নারীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঘেরাওয়ের মধ্যে একটি বিশেষায়িত অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। এ সময় তাদের মাথায় হেলমেট পরানো ছিল। আর এর মধ্য দিয়ে কোনো রক্তপাত ছাড়াই দীর্ঘ ৪১ ঘণ্টার স্নায়ুক্ষয়ী অপেক্ষার অবসান ঘটে।

সোমবার রাত থেকে শেখেরচর ভগীরথপুরে একটি পাঁচতলা বাড়ি এবং এর প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে ছোট গদাইরচর গাঙপাড় এলাকার ৭ তলা এই ‘নিলুফা ভিলা’ ঘিরে রাখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর মধ্যে ভগীরথপুরের বাড়িতে মঙ্গলবার অভিযান চালিয়ে দু’জনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

তবে এ ঘটনায় দুইজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে দাবি করেছেন স্বজনরা। এরা হল- নাজমুল ইসলাম ও হাফেজ ভূঁইয়া। স্বজনরা জানিয়েছেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা তাদের গ্রেফতার করেছে। কিন্তু বিষয়টি স্বীকার করছে না তারা।

অভিযান শেষে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বিফ্রিং করেন। তিনি বলেন, সকাল থেকেই সোয়াট সদস্যরা তাদের (জঙ্গি) সঙ্গে সমঝোতা করার চেষ্টা করছিল। এরই মধ্যে একটি বিস্ফোরণ ঘটায় তারা। দুপুরে তারা আত্মসমর্পণে রাজি হয়। বেলা আড়াইটায় তারা আত্মসমর্পণ করে।

মনিরুল ইসলাম বলেন, আত্মসমর্পণ করা ‘জঙ্গি’রা হল- খাদিজা আক্তার মেঘনা ও ইশরাত জাহান মৌ। এর আগে মঙ্গলবার অভিযানে নিহতের প্রাথমিক পরিচয়ও প্রকাশ করেন তিনি। এরা হল- নব্য জেমএবির মিডিয়া শাখার প্রধান আবু আবদুল্লাহ আল বাঙ্গালী ও তার স্ত্রী আকলিমা আকতার মনি।

সিটিটিসি প্রধান বলেন, মনি, মেঘনা ও মৌ ঢাকার মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাবেক ছাত্রী। গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পর ২০১৬ সালের আগস্টে র‌্যাব-৪ এর হাতে রাজধানীর মিরপুর মডেল থানার এক মামলায় গ্রেফতার হন তারা। ওই সময় তাদের আরেক বান্ধবীও গ্রেফতার হয়েছিল। কয়েক মাস জেল খেটে জামিন পান তারা। ওই বান্ধবী স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলেও আবার জঙ্গিবাদে জড়ায় এ তিনজন। তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সুর্নিদষ্ট প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। তারা সবাই নব্য জেএমবির সদস্য।

মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, আত্মসমর্পণকারী দুই নারীর একজনের বিয়ে হয়েছিল। তার স্বামী নব্য জেএমবির এক শীর্ষ নেতা। তাকে গ্রেফতারে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চলছে। অন্যজনেরও বিয়ের প্রস্তুতি চলছিল। তিনি জানান, নরসিংদী জেলা পুলিশের অধীনে রেখে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, দুই নারী জঙ্গি একটি বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। বুধবার বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে বাড়িটি থেকে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। তাদের কাছ থেকে যেসব বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে, পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল সেসব নিস্তেজ করে দিয়েছে।

মনিরুল বলেন, নিলুফা ভিলায় আগে থেকেই জঙ্গিদের আনাগোনা ছিল। ভগীরথপুরের অভিযানে নিহতরাও এ বাড়িটিতে আসত। নিলুফা ভিলার অবকাঠামো দুর্বল ছিল। তাই এ অভিযান খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।

দুইজন নিখোঁজ : নাজমুলের বোন মুক্তা বলেন, আমার দেবর হাফেজ ভূঁইয়ার সঙ্গে তার যে বন্ধু এসেছিল তার চেহারা ফর্সা-সুন্দর। মুখে কোনো দাড়ি ছিল না। নাজমুল প্রথকে তাকে আমার চাচার বাসা দেখায়। পরে আরও একাধিক বাসা দেখানো হয়। কিন্তু কোনো বাসাই তার পছন্দ হয় না। স্ত্রীর পর্দার কথা বিবেচনা করে বিল্লালের বাসা পছন্দ হয়।

পাঁচতলার দুই ইউনিটের ওই বাসার পঞ্চম তলার বামপাশের ফ্ল্যাটটি ৬ হাজার টাকায় ভাড়া নেন। বাসা ফাঁকা থাকায় ওই রাতেই তারা বাসায় উঠেন। মুক্তা আরও জানান, আমার ভাই কোনো অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত না।

আমাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, নাজমুলকে পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে। কিন্তু এখন তার বিষয়ে কোনো তথ্য পাচ্ছি না। ভাই জীবিত আছে নাকি মারা গেছে, তাও জানতে পারছি না। তাকে গ্রেফতার করা হলে, অন্তত দেখতে যাওয়ার অধিকার তো আমাদের আছে?

নাজমুলের বাসায় কথা বলার সময় তার মা হেলেনা বেগম কান্না করতে করতে মূর্ছা যাচ্ছিলেন। জ্ঞান ফেরার পর বলেন, আমার আর কোনো সন্তান নেই। একটিই মাত্র ছেলে। তার কী অপরাধ? তা জানতে চাই। যাদের জঙ্গি বলা হচ্ছে তাদের তো নাজমুল চিনত না। সে চিনত মুক্তার দেবরকে।

মুক্তার দেবরের সঙ্গে যদি জঙ্গিদের কোনো যোগাযোগ থেকে থাকে, তাহলে তাকে আইনের আওতায় আনা হোক। আমার নিরপরাধ ছেলেকে ছেড়ে দেয়া হোক। নাজমুলের বোন মুক্তা বলেন, সোমবার রাত ৯টার দিকে নাজমুল দোকান থেকে বাড়িতে আসেন।

এ সময় পাঁচতলা ওই বাড়ির মালিক তার মেয়ের জামাই আরিফের মাধ্যমে নাজমুলকে তার বাসায় ডেকে নেন। নাজমুল ওই বাসায় গিয়ে দেখেন সাদা পোশাকে বেশ কয়েকজন পুলিশ অবস্থান করছেন। তারা নাজমুলের পরিচয় জানার পর তার কাছ থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেন।

অপর নিখোঁজ হাফেজ ভূঁইয়ার বাবা নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ৮ ভাই ৩ বোনের মধ্যে হাফেজ হল ৫ম। তিনি ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার। বছরখানেক আগে তিনি পড়ালেখা শেষ করেছেন। আপতত তিনি বাড়িতে থাকেন। মুদি দোকান দেখাশোনা করতেন। পাশাপাশি চাকরি খুঁজছিলেন। বিদেশ যাওয়ার জন্য টাকাও জমা দিয়েছি। ৭-৮ দিন আগে চাকরির পরীক্ষা দিতে তিনি ঢাকায় গিয়েছেন। এরপর আর ফেরেননি। ৪-৫ দিন আগেও তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয়েছে। এরপর থেকে তার কোনো খবর পাচ্ছি না। আমার ধারণা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে ধরেছে। কিন্তু কোনো বাহিনী তার স্বীকার করছে না।

এ বিষয়ে নরসিংদীর এসপি সাইফুল্লাহ আল মামুন যুগান্তরকে বলেন, শেখেরচরে ২ জন নিহত ও নিলুফা ভিলায় দুইজন আত্মসমর্পণের বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি। এ বিষয়ে আমরা পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। নাজমুল এবং হাফেজের বিষয়টি আমরা এখনও অবগত হয়নি।

অন্যদিকে বুধবার দুপুরে শেখেরচর ভগীরথপুর চেয়ারম্যান মার্কেট এলাকায় মাজার রোডে গিয়ে দেখা যায়, মঙ্গলবারের অভিযান চালানো সেই বাড়িতে পুলিশি পাহারা বসানো হয়েছে। সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার পরও সেখানে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।

পরে ওই বাড়ির পাশে অবস্থিত নাজমুল ইসলামের বাড়িতে যাওয়া হয়। নাজমুল ইসলামের বাবা নূর ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, চার মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে সবার ছোট নাজমুল মুদি দোকানদার। শেখেরচরেই তার দোকান।

৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় মুক্তার দেবর হাফেজ ভূঁইয়া তার এক বন্ধুকে নিয়ে আমার বাসায় আসে। তখন নাজমুল দোকানে ছিল।

সে নাজমুলকে ফোনে বলেন, আমার এক বন্ধু নতুন বিয়ে করেছে। বন্ধুর স্ত্রী পর্দানশীল। জরুরিভিত্তিতে বাসা দরকার। একটি বাসা খুঁজে দিতে পারবেন? তখন নাজমুল জানায়, আপনি বাসায় থাকুন, আমি আসছি। আমাদের এলাকায় অনেক বাসা আছে। আপনার যেটি পছন্দ সেটিতেই উঠতে পারবেন।

দুই নারী জঙ্গির পরিচয় : পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, দুই নারী জঙ্গি এক সময়ে মিরপুরের জনতা হাউজিং এলাকায় থাকত। মৌসুমী ওরফে মৌ মিরপুরের ইসলামিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি পাস করে।

২০১২ সালে মিরপুর চিড়িয়াখানা রোডের বিসিআইসি কলেজ হতে জিপিএ-৪.৬০ পেয়ে এইচএসসি পাস করে।

২০১৩ সালে সে মানারাত ইউনিভার্সিটিতে ফার্মাসি বিভাগে অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়। জনতা হাউজিংয়ের একটি বাড়ির পঞ্চমতলায় একটি পরিবারের সঙ্গে সাবলেট হিসেবে থাকে খাদিজা আখতার ওরফে মেঘনা।

সে ২০১৩ সালে জিপিএ-৪.৭০ পেয়ে এইচএসসি পাস করে। ওই বছরই রোকনুজ্জামান নামে এক যুবকের সঙ্গে তার পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়।

রোকনুজ্জামান বর্তমানে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মাসি বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষে শিক্ষার্থী। গত ৫ অক্টোবর নিলুফা ভিলায় উঠে তারা। চার ইউনিটের সাততলা ভবনের সপ্তমতলার দুই রুমের ফ্ল্যাটে তারা থাকত বলে পুলিশ জানিয়েছে।

নিহত স্বামী-স্ত্রীর বাড়ি ঝিনাইদহে : কালীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, অপারেশন ‘গর্ডিয়ান নটে’ নিহত আবু আবদুল্লাহ আল বাঙ্গালী ও তার স্ত্রী আকলিমা আক্তার মনির বাড়ি ঝিনাইদহে। কালীগঞ্জ উপজেলার বেজপাড়া গ্রামের রবিউল ইসলামের ছেলে।

তার স্ত্রী ঢাকার গাজীপুর এলাকার শহিদুল ইসলামের মেয়ে। আবু আবদুল্লাহ সংগঠনে এ নাম ব্যবহার করতেন। পরিবার বা এলাকাবাসীর কাছে তিনি গোলাম মোস্তফা নামে পরিচিত।

জঙ্গি আত্মসমর্পণ নারী

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম