যুগান্তরের গোলটেবিল বৈঠক
ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বড় আকারে দেখা দিলেও মহামারী রূপ নেয়নি * জ্বর হলে অবহেলা না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে * জনগণকে সম্পৃক্ত ও সচেতন করার ওপর গুরুত্বারোপ * শুধু বর্ষা মৌসুমেই নয়, কাজ করতে হবে সারা বছরই * ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে যারা এখন সুস্থ তাদের গ্রামের বাড়ি যেতে সমস্যা নেই * মশা নিধনে বিদ্যমান সিস্টেমকে ঢেলে সাজাতে হবে
Advertisement
যুগান্তর রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০১৯, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। দোষারোপের সংস্কৃতি পরিহার করে এ ব্যাপারে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। গড়ে তুলতে হবে সব সংস্থা নিয়ে ‘সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা’ পদ্ধতি।
বৃহস্পতিবার যুগান্তর আয়োজিত ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতায় করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তারা আরও বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয়- সারা বিশ্বেই এখন ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে।
এর প্রাদুর্ভাব বড় আকারে দেখা দিলেও এখনও তা মহামারী রূপ নেয়নি। ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। শুধু মশার মৌসুমেই নয়, বছরব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সংস্থাসহ সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে কাজ করতে হবে। সমন্বিত মশক নিধন ব্যবস্থাপনাই পারে ডেঙ্গুর হাত থেকে আমাদের রক্ষা করতে।
বক্তারা আরও বলেন, যদি আমরা আগে থেকে সমন্বিত মশক নিধন ব্যবস্থাপনা করতে পারতাম, যেটা আমাদের দেশে খুবই দুর্বল, তাহলে এতটা বাড়তে পারত না। ডেঙ্গুতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই এমন পরামর্শ দিয়ে তারা বলেন, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া রক্ত পরীক্ষা এমনকি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন নেই।
ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে যেতে কোনো সমস্যা নেই বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনগণের সম্পৃক্ততার পাশাপাশি সচেতনতা বাড়ানোসহ বেশকিছু পরামর্শ দেন তারা।
যুগান্তরের বোর্ডরুমে অনুষ্ঠিত এ গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সাবেক মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও যুগান্তরের প্রকাশক অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি। প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক। অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য রাখেন যুগান্তর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাইফুল আলম।
গোলটেবিল বৈঠকে আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম, বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ, বিএমএর মহাসচিব এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল, আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন, কীটতত্ত্ববিদ ড. মঞ্জুর চৌধুরী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার, যুগান্তরের সহকারী সম্পাদক মাহবুব কামাল। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন যুগান্তরের উপসম্পাদক এহসানুল হক।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন- যুগান্তরের প্রধান বার্তা সম্পাদক আবদুর রহমান, ফিচার এডিটর রফিকুল হক দাদু ভাই ও সম্পাদকীয় বিভাগের প্রধান আসিফ রশীদ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আমাদের দেশে বড় আকারে দেখা দিয়েছে। ৫ বছর ধরে ডেঙ্গু কিছু না কিছু আঘাত করেছিল। শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বেই এখন ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে।
ফিলিপাইনে তো ৬শ’ জন মারা গেছেন। অন্যান্য দেশেও লাখ লাখ লোক আক্রান্ত হয়েছেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেশ সিঙ্গাপুরেও ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ছে।
মন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু মোকাবেলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের ডাক্তার-নার্সরা জীবনবাজি রেখে ২৪ ঘণ্টা কাজ করে যাচ্ছেন। এখন দেশের কোথাও কিট-এর অভাব নেই। কেউ অভিযোগ করতে পারবে না কিট-এর অভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, আমাদের দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা কিছুটা বাহবা পাওয়ার জন্য কথা বলব না। আমরা কতটুকু কাজ করতে পারছি সেটাই হল বড় বিষয়। সেটাই জনগণ দেখতে চায়।
ডেঙ্গু মোকাবেলায় সরকারের নেয়া পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, এ ঈদে ডাক্তার ও নার্সদের ছুটি বাতিল করেছি। উন্নত চিকিৎসার জন্য ডাক্তার ও নার্সদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী তারা কাজ করে যাচ্ছেন।
আমরা একটা বুকলেটও তৈরি করেছি। সেখানে ডেঙ্গু হলে করণীয় কী তা বলা আছে। সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে, এমনকি বেসরকারি হাসপাতালে আমরা পরীক্ষার জন্য একটি দাম নির্ধারণ করে দিয়েছি।
গণমাধ্যমে আমরা ডেঙ্গু সচেতনতায় বিজ্ঞাপন দিচ্ছি। জনগণ এ বিষয়ে সচেতন হচ্ছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছেন। আমার সঙ্গে বেশ কয়েকবার কথা হয়েছে। আমাদের কর্মকাণ্ডে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করে এ ব্যাপারে আরও সচেতনতা সৃষ্টির পরামর্শ দিয়েছেন।
জাহিদ মালেক বলেন, নতুন করে ডেঙ্গু রোগী যাতে না বাড়ে আমাদের সেই ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের দেখতে হবে কোথায় হাত দিলে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমবে। সেদিকে আমরা খেয়াল করছি। নতুন রোগীর জন্য আমরা চারটি হাসপাতাল প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়েছি।
সেখানে ৫-৭ হাজার রোগীর জায়গা দিতে পারব। ডাক্তার ও নার্সদের তালিকাও তৈরি করেছি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কতটুকু দায়িত্ব পালন করছে সেই বিচারের ভার আপনাদের ওপর ছেড়ে দিলাম।
তিনি বলেন, মশা মারার ওষুধ কার্যকরভাবে কাজ করেনি বলেই মশাগুলো ঠিকমতো মরেনি। লার্ভা তৈরি হচ্ছে। আমরা শুধু দেয়াল তৈরি করি। কিন্তু শুধু দেয়াল তৈরি করলে হবে না, যদি না শত্রু ধ্বংস না করি।
আগে শত্রু অর্থাৎ মশা মারতে হবে। মশা মারতে পারলে আর কিছু প্রয়োজন হবে না। মশারি দিয়ে তো দুনিয়া ঢাকা যাবে না। অফিস, আদালত এমনকি মসজিদে কি মশারি গায়ে দিয়ে যাওয়া সম্ভব। স্কুলে কি মশারি নিয়ে যেতে পারবে।
আসলে আমাদের প্রতিরোধ করতে হবে। মশা ও লার্ভা ধ্বংস করতে হবে। তবেই মানুষ মশার কামড় থেকে রেহাই পাবে। আগে থেকে আমাদের পরিকল্পনা করতে হবে। প্ল্যানিংয়ের অভাব ছিল। আমরা সিটি কর্পোরেশনগুলোকে সহায়তা করব।
কিন্তু আমাদের সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কাজগুলো ঠিকমতো হচ্ছে কিনা সেজন্য সুপারভিশন লাগবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেখানে যে রকম সহায়তা দরকার তা করবে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। শোকের মাসে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের শহীদদের পাশাপাশি ডেঙ্গুতে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন মন্ত্রী।
অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি : সভাপতির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি উপস্থিত সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, অনেক ব্যস্ততার মাঝে আপনারা কষ্ট করে এ অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ায় আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
আপনাদের উপস্থিতি প্রমাণ করে আপনারা যুগান্তরের সঙ্গে আছেন এবং আশা করি ভবিষ্যতেও থাকবেন। তিনি বলেন, আজ এমন একটি সময় আমরা এখানে উপস্থিত হয়েছি যখন সারা বিশ্বে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রায় ৩০ হাজার লোক ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। হাসপাতালগুলো রোগী জায়গা দিতে পারছে না কিন্তু তারপরও তারা চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন। ডাক্তাররা অনেক কষ্ট করছেন। প্রত্যেকটি ডিপার্টমেন্ট থেকে রোগীদের সহায়তা করা হচ্ছে।
প্রত্যেকে সচেতন ছিলেন। যার যার অবস্থান থেকে যতটুকু করণীয় আপনারা করছেন। যেসব সমস্যা ছিল তা সমাধানে কাজ করছেন। ওষুধসহ প্রয়োজনীয় জিনিস আনছেন। এটা একটা আশার কথা।
সঠিক সময়ে ওষুধ দেয়া সম্ভব হলে, যেখানে যা প্রয়োজন তা দেয়া হলে আক্রান্তের হার এত বেশি হতো না। আমরা কেউ এ সমালোচনায় পড়তাম না। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা খুবই ভালো।
এ পদক্ষেপ যাতে কোনোমতে পিছিয়ে না যায়, এটা যাতে সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হয় আমরা সেই প্রত্যাশাই করব।
সালমা ইসলাম বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বে এ রোগে মানুষ মারা যাচ্ছেন। আমাদের দেশে কিছু হলে আমরা দেখতে পাই এটা আতঙ্কের দিকে বেশি চলে যায়। এজন্য সময় দিতে হয় যাতে আতঙ্কটা তৈরি না হয়। সরকারকে এ ব্যাপারে সময় দিতে হবে।
এটা আজই শেষ হয়ে যাচ্ছে না। আমরা জানি, বছরে কয়েক মাস এ মশার প্রাদুর্ভাব বেশি থাকে। সামনে যাতে কেউ মারা না যান, সেদিকে নজর দিতে হবে।
তিনি বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী এত সচেতন যে রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা যেভাবে তিনি খোঁজখবর রাখছেন তা প্রশংসাযোগ্য। কোথায় কি হচ্ছে, না হচ্ছে সবকিছু তিনি খোঁজ রাখছেন। অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে আজ যে জায়গায় নিয়ে এসেছেন সে জন্য তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই। যুগান্তরের পক্ষ থেকে তার রোগমুক্তির জন্য দোয়া কামনা করছি। সুস্থ হয়ে অতি দ্রুত যাতে আমাদের মাঝে ফিরে আসেন।
সাইফুল আলম : বৈঠকের সূচনা বক্তব্যে যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাইফুল আলম বলেন, এখন ডেঙ্গুর বিষয়টিই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। সবচেয়ে আলোচিত ও উৎকণ্ঠার বিষয় হচ্ছে এটি। এ রোগ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী তা জানতেই এ আলোচনার আয়োজন করা হয়েছে।
আশা করি, এটা সবার জন্যই কাজে আসবে। গোলটেবিল আলোচনায় উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, একটি পত্রিকা হিসেবে যুগান্তরের সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। এ দায় থেকেই ডেঙ্গুর ভয়াবহতা সম্পর্কে দেশবাসীকে সচেতন করতে এ বৈঠক।
সমাপনী বক্তৃতায় তিনি বলেন, জয় আমাদের সব সময় হয়েছে, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধেও হবে। আমরা চাই, ডেঙ্গুতে যেন আর একটি প্রাণও ঝরে না যায়।
মো. আতিকুল ইসলাম : ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান যে সিস্টেম রয়েছে, সেটা যথেষ্ট কার্যকর নয়। এজন্য এ সিস্টেমকে ঢেলে সাজাতে হবে। সারা বছরই গবেষণা করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নিয়ে একটি ‘সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি’ গড়ে তুলতে হবে। আর নগরবাসীকে এ বিষয়টি অভ্যস্ত হতে হবে ‘তিন দিনে, এক দিন জমা পানি ফেলে দিন।’
তিনি বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বিদ্যমান সক্ষমতা খুবই কম। একটি ওয়ার্ডে যেখানে আড়াই থেকে তিন লাখ লোকের বসবাস, সেখানে মশক নিধন কর্মী রয়েছেন মাত্র পাঁচজন। মনিটরিং সিস্টেমও কার্যকর নেই।
মশক নিধন কর্মীদের মনিটরিং সিস্টেম সক্রিয় করতে জিপিএস সিস্টেম চালু করা হয়েছে। বর্ষার মৌসুমে শুধু ডেঙ্গু নিয়ে ভাবলে চলবে না। এ জন্য সারা বছরই কাজ করতে হবে। এখন থেকেই আগামী বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে হবে।
উত্তর সিটির মেয়র বলেন, মশার ওষুধ আমদানির ক্ষেত্রে একটি চক্র গড়ে উঠেছিল, তা ভেঙে দেয়া হয়েছে। উত্তর সিটির ৫৪টি ওয়ার্ডে ৫৪ জন উপসচিবের নেতৃত্বে- স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, কাউন্সিলর এবং উত্তর সিটির একজন সদস্যকে নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছেন।
তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মশার লার্ভা আছে কিনা যাচাই-বাছাই করে দেখছেন। কোনো বাড়িতে লার্ভা পাওয়া গেলে সেই বাসায় লিখে দিচ্ছেন, এ বাসায় মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। ৪ দিন পর আবার সেই বাসা পরিদর্শন করা হচ্ছে, সে সময় মশার লার্ভা পাওয়া গেলে, তাদের জরিমানা করা হচ্ছে।
আতিক বলেন, দুর্যোগ নামার আগে আমাদের প্রস্তুত হতে হবে। কিন্তু আমাদের জনবল ও যন্ত্রপাতির সংকট রয়েছে। সংস্থাগুলোতে পর্যাপ্ত সংখ্যক কীটতত্ত্ববিদ নিয়োগ করতে হবে এবং এ সংক্রান্ত গবেষণা করতে হবে।
অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ : স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমরা কি করেছি, কি করিনি, এখন সেসব বিতর্কে যাওয়ার কোনো দরকার নেই। অতীতের বিষয়গুলো নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করলে সময় নষ্ট হবে, এর কোনো মানে হয় না।
তিনি বলেন, মশক নিধনের দায়িত্ব এক সময় স্বাস্থ্য বিভাগের ছিল, এখন এটা স্থানীয় সরকার বিভাগের কাজ। বিদ্যমান অবস্থায় স্থানীয় সরকার বিভাগের মশক নিধনের সক্ষমতা নেই। সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হলে স্থানীয় সরকার বিভাগকে এ সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। আগস্ট শোকের মাস, এ শোককে শক্তিতে পরিণত করে আমরা বলতে চাই- নাই ভয়, নাই ভয়, ডেঙ্গুকে করব জয়।
অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও ভাইরোলজি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, যেসব শিশুর বয়স ১ বছরের কম বা ৭ মাস তাদের জন্য ডেঙ্গু ভাইরাস খুবই মারাত্মক। এ ধরনের কোনো শিশুর জ্বর বা শরীর ব্যথা হলে তার ডেঙ্গু টেস্ট করতে হবে। কেননা, এরা খুবই দুর্বল হওয়ায় প্রাইমারি ইনফেকশনে এসব শিশু মারা যেতে পারে।
অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ : ডেঙ্গুতে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গু নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। এগুলো দূর করতে হবে। এটা আতঙ্কের রোগ নয়। যদি সময়মতো চিকিৎসা নেয়া সম্ভব হয় তাহলে মৃত্যুর আশঙ্কা নেই।
ডেঙ্গু মহামারী নয়, আমরা সর্বোচ্চ বলতে পারি- ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। তারপরও মানুষ আতঙ্কিত কেন। এর অন্যতম কারণ মশার মতো একটি ক্ষুদ্র প্রাণীর কামড়ে মরে যাবে- এটা মানুষ মেনে নিতে পারছে না। অনেকে জ্বর হলেও পাত্তা দেয় না। কিন্তু হঠাৎ সে সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছে। কারণ, এবার ধরনটা পাল্টে গেছে। সে জন্য এ মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।
তিনি বলেন, যে কোনো জ্বর হলেই অবহেলা করবেন না। ডাক্তারের একটা পরামর্শ নিয়ে রাখবেন। ডাক্তার প্রয়োজন মনে করলে পরীক্ষা করে হাসপাতালে ভর্তি করাবেন। তাই জ্বর হলে ঘরে বসে থাকবেন না, এটা জরুরি। কারও যদি ডেঙ্গুজ্বর হয়েও থাকে, হাসপাতালে ভিড় না করে তাদের নব্বই ভাগই ঘরে বসে চিকিৎসা নিতে পারেন। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া প্যারাসিটামল বাদে কোনো ওষুধ খাওয়া যাবে না। তবে কারও বমি হওয়া, রক্ত পড়া, প্রচণ্ড ব্যথা, হার্ট, কিডনি, লিভারের সমস্যা থাকলে কিংবা গর্ভবতী হলে তাদের অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।
তিনি বলেন, সামনে ঈদ আসছে। এ নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি রয়েছে। মানুষজন বাড়ি যাবে কিনা। এ মুহূর্তে এটা খুব বার্নিং ইস্যু। কারও যদি মনে হয় তার ডেঙ্গুজ্বর হয়েছে তাদের না যাওয়াই ভালো। কারণ, ডেঙ্গু আক্রান্তরা গ্রামে গিয়ে হয়তো সঠিক চিকিৎসা নাও পেতে পারেন।
তবে যিনি ইতিমধ্যে আক্রান্ত হয়ে ভালো হয়ে গেছেন তাদের যেতে কোনো সমস্যা নেই। পাঁচ লাখ লোক গ্রামে যাবেন- এটা সারা দেশে ছড়িয়ে দেবে বলে যে শঙ্কা করা হচ্ছে এটা সঠিক নয়। বাড়ি যাওয়া নিয়ে কোনো বিভ্রান্তির অবকাশ নেই। সবাই নির্ভয়ে বাড়ি যেতে পারেন।
অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। নারকেল তেল ও পেঁপে পাতার রস খাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এগুলোর বৈজ্ঞানিক কোনো ব্যাখ্যা নেই। নাকে তেল দিয়ে ঘুমান কিন্তু তার আগে প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিতে হবে। মশারি টানানো, স্প্রে দেয়া, লম্বা জামা পরা, মোজা পরা- এগুলো বাদ দিয়ে শুধু নাকে তেল দিয়ে ঘুমাবেন না।
ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল : বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল বলেন, একে অন্যকে দোষারোপ না করে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। কে কি করবে, সেটা বিষয় নয়; আমি কি করছি, সেটা বিষয়।
নিজ বাড়ির আঙ্গিনা ও আশপাশের এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। তিনি বলেন, সবাইকে সজাগ হতে হবে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের উচিত, জনগণকে শান্ত থাকার পরামর্শ দেয়া।
মুশতাক হোসেন : আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন বলেন, মশক নিধনে চারটি কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। প্রথমত, যে কোনো রোগীকে চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে। জনগণের উদ্বেগ কমানোর ৮০ ভাগ ক্ষমতা আমাদের আছে।
দ্বিতীয়ত, ডেঙ্গু আক্রান্ত এলাকার যে কোনো জ্বরের রোগীকে মশা থেকে দূরে রাখতে হবে। তৃতীয়ত, ঈদের সময়ও রিপোর্টিং করতে হবে। রোগী কত কমল বা বাড়ল, সেটা ঠিক করতে হবে। চতুর্থত, জাতীয় জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যায় সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
ড. মঞ্জুর চৌধুরী : কীটতত্ত্ববিদ ড. মঞ্জুর চৌধুরী বলেন, অবজেকটিভ চেঞ্জ করতে হবে। ডেঙ্গুর বাহক ছড়ায়, এমন সক্ষম মশা মারার ব্যবস্থা করতে হবে। মশারি, নেট শুধু রোগীকে দিতে হবে তা নয়, সবাইকে এটার ব্যবস্থা করতে হবে।
অধ্যাপক কবিরুল বাশার : অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, এ বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি। যদি আমরা আগে থেকে সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা করতে পারতাম, তাহলে এতটা বাড়তে পারত না। তিনি বলেন, নগর ভবনের মশক নিয়ন্ত্রণ সেল শক্তিশালী করতে হবে। যারা মশার আচরণ জানবে, তাদের দায়িত্ব দিতে হবে। যারা মশা চেনে তারা নগর ভবনে নেই।
মাহবুব কামাল : যুগান্তরের সহকারী সম্পাদক মাহবুব কামাল বলেন, ডেঙ্গু মহামারীকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করা যেতে পারে। বেসামরিক বাহিনীর সঙ্গে সামরিক বাহিনীকেও যুক্ত করা যেতে পারে। দোষারোপের রাজনীতি থেকে বাঁচতে সর্বদলীয় ঐক্য গঠন করা যেতে পারে।
