গণহত্যা নিয়ে আইসিজেতে শুনানি আজ

মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিকভাবে বয়কটের ডাক

হেগসহ বিশ্বব্যাপী প্রচার চালাচ্ছে ৩০ সংগঠন * নির্যাতিতদের বিপক্ষে শুনানিতে দাঁড়াচ্ছেন সু চি * রাখাইন ও শান রাজ্যের নির্যাতিতদের বিচার দাবি

  যুগান্তর ডেস্ক ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিকভাবে বয়কটের ডাক দিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রচারে নেমেছে ৩০টি মানবাধিকার সংগঠন। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে (আইসিজে) রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলা শুনানির আগে সোমবার এ আহ্বান জানানো হয়।

নেদারল্যান্ডসের হেগে স্থানীয় সময় আজ গাম্বিয়ার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুনানি শুরু হবে। মিয়ানমারের হয়ে শুনানিতে অংশ নেবেন স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি। তার পক্ষে দেশটিতে র‌্যালি করেছে সরকারপন্থীরা।

অপরদিকে রাখাইন রাজ্যে নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও শান রাজ্যের ১৭টি সংগঠন মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিচার দাবি করে বিবৃতি দিয়েছে।

বিবিসি ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১১ নভেম্বর অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশনের (ওআইসি) হয়ে গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করে। রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচারের দাবিতে আইসিজেতে মামলাটি হয়।

মামলার বাদীপক্ষ গাম্বিয়ার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মঙ্গলবার শুনানি শুরু হচ্ছে। চলবে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। বুধবার হবে মিয়ানমারের শুনানি, যাতে অংশ নেবেন নোবেলজয়ী অং সান সু চি।

এরপর বৃহস্পতিবার সকালে গাম্বিয়া এবং বিকালে মিয়ানমার প্রতিপক্ষের যুক্তি খণ্ডন ও চূড়ান্ত বক্তব্য পেশ করবে।

গাম্বিয়ার পক্ষে শুনানিতে অংশ নেবেন দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইনমন্ত্রী আবুবকর মারি তামবাদু। রুয়ান্ডা গণহত্যার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা পরিচালনার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ তামবাদু।

তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ যুক্তরাজ্যের প্রফেসর ফিলিপ স্যান্ডসসহ বিশ্ব পরিসরে নেতৃস্থানীয় কয়েকজন আইনজ্ঞের শুনানিতে অংশ নেয়ার কথা রয়েছে।

গাম্বিয়া ও মিয়ানমারের পাশাপাশি বাংলাদেশ এবং কানাডার প্রতিনিধিরা শুনানির সময় পিস প্যালেসে থাকবেন। বাংলাদেশ-কানাডার পাশাপাশি নেদারল্যান্ডস নেপথ্যে থেকে গাম্বিয়াকে সহযোগিতা করবে।

কানাডা ও নেদারল্যান্ডসের পক্ষ থেকে সোমবার দেয়া এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গণহত্যায় দায়ীদের বিচার নিশ্চিতে গাম্বিয়ার এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই এবং এর প্রতি আমাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর কয়েক দশক ধরে নির্যাতন চালানো হচ্ছে। সর্বশেষ গণহত্যা, ধর্ষণ, জ্বালাও-পোড়াও, লুটপাট, বাস্তুচ্যুতের ঘটনা বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে। নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের রক্ষা করতে হবে।

আইসিজেতে বিচারের মাধ্যমে গণহত্যায় দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিতে কানাডা ও নেদারল্যান্ডস সচেষ্ট। অন্য সব দেশকে এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।

মামলার শুনানি শুরুর আগেই মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিকভাবে বয়কট করার আহ্বান জানিয়ে প্রচার শুরু হয়েছে। দেশটির রোহিঙ্গা মুসলিমদের সমর্থনকারী মানবাধিকার কর্মীরা বিশ্বব্যাপী এ প্রচার চালাচ্ছেন।

‘বয়কট মিয়ানমার ক্যাম্পেইন’ শীর্ষক এক বিবৃতিতে ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশন বলছে, রোহিঙ্গা অধিকার কর্মীরা যে ‘গ্লোবাল বয়কট মুভমেন্ট’ শুরু করেছেন তাতে কর্পোরেশন, বিদেশি বিনিয়োগকারী, পেশাজীবী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে মিয়ানমারের সঙ্গে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

১০টি দেশের শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী সংগঠন ও ৩০ মানবাধিকার কর্মী একযোগে এ প্রচার শুরু করেছে। এর উদ্দেশ্য মিয়ানমারের সু চি ও সেনাবাহিনীর কোয়ালিশন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা।

জার্মানিভিত্তিক ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও ‘গ্লোবাল বয়কট মুভমেন্ট’র অন্যতম উদ্যোক্তা নে সাং লুইন বলেন, জাতিসংঘের তথ্য অনুসন্ধান মিশন পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেয়ার নীতি গ্রহণ করেছে মিয়ানমার।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মুভমেন্ট শুরু হয়েছে একটি অনলাইন পিটিশন অভিযানের মাধ্যমে, যেখানে নরওয়ের নোবেল কমিটিকে অং সান সু চির নোবেল পুরস্কার বাতিলের আহ্বান জানানো হয়েছে।

ক্যাম্পেইনের উদ্যোক্তাদের মধ্যে ফরসিয়া কো, রেস্টলেস বিইংস, ডেস্টিনেশন জাস্টিস, রোহিঙ্গা হিউম্যান রাইটস নেটওয়ার্ক অব কানাডা, রোহিঙ্গা হিউম্যান রাইটস ইনিশিয়েটিভ অব ইন্ডিয়া ও এশিয়া সেন্টার রয়েছে।

তারা নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সোমবার র‌্যালি করে। প্রচারে অংশ নেয়া যুক্তরাষ্ট্রে ফ্রি বার্মা আন্দোলনের সূচনাকারী মিয়ামনারের মানবাধিকার কর্মী ড. মং যারনি বলেন, আমি একজন বার্মিজ ও বুদ্ধিস্ট। আমি পরিষ্কারভাবে মিয়ানমারকে বয়কট করার এ ক্যাম্পেইনকে সমর্থন করছি।

মিয়ানমারের সংবাদ মাধ্যম ইরাবতী বলছে, এদিন মিয়ানমারের রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সু চি ও সামরিক বাহিনীর সমর্থনে র‌্যালি বের করে সরকারপন্থীরা।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি নেইপিদোতে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট উইন মিন্তের সঙ্গে বৈঠক করেন সফররত চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই।

তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ এ সংকট মোকাবেলায় মিয়ানমারকে সহায়তা করবে চীন। পরিস্থিতির উন্নয়নের পথ বের করতে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংকট সমাধানেও মিয়ানমারের পাশে থাকবে।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতার মাধ্যমে এ সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। সফরে তিনি অং সান সু চির সঙ্গেও বৈঠক করেন। এরপরই দ্য হেগের উদ্দেশে রওনা হন সু চি।

এদিকে আইসিজেতে নির্যাতনকারীদের বিচার দাবি করেছেন নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গারা। কক্সবাজারের আশ্রয় শিবিরে অবস্থান করা রোহিঙ্গা নারী-পুরুষদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

তারা সবাই মিয়ানমার সরকার ও সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের বিচার দাবি করেন। নির্যাতনের মুখে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা রাখাইন রাজ্যে তাদের ওপর চালানো গণহত্যা, ধর্ষণ, জ্বালাও-পোড়াও, লুটপাটের ভয়াবহ বর্ণনা দেন।

এর আগে আসা আরও চার লাখসহ ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। তাদের অধিকাংশই নির্যাতনের বর্ণনা দেন। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তির অনুসন্ধানেও তা উঠে এসেছে। তারা বলছেন, নির্যাতনের স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে।

মিয়ানমার সরকার কখনোই এর দায় এড়াতে পারে না। দায়ীদের উপযুক্ত বিচার ও রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করা হোক। আমরা আমাদের ভিটায় ফিরতে চাই। নাগরিকত্ব, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ মানবিক সুযোগ-সুবিধা চাই।

পরিবারের সদস্যদের হত্যা ও গণধর্ষণের বিচার চেয়েছেন নূর আলম, মোহাম্মদ জোবায়ের, মোহাম্মদ রশিদসহ উখিয়ার আশ্রয় শিবিরে থাকা বিভিন্ন রোহিঙ্গা পুরুষ।

রাখাইনে তাদের বাপ-ভাই-সন্তানদের গুলি করে হত্যা ও মা-বোন-স্ত্রীদের ধর্ষণ করে মিয়ানমারের সেনা সদস্যরা। যৌন নির্যাতনের শিকার এবং স্বামী-সন্তান হারানো মমতাজ বেগম ও জামালিদা বেগমও কান্নাজড়িত কণ্ঠে নির্যাতনকারীদের কঠোর বিচার দাবি করেন।

মিয়ানমার টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের শান রাজ্যের ১৭টি সংগঠন সোমবার এক বিবৃতিতে রোহিঙ্গা গণহত্যায় দায়ীদের বিচার দাবি করে। তারা বলছেন, নির্যাতনে জড়িত মিয়ানমার সরকার ও সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের উপযুক্ত বিচার হওয়া উচিত।

নয়তো এ ধরনের ঘটনা বাড়তেই থাকবে। শুধু রাখাইনেই নয় শান রাজ্যেও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর বর্বর নির্যাতন চালিয়েছে সামরিক বাহিনী। এখনও তাদের নির্যাতন থামেনি।

রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার হলে ভবিষ্যতে অন্যান্য নির্যাতনের বিচারেরও পথ খুলবে। বিশ্ববাসীর এখনই এসব নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো উচিত।

বিবৃতি দেয়া সংগঠনগুলোর মধ্যে শান হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, শান স্টেট রিফিউজি কমিটি, কং মং মুড়ং আইডিপি ক্যাম্প কমিটি ও লোই তাই লেয়াং আইডিপি ক্যাম্প কমিটি রয়েছে।

আইসিজেতে শুনানিতে সরাসরি কোনো পক্ষ না হলেও গাম্বিয়াকে লজিস্টিক সহায়তা দেবে বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয়) মাসুদ বিন মোমেন এক প্রতিনিধি দল নিয়ে দ্য হেগে পৌঁছেছেন।

২০ সদস্যের ওই প্রতিনিধি দলে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া তিন রোহিঙ্গাও রয়েছেন। দলে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিকেও রাখা হয়েছে।

তারা তথ্য-উপাত্ত নিয়ে রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার শুনানিতে উপস্থিত থাকবেন। কর্মকর্তারা জানান, আদালতে রোহিঙ্গাদের আসার প্রেক্ষাপট নিয়েই বেশি বিতর্ক হতে পারে, সে ক্ষেত্রে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের বক্তব্য এবং তথ্য-প্রমাণ প্রস্তুত রেখেছে বাংলাদেশ।

জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত এ সম্পর্কিত কমিশনের রিপোর্টসহ সংশ্লিষ্ট সব নথি গাম্বিয়াকে সরবরাহ করবে বাংলাদেশ। এ ছাড়া কানাডা ও নেদারল্যান্ডসও নেপথ্য থেকে গাম্বিয়াকে সহায়তা দেবে।

ঘটনাপ্রবাহ : রোহিঙ্গা বর্বরতা

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত