ঋণের কিস্তি ও সুদহার স্থগিত করা জরুরি: প্রধানমন্ত্রীর কাছে শিল্প উদ্যোক্তাদের দাবি

পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত চলতি দায়দেনা ব্লক করতে পারলেই প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্যাকেজ আরও কার্যকর হবে -ব্যবসায়ী নেতারা * ভালো উদ্যোক্তারা খেলাপি হয়ে গেলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু রাখা কঠিন হবে -বিশেষজ্ঞদের অভিমত

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৬ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোববার গণভবন থেকে প্রেস কনফারেন্সে বক্তব্য রাখেন। ছবি: পিআইডি

করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ অবশ্যই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। কিন্তু এ মুহূর্তে সবার আগে প্রয়োজন শিল্প উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীদের চলতি ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো।

একই সঙ্গে ঋণের বিপরীতে সুদ আরোপ স্থগিত করে মূল ঋণসহ আরোপিত সুদ একটি ব্লক অ্যাকাউন্টে কমপক্ষে এক বছরের জন্য নিয়ে যাওয়া। তাহলে এর ওপর আর সুদ আরোপিত হবে না। ফলে ঋণের অঙ্ক বাড়বে না। এর ফলে একদিকে উদ্যোক্তাদের চলতি ঋণ যেমন খেলাপি হবে না, তেমনি প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্যাকেজের আওতায় নতুন ঋণ সুবিধা পেতে সমস্যাও হবে না। কিন্তু এ ঘোষণা না এলে বেশির ভাগ শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু করাই সম্ভব হবে না।

বেশ কয়েকজন শিল্প উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা এবং কয়েকজন বিশেষজ্ঞ রোববার যুগান্তরের কাছে এমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

তারা বলেন, প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণ ও আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ নিঃসন্দেহে একটি সঠিক সিদ্ধান্ত। এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়োপযোগী সাহসী উদ্যোগ। এজন্য সরকারপ্রধানকে আমরা অবশ্যই ধন্যবাদ জানাই এবং তার প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু এখানে কয়েকটি বৈশ্বিক প্রভাবের সরল অঙ্ক আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিতে হবে। প্রথমত, করোনা প্রভাবের কারণে বিশ্বজুড়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবে হ্রাস পাবে। একেবারে অপরিহার্য জিনিস ছাড়া মানুষ এখন তার ফ্যাশনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাহিদার লাগাম টেনে ধরবে। বাজেট কাটছাঁট করবে। এর ফলে বেশিরভাগ শিল্পপ্রতিষ্ঠান আগের মতো সহসা পণ্য উৎপাদনে অর্ডার বা কার্যাদেশ পাবে না। এছাড়া সেভাবে চাহিদা না পেলে অনেকে ফ্যাক্টরি চালু করার ঝুঁকি নেবে না। কেউ কেউ চালু করলেও সীমিত আকারে করবেন। এই নেতিবাচক প্রভাব শুধু রফতানিমুখী শিল্পের ক্ষেত্রে নয়, সব ক্ষেত্রেই পড়বে। প্রতিটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মাথার ওপর এখন এই ‘করোনা খক্ষ’ ঝুলছে।

দ্বিতীয়ত, আল্লাহর রহমতে যদি এ সংকট দ্রুত কেটেও যায়, তাহলে শিল্প উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হল- ব্যাংকের চলতি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করার বাধ্যবাধকতা। কিন্তু ফ্যাক্টরি যেহেতু বন্ধ, সেহেতু ফ্যাক্টরি থেকে মালিকদের নিয়মিত আয়ের পথও বন্ধ। বিপরীতে ব্যয়ের হিসাব থেমে নেই। ব্যয়ের চাপ প্রবল। সেক্ষেত্রে বেশিরভাগ শিল্পমালিক শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের দায়দেনা পরিশোধ করতে পারবেন না। ফলে বিরূপ পরিস্থিতির কারণে অনেকে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হবেন।

তৃতীয়ত, এ অবস্থায় কোনো ঋণখেলাপি ব্যক্তি যদি ব্যাংকের কাছে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল বা চলতি মূলধন হিসেবে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত বিশেষ প্যাকেজের ঋণ চান, তাহলে তার এই ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। কেননা ঋণ দেয়া হবে ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে। সঙ্গত কারণে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত বিশেষ প্যাকেজের ঋণ পেতে হলে শর্ত হিসেবে ব্যাংক আগে বলবে, খেলাপি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে। সেটি যেহেতু তার পক্ষে সম্ভব হবে না, সেহেতু সরকারের আপৎকালীন এই ঋণ সুবিধা থেকে তিনি বঞ্চিত হবেন।

চতুর্থত, শ্রমিক-কর্মচারীদের চাকরি সুরক্ষাসহ নিয়মিত বেতন-ভাতা পরিশোধের আলোচনা তখনই কার্যকর হবে, যখন সংশ্লিষ্ট মিল বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান ভালোভাবে চালু রাখা সম্ভব হবে। এই সংকটের কারণে উৎপাদনের কার্যাদেশ না পেলে এবং খেলাপি ঋণের বোঝা ঘাড়ের ওপর চেপে বসলে এক পর্যায়ে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার বিষয় গৌণ হয়ে পড়বে। কেননা মিল বন্ধ রেখে একজন মালিক কতদিন শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে পারবে। সেটি অবশ্যই প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয়।

তাই শিল্প উদ্যোক্তাসহ বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এ বিষয়ে একটি পৃথক বা সংযোজিত ঘোষণা আসা খুবই জরুরি। সেটি হল, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কিংবা কমপক্ষে আগামী এক বছর পর্যন্ত ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের চলতি ঋণের কিস্তি ও সুদের হিসাব লক বা স্থগিত থাকবে। এক বছরের সুদ মওকুফ করলে সবচেয়ে ভালো হবে। এজন্য সরকার ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় লাইফ লাইন সৃষ্টি করবে বা সাপোর্ট দেবে।

এদিকে বিশ্লেষকদের কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত এই ঋণ সহায়তাকে ব্যাংকনির্ভর প্যাকেজ হিসেবে দেখছেন। তারা যুগান্তরকে বলেন, যদিও এই প্যাকেজের বহুমুখী ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে, তথাপি এই ঋণ সুবিধা দেয়ার জন্য বাংকগুলোকে আগে তার তারল্য প্রবাহ ঠিক করতে হবে। কিন্তু আমরা তো ব্যাংকিং সেক্টরের চলমান দুরবস্থার কথা তো জানি। বেশিরভাগ ব্যাংক তারল্য সংকটের তীব্র জ্বরে আক্রান্ত। তারা বলছেন, এমনিতে একশ্রেণির ব্যাংক লুটেরাদের কারণে দিন দিন খেলাপি ঋণ বাড়ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে টাকা পাচার। তাই নতুন এই সংকট মোকাবেলা করতে গিয়ে যদি দেশের ভালো মান অর্জনকারী শিল্প উদ্যোক্তাদের খেলাপির পথে ঠেলে দেয়া হয়, তাহলে শিল্প প্রতিষ্ঠান চালু রাখা কঠিন হবে।

এ প্রসঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম রোববার যুগান্তরকে বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে কোনো শিল্প উদ্যোক্তা ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারলে আগামী জুন পর্যন্ত খেলাপি না করার নির্দেশ সব ব্যাংককে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এটি স্বল্প সময়ের জন্য হলেও তা করা হয়েছে। এরপর আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করব। তিনি আরও বলেন, এই সুবিধা ভোগ করার পরও খেলাপি হবে এমন ধারণা থাকা ঠিক নয়। উদ্যোক্তাদের এখন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সুবিধাগুলো প্রসঙ্গে বিস্তারিত জেনে নিতে হবে। তিনি মনে করেন, আলোচনার মাধ্যমে অনেক সমস্যার সমাধান হবে। এক প্রশ্নের জবাবে সিনিয়র সচিব বলেন, সৃষ্ট সংকট নিরসনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে। খেলাপি যাতে না হয় সে ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, যিনি এখন খেলাপি নন, তিনি ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি মুক্ত থাকতে পারবেন। যেমন- প্রথমে করোনার ক্ষতি বাবদ ছয় মাস, পরে খেলাপি নির্ণয়ে পদ্ধতিগত ছয় মাস, সব মিলিয়ে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি মুক্ত থাকার সুযোগ পাবেন একজন ভালো গ্রাহক।

পলিসি রিসার্স ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর যুগান্তরকে বলেন, প্রণোদনার প্যাকেজটি ইতিবাচক। এ প্রণোদনা থেকে কোনোভাবেই যাতে এখন যারা ঋণখেলাপি তাদের যাতে কোনো সুবিধা দেয়া না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। কেননা ঋণখেলাপিদের এ প্যাকেজ থেকে নতুন করে অর্থ দিলে এর মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, এই সংকটময় মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়ানোয় তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। তবে শিল্পের জন্য আরও দু-একটি বিষয়ে খেয়াল রাখা দরকার। যেমন- এই আপৎকালীন মুহূর্তে ব্যাংক ঋণের কিস্তি ও সুদ এক বছরের জন্য স্থগিতের নির্দেশনা আসা উচিত। এ বিষয়ে বিটিএমএ বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন জানিয়েছে। জুলাই পর্যন্ত ঋণের কিস্তি মওকুফ করলেও সুদের ক্ষেত্রে কি হবে তা স্পষ্টীকরণ দরকার। যদি চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ ব্যবসায়ীর ওপর জেঁকে বসে তাহলে এই সংকটময় পরিস্থিতিতে তা অনেক ব্যবসায়ী দিতে পারবে না। ফলে খেলাপি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে। আর খেলাপি হলে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্যাকেজের অর্থ পাওয়া দুষ্কর হবে।

বিকেএমইএ’র জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আগামী ১ বছরের জন্য ঋণের কিস্তি এবং সুদ মওকুফ করে সরকারকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া উচিত। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক ৬ মাসের ঋণের কিস্তি পরিশোধের শর্ত শিথিল করে যে সার্কুলার জারি করেছে তাতে সুদের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। এতে কিস্তি দেয়া থেকে ছাড় পেলেও ওভারডিউ সুদ চক্রবৃদ্ধি হারে ব্যবসায়ীদের ঘাড়ে বিশাল বোঝা হিসেবে চেপে বসবে, যা বহন করা বর্তমান প্রেক্ষাপটে কোনো ব্যবসায়ীর পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। তবে তার সুফল পেতে হলে এসব বিষয় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

জানতে চাইলে সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এম কামাল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত কাউকে জুন পর্যন্ত খেলাপি করা হবে না। তবে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে ঠেকে তা এখনও বলা যাচ্ছে না। হয়তো এ সুবিধা আরও বাড়াবে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রয়োজনে বাড়ানো উচিত।

 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত