বাংলাদেশে অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার মতো কাজ হচ্ছে
jugantor
করোনা প্রসঙ্গে যুগান্তরকে ডা. লি ওয়েন ঝিও
বাংলাদেশে অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার মতো কাজ হচ্ছে

  তোহুর আহমদ  

২০ জুন ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সফররত চীনের করোনাভাইরাস বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান ডা. লি ওয়েন ঝিও বলেছেন, বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি এখন ভিন্নমাত্রা পেয়েছে। ভাইরাসটি কোথায় আছে আর কোথায় নেই তা জানা দুষ্কর।

এখানে কাজ হচ্ছে অনেকটা অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার মতো। এভাবে ভাইরাস মোকাবেলা করা সত্যি কঠিন। আমরা মনে করি, যদি কার্যকর লকডাউন, দ্রুত পরীক্ষা, কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং ও চিকিৎসার পরিধি বাড়ানো যায় তবে উত্তরণ সম্ভব। চীনের বিশেষজ্ঞ দলটি বর্তমানে বাংলাদেশ সফর করছে।

ডা. লি ওয়েন ঝিও তার দেশের চিফ ফিজিশিয়ান এবং ডেপুটি ডিজি। ভাইরাস উপদ্রুত চীনের উহানে প্রধান কোভিড হাসপাতালের ইনচার্জ হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। রোগীদের চিকিৎসা দেয়া থেকে শুরু করে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চীনের গৃহীত পরিকল্পনার সঙ্গে তিনি প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। ১০ সদস্যবিশিষ্ট চীনা প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। অপর সদস্যরা হলেন, নিউরো সার্জারি বিশেষজ্ঞ ঝাও জিয়াননং, জনস্বাস্থ্য ও মহামারী বিশেষজ্ঞ ওয়্যাং ড্যান, হাসপাতাল সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ ঝিয়ান ইউ সু মিং, সংক্রামক ওষুধ বিশেষজ্ঞ উ তাও, ক্লিনিক্যাল ল্যাবরেটরি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ লিউ লিং লি, ইমার্জেন্সি ও ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ঝ্যাং হ্যান হং, শ্বাসতন্ত্র ও জরুরি ওষুধ বিশেষজ্ঞ লিউ জিয়াও রান, ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনের ক্যাং ফু ঝিন ও ক্রিটিক্যাল কেয়ারিং বিশেষজ্ঞ লিউ হেই ট্যাং। সফর শেষে ২২ জুন প্রতিনিধি দলটি চীনে ফিরে যাবে।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে ডা. লি ওয়েন ঝিওর সঙ্গে যোগাযোগ করে যুগান্তর। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে লিখিত প্রশ্ন পাঠানোর অনুরোধ জানান। ১৫ জুন তার কাছে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলে তিনি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে যুক্ত ইন্টারপ্রেটরের মাধ্যমে ১০টি প্রশ্নের উত্তর দেন। রোগীদের অবস্থা ও ভাইরাস নিয়ন্ত্রণসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন তিনি।

এ সময় তিনি চীনের পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতির তুলনা করেন। চীনা প্রতিনিধি দল প্রধানের সাক্ষাৎকার গ্রহণে ভাষান্তরসহ সার্বিক সহায়তা দেন দলটির সঙ্গে সার্বক্ষণিক যুক্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রেষণে নিয়োগকৃত ইন্টারপ্রেটর পুলিশ সুপার ডা. এসএম শহীদুল ইসলাম।

যুগান্তর : এ সফরের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক কি কি? করোনাভাইরাস প্রতিরোধে আপনাদের কাছ থেকে বাংলাদেশের ডাক্তাররা অজানা কোন কোন বিষয় জানতে পেরেছেন?

ডা. লি ওয়েন ঝিও : আমরা বাংলাদেশে এসেছি শুধু করোনা মোকাবেলায় আমাদের অভিজ্ঞতা ও এ সংক্রান্ত অর্জিত জ্ঞান ভাগাভাগি করতে। চীনের অভিজ্ঞতা আমরা এখানকার ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে ভাগাভাগি করেছি। আমার মনে হয়েছে, এ দেশের ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা যথেষ্ট দক্ষ। তাদের কাছ থেকে আমরাও চিকিৎসাসংক্রান্ত বেশ কিছু বিষয় শিখেছি।

যুগান্তর : চীন করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কতখানি সফল এবং এক্ষেত্রে সবচেয়ে কোন ব্যবস্থা বেশি ভূমিকা রেখেছে?

ডা. লি ওয়েন ঝিও : হ্যাঁ, কোভিড-১৯ মোকাবেলায় চীন পুরোপুরি সফল হয়েছে বলা যায়। কারণ আমাদের দেশে যে পদ্ধতিটি প্রয়োগ করা হয়েছে সেটি ভাইরাস মোকাবেলায় অত্যন্ত কার্যকর। এটাকে বলা হয়, ডিআরডিটি বা আরলি ডিটেকশন, রিপোর্টিং, ডায়াগনসিস ও ট্রিটমেন্ট। অর্থাৎ করোনা প্রতিরোধে দ্রুত শনাক্তকরণ, জানানো, পরীক্ষা ও চিকিৎসা এ চারটি পদ্ধতির সমন্বিত প্রয়োগ করা হয় হয়েছে। এভাবে চীন ভাইরাস মোকাবেলায় সফল হয়েছে। এছাড়া লকডাউন, কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং ও ব্যাপকভাবে পরীক্ষার হার বাড়ানো হয়। শুধু উহানেই দৈনিক এক মিলিয়ন করোনা টেস্ট করার সক্ষমতা অর্জন করেছে চীন।

যুগান্তর : চীনে পুনরায় করোনাভাইরাস ফিরছে কেন? কতবার সফল হলে করোনাভাইরাস আর ফিরবে না বলা যাবে? না টিকাই একমাত্র সমাধান?

ডা. লি ওয়েন ঝিও : দেখুন, চীন করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। কিন্তু বিদেশ থেকে চীনা নাগরিকরা যখন দেশে ফিরছেন তখন কিছু কিছু জায়গায় ফের ভাইরাস বিস্তার লাভ করছে। সে ক্ষেত্রে আমরা হতাশ নই। আমরা হাত গুটিয়ে বসেও নেই। আমরা যে পদ্ধতিতে সফলতা পেয়েছি এখনও সেটা প্রয়োগ করছি। এখনও লকডাউন, দ্রুত পরীক্ষা ও কন্ট্র্যাক্ট ট্রেসিংয়ের চেয়ে ভালো বিকল্প দেখা যাচ্ছে না। তবে হ্যাঁ, টিকা এলে খুব ভালো হয়। টিকা আবিষ্কৃত হলে এ রোগকে সমূলে নির্মূল করা সম্ভব হবে।

যুগান্তর : চীনের উহানে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি কেন, কিভাবে হল? এর কোনো বৈজ্ঞানিক ও বিশ্বাসযোগ্য উত্তর কি আছে?

ডা. লি ওয়েন ঝিও : এখন পর্যন্ত আমরা যতদূর জানতে পেরেছি এ ভাইরাসের উৎপত্তি বাদুড় থেকে। উহানের একটি বাজার থেকে যে কোনো ভাবে এটি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এটি এমন একটি ভাইরাস যা মানুষকে ব্যাপকভাবে সংক্রমিত করে।

যুগান্তর : ভবিষ্যতে এ রকম আর কোনো ভাইরাস আসার আশঙ্কা কি আছে? থাকলে তার আগাম প্রস্তুতি কি হবে?

ডা. লি ওয়েন ঝিও : বায়ো ডায়ভারসিটি বা জীববৈচিত্র্য যেভাবে ধ্বংস হচ্ছে তাতে কোন ভাইরাস কখন কিভাবে ছড়িয়ে পড়বে তা আগে থেকে বলা মুশকিল। কাজেই এক্ষেত্রে পূর্বানুমানভিত্তিক সতর্কতামূলক পদক্ষেপ কি হবে তা সুস্পষ্টভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে আমাদের সচেতন থাকতে হবে।

যুগান্তর : ভাইরাস গবেষণা ও রোগ প্রতিরোধ বিষয়ে বেইজিং-ঢাকা ভবিষ্যতে কী দ্বিপাক্ষিক কোনো সফর বিনিময় করবে?

ডা. লি ওয়েন ঝিও : হ্যাঁ, আমরা ইতোমধ্যে সরকারি অনেক কোভিড, নন-কোভিড হাসপাতাল, রোগতত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা কেন্দ্র (আইইডিসিআর), স্বাস্থ্য অধিদফতর পরিদর্শন করেছি। আমরা পারস্পরিক অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান ভাগাভাগি করেছি। যদি ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে এ ধরনের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা আসে তবে দ্বিপাক্ষিকভাবে সেটা নির্ধারিত হতে পারে। আমরা অবশ্যই দ্বিপাক্ষিক আলোচনা, জ্ঞান ভাগাভাগি এবং প্রশিক্ষণ বিনিময়ে আগ্রহী।

যুগান্তর : বর্তমানে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ কোন মাত্রায় আছে এবং ভবিষ্যতে এর চেয়েও ভয়াবহ হবে কিনা? যাতে না হয় সেক্ষেত্রে চীনের পরামর্শ কী হবে? এছাড়া যদি হয় তাহলে চীন কিভাবে বাংলাদেশকে সহায়তা করতে পারে?

ডা. লি ওয়েন ঝিও : চীন ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। চীনে যেটা হয়েছে যে, শত্রু কোথায় অর্থাৎ করোনাভাইরাস কোথায় আছে সেটা আমরা জানি। ফলে শত্রু দমনে আমরা সুরক্ষা মেনে যথাযথভাবে কাজ করতে পেরেছি। কিন্তু বাংলাদেশের পরিস্থিতি আলাদা। এখানে সমস্যা হল- করোনাভাইরাস কোথায় আছে সেটাই জানা দুষ্কর। বলা যায়, জানা যাচ্ছে না। এখানে কাজ হচ্ছে অনেকটা অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার মতো। এভাবে ভাইরাস মোকাবেলা করা সত্যি দুষ্কর। আমরা মনে করি, যদি কার্যকর লকডাউন, দ্রুত পরীক্ষা, কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং ও চিকিৎসার পরিধি বাড়ানো যায় তবে উত্তরণ সম্ভব। তাছাড়া চীনের আর্থসামাজিক কাঠামো বাংলাদেশের চেয়ে ভিন্ন। চীনে লকডাউন মানে শতভাগ লকডাউন। করোনা উপদ্রুত এলাকাগুলোকে উচ্চ ঝুঁকি, মাঝারি ঝুঁকি ও স্বল্প ঝুঁকি এলাকায় ভাগ করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। চীন কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং প্রযুক্তি ব্যবহার করেও ভালো ফল পেয়েছে। যাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন করা হয় তাদের সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি মনিটর করা হয়। ফলে উপসর্গ অনুযায়ী তাদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা সহজ হয়েছে।

যুগান্তর : প্রথম দিকে করোনা আক্রান্ত দেশগুলো থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত এবং আমরা তাদের যেভাবে কোয়ারেন্টিন করেছি- তা কী সঠিক ছিল?

ডা. লি ওয়েন ঝিও : আমরা চীনে যেটা করেছি সেটা হল- বিমানবন্দরেই আরটিপিসিআর পদ্ধতিতে আগত যাত্রীকে পরীক্ষা করা হয়েছে। দ্রুত রিপোর্ট তৈরি করে যাদের পজিটিভ পাওয়া গেছে তাদের দ্রুত হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। এছাড়া পজিটিভ বিমানযাত্রীর সামনে তিন সারি ও পেছনের তিন সারি যাত্রীকে বাধ্যতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে। সেখানে ১৪ দিন রাখার পর লক্ষণ বা উপসর্গ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

যুগান্তর : করোনা প্রতিরোধে বাংলাদেশের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা সম্পর্কে চীনের মূল্যায়ন কী?

ডা. লি ওয়েন ঝিও : ভাইরাস মোকাবেলায় বাংলাদেশ সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছে। এখানে আরটিপিসিআর পদ্ধতিতেই পরীক্ষা হচ্ছে। তবে পরীক্ষার সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। দক্ষতাও বৃদ্ধি করা জরুরি। এখানে অনেক স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হচ্ছেন। স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিতের জন্য পিপিই পরা থেকে শুরু করে সুরক্ষার জন্য যত বিষয় আছে সব বিষয়ে আরও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এখানে একটা বিষয় বলে রাখা ভালো যে, পিপিই পরিধানের বিভিন্ন স্তর আছে। হাইরিস্ক, লো রিস্ক ইত্যাদি জায়গায় সুরক্ষা ব্যবস্থা কেমন নিতে হবে তা জানতে হবে। আবার পিপিই খোলা এবং পুনর্ব্যবহারের বিষয়টি আরও ভালোভাবে রপ্ত করতে হবে।

যুগান্তর : বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতকে আরও শক্তিশালী করতে ভবিষ্যতে চীনের কোনো সহায়তা পরিকল্পনা আছে কী? বিশেষ করে চীনের চলমান বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) কর্মসূচির বাইরে ঢাকাকে নিয়ে নতুন আর কোনো প্রজেকশন আছে কী?

ডা. লি ওয়েন ঝিও : আমরা যে ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দলটি এসেছি তার মধ্যে একজন আছেন, যিনি চীনা ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। যেহেতু করোনাভাইরাসের এখনও কোনো ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি তাই উহানে রোগীদের ওপর ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়া গেছে। আর বিআরআই কর্মসূচি সম্পর্কে বলতে পারি- বাংলাদেশের করোনাভাইরাস পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা চীনে ফিরে গিয়ে সরকারের কাছে একটা রিপোর্ট পেশ করব। যেহেতু বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের খুবই ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই ভাইরাস মোকাবেলা ও চিকিৎসার বিষয়ে বাংলাদেশ কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিলে চীন অবশ্যই সেটা বিবেচনা করবে বলে আমি আশাবাদী।

করোনা প্রসঙ্গে যুগান্তরকে ডা. লি ওয়েন ঝিও

বাংলাদেশে অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার মতো কাজ হচ্ছে

 তোহুর আহমদ 
২০ জুন ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সফররত চীনের করোনাভাইরাস বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান ডা. লি ওয়েন ঝিও বলেছেন, বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি এখন ভিন্নমাত্রা পেয়েছে। ভাইরাসটি কোথায় আছে আর কোথায় নেই তা জানা দুষ্কর।

এখানে কাজ হচ্ছে অনেকটা অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার মতো। এভাবে ভাইরাস মোকাবেলা করা সত্যি কঠিন। আমরা মনে করি, যদি কার্যকর লকডাউন, দ্রুত পরীক্ষা, কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং ও চিকিৎসার পরিধি বাড়ানো যায় তবে উত্তরণ সম্ভব। চীনের বিশেষজ্ঞ দলটি বর্তমানে বাংলাদেশ সফর করছে।

ডা. লি ওয়েন ঝিও তার দেশের চিফ ফিজিশিয়ান এবং ডেপুটি ডিজি। ভাইরাস উপদ্রুত চীনের উহানে প্রধান কোভিড হাসপাতালের ইনচার্জ হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। রোগীদের চিকিৎসা দেয়া থেকে শুরু করে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চীনের গৃহীত পরিকল্পনার সঙ্গে তিনি প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। ১০ সদস্যবিশিষ্ট চীনা প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। অপর সদস্যরা হলেন, নিউরো সার্জারি বিশেষজ্ঞ ঝাও জিয়াননং, জনস্বাস্থ্য ও মহামারী বিশেষজ্ঞ ওয়্যাং ড্যান, হাসপাতাল সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ ঝিয়ান ইউ সু মিং, সংক্রামক ওষুধ বিশেষজ্ঞ উ তাও, ক্লিনিক্যাল ল্যাবরেটরি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ লিউ লিং লি, ইমার্জেন্সি ও ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ঝ্যাং হ্যান হং, শ্বাসতন্ত্র ও জরুরি ওষুধ বিশেষজ্ঞ লিউ জিয়াও রান, ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনের ক্যাং ফু ঝিন ও ক্রিটিক্যাল কেয়ারিং বিশেষজ্ঞ লিউ হেই ট্যাং। সফর শেষে ২২ জুন প্রতিনিধি দলটি চীনে ফিরে যাবে।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে ডা. লি ওয়েন ঝিওর সঙ্গে যোগাযোগ করে যুগান্তর। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে লিখিত প্রশ্ন পাঠানোর অনুরোধ জানান। ১৫ জুন তার কাছে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলে তিনি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে যুক্ত ইন্টারপ্রেটরের মাধ্যমে ১০টি প্রশ্নের উত্তর দেন। রোগীদের অবস্থা ও ভাইরাস নিয়ন্ত্রণসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন তিনি।

এ সময় তিনি চীনের পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতির তুলনা করেন। চীনা প্রতিনিধি দল প্রধানের সাক্ষাৎকার গ্রহণে ভাষান্তরসহ সার্বিক সহায়তা দেন দলটির সঙ্গে সার্বক্ষণিক যুক্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রেষণে নিয়োগকৃত ইন্টারপ্রেটর পুলিশ সুপার ডা. এসএম শহীদুল ইসলাম।

যুগান্তর : এ সফরের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক কি কি? করোনাভাইরাস প্রতিরোধে আপনাদের কাছ থেকে বাংলাদেশের ডাক্তাররা অজানা কোন কোন বিষয় জানতে পেরেছেন?

ডা. লি ওয়েন ঝিও : আমরা বাংলাদেশে এসেছি শুধু করোনা মোকাবেলায় আমাদের অভিজ্ঞতা ও এ সংক্রান্ত অর্জিত জ্ঞান ভাগাভাগি করতে। চীনের অভিজ্ঞতা আমরা এখানকার ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে ভাগাভাগি করেছি। আমার মনে হয়েছে, এ দেশের ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা যথেষ্ট দক্ষ। তাদের কাছ থেকে আমরাও চিকিৎসাসংক্রান্ত বেশ কিছু বিষয় শিখেছি।

যুগান্তর : চীন করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কতখানি সফল এবং এক্ষেত্রে সবচেয়ে কোন ব্যবস্থা বেশি ভূমিকা রেখেছে?

ডা. লি ওয়েন ঝিও : হ্যাঁ, কোভিড-১৯ মোকাবেলায় চীন পুরোপুরি সফল হয়েছে বলা যায়। কারণ আমাদের দেশে যে পদ্ধতিটি প্রয়োগ করা হয়েছে সেটি ভাইরাস মোকাবেলায় অত্যন্ত কার্যকর। এটাকে বলা হয়, ডিআরডিটি বা আরলি ডিটেকশন, রিপোর্টিং, ডায়াগনসিস ও ট্রিটমেন্ট। অর্থাৎ করোনা প্রতিরোধে দ্রুত শনাক্তকরণ, জানানো, পরীক্ষা ও চিকিৎসা এ চারটি পদ্ধতির সমন্বিত প্রয়োগ করা হয় হয়েছে। এভাবে চীন ভাইরাস মোকাবেলায় সফল হয়েছে। এছাড়া লকডাউন, কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং ও ব্যাপকভাবে পরীক্ষার হার বাড়ানো হয়। শুধু উহানেই দৈনিক এক মিলিয়ন করোনা টেস্ট করার সক্ষমতা অর্জন করেছে চীন।

যুগান্তর : চীনে পুনরায় করোনাভাইরাস ফিরছে কেন? কতবার সফল হলে করোনাভাইরাস আর ফিরবে না বলা যাবে? না টিকাই একমাত্র সমাধান?

ডা. লি ওয়েন ঝিও : দেখুন, চীন করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। কিন্তু বিদেশ থেকে চীনা নাগরিকরা যখন দেশে ফিরছেন তখন কিছু কিছু জায়গায় ফের ভাইরাস বিস্তার লাভ করছে। সে ক্ষেত্রে আমরা হতাশ নই। আমরা হাত গুটিয়ে বসেও নেই। আমরা যে পদ্ধতিতে সফলতা পেয়েছি এখনও সেটা প্রয়োগ করছি। এখনও লকডাউন, দ্রুত পরীক্ষা ও কন্ট্র্যাক্ট ট্রেসিংয়ের চেয়ে ভালো বিকল্প দেখা যাচ্ছে না। তবে হ্যাঁ, টিকা এলে খুব ভালো হয়। টিকা আবিষ্কৃত হলে এ রোগকে সমূলে নির্মূল করা সম্ভব হবে।

যুগান্তর : চীনের উহানে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি কেন, কিভাবে হল? এর কোনো বৈজ্ঞানিক ও বিশ্বাসযোগ্য উত্তর কি আছে?

ডা. লি ওয়েন ঝিও : এখন পর্যন্ত আমরা যতদূর জানতে পেরেছি এ ভাইরাসের উৎপত্তি বাদুড় থেকে। উহানের একটি বাজার থেকে যে কোনো ভাবে এটি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এটি এমন একটি ভাইরাস যা মানুষকে ব্যাপকভাবে সংক্রমিত করে।

যুগান্তর : ভবিষ্যতে এ রকম আর কোনো ভাইরাস আসার আশঙ্কা কি আছে? থাকলে তার আগাম প্রস্তুতি কি হবে?

ডা. লি ওয়েন ঝিও : বায়ো ডায়ভারসিটি বা জীববৈচিত্র্য যেভাবে ধ্বংস হচ্ছে তাতে কোন ভাইরাস কখন কিভাবে ছড়িয়ে পড়বে তা আগে থেকে বলা মুশকিল। কাজেই এক্ষেত্রে পূর্বানুমানভিত্তিক সতর্কতামূলক পদক্ষেপ কি হবে তা সুস্পষ্টভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে আমাদের সচেতন থাকতে হবে।

যুগান্তর : ভাইরাস গবেষণা ও রোগ প্রতিরোধ বিষয়ে বেইজিং-ঢাকা ভবিষ্যতে কী দ্বিপাক্ষিক কোনো সফর বিনিময় করবে?

ডা. লি ওয়েন ঝিও : হ্যাঁ, আমরা ইতোমধ্যে সরকারি অনেক কোভিড, নন-কোভিড হাসপাতাল, রোগতত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা কেন্দ্র (আইইডিসিআর), স্বাস্থ্য অধিদফতর পরিদর্শন করেছি। আমরা পারস্পরিক অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান ভাগাভাগি করেছি। যদি ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে এ ধরনের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা আসে তবে দ্বিপাক্ষিকভাবে সেটা নির্ধারিত হতে পারে। আমরা অবশ্যই দ্বিপাক্ষিক আলোচনা, জ্ঞান ভাগাভাগি এবং প্রশিক্ষণ বিনিময়ে আগ্রহী।

যুগান্তর : বর্তমানে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ কোন মাত্রায় আছে এবং ভবিষ্যতে এর চেয়েও ভয়াবহ হবে কিনা? যাতে না হয় সেক্ষেত্রে চীনের পরামর্শ কী হবে? এছাড়া যদি হয় তাহলে চীন কিভাবে বাংলাদেশকে সহায়তা করতে পারে?

ডা. লি ওয়েন ঝিও : চীন ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। চীনে যেটা হয়েছে যে, শত্রু কোথায় অর্থাৎ করোনাভাইরাস কোথায় আছে সেটা আমরা জানি। ফলে শত্রু দমনে আমরা সুরক্ষা মেনে যথাযথভাবে কাজ করতে পেরেছি। কিন্তু বাংলাদেশের পরিস্থিতি আলাদা। এখানে সমস্যা হল- করোনাভাইরাস কোথায় আছে সেটাই জানা দুষ্কর। বলা যায়, জানা যাচ্ছে না। এখানে কাজ হচ্ছে অনেকটা অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার মতো। এভাবে ভাইরাস মোকাবেলা করা সত্যি দুষ্কর। আমরা মনে করি, যদি কার্যকর লকডাউন, দ্রুত পরীক্ষা, কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং ও চিকিৎসার পরিধি বাড়ানো যায় তবে উত্তরণ সম্ভব। তাছাড়া চীনের আর্থসামাজিক কাঠামো বাংলাদেশের চেয়ে ভিন্ন। চীনে লকডাউন মানে শতভাগ লকডাউন। করোনা উপদ্রুত এলাকাগুলোকে উচ্চ ঝুঁকি, মাঝারি ঝুঁকি ও স্বল্প ঝুঁকি এলাকায় ভাগ করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। চীন কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং প্রযুক্তি ব্যবহার করেও ভালো ফল পেয়েছে। যাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন করা হয় তাদের সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি মনিটর করা হয়। ফলে উপসর্গ অনুযায়ী তাদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা সহজ হয়েছে।

যুগান্তর : প্রথম দিকে করোনা আক্রান্ত দেশগুলো থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত এবং আমরা তাদের যেভাবে কোয়ারেন্টিন করেছি- তা কী সঠিক ছিল?

ডা. লি ওয়েন ঝিও : আমরা চীনে যেটা করেছি সেটা হল- বিমানবন্দরেই আরটিপিসিআর পদ্ধতিতে আগত যাত্রীকে পরীক্ষা করা হয়েছে। দ্রুত রিপোর্ট তৈরি করে যাদের পজিটিভ পাওয়া গেছে তাদের দ্রুত হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। এছাড়া পজিটিভ বিমানযাত্রীর সামনে তিন সারি ও পেছনের তিন সারি যাত্রীকে বাধ্যতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে। সেখানে ১৪ দিন রাখার পর লক্ষণ বা উপসর্গ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

যুগান্তর : করোনা প্রতিরোধে বাংলাদেশের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা সম্পর্কে চীনের মূল্যায়ন কী?

ডা. লি ওয়েন ঝিও : ভাইরাস মোকাবেলায় বাংলাদেশ সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছে। এখানে আরটিপিসিআর পদ্ধতিতেই পরীক্ষা হচ্ছে। তবে পরীক্ষার সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। দক্ষতাও বৃদ্ধি করা জরুরি। এখানে অনেক স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হচ্ছেন। স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিতের জন্য পিপিই পরা থেকে শুরু করে সুরক্ষার জন্য যত বিষয় আছে সব বিষয়ে আরও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এখানে একটা বিষয় বলে রাখা ভালো যে, পিপিই পরিধানের বিভিন্ন স্তর আছে। হাইরিস্ক, লো রিস্ক ইত্যাদি জায়গায় সুরক্ষা ব্যবস্থা কেমন নিতে হবে তা জানতে হবে। আবার পিপিই খোলা এবং পুনর্ব্যবহারের বিষয়টি আরও ভালোভাবে রপ্ত করতে হবে।

যুগান্তর : বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতকে আরও শক্তিশালী করতে ভবিষ্যতে চীনের কোনো সহায়তা পরিকল্পনা আছে কী? বিশেষ করে চীনের চলমান বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) কর্মসূচির বাইরে ঢাকাকে নিয়ে নতুন আর কোনো প্রজেকশন আছে কী?

ডা. লি ওয়েন ঝিও : আমরা যে ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দলটি এসেছি তার মধ্যে একজন আছেন, যিনি চীনা ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। যেহেতু করোনাভাইরাসের এখনও কোনো ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি তাই উহানে রোগীদের ওপর ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়া গেছে। আর বিআরআই কর্মসূচি সম্পর্কে বলতে পারি- বাংলাদেশের করোনাভাইরাস পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা চীনে ফিরে গিয়ে সরকারের কাছে একটা রিপোর্ট পেশ করব। যেহেতু বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের খুবই ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই ভাইরাস মোকাবেলা ও চিকিৎসার বিষয়ে বাংলাদেশ কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিলে চীন অবশ্যই সেটা বিবেচনা করবে বলে আমি আশাবাদী।

 

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস