রায়হানের শরীরে ৯৭টি আঘাতের চিহ্ন
jugantor
ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট
রায়হানের শরীরে ৯৭টি আঘাতের চিহ্ন
মৃত্যুর ২-৪ ঘণ্টা আগে করা হয় নির্যাতন * দুটি আঙুলের নখ উপড়ানো

  মাহবুবুর রহমান রিপন  

১৮ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সিলেটে পুলিশ হেফাজতে মারা যাওয়া রায়হানের শরীরে ৯৭টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৪টি ছিল গুরুতর। তার দুটি আঙুলের নখ উপড়ে ফেলা হয়েছে। আর এমন নির্যাতন চালানো হয় তার মৃত্যুর ২ থেকে ৪ ঘণ্টা আগে। এছাড়া তার শরীরে চামড়ার নিচ থেকে প্রায় ২ লিটার রক্ত পাওয়া গেছে। রায়হানের লাশের ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। রিপোর্টটি যুগান্তরের হাতে এসেছে।

সিসি ক্যামেরার ফুটেজ অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর রাত ৩টা ৯ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডে স্বাভাবিক অবস্থায় রায়হানকে সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে ধরে আনা হয়। পরে সকাল ৬টা ২৪ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে ফাঁড়ি থেকে বের করা হয়। ৬টা ৪০ মিনিটে ভর্তি করা হয় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে তিনি মারা যান। ওই হাসপাতালেই বেলা ১টা থেকে দেড়টার মধ্যে লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ১৫ অক্টোবর সেই ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট মামলার তদন্তের দায়িত্বে থাকা পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়, রায়হানের মৃত্যুর ২ থেকে ৪ ঘণ্টা আগে তার ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। সে হিসেবে ফাঁড়িতে আনার পর থেকেই তার ওপর নির্যাতন চলে। এতে আরও বলা হয়, রায়হানের পিঠ, দুই থাই, দুই হাঁটুর জয়েন্ট, দুই কবজির জয়েন্ট, পায়ের গোড়ালি, পায়ের পাতা, দুই বাহুর চার পাশে ৯৭টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৪টি আঘাত গুরুতর- বিশেষ করে দুই হাতের কবজিতে ৪টি, ডান পায়ের সামনের দিকে ২টি, পেছনের দিকে ৩টি, বাম পায়ের সামনের দিকে ২টি ও ডান পায়ের গোড়ালির ৩টি আঘাত।

রিপোর্টে আরও বলা হয়, রায়হানের ডান হাতের কনিষ্ঠ আঙুল আর বাম হাতের অনামিকার নখ উপড়ানো ছিল। অসংখ্য আঘাতের কারণে হাইপোভলিউমিক শক ও নিউরোজেনিক শকে মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, কিডনিসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো কর্মক্ষমতা হারানোর কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। তবে মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ কারণ ভিসেরা প্রতিবেদন পাওয়ার পর বলা যাবে বলে প্রাথমিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে একটি সূত্র জানায়, ঘটনার দিন রায়হান ও অভিযুক্ত বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবরের অবস্থান নিশ্চিত হয়েছে তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই। তাদের মোবাইল ফোনের কললিস্টের সূত্র ধরে সেই দিনের অবস্থান ও কার কার সঙ্গে তারা কথা বলেছেন, তা নিশ্চিত হওয়া গেছে। ঘটনার দিন শনিবার রাত ২টা ২৮ মিনিট ১৪ সেকেন্ডে রায়হানের অবস্থান ছিল কাষ্টঘর এলাকায়। এরপর রোববার সকাল ৮টা ৫৪ মিনিট পর্যন্ত বন্দরবাজার ফাঁড়িতেই ছিল রায়হানের মোবাইল ফোন। অন্যদিকে এসআই আকবরের অবস্থান শনিবার রাত সাড়ে ১১টা থেকে পরদিন সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত ফাঁড়িতেই ছিল। পরে সেখান থেকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান আকবর।

প্রতিবাদ-মানববন্ধন অব্যাহত : সিলেটে রায়হান আহমদের হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে প্রতিবাদ মানববন্ধন অব্যাহত আছে। শনিবার নগরীতে প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধন করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। বেলা ২টায় জেলা জাতীয় পার্টির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। জেলা জাতীয় পার্টির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এমএ মালেক খানের সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব তেতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান উসমান আলীর পরিচালনায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আবদুল্লাহ সিদ্দিকী। বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুদ্দিন খালেদ, জেলা জাতীয় পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুস শহিদ লস্কর বশির। এছাড়া সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ১৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম মুনিমের উদ্যোগে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। পৃথক স্থানে মানববন্ধন করেছে ন্যাশনালিস্ট ফোরাম, নগরীর লালদিঘীরপাড় ব্যবসায়ীরা, নয়াবাজার এলাকাবাসী ও ভাতালিয়া এলাকাবাসী।

এদিকে রায়হানের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শনিবার সকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের প্রতিনিধি হিসেবে রায়হানের বাড়িতে যান বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. মোহাম্মাদ এনামুল হক চৌধুরী। তিনি রায়হানের শোকাহত পরিবারকে সমবেদনা জানান এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে তার পরিবারকে উপহার সামগ্রী প্রদান করেন। এ সময় বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট

রায়হানের শরীরে ৯৭টি আঘাতের চিহ্ন

মৃত্যুর ২-৪ ঘণ্টা আগে করা হয় নির্যাতন * দুটি আঙুলের নখ উপড়ানো
 মাহবুবুর রহমান রিপন 
১৮ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সিলেটে পুলিশ হেফাজতে মারা যাওয়া রায়হানের শরীরে ৯৭টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৪টি ছিল গুরুতর। তার দুটি আঙুলের নখ উপড়ে ফেলা হয়েছে। আর এমন নির্যাতন চালানো হয় তার মৃত্যুর ২ থেকে ৪ ঘণ্টা আগে। এছাড়া তার শরীরে চামড়ার নিচ থেকে প্রায় ২ লিটার রক্ত পাওয়া গেছে। রায়হানের লাশের ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। রিপোর্টটি যুগান্তরের হাতে এসেছে।

সিসি ক্যামেরার ফুটেজ অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর রাত ৩টা ৯ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডে স্বাভাবিক অবস্থায় রায়হানকে সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে ধরে আনা হয়। পরে সকাল ৬টা ২৪ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে ফাঁড়ি থেকে বের করা হয়। ৬টা ৪০ মিনিটে ভর্তি করা হয় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে তিনি মারা যান। ওই হাসপাতালেই বেলা ১টা থেকে দেড়টার মধ্যে লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ১৫ অক্টোবর সেই ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট মামলার তদন্তের দায়িত্বে থাকা পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়, রায়হানের মৃত্যুর ২ থেকে ৪ ঘণ্টা আগে তার ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। সে হিসেবে ফাঁড়িতে আনার পর থেকেই তার ওপর নির্যাতন চলে। এতে আরও বলা হয়, রায়হানের পিঠ, দুই থাই, দুই হাঁটুর জয়েন্ট, দুই কবজির জয়েন্ট, পায়ের গোড়ালি, পায়ের পাতা, দুই বাহুর চার পাশে ৯৭টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৪টি আঘাত গুরুতর- বিশেষ করে দুই হাতের কবজিতে ৪টি, ডান পায়ের সামনের দিকে ২টি, পেছনের দিকে ৩টি, বাম পায়ের সামনের দিকে ২টি ও ডান পায়ের গোড়ালির ৩টি আঘাত।

রিপোর্টে আরও বলা হয়, রায়হানের ডান হাতের কনিষ্ঠ আঙুল আর বাম হাতের অনামিকার নখ উপড়ানো ছিল। অসংখ্য আঘাতের কারণে হাইপোভলিউমিক শক ও নিউরোজেনিক শকে মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, কিডনিসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো কর্মক্ষমতা হারানোর কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। তবে মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ কারণ ভিসেরা প্রতিবেদন পাওয়ার পর বলা যাবে বলে প্রাথমিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে একটি সূত্র জানায়, ঘটনার দিন রায়হান ও অভিযুক্ত বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবরের অবস্থান নিশ্চিত হয়েছে তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই। তাদের মোবাইল ফোনের কললিস্টের সূত্র ধরে সেই দিনের অবস্থান ও কার কার সঙ্গে তারা কথা বলেছেন, তা নিশ্চিত হওয়া গেছে। ঘটনার দিন শনিবার রাত ২টা ২৮ মিনিট ১৪ সেকেন্ডে রায়হানের অবস্থান ছিল কাষ্টঘর এলাকায়। এরপর রোববার সকাল ৮টা ৫৪ মিনিট পর্যন্ত বন্দরবাজার ফাঁড়িতেই ছিল রায়হানের মোবাইল ফোন। অন্যদিকে এসআই আকবরের অবস্থান শনিবার রাত সাড়ে ১১টা থেকে পরদিন সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত ফাঁড়িতেই ছিল। পরে সেখান থেকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান আকবর।

প্রতিবাদ-মানববন্ধন অব্যাহত : সিলেটে রায়হান আহমদের হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে প্রতিবাদ মানববন্ধন অব্যাহত আছে। শনিবার নগরীতে প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধন করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। বেলা ২টায় জেলা জাতীয় পার্টির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। জেলা জাতীয় পার্টির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এমএ মালেক খানের সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব তেতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান উসমান আলীর পরিচালনায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আবদুল্লাহ সিদ্দিকী। বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুদ্দিন খালেদ, জেলা জাতীয় পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুস শহিদ লস্কর বশির। এছাড়া সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ১৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম মুনিমের উদ্যোগে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। পৃথক স্থানে মানববন্ধন করেছে ন্যাশনালিস্ট ফোরাম, নগরীর লালদিঘীরপাড় ব্যবসায়ীরা, নয়াবাজার এলাকাবাসী ও ভাতালিয়া এলাকাবাসী।

এদিকে রায়হানের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শনিবার সকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের প্রতিনিধি হিসেবে রায়হানের বাড়িতে যান বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. মোহাম্মাদ এনামুল হক চৌধুরী। তিনি রায়হানের শোকাহত পরিবারকে সমবেদনা জানান এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে তার পরিবারকে উপহার সামগ্রী প্রদান করেন। এ সময় বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন