বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি: জালিয়াতদের বন্ধকি সম্পদ নিলামের উদ্যোগ
jugantor
বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি: জালিয়াতদের বন্ধকি সম্পদ নিলামের উদ্যোগ

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

০৯ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জালিয়াতি করে যারা ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছেন তাদের বন্ধকি সম্পদ নিলাম করার উদ্যোগ নিয়েছে বেসিক ব্যাংক। ইতোমধ্যে তিনটি বন্ধকি সম্পদ নিলাম করে ঋণের আংশিক টাকা আদায় করা হয়েছে। চলতি বছরেও এ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। যেসব গ্রাহক জালিয়াতি করে ঋণ নিয়ে টাকা পাচার করে বিদেশে পালিয়ে গেছেন তাদের দেশে ফেরত আনার তৎপরতা শুরু হয়েছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান শুরু করেছে ব্যাংক। চলতি মাস থেকে ঋণ আদায় কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, জালিয়াতির কারণে মূলধন হারানো বেসিক ব্যাংক আর্থিক দুর্বলতা ঘোচাতে বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো- আমানত বাড়ানো ও বকেয়া ঋণ আদায়। একই সঙ্গে খরচ নিয়ন্ত্রণ করে আয় বাড়ানোর কৌশল নির্ধারণ করেছে ব্যাংক। এ লক্ষ্যে বিদায়ী বছরে ব্যাংকটি নতুন নতুন বিশেষ সঞ্চয়ী স্কিম চালু করেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে নতুন আমানত সংগ্রহ করছে। এর মাধ্যমে তারল্য প্রবাহ বাড়িয়ে ব্যাংকটির কার্যক্রম গতিশীল করার চেষ্টা করা হবে। এ প্রসঙ্গে বেসিক ব্যাংকের এমডি রফিকুল আলম বলেন, সরকার থেকে নতুন করে আর মূলধনের জোগান দেওয়া হচ্ছে না। এখন নিজেদের উদ্যোগেই ব্যাংকটিকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে হচ্ছে। সরকার আর্থিক সহায়তা দিলে হয়তো দ্রুত ঘুরে দাঁড়াত। এখন সেটি হবে না। ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াবে। এজন্য ঋণ আদায় ও আমানত বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এজন্য নেওয়া হয়েছে বহুমুখী কর্মসূচি। এগুলো নতুন বছরে বাস্তবায়ন হলে ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করবে। তিনি আরও বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে গত বছরে ঋণ আদায় করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম সীমিত থাকায় আয় বাড়েনি, খরচও কমেনি। এ কারণে ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি ২০১৯ সালের মতোই ২০২০ সালেও রয়ে গেছে। তবে আমানত বেড়েছে। লোকসানও কিছুটা কমেছে।

২০১২ সালে বেসিক ব্যাংক জালিয়াতি করে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করার ঘটনা ধরা পড়ে। এরপর থেকে সবল ব্যাংকটি দুর্বল হতে থাকে। সে দুর্বলতা এখনও ব্যাংকটি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। দুর্বলতা কাটাতে বেসিক ব্যাংককে সরকার থেকে ৩ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। তাতেও দুর্বলতা কাটেনি। ৩ বছর ধরে ব্যাংকটিকে কোনো মূলধনের জোগান দেওয়া হচ্ছে না। সরকার এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাংকটিকে আর কোনো মূলধন জোগান দেওয়া হবে না। নিজস্ব উদ্যোগে সারভাইভ (টিকে থাকতে) করতে হবে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেসিককে বেশ কিছু নীতি সহায়তায় ছাড় দিচ্ছে। এর মধ্যে প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি পূরণে সময় বাড়িয়ে দিয়েছে। একসঙ্গে না রেখে এগুলো পর্যায়ক্রমে রাখা যাবে।

সূত্র জানায়, সরকার থেকে আর মূলধন পাওয়া যাবে না- এমন বার্তা পেয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এখন নিজেই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এর মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে ঋণ আদায় ও আমানত বাড়ানোর ওপর। এক্ষেত্রে ব্যাংক বড় ধরনের অ্যাকশন প্ল্যান হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- যারা জালিয়াতি করে ঋণ নিয়েছে এবং ব্যাংকের কাছে তাদের বন্ধকি সম্পদ রয়েছে সেগুলোকে শনাক্ত করা হয়েছে। এসব সম্পদ ব্যাংক নিলাম করে বিক্রি করে টাকা আদায় করবে। এতে ঋণের টাকা আদায় না হলে গ্রাহকের অন্য সম্পদ বিক্রি করে টাকা আদায়ের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক বেসিকের এ প্রক্রিয়াকে সমর্থন করেছে। প্রচলিত অর্থঋণ আদালত আইন অনুযায়ী কোনো গ্রাহক মন্দ মানে ঋণ খেলাপি হলে শুধু নোটিশ দিয়ে ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে কোনো মামলা ছাড়াই বন্ধকি সম্পদ বিক্রি করতে পারে। এতে ঋণের টাকা আদায় না হলে গ্রাহকের অন্যসব সম্পদ নিলাম করার জন্য মামলা করতে পারে। বেসিক ব্যাংক এখন এসব প্রক্রিয়ার দিকে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে তারা তিনজন গ্রাহকের বন্ধকি সম্পদ নিলাম করেছে।

এ প্রসঙ্গে ব্যাংকের এমডি বলেন, এ প্রক্রিয়ায় গ্রাহক আদালতে মামলা করে প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত করতে চাইলে তা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ আইনজীবী প্যানেল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা কাজ শুরু করেছেন।

সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে তদন্তের প্রথম দিকে বেসিকের প্রায় ৩০০ গ্রাহকের সন্ধান পাওয়া যায়নি। এখন সবার সন্ধান পাওয়া গেছে। কয়েকজন ছাড়া অন্যরা ঋণের দায় স্বীকার করেছেন। গ্রাহকের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক করে ঋণ নবায়ন করা হয়েছে। কিন্তু তারা ঋণ পরিশাধ করছেন না। ফলে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে।

ব্যাংকের ঋণ গ্রহীতাদের মধ্যে কয়েকজন এলসি খুলে ঋণের টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। এমন ৫-৬ জন আছেন বিদেশে। তারা দেশে আছেন না। ঋণও শোধ করছেন না। তাদের টাকা আদায়ে বিকল্প পথে এগোনো হচ্ছে। বিএফআইইউর মাধ্যমে তাদের ব্যাপারে অনুসন্ধান হচ্ছে।

এদিকে আমানত বাড়াতে নতুন বছরে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চালু করেছে নতুন ও ব্যতিক্রমী সঞ্চয় প্রকল্প। এর মধ্যে আছে বেসিক ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিং হিসাব, তৈরি পোশাক ও চামড়া শিল্পে কর্মীদের সঞ্চয়ী হিসাব, কৃষক সঞ্চয়ী হিসাব, তৃণমূল সঞ্চয়ী হিসাব, গাড়ির চালক ও ড্রাইভারদের জন্য চলন্তিকা সঞ্চয়ী হিসাব, মুক্তিযোদ্ধা সঞ্চয়ী হিসাব, পথশিশুদের জন্য পথপুষ্প সঞ্চয়ী হিসাব।

মুজিববর্ষ উপলক্ষে তারা আকর্ষণীয় মুনাফায় বিশেষ আমানত প্রকল্প শতবর্ষ সঞ্চয় প্রকল্প চালু করেছে। এ হিসাবের মাধ্যমে গ্রাহকরা প্রতি মাসে মাত্র আড়াই হাজার টাকা জমা করে ১০০ মাসে আয় করতে পারবেন ১ লাখ টাকা। আগামী ১৭ মার্চ পর্যন্ত এ আওতায় হিসাব খোলা যাবে।

এছাড়াও ব্যাংক বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করে বিল জমা নিচ্ছে। ইতোমধ্যে বাখরাবাদ গ্যাস, তিতাস গ্যাসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে বিল জমা নিতে। ফলে এসব আমানত ব্যাংকে জমা হবে। এভাবে তারল্য বাড়ানো হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, বেসিক বাংক আমানতের চেয়ে বেশি ঋণ দিয়েছে। জালিয়াতির সময় ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত আগ্রাসী বাংকিংয়ের মাধ্যমে এসব ঋণ দেয়া হয়েছে। ফলে ঋণ আমানত অনুপাত বেড়ে গেছে। ২০১৮ সালে এ হার ছিল ১০৯ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ ওই বছরে ১০০ টাকা রেখে ঋণ দিয়েছে ১০৯ টাকা ৪৫ পয়সা। ঋণ করে ৯ টাকা ৪৫ পয়সা দেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালে তা কমে ১০৩ দশমিক ৮৮ শতাংশে নেমে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ধরনের আগ্রাসী ব্যাংকিংকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করে। এ কারণে এমন ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকিং করলে জরিমানাও করা হচ্ছে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বাংকগুলো তাদের মোট আমানতের ৮৫ শতাংশের বেশি ঋণ দিতে পারে না। এ বিষয়ে ব্যাংকের এমডি বলেন, ঋণ আমানত অনুপাত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সীমার মধ্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছি। ধীরে ধীরে এ হার কমছে।

সূত্র জানায়, করোনার কারণে এক বছর কিস্তি আদায় স্থগিত ছিল। ফলে ঋণ আদায় বাড়ানো সম্ভব হয়নি। জানুয়ারি থেকে কিস্তি আদায় শুরু হবে। ফলে আদায় বাড়বে বলে মনে করছে ব্যাংক। এর মধ্যে শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপির কাছ থেকে ঋণ আদায়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে ব্যাংকের এমডি রফিকুল আলম বলেন, শীর্ষ খেলাপিদের বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তাদের কয়েকটি ঋণের কিস্তি জানুয়ারিতে দেওয়ার কথা রয়েছে। আশা করি, সেগুলো আদায় করা সম্ভব হবে।

সূত্র জানায়, ব্যাংকের আয় বাড়িয়ে ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে লোকসান কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় লোকসান আগের চেয়ে কমেছে। ২০১৮ সালে ১২০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। ২০১৯ সালে কিছুটা কমে ১১৮ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।

জালিয়াতির সময় ব্যাংকের শাখা ছিল ৬৮টি। ২০১৯ সালে চারটি নতুন শাখা খোলা হয়। ফলে শাখার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭২টি। এছাড়া যেসব শাখা লোকসানি সেগুলোকে ভালো ব্যবসা হবে এমন জায়গায় স্থানান্তর করা হচ্ছে। ব্যাংকের শাখা বাড়লেও কর্মীর সংখ্যা কমেছে।

সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকের মোট ঋণ বিতরণ করা ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে নিয়মিত ঋণ ৪ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। বিশেষ হিসাবে অর্থাৎ খেলাপি হওয়ার আগের ধাপে রয়েছে ২ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। মোট খেলাপি ঋণ ৭ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ৫১ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এর মধ্যে আদায় অযোগ্য মন্দ ঋণ ৭ হাজার ৩৬৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা। যা মোট খেলাপি ঋণের ৫০ শতাংশ। ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখার প্রয়োজন ৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। প্রভিশন রয়েছে ২ হাজার ৩৪১ কোটি টাকা। ঘাটতির পরিমাণ ৩ হাজার ২৩৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা। খেলাপি ঋণের বিপরীতে স্থগিত সুদের পরিমাণ ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।

বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি: জালিয়াতদের বন্ধকি সম্পদ নিলামের উদ্যোগ

 যুগান্তর প্রতিবেদন 
০৯ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জালিয়াতি করে যারা ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছেন তাদের বন্ধকি সম্পদ নিলাম করার উদ্যোগ নিয়েছে বেসিক ব্যাংক। ইতোমধ্যে তিনটি বন্ধকি সম্পদ নিলাম করে ঋণের আংশিক টাকা আদায় করা হয়েছে। চলতি বছরেও এ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। যেসব গ্রাহক জালিয়াতি করে ঋণ নিয়ে টাকা পাচার করে বিদেশে পালিয়ে গেছেন তাদের দেশে ফেরত আনার তৎপরতা শুরু হয়েছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান শুরু করেছে ব্যাংক। চলতি মাস থেকে ঋণ আদায় কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, জালিয়াতির কারণে মূলধন হারানো বেসিক ব্যাংক আর্থিক দুর্বলতা ঘোচাতে বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো- আমানত বাড়ানো ও বকেয়া ঋণ আদায়। একই সঙ্গে খরচ নিয়ন্ত্রণ করে আয় বাড়ানোর কৌশল নির্ধারণ করেছে ব্যাংক। এ লক্ষ্যে বিদায়ী বছরে ব্যাংকটি নতুন নতুন বিশেষ সঞ্চয়ী স্কিম চালু করেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে নতুন আমানত সংগ্রহ করছে। এর মাধ্যমে তারল্য প্রবাহ বাড়িয়ে ব্যাংকটির কার্যক্রম গতিশীল করার চেষ্টা করা হবে। এ প্রসঙ্গে বেসিক ব্যাংকের এমডি রফিকুল আলম বলেন, সরকার থেকে নতুন করে আর মূলধনের জোগান দেওয়া হচ্ছে না। এখন নিজেদের উদ্যোগেই ব্যাংকটিকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে হচ্ছে। সরকার আর্থিক সহায়তা দিলে হয়তো দ্রুত ঘুরে দাঁড়াত। এখন সেটি হবে না। ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াবে। এজন্য ঋণ আদায় ও আমানত বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এজন্য নেওয়া হয়েছে বহুমুখী কর্মসূচি। এগুলো নতুন বছরে বাস্তবায়ন হলে ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করবে। তিনি আরও বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে গত বছরে ঋণ আদায় করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম সীমিত থাকায় আয় বাড়েনি, খরচও কমেনি। এ কারণে ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি ২০১৯ সালের মতোই ২০২০ সালেও রয়ে গেছে। তবে আমানত বেড়েছে। লোকসানও কিছুটা কমেছে।

২০১২ সালে বেসিক ব্যাংক জালিয়াতি করে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করার ঘটনা ধরা পড়ে। এরপর থেকে সবল ব্যাংকটি দুর্বল হতে থাকে। সে দুর্বলতা এখনও ব্যাংকটি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। দুর্বলতা কাটাতে বেসিক ব্যাংককে সরকার থেকে ৩ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। তাতেও দুর্বলতা কাটেনি। ৩ বছর ধরে ব্যাংকটিকে কোনো মূলধনের জোগান দেওয়া হচ্ছে না। সরকার এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাংকটিকে আর কোনো মূলধন জোগান দেওয়া হবে না। নিজস্ব উদ্যোগে সারভাইভ (টিকে থাকতে) করতে হবে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেসিককে বেশ কিছু নীতি সহায়তায় ছাড় দিচ্ছে। এর মধ্যে প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি পূরণে সময় বাড়িয়ে দিয়েছে। একসঙ্গে না রেখে এগুলো পর্যায়ক্রমে রাখা যাবে।

সূত্র জানায়, সরকার থেকে আর মূলধন পাওয়া যাবে না- এমন বার্তা পেয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এখন নিজেই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এর মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে ঋণ আদায় ও আমানত বাড়ানোর ওপর। এক্ষেত্রে ব্যাংক বড় ধরনের অ্যাকশন প্ল্যান হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- যারা জালিয়াতি করে ঋণ নিয়েছে এবং ব্যাংকের কাছে তাদের বন্ধকি সম্পদ রয়েছে সেগুলোকে শনাক্ত করা হয়েছে। এসব সম্পদ ব্যাংক নিলাম করে বিক্রি করে টাকা আদায় করবে। এতে ঋণের টাকা আদায় না হলে গ্রাহকের অন্য সম্পদ বিক্রি করে টাকা আদায়ের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক বেসিকের এ প্রক্রিয়াকে সমর্থন করেছে। প্রচলিত অর্থঋণ আদালত আইন অনুযায়ী কোনো গ্রাহক মন্দ মানে ঋণ খেলাপি হলে শুধু নোটিশ দিয়ে ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে কোনো মামলা ছাড়াই বন্ধকি সম্পদ বিক্রি করতে পারে। এতে ঋণের টাকা আদায় না হলে গ্রাহকের অন্যসব সম্পদ নিলাম করার জন্য মামলা করতে পারে। বেসিক ব্যাংক এখন এসব প্রক্রিয়ার দিকে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে তারা তিনজন গ্রাহকের বন্ধকি সম্পদ নিলাম করেছে।

এ প্রসঙ্গে ব্যাংকের এমডি বলেন, এ প্রক্রিয়ায় গ্রাহক আদালতে মামলা করে প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত করতে চাইলে তা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ আইনজীবী প্যানেল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা কাজ শুরু করেছেন।

সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে তদন্তের প্রথম দিকে বেসিকের প্রায় ৩০০ গ্রাহকের সন্ধান পাওয়া যায়নি। এখন সবার সন্ধান পাওয়া গেছে। কয়েকজন ছাড়া অন্যরা ঋণের দায় স্বীকার করেছেন। গ্রাহকের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক করে ঋণ নবায়ন করা হয়েছে। কিন্তু তারা ঋণ পরিশাধ করছেন না। ফলে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে।

ব্যাংকের ঋণ গ্রহীতাদের মধ্যে কয়েকজন এলসি খুলে ঋণের টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। এমন ৫-৬ জন আছেন বিদেশে। তারা দেশে আছেন না। ঋণও শোধ করছেন না। তাদের টাকা আদায়ে বিকল্প পথে এগোনো হচ্ছে। বিএফআইইউর মাধ্যমে তাদের ব্যাপারে অনুসন্ধান হচ্ছে।

এদিকে আমানত বাড়াতে নতুন বছরে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চালু করেছে নতুন ও ব্যতিক্রমী সঞ্চয় প্রকল্প। এর মধ্যে আছে বেসিক ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিং হিসাব, তৈরি পোশাক ও চামড়া শিল্পে কর্মীদের সঞ্চয়ী হিসাব, কৃষক সঞ্চয়ী হিসাব, তৃণমূল সঞ্চয়ী হিসাব, গাড়ির চালক ও ড্রাইভারদের জন্য চলন্তিকা সঞ্চয়ী হিসাব, মুক্তিযোদ্ধা সঞ্চয়ী হিসাব, পথশিশুদের জন্য পথপুষ্প সঞ্চয়ী হিসাব।

মুজিববর্ষ উপলক্ষে তারা আকর্ষণীয় মুনাফায় বিশেষ আমানত প্রকল্প শতবর্ষ সঞ্চয় প্রকল্প চালু করেছে। এ হিসাবের মাধ্যমে গ্রাহকরা প্রতি মাসে মাত্র আড়াই হাজার টাকা জমা করে ১০০ মাসে আয় করতে পারবেন ১ লাখ টাকা। আগামী ১৭ মার্চ পর্যন্ত এ আওতায় হিসাব খোলা যাবে।

এছাড়াও ব্যাংক বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করে বিল জমা নিচ্ছে। ইতোমধ্যে বাখরাবাদ গ্যাস, তিতাস গ্যাসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে বিল জমা নিতে। ফলে এসব আমানত ব্যাংকে জমা হবে। এভাবে তারল্য বাড়ানো হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, বেসিক বাংক আমানতের চেয়ে বেশি ঋণ দিয়েছে। জালিয়াতির সময় ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত আগ্রাসী বাংকিংয়ের মাধ্যমে এসব ঋণ দেয়া হয়েছে। ফলে ঋণ আমানত অনুপাত বেড়ে গেছে। ২০১৮ সালে এ হার ছিল ১০৯ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ ওই বছরে ১০০ টাকা রেখে ঋণ দিয়েছে ১০৯ টাকা ৪৫ পয়সা। ঋণ করে ৯ টাকা ৪৫ পয়সা দেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালে তা কমে ১০৩ দশমিক ৮৮ শতাংশে নেমে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ধরনের আগ্রাসী ব্যাংকিংকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করে। এ কারণে এমন ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকিং করলে জরিমানাও করা হচ্ছে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বাংকগুলো তাদের মোট আমানতের ৮৫ শতাংশের বেশি ঋণ দিতে পারে না। এ বিষয়ে ব্যাংকের এমডি বলেন, ঋণ আমানত অনুপাত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সীমার মধ্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছি। ধীরে ধীরে এ হার কমছে।

সূত্র জানায়, করোনার কারণে এক বছর কিস্তি আদায় স্থগিত ছিল। ফলে ঋণ আদায় বাড়ানো সম্ভব হয়নি। জানুয়ারি থেকে কিস্তি আদায় শুরু হবে। ফলে আদায় বাড়বে বলে মনে করছে ব্যাংক। এর মধ্যে শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপির কাছ থেকে ঋণ আদায়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে ব্যাংকের এমডি রফিকুল আলম বলেন, শীর্ষ খেলাপিদের বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তাদের কয়েকটি ঋণের কিস্তি জানুয়ারিতে দেওয়ার কথা রয়েছে। আশা করি, সেগুলো আদায় করা সম্ভব হবে।

সূত্র জানায়, ব্যাংকের আয় বাড়িয়ে ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে লোকসান কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় লোকসান আগের চেয়ে কমেছে। ২০১৮ সালে ১২০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। ২০১৯ সালে কিছুটা কমে ১১৮ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।

জালিয়াতির সময় ব্যাংকের শাখা ছিল ৬৮টি। ২০১৯ সালে চারটি নতুন শাখা খোলা হয়। ফলে শাখার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭২টি। এছাড়া যেসব শাখা লোকসানি সেগুলোকে ভালো ব্যবসা হবে এমন জায়গায় স্থানান্তর করা হচ্ছে। ব্যাংকের শাখা বাড়লেও কর্মীর সংখ্যা কমেছে।

সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকের মোট ঋণ বিতরণ করা ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে নিয়মিত ঋণ ৪ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। বিশেষ হিসাবে অর্থাৎ খেলাপি হওয়ার আগের ধাপে রয়েছে ২ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। মোট খেলাপি ঋণ ৭ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ৫১ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এর মধ্যে আদায় অযোগ্য মন্দ ঋণ ৭ হাজার ৩৬৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা। যা মোট খেলাপি ঋণের ৫০ শতাংশ। ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখার প্রয়োজন ৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। প্রভিশন রয়েছে ২ হাজার ৩৪১ কোটি টাকা। ঘাটতির পরিমাণ ৩ হাজার ২৩৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা। খেলাপি ঋণের বিপরীতে স্থগিত সুদের পরিমাণ ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।