বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ সমাবেশ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংঘর্ষে নিহত ৫ আহত ৫০
আজ সারা দেশে হেফাজতের হরতাল
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২১, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
হেফাজতে ইসলামের ডাকা রোববারের (আজকের) হরতালের সমর্থনে শনিবার দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও সমাবেশ হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিক্ষোভ মিছিল বের করলে সংঘর্ষ হয়। এতে পাঁচজন মারা যান।
এছাড়া ২০ পুলিশ সদস্যসহ অর্ধশত জন আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৪ জনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
হাটহাজারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শুক্রবার সংঘর্ষে পাঁচজনের নিহত হওয়ার প্রতিবাদে আজ সারা দেশে হরতালের ডাক দিয়েছে সংগঠনটি। হরতাল শান্তিপূর্ণভাবে পালন করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন হেফাজতের আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী।
এদিকে ঢাকার মালিবাগে দুপুরে একটি যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এছাড়া এলিফেন্ট রোডে গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। সহিংস ঘটনার পর ঢাকার রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা কমে যায়।
পরিবহণ সংকটে নগরবাসীকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। শুক্রবারের সংঘর্ষের পর শনিবারও জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম এলাকা ছিল উত্তপ্ত। উত্তরাসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে স্টাফ রিপোর্টার সাব্বির আহমেদ সুবীর জানান, হরতালের সমর্থনে হেফাজতের বের করা বিক্ষোভ মিছিলে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংঘর্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন।
এ সংঘর্ষে ২০ পুলিশসহ অর্ধশত ব্যক্তি আহত হন। শনিবার বিকালে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নন্দনপুরে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী মহাসড়কে অবস্থান করেন। এ সময় পুলিশ-বিজিবি সদস্যরা তাদের ধাওয়া করলে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এতে বেশ কয়েকজন আহত হন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে আহতদের আনা হলে চিকিৎসকরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, হাসপাতালে আনার আগেই পাঁচজন মারা গেছেন। সবাই গুলিবিদ্ধ ছিল।
আহতদের সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা দেওয়া হয়। নিহতরা হলেন-সুহিলপুর ইউনিয়নের হারিয়া গ্রামের আব্দুল লতিফ মিয়ার ছেলে ওয়ার্কশপের দোকানি জুরু আলম (৩৫), সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার দাবিড় মিয়ার ছেলে শ্রমিক বাদল মিয়া (২৪), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৈন্দ গ্রামের জুরু আলীর ছেলে সুজন মিয়া (২২), ভূধল গ্রামের আলী আহমদের ছেলে কাউসার (২০) ও মাদ্রাসার ছাত্র জুবায়ের (১৪)।
এদিকে শনিবার বিকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের টিএ রোড দিয়ে আওয়ামী লীগের একটি মিছিল জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসা এলাকা অতিক্রম করার সময় পেছন দিক থেকে মাদ্রাসার কয়েকজন ছাত্রকে ধাওয়া করে।
এ সময় ছাত্ররাও পালটা ধাওয়া দেয়। তখন অর্ধশত ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। কিছুক্ষণ পর মাদ্রাসাকে রক্ষার জন্য কান্দিপাড়া মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা করা হলে হাজার হাজার লোক রাস্তায় নেমে পড়ে।
তখন ছাত্রলীগ কর্মীরা পিছু হটে। ক্ষুব্ধ লোকজন প্রধান সড়ক অবরোধ করে রাস্তায় আগুন ধরিয়ে দেয় এবং যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়। এ সময় শহরের দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। পরে বিজিবি সদস্য ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
তাণ্ডবের ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ১০ প্লাটুন বিজিবি সদস্য শহরের বিভিন্ন এলাকায় টহল দিচ্ছেন। বিজিবির পাশাপাশি অতিরিক্ত পুলিশ ও এবিপিএন সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে।
শুক্রবারের ঘটনায় ১৪ জনকে পুলিশ আটক করেছে বলে জানা যায়। এ বিষয়ে সরাইল থানা পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) কবির হোসেন জানান, বিক্ষোভ মিছিল থেকে হঠাৎ করে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালানো হয়।
এছাড়া গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আলী আহমেদের ছেলে কাউসার মিয়া, সাইদ মিয়ার ছেলে নুরুল আমিন, আব্দুল সাত্তারের ছেলে বাছির মিয়া (২৮), আবদুল হোসেনের ছেলে ছাদের মিয়া (৩৫) হাসপাতালে আনা হয়।
ঢাকায় উত্তাপ: পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী শনিবার দুপুর ১২টার দিকে হেফাজতে ইসলামের বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু হয়। এর আগে বেলা সোয়া ১১টার দিকে কয়েকশ নেতাকর্মী বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটের সিঁড়িতে অবস্থান নেয়।
হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা নুরুল ইসলামের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ফজলুল করিম কাসেমী, ঢাকা মহানগরের সভাপতি জুনায়েদ আল হাবীব, ঢাকা মহানগরের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মামুনুল হক প্রমুখ।
তারা বলেন, রোববারের (আজ) হরতালে বাধা দিলে লাগাতার কর্মসূচি দেওয়া হবে। আমরা মাঠে থাকব। কোনো অফিস-আদালত খুলবে না। গাড়ির চাকা ঘুরবে না।
এদিকে শনিবার বিকালে রাজধানীর খিলগাঁও মাখজানুল উলুম মাদ্রাসায় এক সংবাদ সম্মেলনে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা নুরুল ইসলাম জিহাদী বলেন, আমাদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ কর্মসূচিতে হাটহাজারী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও বায়তুল মোকাররমে ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
শনিবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে রাজধানীর মালিবাগ রেলগেটে পুলিশ বক্সের সামনে কে বা কারা তুরাগ পরিবহণের একটি বাসে অগ্নিসংযোগ করে। বাসে আগুন দেখে আতঙ্কে যাত্রীরা জানালার কাচ ভেঙে লাফিয়ে পড়ে।
এতে কয়েকজন সামান্য আঘাত পান। হাতিরঝিল থানার এসআই আব্দুল আলীম যুগান্তরকে জানান, এটা নাশকতা না দুর্ঘটনা, এ ব্যাপারে তদন্ত করছে পুলিশ।
উত্তরায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক সংলগ্ন মালেকা বানু স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে হেফাজত বিক্ষোভ সমাবেশ করে। এতে সভাপতিত্ব করেন মাওলানা নাজমুল হাসান। হরতালে সমর্থন জানিয়েছে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন।
বাবুনগরীর বিবৃতি : শনিবার এক বিবৃতিতে জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, আন্দোলনরত তৌহিদি জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করায় পাঁচজন শহিদ হয়েছে। গুলি ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে প্রায় চারশ প্রতিবাদী তৌহিদি জনতাকে আহত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে হামলা বরদাশত করা যায় না। তবে হরতালে বাধা দেওয়া হলে সরকার পতন আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা।
ঢাকায় বাস-মিনিবাস চলবে : হরতালে ঢাকা শহর, শহরতলী এবং আন্তঃজেলা রুটে বাস ও মিনিবাস চলাচল অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে ঢাকা সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতি।
শনিবার এক বিবৃতিতে সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, হরতালে বাস চলাচলে যাতে কোনো ধরনের বাধার সৃষ্টি করা না হয়, সেজন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা জেরদার করতে পুলিশ প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাই।
ঢাকায় মামলা : রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে শুক্রবার সড়ক অবরোধ করে পুলিশের ওপর হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় অজ্ঞাত ৩/৪ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। শুক্রবার রাতে যাত্রাবাড়ী থানায় মামলাটি করা হয়।
শনিবার সকাল থেকে বায়তুল মোকাররম, পল্টন, প্রেস ক্লাব, মতিঝিল, গুলিস্তান ও আশপাশের এলাকার প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে সতর্ক অবস্থান নেয় পুলিশ-র্যাব। এ সময় পুরো এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করে।
হরতালের সমর্থনে ঢাকার বাইরের বিক্ষোভ সমাবেশ সম্পর্কে যুগান্তরের ব্যুরো, অফিস ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
চট্টগ্রাম : মাদ্রাসাছাত্র ও কর্মীদের হত্যার প্রতিবাদে দুপুরে চট্টগ্রাম মহানগরীতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করেছে হেফাজতে ইসলাম। নগরীর জমিয়তুল ফালাহ ময়দানে সমাবেশ শেষে বিক্ষোভ মিছিল নগরীর ওয়াসা মোড় থেকে সিনেমা প্যালেসে গিয়ে শেষ হয়।
চারজনের নিহতের ঘটনায় শনিবারও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে হাটহাজারীজুড়ে। হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত এলাকার বিভিন্ন স্থানে সড়কে বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড এবং ইটের দেওয়াল তুলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়।
সিলেট : হরতালের সমর্থনে সিলেটে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে হেফাজত। বাদ আসর নগরীর বন্দরবাজারস্থ জামে মসজিদের সামনে থেকে মিছিল শুরু হয়ে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে কোর্ট পয়েন্টে গিয়ে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
হেফাজতে ইসলাম কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও সিলেট জেলার সভাপতি মাওলানা মুফতি মুহিব্বুল হক গাছবাড়ির সভাপতিত্বে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
বরিশাল : পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে নগরীতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে হেফাজত ইসলামের নেতাকর্মীরা। দুপুরে নগরীর বাজার রোডের খাজা মাঈনুদ্দিন মাদ্রাসা মাঠে অনুষ্ঠিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বরিশাল সংগঠনের নায়েবে আমির ও খাজা মাঈনুদ্দিন মাদ্রাসার পরিচালক হাফেজ মো. আবদুল হালিম।
ভাঙ্গা (ফরিদপুর) : মিছিলে বাধা দিলে হেফাজত নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এ সময় বিক্ষোভকারীরা থানায় ঢুকে দুটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ৩৫ রাউন্ড গুলি ছোড়ে।
এ সময় ইটের আঘাতে এসআইসহ ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন। এ ঘটনায় হেফাজতের দুই কর্মীকে পুলিশ আটক করে। আহত পুলিশ সদস্যদের ভাঙ্গা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এছাড়া হরতালের সমর্থনে রংপুর, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ, ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া ও নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা।
