বস্ত্র খাতে প্রণোদনা বাড়ালে কাপড় আমদানির প্রয়োজন হবে না
jugantor
সাক্ষাৎকার: মোহাম্মদ আলী খোকন
বস্ত্র খাতে প্রণোদনা বাড়ালে কাপড় আমদানির প্রয়োজন হবে না
করোনা মহামারিতে টেক্সটাইল খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুরুর দিকে রপ্তানি পণ্যের বিল পাওয়া যায়নি। সরকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করলেও সেখানে টেক্সটাইল খাতকে রাখা হয়নি। অথচ বস্ত্র খাতে যথাযথ প্রণোদনা দিলে বিদেশ থেকে কাপড় আমদানির প্রয়োজন পড়বে না। টেক্সটাইল খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন -

  সাদ্দাম হোসেন ইমরান  

২৯ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যুগান্তর : করোনাভাইরাসের প্রেক্ষাপটে শিল্পের বর্তমান অবস্থা কেমন?

মোহাম্মদ আলী খোকন : করোনাভাইরাস দেশের ও বিশ্বের আর্থসামাজিক পরিস্থিতিকে কঠিনভাবে আঘাত করেছে। গত বছর করোনার শুরুতে রপ্তানির বাজার দীর্ঘ সময় বন্ধ থেকেছে। বাংলাদেশেও শিল্প-কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থেকেছে। ক্রেতারা ব্যাপক হারে অর্ডার বাতিল করেছেন। রপ্তানির বিলও ঠিকমতো আসেনি। সেই বিল এখনো আসছে না। বর্তমানে ২ বিলিয়ন ডলারের অর্ডার রয়েছে। আরও ২ বিলিয়ন ডলারের পিআই রয়েছে। মোটা দাগে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলছে। এর কৃতিত্ব সরকারপ্রধানের। স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানা খোলা রাখার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা যুগোপযোগী।

যুগান্তর : গত বছর কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে?

মোহাম্মদ আলী খোকন : করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে টেক্সটাইল খাত। একদিকে রপ্তানি অর্ডার বাতিল হয়েছে, অন্যদিকে স্থানীয় বাজার হারিয়েছে এ খাত। আনুমানিক হিসাবে গত বছর ৬-৭ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ক্ষতি হয়েছে। আর স্থানীয় বাজারে ক্ষতির পরিমাণ ৫ বিলিয়ন ডলার। পহেলা বৈশাখ, জাকাতের কাপড় ও রোজার ঈদ টেক্সটাইল খাতে বড় একটি মৌসুম। গত বছর সেটি হারিয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এবার সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অনেকে মহাজনি সুদ নিয়ে শুরু করেছিলেন। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সব ওলটপালট করে দিয়েছে। এবার সরকার ঈদের আগে মার্কেট খুলে দেওয়ায় কিছুটা হলেও ক্ষতি পোষানো যাবে। এটা সরকারের যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত বলে মনে করি।

যুগান্তর : করোনার প্রকোপ দীর্ঘায়িত হওয়ায় নতুন কী কী সমস্যা হচ্ছে?

মোহাম্মদ আলী খোকন : করোনার প্রকোপ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, সমস্যা তত বাড়ছে। কোথায় গিয়ে তা থামবে, কোনো অনুমান করা যাচ্ছে না। যে কারণে এখন কোনো উদ্যোক্তাই ব্যবসা বাড়ানোর পরিকল্পনা করতে পারছেন না। শুধু চালু ব্যবসাটা ধরে রাখার চেষ্টায় আছেন। শুধু যে দেশের রপ্তানিকারকরাই সংকটে পড়েছেন, তা নয়। বড় বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোও সংকটে পড়েছে। তারা পণ্য বিক্রি করতে পারছেন না বলে রপ্তানি বিলের অর্থও পরিশোধ করতে পারছেন না। এ কারণে দেশের অনেক উদ্যোক্তার পক্ষেই ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ মুহূর্তে ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থতার কারণে যাতে কাউকে ঋণখেলাপি হিসাবে চিহ্নিত না করা হয়, সে ব্যবস্থা নেওয়াটা জরুরি।

যুগান্তর : টেক্সটাইল শিল্পে গ্যাসের চাপ একটি বড় সমস্যা। এটি সমাধানে কোনো উদ্যোগ নিয়েছেন কি না?

মোহাম্মদ আলী খোকন : নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও এবং গাজীপুর অঞ্চলের মিল মালিকদের কাছে গ্যাস এখন সোনার হরিণ। তিতাসকে বারবার চিঠি দেওয়ার পরও সমস্যার সমাধান করতে এক মাস লেগেছে, তাও মন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনার পর হয়েছে। কিন্তু এটা কতদিন ঠিক থাকবে, তা বলা যাচ্ছে না। এক মাস গ্যাসের চাপ ঠিক থাকলে দুই মাস থাকে না। বিল কিন্তু ঠিকই নিচ্ছে। গ্যাসের দাম বাড়লেও তিতাসের সেবার মান বাড়েনি এবং সমস্যা হলে সেটা সমাধানে উদ্যোগী ভূমিকা নেই। তিতাসের সেবার মান নিয়ে আমরা শঙ্কিত। যে পরিমাণ বিল দেই, সেই পরিমাণ সেবা পাচ্ছি না।

যুগান্তর : বর্তমানে ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হয়?

মোহাম্মদ আলী খোকন : ব্যাংক ঋণ পেতে অনেক জটিলতার পড়তে হয়। ব্যাংকের নিয়মনীতি মানতে অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন ইন্টারন্যাশনাল ক্রেডিট রিস্ক রেটিং ব্যবস্থা চালু করেছে। এই রেটিংয়ের নীতিমালা মেনে ঋণ নিতে হয়। এর আওতায় ঋণ নিতে হলে কোনো গ্রাহকের ঝুঁকির মাত্রা কোনোক্রমেই ৬০-এর উপরে যাওয়া যাবে না। এর নিচে থাকতে হবে। এর উপরে গেলে ঋণ মিলবে না। কিন্তু দেখা যায়, অনেক গ্রাহক এ ঝুঁকির কারণে এখন ঋণ নিতে পারেন না। করোনাকালীন এটি স্থগিত করার জন্য আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ করেছি। এটি স্থগিত না করা হলে অনেক উদ্যোক্তা ঋণ নিয়ে সচল হতে পারবেন না। এখন তো করোনার ধাক্কায় এমনিতেই অবস্থা খারাপ। নীতিমালা বাস্তবায়ন করে ঋণ নেওয়া সম্ভব হবে না। নীতিমালা অনুযায়ী ঝুঁকি কমাতে হলে সার্বিক ব্যবসায়িক ঝুঁকির মাত্রা কম থাকতে হবে। এখন তো ঝুঁকির মাত্রা অনেক বেশি। যে পণ্যটি তৈরি হচ্ছে সেটি রপ্তানি করা সম্ভব হবে কি না, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। রপ্তানি হলেও এর মূল্য কবে পাওয়া যাবে, এরও কোনো গ্যারান্টি নেই। ফলে সব মিলেই ঝুঁকি আছে। এছাড়া মুনাফা বেশি করতে হবে। ঋণের পরিমাণ কম থাকতে হবে। করোনার কারণে এখন যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে তাতে এখন বেশি মুনাফা করা সম্ভব নয়, এখন বেশি ঋণের দরকার। কারণ করোনার কারণে ব্যবসায়ীদের হাতে তারল্যপ্রবাহ অনেক কমে গেছে। এখন ঋণ নিয়েই ব্যবসা সচল করতে হবে। গত বছর এটা নিয়ে সরকারের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করেছি। আমরা এটা রহিত করার দাবি জানিয়েছি। কিন্তু দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এটি সাময়িকভাবে কিছু শিথিল করেছে। কিন্তু তাতে কাজ হচ্ছে না। এখন এটিকে রহিত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

যুগান্তর : আগামী অর্থবছরের বাজেট আসন্ন। বাজেটে আপনাদের প্রত্যাশা কী?

মোহাম্মদ আলী খোকন : সব সময়ই বাজেটে আমাদের অনেক বেশি প্রত্যাশা থাকে। এবারও আছে। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের টেক্সটাইল শিল্প খাতে প্রণোদনার পরিমাণ আরও বাড়াতে হবে। এ খাতের কয়েকটি অংশে প্রণোদনা বাড়ানো হলে বিদেশ থেকে কাপড় আমদানির প্রয়োজন হবে না। আমদানির বিকল্প সমুদয় কাপড় দেশেই উৎপাদন করে রপ্তানির চাহিদা মেটানো যাবে। এতে একদিকে দেশে বস্ত্র খাতের বিকাশ ঘটবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান বাড়বে। পাশাপাশি আমদানি বাবদ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

যুগান্তর : কী ধরনের প্রণোদনা চান আপনারা?

মোহাম্মদ আলী খোকন : ওভেন পোশাক রপ্তানির জন্য দেশে এখনো বিদেশ থেকে অনেক কাপড় আমদানি করতে হয়। অথচ দেশীয় টেক্সটাইল কারখানাগুলোই এসব কাপড় উৎপাদন করতে সক্ষম। আগামী বাজেটে এ খাতে প্রণোদনার পরিমাণ একটু বাড়িয়ে দিলে খুব সহজেই চাহিদার সমপরিমাণ কাপড় উৎপাদন করতে পারবে দেশীয় বস্ত্র কারখানাগুলো। এজন্য আরও কিছু বিনিয়োগ করতে হবে। বর্তমানে এ খাতে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে ৪ শতাংশ। এর মোট পরিমাণের ওপর থেকে আবার ১০ শতাংশ কর কেটে নিচ্ছে সরকার। ফলে প্রণোদনার ২ দশমিক ৫ থেকে ২ দশমিক ৬ শতাংশ পাচ্ছেন রপ্তানিকারকরা। এ খাতের ওপর আরোপিত কর প্রত্যাহার করা হলে রপ্তানিকারকদের তারল্যপ্রবাহ বাড়বে। ওই অংশ বিনিয়োগ করা যাবে। তাছাড়া দেশের স্পিনিং মিলগুলোতে বিভিন্ন ধরনের সুতা উৎপাদিত হচ্ছে। এসব সুতায় বিভিন্ন হারে ভ্যাট ও ট্যাক্স আরোপিত রয়েছে। শিল্পের স্বার্থে আগামী এক বছর ভ্যাট-ট্যাক্স প্রত্যাহার করা উচিত।

যুগান্তর : ব্যবসায়ীদের একটি বড় দাবি হচ্ছে করপোরেট করের হার কমানো। প্রতি বছরই এ নিয়ে আপনারা সরকারের সঙ্গে কথা বলেন। এ প্রসঙ্গে আপনার বক্তব্য কী?

মোহাম্মদ আলী খোকন : দেশীয় শিল্পবিকাশের ক্ষেত্রে অন্যতম একটি প্রতিবন্ধক হচ্ছে বর্তমানে আরোপিত উচ্চ করপোরেট করহার। বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোসহ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় করপোরেট করের হার অনেক বেশি। দেশীয় শিল্পের স্বার্থরক্ষায় ও বিকাশের সুযোগ দিতে করপোরেট করের হার কমানোর কোনো বিকল্প নেই। করপোরেট করের হার কমানো হলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোয় তারল্যের প্রবাহ বাড়বে। ওই অর্থ তারা পুনরায় বিনিয়োগ করতে পারবে, যা করোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অর্থনীতিকেও পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। করপোরেট করের হার না কমালে দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সবলভাবে টিকিয়ে রাখা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হবে। করোনার আঘাত থেকে দেশীয় শিল্পকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে করপোরেট করহার কমানো একটি উপায় হতে পারে। আরও নানা ধরনের প্রণোদনা প্রয়োজন। এর মধ্যে বিভিন্ন খাতে করের হার কমানো, অবকাঠামোগত ফি মওকুফ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

যুগান্তর : রপ্তানি আয়ের ওপর আরোপিত উৎসে কর নিয়ে আপনার বক্তব্য কী?

মোহাম্মদ আলী খোকন : রপ্তানি আয় দেশে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংক এখন শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ হারে উৎসে আয়কর কেটে রাখে। এ হার আমরা প্রত্যাহার করার দাবি করে আসছি। যে কর কাটা হয় সেটাকে আগামী বাজেটে যেন চূড়ান্ত কর দায় হিসাবে অভিহিত করা হয়, সেই ব্যাপারে বিধান করার প্রস্তাব করেছি। এতে সরকারের কর আদায়ে ও ব্যবসায়ীদের কর দিতে জটিলতা কমবে।

যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।

মোহাম্মদ আলী খোকন : ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার: মোহাম্মদ আলী খোকন

বস্ত্র খাতে প্রণোদনা বাড়ালে কাপড় আমদানির প্রয়োজন হবে না

করোনা মহামারিতে টেক্সটাইল খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুরুর দিকে রপ্তানি পণ্যের বিল পাওয়া যায়নি। সরকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করলেও সেখানে টেক্সটাইল খাতকে রাখা হয়নি। অথচ বস্ত্র খাতে যথাযথ প্রণোদনা দিলে বিদেশ থেকে কাপড় আমদানির প্রয়োজন পড়বে না। টেক্সটাইল খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন -
 সাদ্দাম হোসেন ইমরান 
২৯ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যুগান্তর : করোনাভাইরাসের প্রেক্ষাপটে শিল্পের বর্তমান অবস্থা কেমন?

মোহাম্মদ আলী খোকন : করোনাভাইরাস দেশের ও বিশ্বের আর্থসামাজিক পরিস্থিতিকে কঠিনভাবে আঘাত করেছে। গত বছর করোনার শুরুতে রপ্তানির বাজার দীর্ঘ সময় বন্ধ থেকেছে। বাংলাদেশেও শিল্প-কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থেকেছে। ক্রেতারা ব্যাপক হারে অর্ডার বাতিল করেছেন। রপ্তানির বিলও ঠিকমতো আসেনি। সেই বিল এখনো আসছে না। বর্তমানে ২ বিলিয়ন ডলারের অর্ডার রয়েছে। আরও ২ বিলিয়ন ডলারের পিআই রয়েছে। মোটা দাগে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলছে। এর কৃতিত্ব সরকারপ্রধানের। স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানা খোলা রাখার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা যুগোপযোগী।

যুগান্তর : গত বছর কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে?

মোহাম্মদ আলী খোকন : করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে টেক্সটাইল খাত। একদিকে রপ্তানি অর্ডার বাতিল হয়েছে, অন্যদিকে স্থানীয় বাজার হারিয়েছে এ খাত। আনুমানিক হিসাবে গত বছর ৬-৭ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ক্ষতি হয়েছে। আর স্থানীয় বাজারে ক্ষতির পরিমাণ ৫ বিলিয়ন ডলার। পহেলা বৈশাখ, জাকাতের কাপড় ও রোজার ঈদ টেক্সটাইল খাতে বড় একটি মৌসুম। গত বছর সেটি হারিয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এবার সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অনেকে মহাজনি সুদ নিয়ে শুরু করেছিলেন। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সব ওলটপালট করে দিয়েছে। এবার সরকার ঈদের আগে মার্কেট খুলে দেওয়ায় কিছুটা হলেও ক্ষতি পোষানো যাবে। এটা সরকারের যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত বলে মনে করি।

যুগান্তর : করোনার প্রকোপ দীর্ঘায়িত হওয়ায় নতুন কী কী সমস্যা হচ্ছে?

মোহাম্মদ আলী খোকন : করোনার প্রকোপ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, সমস্যা তত বাড়ছে। কোথায় গিয়ে তা থামবে, কোনো অনুমান করা যাচ্ছে না। যে কারণে এখন কোনো উদ্যোক্তাই ব্যবসা বাড়ানোর পরিকল্পনা করতে পারছেন না। শুধু চালু ব্যবসাটা ধরে রাখার চেষ্টায় আছেন। শুধু যে দেশের রপ্তানিকারকরাই সংকটে পড়েছেন, তা নয়। বড় বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোও সংকটে পড়েছে। তারা পণ্য বিক্রি করতে পারছেন না বলে রপ্তানি বিলের অর্থও পরিশোধ করতে পারছেন না। এ কারণে দেশের অনেক উদ্যোক্তার পক্ষেই ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ মুহূর্তে ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থতার কারণে যাতে কাউকে ঋণখেলাপি হিসাবে চিহ্নিত না করা হয়, সে ব্যবস্থা নেওয়াটা জরুরি।

যুগান্তর : টেক্সটাইল শিল্পে গ্যাসের চাপ একটি বড় সমস্যা। এটি সমাধানে কোনো উদ্যোগ নিয়েছেন কি না?

মোহাম্মদ আলী খোকন : নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও এবং গাজীপুর অঞ্চলের মিল মালিকদের কাছে গ্যাস এখন সোনার হরিণ। তিতাসকে বারবার চিঠি দেওয়ার পরও সমস্যার সমাধান করতে এক মাস লেগেছে, তাও মন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনার পর হয়েছে। কিন্তু এটা কতদিন ঠিক থাকবে, তা বলা যাচ্ছে না। এক মাস গ্যাসের চাপ ঠিক থাকলে দুই মাস থাকে না। বিল কিন্তু ঠিকই নিচ্ছে। গ্যাসের দাম বাড়লেও তিতাসের সেবার মান বাড়েনি এবং সমস্যা হলে সেটা সমাধানে উদ্যোগী ভূমিকা নেই। তিতাসের সেবার মান নিয়ে আমরা শঙ্কিত। যে পরিমাণ বিল দেই, সেই পরিমাণ সেবা পাচ্ছি না।

যুগান্তর : বর্তমানে ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হয়?

মোহাম্মদ আলী খোকন : ব্যাংক ঋণ পেতে অনেক জটিলতার পড়তে হয়। ব্যাংকের নিয়মনীতি মানতে অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন ইন্টারন্যাশনাল ক্রেডিট রিস্ক রেটিং ব্যবস্থা চালু করেছে। এই রেটিংয়ের নীতিমালা মেনে ঋণ নিতে হয়। এর আওতায় ঋণ নিতে হলে কোনো গ্রাহকের ঝুঁকির মাত্রা কোনোক্রমেই ৬০-এর উপরে যাওয়া যাবে না। এর নিচে থাকতে হবে। এর উপরে গেলে ঋণ মিলবে না। কিন্তু দেখা যায়, অনেক গ্রাহক এ ঝুঁকির কারণে এখন ঋণ নিতে পারেন না। করোনাকালীন এটি স্থগিত করার জন্য আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ করেছি। এটি স্থগিত না করা হলে অনেক উদ্যোক্তা ঋণ নিয়ে সচল হতে পারবেন না। এখন তো করোনার ধাক্কায় এমনিতেই অবস্থা খারাপ। নীতিমালা বাস্তবায়ন করে ঋণ নেওয়া সম্ভব হবে না। নীতিমালা অনুযায়ী ঝুঁকি কমাতে হলে সার্বিক ব্যবসায়িক ঝুঁকির মাত্রা কম থাকতে হবে। এখন তো ঝুঁকির মাত্রা অনেক বেশি। যে পণ্যটি তৈরি হচ্ছে সেটি রপ্তানি করা সম্ভব হবে কি না, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। রপ্তানি হলেও এর মূল্য কবে পাওয়া যাবে, এরও কোনো গ্যারান্টি নেই। ফলে সব মিলেই ঝুঁকি আছে। এছাড়া মুনাফা বেশি করতে হবে। ঋণের পরিমাণ কম থাকতে হবে। করোনার কারণে এখন যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে তাতে এখন বেশি মুনাফা করা সম্ভব নয়, এখন বেশি ঋণের দরকার। কারণ করোনার কারণে ব্যবসায়ীদের হাতে তারল্যপ্রবাহ অনেক কমে গেছে। এখন ঋণ নিয়েই ব্যবসা সচল করতে হবে। গত বছর এটা নিয়ে সরকারের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করেছি। আমরা এটা রহিত করার দাবি জানিয়েছি। কিন্তু দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এটি সাময়িকভাবে কিছু শিথিল করেছে। কিন্তু তাতে কাজ হচ্ছে না। এখন এটিকে রহিত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

যুগান্তর : আগামী অর্থবছরের বাজেট আসন্ন। বাজেটে আপনাদের প্রত্যাশা কী?

মোহাম্মদ আলী খোকন : সব সময়ই বাজেটে আমাদের অনেক বেশি প্রত্যাশা থাকে। এবারও আছে। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের টেক্সটাইল শিল্প খাতে প্রণোদনার পরিমাণ আরও বাড়াতে হবে। এ খাতের কয়েকটি অংশে প্রণোদনা বাড়ানো হলে বিদেশ থেকে কাপড় আমদানির প্রয়োজন হবে না। আমদানির বিকল্প সমুদয় কাপড় দেশেই উৎপাদন করে রপ্তানির চাহিদা মেটানো যাবে। এতে একদিকে দেশে বস্ত্র খাতের বিকাশ ঘটবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান বাড়বে। পাশাপাশি আমদানি বাবদ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

যুগান্তর : কী ধরনের প্রণোদনা চান আপনারা?

মোহাম্মদ আলী খোকন : ওভেন পোশাক রপ্তানির জন্য দেশে এখনো বিদেশ থেকে অনেক কাপড় আমদানি করতে হয়। অথচ দেশীয় টেক্সটাইল কারখানাগুলোই এসব কাপড় উৎপাদন করতে সক্ষম। আগামী বাজেটে এ খাতে প্রণোদনার পরিমাণ একটু বাড়িয়ে দিলে খুব সহজেই চাহিদার সমপরিমাণ কাপড় উৎপাদন করতে পারবে দেশীয় বস্ত্র কারখানাগুলো। এজন্য আরও কিছু বিনিয়োগ করতে হবে। বর্তমানে এ খাতে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে ৪ শতাংশ। এর মোট পরিমাণের ওপর থেকে আবার ১০ শতাংশ কর কেটে নিচ্ছে সরকার। ফলে প্রণোদনার ২ দশমিক ৫ থেকে ২ দশমিক ৬ শতাংশ পাচ্ছেন রপ্তানিকারকরা। এ খাতের ওপর আরোপিত কর প্রত্যাহার করা হলে রপ্তানিকারকদের তারল্যপ্রবাহ বাড়বে। ওই অংশ বিনিয়োগ করা যাবে। তাছাড়া দেশের স্পিনিং মিলগুলোতে বিভিন্ন ধরনের সুতা উৎপাদিত হচ্ছে। এসব সুতায় বিভিন্ন হারে ভ্যাট ও ট্যাক্স আরোপিত রয়েছে। শিল্পের স্বার্থে আগামী এক বছর ভ্যাট-ট্যাক্স প্রত্যাহার করা উচিত।

যুগান্তর : ব্যবসায়ীদের একটি বড় দাবি হচ্ছে করপোরেট করের হার কমানো। প্রতি বছরই এ নিয়ে আপনারা সরকারের সঙ্গে কথা বলেন। এ প্রসঙ্গে আপনার বক্তব্য কী?

মোহাম্মদ আলী খোকন : দেশীয় শিল্পবিকাশের ক্ষেত্রে অন্যতম একটি প্রতিবন্ধক হচ্ছে বর্তমানে আরোপিত উচ্চ করপোরেট করহার। বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোসহ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় করপোরেট করের হার অনেক বেশি। দেশীয় শিল্পের স্বার্থরক্ষায় ও বিকাশের সুযোগ দিতে করপোরেট করের হার কমানোর কোনো বিকল্প নেই। করপোরেট করের হার কমানো হলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোয় তারল্যের প্রবাহ বাড়বে। ওই অর্থ তারা পুনরায় বিনিয়োগ করতে পারবে, যা করোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অর্থনীতিকেও পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। করপোরেট করের হার না কমালে দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সবলভাবে টিকিয়ে রাখা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হবে। করোনার আঘাত থেকে দেশীয় শিল্পকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে করপোরেট করহার কমানো একটি উপায় হতে পারে। আরও নানা ধরনের প্রণোদনা প্রয়োজন। এর মধ্যে বিভিন্ন খাতে করের হার কমানো, অবকাঠামোগত ফি মওকুফ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

যুগান্তর : রপ্তানি আয়ের ওপর আরোপিত উৎসে কর নিয়ে আপনার বক্তব্য কী?

মোহাম্মদ আলী খোকন : রপ্তানি আয় দেশে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংক এখন শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ হারে উৎসে আয়কর কেটে রাখে। এ হার আমরা প্রত্যাহার করার দাবি করে আসছি। যে কর কাটা হয় সেটাকে আগামী বাজেটে যেন চূড়ান্ত কর দায় হিসাবে অভিহিত করা হয়, সেই ব্যাপারে বিধান করার প্রস্তাব করেছি। এতে সরকারের কর আদায়ে ও ব্যবসায়ীদের কর দিতে জটিলতা কমবে।

যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।

মোহাম্মদ আলী খোকন : ধন্যবাদ।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস