নতুন কর নয় ফাঁকি বন্ধ করুন: সিপিডি
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০১ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাব ফেলছে করোনা ভাইরাস। আয় ও ব্যয়সহ সব খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বল্প নয়, মধ্যমেয়াদি পদক্ষেপ জরুরি। সামগ্রিকভাবে সম্প্রসারণমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে আয় বাড়াতে নতুন কর আরোপ না করে, কর ফাঁকি ও অর্থ পাচার বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়। সংস্থাটি বলছে, ব্যয়ের ক্ষেত্রে ৪টি খাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই)। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির চিন্তা থেকে বেরিয়ে বৈষম্য রোধ ও সুষম বণ্টনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। ব্যাংকিং খাতে সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এবং গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির সিনিয়র রিসার্স ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, চলতি অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন চিত্র হতাশাজনক। ১০ মাসে বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৪২ শতাংশ। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কম। একই সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে ৪৯ শতাংশ। আর স্বাস্থ্য খাতের এডিপি বাস্তবায়ন মাত্র ৩১ শতাংশ। এছাড়া ব্যক্তি খাতে ঋণ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল যেখানে ১৫ শতাংশ, প্রথম ৮ মাসে তা হয়েছে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। আর বিদেশি সাহায্যের ৪৭ দশমিক ৫০ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, চলতি অর্থবছরে শিল্পের উৎপাদন কমে গেছে। জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বৃহৎ ও মাঝারি শিল্পে উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৭০ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ১৪ দশমিক ৩০ শতাংশ। আর ক্ষুদ্র শিল্পে চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি মাত্র ১ দশমিক ৮০ শতাংশ। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ। তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, অর্থনীতি চাঙা করতে সম্প্রসারণমূলক অর্থনীতিতে যেতে হবে। আর অর্থনীতি বড় করার শক্তি আমাদের রয়েছে। কারণ এখনো বাংলাদেশে জিডিপির তুলনায় ঋণ ৩২ থেকে ৩৩ শতাংশ। এটি খুবই কম। প্রতিযোগী দেশগুলোর অনেক বেশি। অর্থাৎ এখনো ঋণ করার অনেক সুযোগ রয়েছে। কৃষি খাতে মূল্য কমিশন ও ব্যাংক কমিশন করার সুপারিশও করেছে সিপিডি। তিনি বলেন, বর্তমানে যে কর কাঠামো আছে, তার মধ্যে নতুন করে কর আরোপের সুযোগ খুব বেশি নেই। কারণ অর্থনীতি চাপের মধ্যে। সেজন্য নতুন কর বা উচ্চ করের ভেতরে এখন যাওয়াটা ঠিক হবে না। প্রবন্ধে আরও বলা হয়, ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের জন্য একটি কমিশন গঠনের জন্য বহুদিন থেকে বলে আসছে সিপিডি। সরকার একবার উদ্যোগ নিয়েও আবার পিছিয়ে গেছে। কিন্তু এই কমিশন খুবই জরুরি। এর অন্যতম কারণ, খেলাপি ঋণের যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, বাস্তবে তা আরও অনেক বেশি। সিপিডির এই রিসার্স ফেলো বলেন, প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণ জরুরি। এক্ষেত্রে বহুপাক্ষিক টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। তিনি আরও বলেন, এবারের বাজেটে ব্যয়ের দিক থেকে স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, এ সময়ে নতুন কর আরোপ করা কঠিন। কিন্তু বাজেট বাস্তবায়নে অর্থের দরকার। এ অবস্থায় আয় বাড়াতে কর ফাঁকি রোধ এবং অর্থ পাচার বন্ধে নজর দেওয়া। তিনি বলেন, করোনাকালে সাধারণ মানুষের আয় কমেছে। বিপরীতে খাদ্য ও চিকিৎসা খাতের মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এতে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া এখন সুদের হার অনেক কম। কিন্তু তারপরও ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগে তেমন চাঞ্চল্য নেই। সবকিছু বিবেচনা করে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্রিফিংয়ে চাল, ভোজ্যতেল ও চিনির দামের অস্থিরতার তথ্যও তুলে ধরে সিপিডি। এ বিষয়ে তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, চাল, ভোজ্যতেল, চিনির দাম বিশ্ববাজারে ও দেশের বাজারে অনেক ওঠানামা করেছে। তবে দেশের বাজারে চালের বাজার যতটা অস্থিতিশীল ছিল, বিশ্ববাজারে ততটা নয়। এটা চিন্তার বিষয়। তিনি বলেন, সার্বিকভাবে বিশ্ববাজারে দাম ওঠানামার ওপরই দেশের বাজারে দাম নির্ভর করে না। এর সঙ্গে আরও অনেক কিছু জড়িত। চাল ও গমের মজুত অনেক কমে গেছে। এটার একটা বিরূপ প্রভাব আছে। চাল আমদানির ক্ষেত্রে ব্যক্তি খাতের আমদানিকারকদের আরও বেশি উৎসাহ দিতে হবে। আর অভ্যন্তরীণভাবে যে চাল সংগ্রহ করা হয়, তা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে নিতে পারলে অধিক কার্যকর হবে। এ সময় ‘কৃষি দামের কমিশন’ গঠনেরও প্রস্তাব দেওয়া হয় সিপিডির পক্ষ থেকে।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেট বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। তিনি বলেন, গ্রামের প্রচ্ছন্ন বেকার মানুষগুলো এখনো শহরের দিকে আসার চেষ্টা করছে। এসব মানুষকে কীভাবে প্রণোদনার আওতায় আনা যায়, তা মধ্যমেয়াদি কার্যক্রমের আওতায় খুঁজে বের করতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে আরও বরাদ্দ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সামাজিক সুরক্ষা খাত শক্তিশালী করা। এ খাতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বরাদ্দের তুলনায় আমাদের বরাদ্দ সবচেয়ে কম। স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ব্যয় করতে না পারা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে এখন কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে এ খাতে একটি বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ক্লিনিকগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কীভাবে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানো যায়, সেদিকে চিন্তা করতে পারে সরকার।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকার বলছে, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে জিডিপির ৩ শতাংশ বরাদ্দ। বাস্তবে এটা দেড় শতাংশ হবে। তিনি বলেন, জিডিপি অন্তত ৪ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ রাখা উচিত।’ সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে ফাহমিদা বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে একদিকে অর্থ বরাদ্দ কম, ‘অন্যদিকে অর্থ ব্যবহার করার সক্ষমতা নেই। কোন মন্ত্রণালয়ের কোন খাতে কী ধরনের সক্ষমতা আছে, কত ব্যয় করতে পারে, সেটাকে বেঞ্চমার্ক ধরে অর্থ মন্ত্রণালয় বরাদ্দ দেয়। এখন বর্ধিত যে অর্থ দেওয়া হবে, সেটা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কীভাবে খরচ করবে? আবার যেটা খরচ করল সেটাও বা কীভাবে হলো? এখানে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা হচ্ছে। ফলে একটা খাতের যে বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম, দুর্নীতি, দুর্বলতা এগুলোর কারণেই কিন্তু বরাদ্দ দিয়েও লাভ নেই। সুতরাং যেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সেটার যথাযথ বাস্তবায়ন করাই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, ‘এখানে কাঠামোগত সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। এই কার্যক্রমগুলো চালিয়ে যেতে হবে। না হলে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে কোনো লাভ হবে না। গতানুগতিক যেভাবে ব্যয় হচ্ছিল, সেভাবেই হবে। বরাদ্দ বাড়ালে কিছুটা অপচয় হবে, কিছুটা চুরি হবে, এভাবেই চলে যাবে। দিন শেষে মানুষের কোনো উপকার হবে না।’ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, যে কোনো সংস্কারের বিষয় এলেই সরকারের মধ্যে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। আর বাস্তবায়ন করতে হলে সংস্কারের বিকল্প নেই।
