বাজেটে কর ছাড়ে শুভংকরের ফাঁকি
jugantor
বাজেটে কর ছাড়ে শুভংকরের ফাঁকি

  সাদ্দাম হোসেন ইমরান  

১৪ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রস্তাবিত বাজেটে করছাড় দিলেও তাতে শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে। যেমন করপোরেট কর, এক ব্যক্তির কোম্পানির কর এবং সব রপ্তানিমুখী শিল্পে একই হারে করারোপের মাধ্যমে ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে জুড়ে দেওয়া হয়েছে কঠিন শর্ত। এ কারণে প্রকৃতপক্ষেই শিল্প করছাড়ের সুবিধা নিতে পারবে কি না, তা নিয়ে উদ্যোক্তাদের মনে প্রশ্ন জেগেছে। আবার অর্থবিলের মাধ্যমে আয়কর অধ্যাদেশে কয়েকটি ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এতে উৎসে কর আদায়ের ব্যর্থতার দায়ে প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন, খেলাপি ঋণের মওকুফের ওপর করারোপ এবং কোম্পানির সুদ আয়ে দ্বিগুণ করারোপ করা হয়েছে; যা শিল্পমালিকদের ভাবিয়ে তুলেছে।

এবারের বাজেটে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় করপোরেট কর হ্রাস। এ নিয়ে টানা ৩ অর্থবছরে এ কর হ্রাস করা হলো। আগের দুবার শর্তহীনভাবে করপোরেট করছাড় দেওয়া হলেও এবার কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

তা হলো-সব ধরনের প্রাপ্তি ও আয় ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে করতে হবে। এছাড়া ১২ লাখ টাকার বেশি ব্যয় ও বিনিয়োগ ব্যাংক স্থানান্তরের মাধ্যমে করতে হবে। অর্থাৎ, ১২ লাখ টাকা বেশি ক্যাশ লেনদেন করলে ওই কোম্পানি করছাড়ের সুবিধা পাবে না, আগের হারেই করপোরেট কর দিতে হবে। কোম্পানি ছোট হোক বা বড়-সবার ক্ষেত্রেই এ শর্ত প্রযোজ্য।

অর্থনীতিবিদ ও শিল্পমালিকরা বলছেন, ছোট ও বড় প্রতিষ্ঠানের ক্যাশ লেনদেনের সীমা এক হতে পারে না। বড় প্রতিষ্ঠানের লেনদেন বেশি হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে ছোট প্রতিষ্ঠানকে যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, বড় প্রতিষ্ঠানকেও সেই শর্ত মানতে হবে; যা অযৌক্তিক ও বাস্তবতাবিবর্জিত।

শনিবার বাজেট প্রতিক্রিয়ায় এফবিসিসিআই সভাপতি জসিম উদ্দিন করপোরেট কর হ্রাস প্রসঙ্গে বলেন, সরকার বিভিন্ন জায়গায় করছাড় দিয়েছে। আবার সামগ্রিকভাবে দেওয়ার চেয়ে নিয়েছে বেশি। করের করপোরেট ছাড় দিয়েছে ঠিক, ছাড়ের চেয়ে নেওয়ার ব্যালেন্সটি অর্থমন্ত্রীর পক্ষেই বেশি যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, করপোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানো হয়েছে, যা প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। তবে অগ্রিম আয়কর ও আগাম কর বিদ্যমান থাকায় এই কর সুবিধা ব্যবসায়ীদের জন্য তেমন সুফল বয়ে আনবে না। কারণ, অগ্রিম আয়কর ও আগাম কর সমন্বয় করা হয় না। যদি এই কর ফেরত দেওয়াই হয়ে থাকে, তাহলে নেওয়ার দরকার কী। করপোরেট কর না কমিয়ে এগুলো উঠিয়ে দিলে ভালো হতো।

এ তো গেল সাধারণ প্রতিষ্ঠানের করপোরেট কর। বাজেটে সব রপ্তানিমুখী শিল্পে একই হারে (সাধারণ শিল্পে ১২ শতাংশ এবং সবুজ শিল্পে ১০ শতাংশ) করারোপের ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী, যা বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হয়েছে। তবে রপ্তানির উৎসে কর দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ-অর্থাৎ রপ্তানির উৎসে কর দ্বিগুণ করা হয়েছে। প্রায় বেশির ভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান কেটে নেওয়া উৎসে কর অনুযায়ী রিটার্নে আয় দেখিয়ে থাকে। তাই সাধারণ হারে কর দেয় না। বাজেটে উৎসে কর দ্বিগুণ করায় রপ্তানিকারকদের বেশি কর দিতে হবে।

এ বিষয়ে বিকেএমইএ-এর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, রপ্তানিমুখী শিল্পমালিকরা নিয়ম মেনে কর দিতে চান। কিন্তু আয়কর বিভাগের সেখানে সদিচ্ছার ঘাটতি আছে। উৎসে কর সমন্বয়ের কথা থাকলেও চূড়ান্ত রিটার্নে সেটা করা হয় না। আবার উপকর কমিশনার অনেক খরচ অনুমোদন করেন না, সেই খরচের ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর নির্ধারণ করেন। গত ২ বছর রপ্তানিমুখী শিল্পের লোকসান হলেও এ প্রক্রিয়ার ব্যত্যয় ঘটেনি। তাই কর কর্মকর্তারা যে বলে থাকেন, রপ্তানিকারকরা দশমিক ৫০ শতাংশের বেশি কর দেন না, সেটি ভুল।

তথ্য বলছে, আয়কর বিভাগ প্রতিবছর যে পরিমাণ কর আদায় করে, এর মধ্যে ৬২-৬৫ শতাংশই উৎসে কর থেকে আসে। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকা উৎসে কর আদায় হয়েছে। উৎসে কর মূলত সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সেবা ও বিলের বিপরীতে আদায় করে তা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়। এক্ষেত্রে কর বিভাগ শুধু মনিটরিং করে থাকে। প্রস্তাবিত বাজেটে উৎসে কর কর্তন ও আদায়ে ব্যর্থতার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়ী করে জরিমানার বিধান করা হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত হারের চেয়ে কম হারে উৎসে কর কর্তন করলে যে অঙ্কের কর কম কর্তন করেছে, সেই অঙ্কের কর প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আদায়ের বিধান করা হয়েছে। আবার ব্যর্থতার জন্য সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানাও করতে পারবে আয়কর বিভাগ। শুধু তাই নয়, উৎসে কর আদায় কার্যক্রম গতিশীল করতে বাজেটে কর কর্মকর্তাদের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। চাইলে কর কর্মকর্তারা ব্যবসা প্রাঙ্গণে বাধাহীনভাবে প্রবেশ করতে পারবেন। পাশাপাশি অ্যাকাউন্ট বই ও রেকর্ড বই জব্দ করতে পারবেন। এক্ষেত্রে কর কর্মকর্তা বাধার শিকার হলে উৎসে কর্তনকারী প্রতিষ্ঠান বা বাধা প্রদানকারী ব্যক্তিকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারবেন। শনিবার এফবিসিসিআই বাজেট প্রতিক্রিয়ায় এক প্রশ্নের জবাবে ডিসিসিআই সভাপতি রিজওয়ান রহমান বলেন, উৎসে কর আদায়ে অসহযোগিতার জন্য কর কর্মকর্তাদের ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এতে হয়রানি অবশ্যই বাড়বে। কেউ কর ফাঁকি দিলে প্রচলিত আইনেও প্রয়োজনে জেল-জরিমানা দিতে পারে।

এর বাইরেও ছোট-বড় সব শ্রেণির শিল্পমালিকদের করের জালে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলা হয়েছে। যেমন: বাজেটে সার্টিফিকেট (কর আদায়ের নোটিশ) ইস্যুর পাশাপাশি বকেয়া কর আদায়ে গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে আয়কর বিভাগ সংশ্লিষ্ট সেবা সরবরাহকারী বিভাগকে নোটিশ পাঠাতে পারবে।

নোটিশ প্রাপ্তির ২১ দিনের মধ্যে ব্যবস্থা নিতে হবে সেবা সরবরাহকারী সংস্থাকে। নইলে সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে আয়কর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আবার লোকসানের কারণে ৩ বছরের বেশি বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানের বকেয়া কর আদায়ে পরিচালকদের কাছ থেকে আদায়ের বিধান করা হয়েছে। এছাড়া ব্যাংক খেলাপি ঋণের সুদ মওকুফ করা হলে সেই সুদ অঙ্কের ওপর কর আদায়ের বিধান করা হয়েছে। মন্দ ঋণের প্রবণতা হ্রাস করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কোম্পানির সুদ আয়ে দ্বিগুণ করারোপ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের সুদ আয়ের ওপর ১০ শতাংশ উৎসে কর কাটা হয়, এটি বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। রিটার্ন জমার স্লিপ না দিলে অতিরিক্ত আরও ৫০ শতাংশ উৎসে কর কাটা হবে।

খেলাপি ঋণ ও ঋণের সুদ মওকুফের ওপর করারোপের বিষয়ে শনিবার বাজেট প্রতিক্রিয়ায় জসিম উদ্দিন বলেন, খেলাপি ঋণ মওকুফ করা হলে তা করযোগ্য আয় হিসাবে গণ্য করা হবে কেন? দুর্ভোগ লাঘবের জন্যই খেলাপি ঋণ মওকুফ করা হয়ে থাকে। তাই মওকুফকৃত ঋণের ওপর করারোপ করা যুক্তিযুক্ত নয়। যে মরেই গেছে, সে ট্যাক্স দেবে কোত্থেকে। লাশের কাছ থেকে ট্যাক্স নেওয়া ঠিক হবে না। কোম্পানির সুদ আয়ের ওপর উৎসে কর দ্বিগুণ করায় ছোট কোম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে-এমন মন্তব্য করে জসিম উদ্দিন বলেন, ছোট কোম্পানিগুলো নিরাপত্তার জন্য এফডিআর করে রাখে। এ অবস্থায় ২০ শতাংশ উৎসে কর আদায় করলে কেউ আর ব্যাংকে টাকা রাখতে উৎসাহিত হবে না। বালিশের নিচে, মাটির নিচে টাকা রাখবে। আর পাচারও করে দিতে পারে।

প্রস্তাবিত বাজেটে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও নিস্তার দেওয়া হয়নি। আগামী ১ জুলাই থেকে ব্যবসাস্থল বা দোকানে টিআইএন-এর (করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর) পরিবর্তে রিটার্ন জমার স্লিপ ঝোলানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ব্যত্যয় ঘটলে সর্বনিু ৫ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে।

বাজেটে কর ছাড়ে শুভংকরের ফাঁকি

 সাদ্দাম হোসেন ইমরান 
১৪ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রস্তাবিত বাজেটে করছাড় দিলেও তাতে শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে। যেমন করপোরেট কর, এক ব্যক্তির কোম্পানির কর এবং সব রপ্তানিমুখী শিল্পে একই হারে করারোপের মাধ্যমে ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে জুড়ে দেওয়া হয়েছে কঠিন শর্ত। এ কারণে প্রকৃতপক্ষেই শিল্প করছাড়ের সুবিধা নিতে পারবে কি না, তা নিয়ে উদ্যোক্তাদের মনে প্রশ্ন জেগেছে। আবার অর্থবিলের মাধ্যমে আয়কর অধ্যাদেশে কয়েকটি ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এতে উৎসে কর আদায়ের ব্যর্থতার দায়ে প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন, খেলাপি ঋণের মওকুফের ওপর করারোপ এবং কোম্পানির সুদ আয়ে দ্বিগুণ করারোপ করা হয়েছে; যা শিল্পমালিকদের ভাবিয়ে তুলেছে।

এবারের বাজেটে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় করপোরেট কর হ্রাস। এ নিয়ে টানা ৩ অর্থবছরে এ কর হ্রাস করা হলো। আগের দুবার শর্তহীনভাবে করপোরেট করছাড় দেওয়া হলেও এবার কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

তা হলো-সব ধরনের প্রাপ্তি ও আয় ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে করতে হবে। এছাড়া ১২ লাখ টাকার বেশি ব্যয় ও বিনিয়োগ ব্যাংক স্থানান্তরের মাধ্যমে করতে হবে। অর্থাৎ, ১২ লাখ টাকা বেশি ক্যাশ লেনদেন করলে ওই কোম্পানি করছাড়ের সুবিধা পাবে না, আগের হারেই করপোরেট কর দিতে হবে। কোম্পানি ছোট হোক বা বড়-সবার ক্ষেত্রেই এ শর্ত প্রযোজ্য।

অর্থনীতিবিদ ও শিল্পমালিকরা বলছেন, ছোট ও বড় প্রতিষ্ঠানের ক্যাশ লেনদেনের সীমা এক হতে পারে না। বড় প্রতিষ্ঠানের লেনদেন বেশি হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে ছোট প্রতিষ্ঠানকে যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, বড় প্রতিষ্ঠানকেও সেই শর্ত মানতে হবে; যা অযৌক্তিক ও বাস্তবতাবিবর্জিত।

শনিবার বাজেট প্রতিক্রিয়ায় এফবিসিসিআই সভাপতি জসিম উদ্দিন করপোরেট কর হ্রাস প্রসঙ্গে বলেন, সরকার বিভিন্ন জায়গায় করছাড় দিয়েছে। আবার সামগ্রিকভাবে দেওয়ার চেয়ে নিয়েছে বেশি। করের করপোরেট ছাড় দিয়েছে ঠিক, ছাড়ের চেয়ে নেওয়ার ব্যালেন্সটি অর্থমন্ত্রীর পক্ষেই বেশি যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, করপোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানো হয়েছে, যা প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। তবে অগ্রিম আয়কর ও আগাম কর বিদ্যমান থাকায় এই কর সুবিধা ব্যবসায়ীদের জন্য তেমন সুফল বয়ে আনবে না। কারণ, অগ্রিম আয়কর ও আগাম কর সমন্বয় করা হয় না। যদি এই কর ফেরত দেওয়াই হয়ে থাকে, তাহলে নেওয়ার দরকার কী। করপোরেট কর না কমিয়ে এগুলো উঠিয়ে দিলে ভালো হতো।

এ তো গেল সাধারণ প্রতিষ্ঠানের করপোরেট কর। বাজেটে সব রপ্তানিমুখী শিল্পে একই হারে (সাধারণ শিল্পে ১২ শতাংশ এবং সবুজ শিল্পে ১০ শতাংশ) করারোপের ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী, যা বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হয়েছে। তবে রপ্তানির উৎসে কর দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ-অর্থাৎ রপ্তানির উৎসে কর দ্বিগুণ করা হয়েছে। প্রায় বেশির ভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান কেটে নেওয়া উৎসে কর অনুযায়ী রিটার্নে আয় দেখিয়ে থাকে। তাই সাধারণ হারে কর দেয় না। বাজেটে উৎসে কর দ্বিগুণ করায় রপ্তানিকারকদের বেশি কর দিতে হবে।

এ বিষয়ে বিকেএমইএ-এর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, রপ্তানিমুখী শিল্পমালিকরা নিয়ম মেনে কর দিতে চান। কিন্তু আয়কর বিভাগের সেখানে সদিচ্ছার ঘাটতি আছে। উৎসে কর সমন্বয়ের কথা থাকলেও চূড়ান্ত রিটার্নে সেটা করা হয় না। আবার উপকর কমিশনার অনেক খরচ অনুমোদন করেন না, সেই খরচের ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর নির্ধারণ করেন। গত ২ বছর রপ্তানিমুখী শিল্পের লোকসান হলেও এ প্রক্রিয়ার ব্যত্যয় ঘটেনি। তাই কর কর্মকর্তারা যে বলে থাকেন, রপ্তানিকারকরা দশমিক ৫০ শতাংশের বেশি কর দেন না, সেটি ভুল।

তথ্য বলছে, আয়কর বিভাগ প্রতিবছর যে পরিমাণ কর আদায় করে, এর মধ্যে ৬২-৬৫ শতাংশই উৎসে কর থেকে আসে। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকা উৎসে কর আদায় হয়েছে। উৎসে কর মূলত সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সেবা ও বিলের বিপরীতে আদায় করে তা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়। এক্ষেত্রে কর বিভাগ শুধু মনিটরিং করে থাকে। প্রস্তাবিত বাজেটে উৎসে কর কর্তন ও আদায়ে ব্যর্থতার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়ী করে জরিমানার বিধান করা হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত হারের চেয়ে কম হারে উৎসে কর কর্তন করলে যে অঙ্কের কর কম কর্তন করেছে, সেই অঙ্কের কর প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আদায়ের বিধান করা হয়েছে। আবার ব্যর্থতার জন্য সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানাও করতে পারবে আয়কর বিভাগ। শুধু তাই নয়, উৎসে কর আদায় কার্যক্রম গতিশীল করতে বাজেটে কর কর্মকর্তাদের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। চাইলে কর কর্মকর্তারা ব্যবসা প্রাঙ্গণে বাধাহীনভাবে প্রবেশ করতে পারবেন। পাশাপাশি অ্যাকাউন্ট বই ও রেকর্ড বই জব্দ করতে পারবেন। এক্ষেত্রে কর কর্মকর্তা বাধার শিকার হলে উৎসে কর্তনকারী প্রতিষ্ঠান বা বাধা প্রদানকারী ব্যক্তিকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারবেন। শনিবার এফবিসিসিআই বাজেট প্রতিক্রিয়ায় এক প্রশ্নের জবাবে ডিসিসিআই সভাপতি রিজওয়ান রহমান বলেন, উৎসে কর আদায়ে অসহযোগিতার জন্য কর কর্মকর্তাদের ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এতে হয়রানি অবশ্যই বাড়বে। কেউ কর ফাঁকি দিলে প্রচলিত আইনেও প্রয়োজনে জেল-জরিমানা দিতে পারে।

এর বাইরেও ছোট-বড় সব শ্রেণির শিল্পমালিকদের করের জালে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলা হয়েছে। যেমন: বাজেটে সার্টিফিকেট (কর আদায়ের নোটিশ) ইস্যুর পাশাপাশি বকেয়া কর আদায়ে গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে আয়কর বিভাগ সংশ্লিষ্ট সেবা সরবরাহকারী বিভাগকে নোটিশ পাঠাতে পারবে।

নোটিশ প্রাপ্তির ২১ দিনের মধ্যে ব্যবস্থা নিতে হবে সেবা সরবরাহকারী সংস্থাকে। নইলে সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে আয়কর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আবার লোকসানের কারণে ৩ বছরের বেশি বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানের বকেয়া কর আদায়ে পরিচালকদের কাছ থেকে আদায়ের বিধান করা হয়েছে। এছাড়া ব্যাংক খেলাপি ঋণের সুদ মওকুফ করা হলে সেই সুদ অঙ্কের ওপর কর আদায়ের বিধান করা হয়েছে। মন্দ ঋণের প্রবণতা হ্রাস করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কোম্পানির সুদ আয়ে দ্বিগুণ করারোপ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের সুদ আয়ের ওপর ১০ শতাংশ উৎসে কর কাটা হয়, এটি বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। রিটার্ন জমার স্লিপ না দিলে অতিরিক্ত আরও ৫০ শতাংশ উৎসে কর কাটা হবে।

খেলাপি ঋণ ও ঋণের সুদ মওকুফের ওপর করারোপের বিষয়ে শনিবার বাজেট প্রতিক্রিয়ায় জসিম উদ্দিন বলেন, খেলাপি ঋণ মওকুফ করা হলে তা করযোগ্য আয় হিসাবে গণ্য করা হবে কেন? দুর্ভোগ লাঘবের জন্যই খেলাপি ঋণ মওকুফ করা হয়ে থাকে। তাই মওকুফকৃত ঋণের ওপর করারোপ করা যুক্তিযুক্ত নয়। যে মরেই গেছে, সে ট্যাক্স দেবে কোত্থেকে। লাশের কাছ থেকে ট্যাক্স নেওয়া ঠিক হবে না। কোম্পানির সুদ আয়ের ওপর উৎসে কর দ্বিগুণ করায় ছোট কোম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে-এমন মন্তব্য করে জসিম উদ্দিন বলেন, ছোট কোম্পানিগুলো নিরাপত্তার জন্য এফডিআর করে রাখে। এ অবস্থায় ২০ শতাংশ উৎসে কর আদায় করলে কেউ আর ব্যাংকে টাকা রাখতে উৎসাহিত হবে না। বালিশের নিচে, মাটির নিচে টাকা রাখবে। আর পাচারও করে দিতে পারে।

প্রস্তাবিত বাজেটে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও নিস্তার দেওয়া হয়নি। আগামী ১ জুলাই থেকে ব্যবসাস্থল বা দোকানে টিআইএন-এর (করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর) পরিবর্তে রিটার্ন জমার স্লিপ ঝোলানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ব্যত্যয় ঘটলে সর্বনিু ৫ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন