আর কতকাল গাফিলতির মৃত্যু
jugantor
আর কতকাল গাফিলতির মৃত্যু
একের পর এক তদন্ত কমিটি, চিহ্নিত হয় দুর্ঘটনার কারণ * সমাধানে আসে নানা সুপারিশ, কিন্তু বাস্তবায়ন নেই * অধরাই থাকছে দায়ীরা

  মতিন আব্দুল্লাহ  

১৭ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আর কতকাল গাফিলতির মৃত্যু

সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তদের চরম গাফিলতিতে একের পর এক ঘটছে বড় বড় দুর্ঘটনা। দীর্ঘ হচ্ছে হতাহতের মিছিল। কিন্তু এতকিছুর পরও এক রকম ‘নীরব দর্শকের ভূমিকায়’ কর্তৃপক্ষ। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমস্যার সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাও উপেক্ষিত।

যদিও কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই দৌড়ঝাঁপ শুরু হয় সংশ্লিষ্টদের। গঠন হয় একের পর তদন্ত কমিটি। জমা পড়ে প্রতিবেদন। চিহ্নিত হয় দুর্ঘটনার কারণ। সমাধানে আসে নানা সুপারিশ। কিন্তু বাস্তবায়ন নেই এগুলোর। অধরাই থাকছে দায়ীরা। হচ্ছে দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি।

জানা গেছে, নির্মাণাধীন প্রকল্পের গার্ডার পড়ে এ পর্যন্ত ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে নিহত হয়েছেন ২৩ জন। আহত অর্ধশতাধিক। রাজধানীর নিমতলী, চুড়িহাট্টা, কামালবাগসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল ব্যবসার কারণে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে গত এক দশকে জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে দুই শতাধিক মানুষের। দগ্ধ হয়েছেন কয়েকশ।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ড. মো. হাদিউজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, প্রকৌশলগত হিসাব অনুযায়ী নির্মাণ প্রকল্পের গার্ডার উঠানোর সময় ছুটে যাওয়া স্বাভাবিক ঘটনা।

প্রতি ১০টি গার্ডার উত্তোলনের সময় একটি ছুটে যাওয়ার বিষয়টিকে স্বাভাবিক হিসাবে দেখা হয়। তবে নির্মাণকাজের সময় সে ধরনের নিরাপত্তা, সতর্কতা ও প্রস্তুতি রাখতে হবে। তিনি আরও বলেন, গার্ডার পড়ে হতাহতের ঘটনা আগেও ঘটেছে। সে সময় তদন্ত হয়েছে।

কিন্তু দায় চিহ্নিত করে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হয়নি। এজন্য এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। এ ঘটনারও তদন্ত হচ্ছে বলে জেনেছি, তদন্তে কারণ ও দায় চিহ্নিত করে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম-সম্পাদক ও নগর বিশেষজ্ঞ স্থপতি ইকবাল হাবিব যুগান্তরকে বলেন, পুরান ঢাকা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক গুদাম সরানোর জন্য এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি।

এ কারণেই নিমতলী ও চুড়িহাট্টার মতো ট্র্যাজেডির পরও ওই এলাকার বাসিন্দারা রাসায়নিক গুদাম মেনে নিয়েই বসবাস করছেন।

এটার মূল কারণ সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর অনীহা, অপারগতা ও অনিচ্ছা। সে কারণে এবং লোভের কারণে পুরান ঢাকার বাসিন্দারা রাসায়নিককে সঙ্গে নিয়েই বসবাসে অভ্যস্ত হচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, নিমতলীর ঘটনার পর কমিটি গঠন হলো, তদন্ত হলো, ২১ দফা সুপারিশ দিল কমিটি, প্রধানমন্ত্রী পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম সরিয়ে নিতে নির্দেশনা দিলেন।

এরপরও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো সেসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে কার্যকর অর্থে সক্রিয় হয়নি। এ কারণে এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেই চলেছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত না করায় এই অবস্থা চলতেই আছে।

জানি না, কোথায় গিয়ে ঠেকবে। এ সমস্যার সমাধানের ব্যাপারে এত এত বার বলেছি। কিন্তু সব অনিয়ম গা সওয়া হয়ে গেছে। কোনো প্রতিকার মিলছে না।

বিআরটি প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের জয়দেবপুর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার করিডরে দ্রুতগতির বাস চলাচলের জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

এ প্রকল্পের নাম বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি)। ২০১২ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের কাজ এক যুগেও শেষ করতে পারেনি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিআরটি কোম্পানি।

২০১৭ সালে পুরোদমে কাজ শুরুর পর এখন পর্যন্ত ৭০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে বলে দাবি করছে ঢাকা বিআরটি কোম্পানি। বাকি ৩০ ভাগ কাজ আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করে প্রকল্প চালুর ঘোষণা দিয়েছে।

এ প্রকল্পের বর্তমান আকার ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। ব্যয় আরও বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এখন পর্যন্ত চারবার গার্ডার পড়ার ঘটনা ঘটেছে।

এতে ৬ জন নিহত ও ৬ জন আহতের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় তদন্ত করে দায় চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করা হয়নি।

বিআরটি প্রকল্প সূত্রে আরও জানা যায়, গত বছরের ১৪ মার্চ প্রথম বিআরটি প্রকল্পে গার্ডার ধসের ঘটনা ঘটে। একই দিনে দুবার বিমানবন্দর ও আব্দুল্লাপুরে দুটি গার্ডার ধসে পড়ে।

এতে ছয়জন আহত হন। তাদের মধ্যে পথচারী ও প্রকল্পের নিরাপত্তাকর্মী ছিলেন। এরপর গত ১৫ জুলাই গাজীপুর শহরে বিআরটির গার্ডারের নিচে চাপা পড়ে একজন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন।

সবশেষ গত সোমবার জাতীয় শোক দিবসের দিনে উত্তরায় ক্রেন থেকে একটি গার্ডার সড়কে আচড়ে পড়ে যাত্রীবাহী মাইক্রোবাসের ওপর। এতে ঘটনাস্থলে পাঁচজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন।

চট্টগ্রামের বন্দরহাট ফ্লাইওভার নির্মাণকাজের সময় ২০১২ সালের ২৯ জুন প্রথম ১৩০ ফুটের কংক্রিটের গার্ডার নিচে পড়ে যায়। এরপর একই বছরের ২৪ নভেম্বর ওই ফ্লাইওভারের আরেকটি বিশালাকৃতির গার্ডার পড়ে ১৩ জন নিহত হন।

ওই ঘটনায় আরও অনেকে আহত হন। এসব ঘটনার তদন্ত হলেও দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০১২ সালে দেশে প্রথমবারের মতো বিমানবন্দর-জয়দেবপুর পর্যন্ত এই বিআরটি প্রকল্পের কাজ শুরু করে সরকার। সরকারের অগ্রাধিকার এই প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে চার ভাগে ভাগ করা হয়।

এর মধ্যে উড়াল সড়ক ও সমতল সড়ক নির্মাণের দায়িত্ব পালন করছে তিনটি চায়না কোম্পানি। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে চায়না গেজহুয়া গ্রুপ, জিয়াংশু প্রভিনশিয়াল ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ এবং ওয়েহেই ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেটিভ।

আর গাজীপুর অংশের ডিপো নির্মাণের কাজ করেছে সেল-ইউডিসি। বিআরটি প্রকল্পে দেশীয় কোম্পানির প্যাকেজের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। চায়না কোম্পানির তিনটি প্যাকেজের কাজ ২০১৬ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখনো ওই তিন কোম্পানির কাজ চলছে।

আরও জানা যায়, চায়না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই অর্থ সংকটে ভোগেন। তাদের এ ধরনের কাজের সক্ষমতাও কম। এজন্য প্রকল্পের কাজ এগোচ্ছে না। জোড়াতালি দিয়ে চলমান কাজের মান নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।

২০১৭ সালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের জয়দেবপুর পর্যন্ত অংশের কাজ শুরুর পর থেকেই ওই সড়কে নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। ভাঙাচোরা-জলাবদ্ধতা, সরু সড়কে বছরের পর বছর ভয়াবহ যানজটের ধকল সইতে হয়েছে ঢাকা ও গাজীপুরবাসীকে।

এ বিষয়ে বিআরটি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বিআরটি প্রকল্পের গার্ডার পড়েছিল নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে। এখানে ক্রেনের ত্রুটি ছিল বলে মনে হচ্ছে।

বিষয়টি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বেরিয়ে আসবে। ওই ক্রেনটির ৮০ টনের বেশি ওজনের গার্ডার বহনের সক্ষমতা রয়েছে। আর ওই গার্ডারের ওজন সক্ষমতার মধ্যে রয়েছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে একই বিষয়ে সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এবিএম আমানউল্লাহ নুরী বলেন, আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করছি। এ ঘটনায় যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ঘটনার দায় নেবেন কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দায় কি আমার? আমি কি মালিক? আমি কি বিআরটি’র প্রকল্প পরিচালক? আপনি তাদের জিজ্ঞাসা করতে পারেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর অঞ্চল ও পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, বিআরটি প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশের শর্ত মানছে না।

সেটা যথাযথভাবে দেখভালও করছে না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও বিআরটি কোম্পানির যৌথ ব্যর্থতায় দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে। সুষ্ঠু তদন্ত করে দায় চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের অনিয়ম বন্ধ হবে না।

পুরান ঢাকায় প্রায় ২ হাজার অবৈধ কেমিক্যাল প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর সরকার পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা প্রদান করে। এরপর এক দশকের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও কোনো কেমিক্যাল কারখানা স্থানান্তর হয়নি।

২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ৭৮ জন প্রাণ হারান। এরপর আবারও তোড়জোড় শুরু হয়। তদন্ত কমিটি হয়, প্রতিবেদনে নানা সুপারিশ করা হয়।

ইতোমধ্যে প্রায় চার বছর অতিবাহিত হলেও পুরান ঢাকার অবস্থা সেই আগের মতোই রয়েছে। এ অবস্থায় সোমবার পুরান ঢাকার কামালবাগে প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ছয়জন নিহত হয়েছেন।

এখন নতুন করে তদন্ত কমিটি হয়েছে। চলছে তোড়জোড়। এবারের তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে বিশ্বাস করেন না নগরবাসী।

আর কতকাল গাফিলতির মৃত্যু

একের পর এক তদন্ত কমিটি, চিহ্নিত হয় দুর্ঘটনার কারণ * সমাধানে আসে নানা সুপারিশ, কিন্তু বাস্তবায়ন নেই * অধরাই থাকছে দায়ীরা
 মতিন আব্দুল্লাহ 
১৭ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
আর কতকাল গাফিলতির মৃত্যু
চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডে নিহততের লাশ নিয়ে যাচ্ছেন স্বজনরা। ছবি: যুগান্তর

সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তদের চরম গাফিলতিতে একের পর এক ঘটছে বড় বড় দুর্ঘটনা। দীর্ঘ হচ্ছে হতাহতের মিছিল। কিন্তু এতকিছুর পরও এক রকম ‘নীরব দর্শকের ভূমিকায়’ কর্তৃপক্ষ। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমস্যার সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাও উপেক্ষিত।

যদিও কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই দৌড়ঝাঁপ শুরু হয় সংশ্লিষ্টদের। গঠন হয় একের পর তদন্ত কমিটি। জমা পড়ে প্রতিবেদন। চিহ্নিত হয় দুর্ঘটনার কারণ। সমাধানে আসে নানা সুপারিশ। কিন্তু বাস্তবায়ন নেই এগুলোর। অধরাই থাকছে দায়ীরা। হচ্ছে দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি।

জানা গেছে, নির্মাণাধীন প্রকল্পের গার্ডার পড়ে এ পর্যন্ত ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে নিহত হয়েছেন ২৩ জন। আহত অর্ধশতাধিক। রাজধানীর নিমতলী, চুড়িহাট্টা, কামালবাগসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল ব্যবসার কারণে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে গত এক দশকে জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে দুই শতাধিক মানুষের। দগ্ধ হয়েছেন কয়েকশ।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ড. মো. হাদিউজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, প্রকৌশলগত হিসাব অনুযায়ী নির্মাণ প্রকল্পের গার্ডার উঠানোর সময় ছুটে যাওয়া স্বাভাবিক ঘটনা।

প্রতি ১০টি গার্ডার উত্তোলনের সময় একটি ছুটে যাওয়ার বিষয়টিকে স্বাভাবিক হিসাবে দেখা হয়। তবে নির্মাণকাজের সময় সে ধরনের নিরাপত্তা, সতর্কতা ও প্রস্তুতি রাখতে হবে। তিনি আরও বলেন, গার্ডার পড়ে হতাহতের ঘটনা আগেও ঘটেছে। সে সময় তদন্ত হয়েছে।

কিন্তু দায় চিহ্নিত করে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হয়নি। এজন্য এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। এ ঘটনারও তদন্ত হচ্ছে বলে জেনেছি, তদন্তে কারণ ও দায় চিহ্নিত করে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম-সম্পাদক ও নগর বিশেষজ্ঞ স্থপতি ইকবাল হাবিব যুগান্তরকে বলেন, পুরান ঢাকা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক গুদাম সরানোর জন্য এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি।

এ কারণেই নিমতলী ও চুড়িহাট্টার মতো ট্র্যাজেডির পরও ওই এলাকার বাসিন্দারা রাসায়নিক গুদাম মেনে নিয়েই বসবাস করছেন।

এটার মূল কারণ সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর অনীহা, অপারগতা ও অনিচ্ছা। সে কারণে এবং লোভের কারণে পুরান ঢাকার বাসিন্দারা রাসায়নিককে সঙ্গে নিয়েই বসবাসে অভ্যস্ত হচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, নিমতলীর ঘটনার পর কমিটি গঠন হলো, তদন্ত হলো, ২১ দফা সুপারিশ দিল কমিটি, প্রধানমন্ত্রী পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম সরিয়ে নিতে নির্দেশনা দিলেন।

এরপরও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো সেসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে কার্যকর অর্থে সক্রিয় হয়নি। এ কারণে এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেই চলেছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত না করায় এই অবস্থা চলতেই আছে।

জানি না, কোথায় গিয়ে ঠেকবে। এ সমস্যার সমাধানের ব্যাপারে এত এত বার বলেছি। কিন্তু সব অনিয়ম গা সওয়া হয়ে গেছে। কোনো প্রতিকার মিলছে না।

বিআরটি প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের জয়দেবপুর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার করিডরে দ্রুতগতির বাস চলাচলের জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

এ প্রকল্পের নাম বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি)। ২০১২ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের কাজ এক যুগেও শেষ করতে পারেনি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিআরটি কোম্পানি।

২০১৭ সালে পুরোদমে কাজ শুরুর পর এখন পর্যন্ত ৭০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে বলে দাবি করছে ঢাকা বিআরটি কোম্পানি। বাকি ৩০ ভাগ কাজ আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করে প্রকল্প চালুর ঘোষণা দিয়েছে।

এ প্রকল্পের বর্তমান আকার ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। ব্যয় আরও বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এখন পর্যন্ত চারবার গার্ডার পড়ার ঘটনা ঘটেছে।

এতে ৬ জন নিহত ও ৬ জন আহতের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় তদন্ত করে দায় চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করা হয়নি।

বিআরটি প্রকল্প সূত্রে আরও জানা যায়, গত বছরের ১৪ মার্চ প্রথম বিআরটি প্রকল্পে গার্ডার ধসের ঘটনা ঘটে। একই দিনে দুবার বিমানবন্দর ও আব্দুল্লাপুরে দুটি গার্ডার ধসে পড়ে।

এতে ছয়জন আহত হন। তাদের মধ্যে পথচারী ও প্রকল্পের নিরাপত্তাকর্মী ছিলেন। এরপর গত ১৫ জুলাই গাজীপুর শহরে বিআরটির গার্ডারের নিচে চাপা পড়ে একজন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন।

সবশেষ গত সোমবার জাতীয় শোক দিবসের দিনে উত্তরায় ক্রেন থেকে একটি গার্ডার সড়কে আচড়ে পড়ে যাত্রীবাহী মাইক্রোবাসের ওপর। এতে ঘটনাস্থলে পাঁচজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন।

চট্টগ্রামের বন্দরহাট ফ্লাইওভার নির্মাণকাজের সময় ২০১২ সালের ২৯ জুন প্রথম ১৩০ ফুটের কংক্রিটের গার্ডার নিচে পড়ে যায়। এরপর একই বছরের ২৪ নভেম্বর ওই ফ্লাইওভারের আরেকটি বিশালাকৃতির গার্ডার পড়ে ১৩ জন নিহত হন।

ওই ঘটনায় আরও অনেকে আহত হন। এসব ঘটনার তদন্ত হলেও দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০১২ সালে দেশে প্রথমবারের মতো বিমানবন্দর-জয়দেবপুর পর্যন্ত এই বিআরটি প্রকল্পের কাজ শুরু করে সরকার। সরকারের অগ্রাধিকার এই প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে চার ভাগে ভাগ করা হয়।

এর মধ্যে উড়াল সড়ক ও সমতল সড়ক নির্মাণের দায়িত্ব পালন করছে তিনটি চায়না কোম্পানি। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে চায়না গেজহুয়া গ্রুপ, জিয়াংশু প্রভিনশিয়াল ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ এবং ওয়েহেই ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেটিভ।

আর গাজীপুর অংশের ডিপো নির্মাণের কাজ করেছে সেল-ইউডিসি। বিআরটি প্রকল্পে দেশীয় কোম্পানির প্যাকেজের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। চায়না কোম্পানির তিনটি প্যাকেজের কাজ ২০১৬ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখনো ওই তিন কোম্পানির কাজ চলছে।

আরও জানা যায়, চায়না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই অর্থ সংকটে ভোগেন। তাদের এ ধরনের কাজের সক্ষমতাও কম। এজন্য প্রকল্পের কাজ এগোচ্ছে না। জোড়াতালি দিয়ে চলমান কাজের মান নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।

২০১৭ সালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের জয়দেবপুর পর্যন্ত অংশের কাজ শুরুর পর থেকেই ওই সড়কে নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। ভাঙাচোরা-জলাবদ্ধতা, সরু সড়কে বছরের পর বছর ভয়াবহ যানজটের ধকল সইতে হয়েছে ঢাকা ও গাজীপুরবাসীকে।

এ বিষয়ে বিআরটি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বিআরটি প্রকল্পের গার্ডার পড়েছিল নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে। এখানে ক্রেনের ত্রুটি ছিল বলে মনে হচ্ছে।

বিষয়টি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বেরিয়ে আসবে। ওই ক্রেনটির ৮০ টনের বেশি ওজনের গার্ডার বহনের সক্ষমতা রয়েছে। আর ওই গার্ডারের ওজন সক্ষমতার মধ্যে রয়েছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে একই বিষয়ে সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এবিএম আমানউল্লাহ নুরী বলেন, আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করছি। এ ঘটনায় যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ঘটনার দায় নেবেন কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দায় কি আমার? আমি কি মালিক? আমি কি বিআরটি’র প্রকল্প পরিচালক? আপনি তাদের জিজ্ঞাসা করতে পারেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর অঞ্চল ও পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, বিআরটি প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশের শর্ত মানছে না।

সেটা যথাযথভাবে দেখভালও করছে না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও বিআরটি কোম্পানির যৌথ ব্যর্থতায় দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে। সুষ্ঠু তদন্ত করে দায় চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের অনিয়ম বন্ধ হবে না।

পুরান ঢাকায় প্রায় ২ হাজার অবৈধ কেমিক্যাল প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর সরকার পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা প্রদান করে। এরপর এক দশকের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও কোনো কেমিক্যাল কারখানা স্থানান্তর হয়নি।

২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ৭৮ জন প্রাণ হারান। এরপর আবারও তোড়জোড় শুরু হয়। তদন্ত কমিটি হয়, প্রতিবেদনে নানা সুপারিশ করা হয়।

ইতোমধ্যে প্রায় চার বছর অতিবাহিত হলেও পুরান ঢাকার অবস্থা সেই আগের মতোই রয়েছে। এ অবস্থায় সোমবার পুরান ঢাকার কামালবাগে প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ছয়জন নিহত হয়েছেন।

এখন নতুন করে তদন্ত কমিটি হয়েছে। চলছে তোড়জোড়। এবারের তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে বিশ্বাস করেন না নগরবাসী।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন