খাদ্য আমদানিতে সর্বোচ্চ ৮২ ভাগ ব্যয় বৃদ্ধি
jugantor
পরিবহণ ভাড়া ও ডলারের দামের প্রভাব
খাদ্য আমদানিতে সর্বোচ্চ ৮২ ভাগ ব্যয় বৃদ্ধি
চালের দাম একগুণ, গম দ্বিগুণ, সয়াবিন দেড়গুণ, জাহাজ ভাড়া ৭২ শতাংশ বেড়েছে

  দেলোয়ার হুসেন  

০৯ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিতে আমদানি ব্যয় লাগামহীন হয়ে পড়েছে। টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বৃদ্ধিও এ খাতের খরচ বাড়িয়েছে। ফলে প্রায় আকাশ ছুঁয়েছে পণ্যের মূল্য।

মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত, আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম, পরিবহণ ভাড়া ও ডলারের বাড়তি দাম আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে যোগ হয়েছে। এসব কারণে প্রতিমাসে খাদ্য আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে গড়ে ১৫ থেকে ৮২ শতাংশ। আগে বছরে মোট আমদানির ১০ থেকে ১২ শতাংশ ব্যয় হতো খাদ্য আনতে। গত মে থেকে প্রতিমাসে এ খাতে ব্যয় হচ্ছে গড়ে ৮ থেকে সাড়ে ১০ শতাংশ। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বেড়েছে।

মূল্যস্ফীতির হার ঊর্ধ্বমুখী। টাকার মান কমে গিয়ে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। কমে গেছে আয়। মানুষ এখন বাধ্য হয়ে সঞ্চয়ে হাত দিয়েছে। যে কারণে সঞ্চয় কমে গেছে এবং আগের সঞ্চয় থেকে অর্থ তুলে নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।

মে থেকে ডলারের দাম বাড়তে থাকে। গত অর্থবছরে দাম ছিল ৮৬ টাকা, এখন প্রতি ডলার গড়ে ১০৫ থেকে ১০৭ টাকা। দাম বেড়েছে ২০ থেকে ২১ টাকা। ডলারের দামের কারণে খাদ্য আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। এ সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম এক গুণ, গমের দাম দ্বিগুণ, সয়াবিনের দাম দেড়গুণ বেড়েছে। এছাড়া অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দামও বেড়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় জাহাজ ভাড়াসহ অন্যান্য পরিবহণ ভাড়াও বেড়েছে। জাহাজ ভাড়া বেড়েছে ৭২ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, খাদ্য আমদানি করতে হলে রিজার্ভ বেশি রাখতে হয়। খাদ্য আমদানি না করলে রিজার্ভ কম থাকলেও চলে। কারণ খাদ্য আমদানিতে বেশি অর্থ ব্যয় হয়। খাদ্য জরুরি পণ্য এটি আমদানি না করে উপায় নেই। কিন্তু অন্য পণ্য আমদানি না করেও রিজার্ভ সাশ্রয় করা সম্ভব। বর্তমানে দেশে যে সংকট তার প্রধান কারণ ডলারের অভাব। এ কারণে ডলারের দাম বাড়ছে, আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। এতে খাদ্যসহ আমদানিকৃত সব পণ্যের দাম বেড়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতির হারও ঊর্ধ্বমুখী। রিজার্ভ বেশি থাকলে ডলারের দাম বৃদ্ধি ও টাকার অবমূল্যায়ন জনিত মূল্যস্ফীতি ঠেকানো যেত। একই সঙ্গে ভর্তুকি দিয়ে আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতির হারও রোধ করা সম্ভব হতো। ডলারের সংকটের কারণে এগুলো সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি বলেন, রিজার্ভ ব্যবহারে সরকারকে সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। কারণ এটা বিপদের সময় ব্যবহারের জন্য রাখতে হয়। কিন্তু সুসময়ে এর ব্যবহার যথাযথভাবে হয়নি। যে কারণে এখন সংকটে পড়তে হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যমতে, কোনো দেশ বেশি মাত্রায় খাদ্য আমদানি না করলে তাদের রিজার্ভ তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান রাখতে হয়। আর খাদ্য আমদানি করলে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান রাখতে হয়। দুর্যোগ দেখা দিলে আরও বেশি রিজার্ভ রাখতে হয়। বাংলাদেশের গ্রস রিজার্ভ ৩৫৭৫ কোটি ডলার। এ থেকে বিভিন্ন তহবিলে বরাদ্দ অর্থ বাদ দিলে নিট হিসাবে রিজার্ভ ২৭০০ কোটি ডলার। যা দিয়ে চার মাসের কম সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। বাংলাদেশ খাদ্য আমদানি করে বলে রিজার্ভ পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান থাকতে হবে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রতিমাসে খাদ্য আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ১৫ থেকে ৮২ শতাংশ। এর মধ্যে চাল, চিনি ও ভোজ্যতেল আমদানিতেই ব্যয় বেড়েছে বেশি। ফল, পেঁয়াজ ও মসলা আমদানিতে ব্যয় কমেছে। রিজার্ভে চাপ কমাতে আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে এপ্রিল থেকে এলসি মার্জিন, বাড়তি শুল্ক আরোপসহ বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব কারণে এ খাতে আমদানি ব্যয় কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে খাদ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল মোট আমদানির ২ দশমিক ২৭ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ ব্যয় বেড়ে ৩ দশমিক ১০ শতাংশে দাঁড়ায়। পরের বছর অর্থাৎ ২০২০-২১ অর্থবছরে এক লাফে বেড়ে মোট আমদানি ব্যয়ের ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ খরচ করতে হয়। করোনার কারণে ওই বছরে বিশ্বব্যাপী লকডাউন ছিল। বাংলাদেশেও ছিল লকডাউন। এতে খাদ্য উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়।

করোনার প্রকোপ কমার পর উৎপাদন ও সরবরাহ ঘাটতির কারণে হঠাৎ খাদ্যের দাম বেড়ে যায়। ফলে সে বছর খাদ্য আমদানিতে ব্যয় বেশি হয়েছে। করোনার কারণে যাতে দেশে খাদ্য ঘাটতি দেখা না দেয় সেজন্য সরকার থেকে আমদানি বাড়ানো হয়েছিল। এছাড়া ওই বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশে খাদ্য উৎপাদনও ব্যাহত হয়েছিল।

২০২১-২২ অর্থবছরে মোট আমদানির ১০ দশমিক ৩৭ শতাংশ ব্যয় হয়েছিল খাদ্য আমদানিতে। ওই বছরেও বিশ্বব্যাপী খাদ্যের দাম ছিল বেশি। এছাড়া ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে খাদ্য উপকরণের দাম আরও বেড়ে যায়। এতেও খাদ্য আমদানি ব্যয় বাড়ে।

গত অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে খ৬াদ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল মোট আমদানি খরচের ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে খরচ হয়েছে মোট আমদানি ব্যয়ের ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। গত অর্থবছরের শেষ দিকের তুলনায় চলতি অর্থবছরের আগস্ট পর্যন্ত চাল, ডাল, গমসহ কিছু খাদ্যপণ্যের দাম গড়ে ১১ শতাংশ কমেছে। এছাড়া রিজার্ভ সাশ্রয় করতে আমদানি নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। অনেক দেশ উৎপাদন ও সরবরাহ সংকটের কারণে খাদ্য পণ্য রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। এ কারণে খাদ্য আমদানি খাতে ব্যয় কিছুটা কমেছে। গত অর্থবছরের জুলাই আগস্টের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে চাল ও গম আমদানির এলসি খোলা কমেছে ৩৪ দশমিক ৬০ শতাংশ, আমদানি কমেছে ৩১ দশমিক ৮৪ শতাংশ। চিনি ও লবণ আমদানির এলসি খোলা কমেছে সাড়ে ৩৬ শতাংশ, আমদানি বেড়েছে সাড়ে ১১ শতাংশ। দুধ আমদানির এলসি খোলা বেড়েছে ৫৭ শতাংশ, আমদানি কমেছে ২ দশমিক ৬৯ শতাংশ। মসলা আমদানির এলসি কমেছে ১৬ দশমিক ৩১ শতাংশ এবং আমদানি কমেছে ৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ। ভোজ্যতেল আমদানির এলসি খোলা ২০৪ শতাংশ এবং আমদানি বেড়েছে ১৮৪ শতাংশ। ডাল আমদানির এলসি ৭০ শতাংশ এবং আমদানি বেড়েছে ১৭ শতাংশ। পেঁয়াজ আমদানির এলসি ১১ শতাংশ এবং আমদানি ৩৪ শতাংশ কমেছে। ফল আমদানির এলসি ৪২ শতাংশ ও আমদানি কমেছে ১৪ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১৫৩০ কোটি ডলার। এর মধ্যে খাদ্য আমদানিতে খরচ হয়েছে ১২৫ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে আমদানিতে মোট খরচ হয়েছিল ১০৭৫ কোটি ডলার। খাদ্য খাতে খরচ হয়েছিল ১১৪ কোটি ডলার।

গত বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে গত অর্থবছর পর্যন্ত চাল আমদানিতে সবচেয়ে বেশি খরচ বেড়েছে। ওই সময়ে চাল আমদানি ব্যয় সাড়ে ৭ কোটি ডলার থেকে বেড়ে সাড়ে ৩৭ কোটি ডলার হয়েছে। বেড়েছে প্রায় পাঁচগুণ। একই সময়ে গম আমদানি বেড়েছে দেড়গুণ। দুধ, মসলা ও চিনি আমদানি ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম বেড়েছে। তবে ভোজ্যতেল আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৩০ শতাংশ।

পরিবহণ ভাড়া ও ডলারের দামের প্রভাব

খাদ্য আমদানিতে সর্বোচ্চ ৮২ ভাগ ব্যয় বৃদ্ধি

চালের দাম একগুণ, গম দ্বিগুণ, সয়াবিন দেড়গুণ, জাহাজ ভাড়া ৭২ শতাংশ বেড়েছে
 দেলোয়ার হুসেন 
০৯ নভেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিতে আমদানি ব্যয় লাগামহীন হয়ে পড়েছে। টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বৃদ্ধিও এ খাতের খরচ বাড়িয়েছে। ফলে প্রায় আকাশ ছুঁয়েছে পণ্যের মূল্য।

মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত, আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম, পরিবহণ ভাড়া ও ডলারের বাড়তি দাম আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে যোগ হয়েছে। এসব কারণে প্রতিমাসে খাদ্য আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে গড়ে ১৫ থেকে ৮২ শতাংশ। আগে বছরে মোট আমদানির ১০ থেকে ১২ শতাংশ ব্যয় হতো খাদ্য আনতে। গত মে থেকে প্রতিমাসে এ খাতে ব্যয় হচ্ছে গড়ে ৮ থেকে সাড়ে ১০ শতাংশ। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বেড়েছে।

মূল্যস্ফীতির হার ঊর্ধ্বমুখী। টাকার মান কমে গিয়ে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। কমে গেছে আয়। মানুষ এখন বাধ্য হয়ে সঞ্চয়ে হাত দিয়েছে। যে কারণে সঞ্চয় কমে গেছে এবং আগের সঞ্চয় থেকে অর্থ তুলে নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।

মে থেকে ডলারের দাম বাড়তে থাকে। গত অর্থবছরে দাম ছিল ৮৬ টাকা, এখন প্রতি ডলার গড়ে ১০৫ থেকে ১০৭ টাকা। দাম বেড়েছে ২০ থেকে ২১ টাকা। ডলারের দামের কারণে খাদ্য আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। এ সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম এক গুণ, গমের দাম দ্বিগুণ, সয়াবিনের দাম দেড়গুণ বেড়েছে। এছাড়া অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দামও বেড়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় জাহাজ ভাড়াসহ অন্যান্য পরিবহণ ভাড়াও বেড়েছে। জাহাজ ভাড়া বেড়েছে ৭২ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, খাদ্য আমদানি করতে হলে রিজার্ভ বেশি রাখতে হয়। খাদ্য আমদানি না করলে রিজার্ভ কম থাকলেও চলে। কারণ খাদ্য আমদানিতে বেশি অর্থ ব্যয় হয়। খাদ্য জরুরি পণ্য এটি আমদানি না করে উপায় নেই। কিন্তু অন্য পণ্য আমদানি না করেও রিজার্ভ সাশ্রয় করা সম্ভব। বর্তমানে দেশে যে সংকট তার প্রধান কারণ ডলারের অভাব। এ কারণে ডলারের দাম বাড়ছে, আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। এতে খাদ্যসহ আমদানিকৃত সব পণ্যের দাম বেড়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতির হারও ঊর্ধ্বমুখী। রিজার্ভ বেশি থাকলে ডলারের দাম বৃদ্ধি ও টাকার অবমূল্যায়ন জনিত মূল্যস্ফীতি ঠেকানো যেত। একই সঙ্গে ভর্তুকি দিয়ে আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতির হারও রোধ করা সম্ভব হতো। ডলারের সংকটের কারণে এগুলো সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি বলেন, রিজার্ভ ব্যবহারে সরকারকে সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। কারণ এটা বিপদের সময় ব্যবহারের জন্য রাখতে হয়। কিন্তু সুসময়ে এর ব্যবহার যথাযথভাবে হয়নি। যে কারণে এখন সংকটে পড়তে হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যমতে, কোনো দেশ বেশি মাত্রায় খাদ্য আমদানি না করলে তাদের রিজার্ভ তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান রাখতে হয়। আর খাদ্য আমদানি করলে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান রাখতে হয়। দুর্যোগ দেখা দিলে আরও বেশি রিজার্ভ রাখতে হয়। বাংলাদেশের গ্রস রিজার্ভ ৩৫৭৫ কোটি ডলার। এ থেকে বিভিন্ন তহবিলে বরাদ্দ অর্থ বাদ দিলে নিট হিসাবে রিজার্ভ ২৭০০ কোটি ডলার। যা দিয়ে চার মাসের কম সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। বাংলাদেশ খাদ্য আমদানি করে বলে রিজার্ভ পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান থাকতে হবে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রতিমাসে খাদ্য আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ১৫ থেকে ৮২ শতাংশ। এর মধ্যে চাল, চিনি ও ভোজ্যতেল আমদানিতেই ব্যয় বেড়েছে বেশি। ফল, পেঁয়াজ ও মসলা আমদানিতে ব্যয় কমেছে। রিজার্ভে চাপ কমাতে আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে এপ্রিল থেকে এলসি মার্জিন, বাড়তি শুল্ক আরোপসহ বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব কারণে এ খাতে আমদানি ব্যয় কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে খাদ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল মোট আমদানির ২ দশমিক ২৭ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ ব্যয় বেড়ে ৩ দশমিক ১০ শতাংশে দাঁড়ায়। পরের বছর অর্থাৎ ২০২০-২১ অর্থবছরে এক লাফে বেড়ে মোট আমদানি ব্যয়ের ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ খরচ করতে হয়। করোনার কারণে ওই বছরে বিশ্বব্যাপী লকডাউন ছিল। বাংলাদেশেও ছিল লকডাউন। এতে খাদ্য উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়।

করোনার প্রকোপ কমার পর উৎপাদন ও সরবরাহ ঘাটতির কারণে হঠাৎ খাদ্যের দাম বেড়ে যায়। ফলে সে বছর খাদ্য আমদানিতে ব্যয় বেশি হয়েছে। করোনার কারণে যাতে দেশে খাদ্য ঘাটতি দেখা না দেয় সেজন্য সরকার থেকে আমদানি বাড়ানো হয়েছিল। এছাড়া ওই বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশে খাদ্য উৎপাদনও ব্যাহত হয়েছিল।

২০২১-২২ অর্থবছরে মোট আমদানির ১০ দশমিক ৩৭ শতাংশ ব্যয় হয়েছিল খাদ্য আমদানিতে। ওই বছরেও বিশ্বব্যাপী খাদ্যের দাম ছিল বেশি। এছাড়া ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে খাদ্য উপকরণের দাম আরও বেড়ে যায়। এতেও খাদ্য আমদানি ব্যয় বাড়ে।

গত অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে খ৬াদ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল মোট আমদানি খরচের ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে খরচ হয়েছে মোট আমদানি ব্যয়ের ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। গত অর্থবছরের শেষ দিকের তুলনায় চলতি অর্থবছরের আগস্ট পর্যন্ত চাল, ডাল, গমসহ কিছু খাদ্যপণ্যের দাম গড়ে ১১ শতাংশ কমেছে। এছাড়া রিজার্ভ সাশ্রয় করতে আমদানি নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। অনেক দেশ উৎপাদন ও সরবরাহ সংকটের কারণে খাদ্য পণ্য রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। এ কারণে খাদ্য আমদানি খাতে ব্যয় কিছুটা কমেছে। গত অর্থবছরের জুলাই আগস্টের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে চাল ও গম আমদানির এলসি খোলা কমেছে ৩৪ দশমিক ৬০ শতাংশ, আমদানি কমেছে ৩১ দশমিক ৮৪ শতাংশ। চিনি ও লবণ আমদানির এলসি খোলা কমেছে সাড়ে ৩৬ শতাংশ, আমদানি বেড়েছে সাড়ে ১১ শতাংশ। দুধ আমদানির এলসি খোলা বেড়েছে ৫৭ শতাংশ, আমদানি কমেছে ২ দশমিক ৬৯ শতাংশ। মসলা আমদানির এলসি কমেছে ১৬ দশমিক ৩১ শতাংশ এবং আমদানি কমেছে ৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ। ভোজ্যতেল আমদানির এলসি খোলা ২০৪ শতাংশ এবং আমদানি বেড়েছে ১৮৪ শতাংশ। ডাল আমদানির এলসি ৭০ শতাংশ এবং আমদানি বেড়েছে ১৭ শতাংশ। পেঁয়াজ আমদানির এলসি ১১ শতাংশ এবং আমদানি ৩৪ শতাংশ কমেছে। ফল আমদানির এলসি ৪২ শতাংশ ও আমদানি কমেছে ১৪ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১৫৩০ কোটি ডলার। এর মধ্যে খাদ্য আমদানিতে খরচ হয়েছে ১২৫ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে আমদানিতে মোট খরচ হয়েছিল ১০৭৫ কোটি ডলার। খাদ্য খাতে খরচ হয়েছিল ১১৪ কোটি ডলার।

গত বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে গত অর্থবছর পর্যন্ত চাল আমদানিতে সবচেয়ে বেশি খরচ বেড়েছে। ওই সময়ে চাল আমদানি ব্যয় সাড়ে ৭ কোটি ডলার থেকে বেড়ে সাড়ে ৩৭ কোটি ডলার হয়েছে। বেড়েছে প্রায় পাঁচগুণ। একই সময়ে গম আমদানি বেড়েছে দেড়গুণ। দুধ, মসলা ও চিনি আমদানি ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম বেড়েছে। তবে ভোজ্যতেল আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৩০ শতাংশ।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন