চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট
কৃচ্ছ্রসাধনের উলটোপথে নির্বাচন কমিশন
বাড়তি ১০৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা চায় কমিশন * আপ্যায়ন, ভ্রমণ, গাড়ির জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে বিদ্যমান বরাদ্দের ৫০ শতাংশ ব্যয়ের নির্দেশনা স্থগিত চেয়ে চিঠি
Advertisement
কাজী জেবেল
প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সরকারি অর্থব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন নীতির উলটোপথে হাঁটছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোটার তালিকা হালনাগাদ, নির্বাচনসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ, নির্বাচন পরিচালনাসহ বিভিন্ন খাতে বাজেটের চেয়ে ব্যয় বাড়াচ্ছে ইসি সচিবালয়।
চলতি অর্থবছরের (২০২২-২৩) বাকি সময়ের জন্য সংশোধিত বাজেটে বাড়তি ১০৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা চাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাড়তি এ টাকা চেয়ে শিগগিরই অর্থ বিভাগে আধাসরকারি পত্র দেওয়া হবে। যদিও অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সংশোধিত বাজেটে কোনোভাবেই অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দাবি না করার কথা বলা আছে।
সোমবার বাজেট ব্যবস্থাপনা কমিটির এক সভায় বাড়তি এসব বরাদ্দ চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এছাড়া আপ্যায়ন, ভ্রমণসহ বিভিন্ন খাতে বরাদ্দের ৫০ ভাগ ব্যয়ের নির্দেশনা থাকলেও সেটি মানতে পারছে না কমিশন। এসব খাতে ৫০ ভাগ ব্যয়ের ওই শর্ত শিথিল বা স্থগিত করার অনুরোধ জানিয়ে চলতি সপ্তাহে চিঠি দিয়েছে। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, সরকারের ওই শর্তের কারণে নির্বাচন, ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা এবং জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন কার্যক্রম চালাতে সমস্যা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায় উল্লিখিত সব তথ্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ও ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ব্যবহার বাড়ানো, বিএনপির সংসদ-সদস্যদের ছেড়ে দেওয়া ছয়টি আসনে উপনির্বাচন, ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরে অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজন হচ্ছে। তাদের যুক্তি-কোনো সংসদীয় আসন বা স্থানীয় সরকার নির্বাচন করতে হলে সব কেন্দ্রেই ভোটগ্রহণ করতে হয়। এক্ষেত্রে ব্যয় অর্ধেকে রাখতে সরকারের নীতি মানার সুযোগ নেই।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের সচিব মো. জাহাংগীর আলম যুগান্তরকে বলেন, যৌক্তিক কিছু কারণেই ব্যয় বাড়ছে। যেমন জাতীয় সংসদের ছয়টি আসনে ভোটগ্রহণ করতে হলে সেখানে টাকা লাগবে, যেটি আমাদের বাজেটে আগ থেকে ধরা ছিল না।
তিনি বলেন, সংশোধিত বাজেটে আহামরি টাকা চাচ্ছি না। আমরা কিছু খাতে ব্যয় কমিয়েছি, কিছু খাতে বেড়েছে। সেগুলো সমন্বয় করে বরাদ্দ চাওয়া হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কৃচ্ছ সাধনে সরকারের যে নীতি, তা আমাদের মানতেই হবে। বাজেটে যে অঙ্কের টাকা দেখানো হচ্ছে, তার সবই ব্যয় হবে না। আগামী অর্থবছরের বাজেটের সুবিধার্থে সংশোধিত বাজেট তৈরি করা হচ্ছে।
জানা যায়, দেশের আর্থিক অবস্থা অবনতি বিবেচনায় সরকার কয়েকটি পরিপত্র জারি করে বাজেটের টাকা খরচের কৃচ্ছ্রসাধনের নির্দেশনা দিয়ে আসছে। সর্বশেষ ২৩ ডিসেম্বর জারি করা নির্দেশনায় সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দের অতিরিক্ত দাবি করা যাবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ভ্রমণ, আপ্যায়ন, মনিহারি খাতে বরাদ্দের ৫০ শতাংশ ব্যয় করা, জ্বালানি তেলের বরাদ্দের ২০ শতাংশ ও বিদ্যুতের ২৫ শতাংশ সাশ্রয় করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। যদিও ইসির সংশোধিত বাজেটে এর উলটো চিত্র দেখা যাচ্ছে।
আরও জানা যায়, চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে নির্বাচন কমিশনের জন্য ৭৮৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকা সংস্থান রয়েছে। নির্বাচন পরিচালনা, নির্বাচনি প্রশিক্ষণ, ভোটার তালিকা তৈরি, মাঠ পর্যায়ের অফিস পরিচালনাসহ মোটা দাগে ১১টি খাতে এসব বাজেট ধরা রয়েছে।
কৃচ্ছ্রসাধন নির্দেশনা জারির পর সংশোধিত বাজেটে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, আঞ্চলিক, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অফিসগুলোর যে খরচ ধরা হয়েছে, তার কিছুটা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন, ভোটার তালিকা, জাতীয় পরিচয় নিবন্ধনসহ কয়েকটি খাতে বাড়তি বরাদ্দ চাওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ চাওয়া হচ্ছে ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন কার্যক্রমের নামে। চলতি অর্থবছরে (২০২২-২৩) ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমে বাজেটে বরাদ্দ রয়েছে ৭৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। এ খাতে অতিরিক্ত ২৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হচ্ছে। এছাড়া জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের জন্য সংশোধিত বাজেটে অতিরিক্ত ৬৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা বরাদ্দের জন্য অনুরোধ জানানো হবে।
এ দুটি খাতে বাড়তি বরাদ্দ চাওয়ার কারণ হিসাবে এ অনুবিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নাম গোপন রাখার শর্তে জানান, নাগরিকদের স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার কাজ নিয়ে ফ্রান্সের ওবার্থুর টেকনোলজিসের সঙ্গে ইসির পুরোনো বিবাদ রয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল হলেও নানা ধরনের জটিলতা রয়ে গেছে। ফলে ধাপে ধাপে ওই খাতে অর্থব্যয় করতে হচ্ছে। যদিও বিগত অর্থবছরে ওই টাকা ফেরত দেওয়া হয়।
এবার আর্থিক সংকটের মধ্যে ওই টাকা চাওয়া হচ্ছে। তারা আরও জানান, জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের জন্য যে বাড়তি ৬৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হচ্ছে, এর পুরোটাই ওই খাতে ব্যয় হবে। নির্বাচন কমিশন ১৩.৪ মিলিয়ন ব্ল্যাংক স্মার্ট কার্ড খালাস করেছে। ওই কার্ডের কাস্টমস ডিউটি বাবদ ৪৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে এনবিআরের। এছাড়া ওবার্থুর টেকনোলজিসের পাওনা রয়েছে ৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এর বাইরে আরও ৮ কোটি ১৪ লাখ টাকা ব্যয় রয়েছে এ খাতে।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫০ আসনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণ করার লক্ষ্যে কর্মকর্তা, ট্রাবলস্যুটার, মোবাইল টিম এবং প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অতিরিক্ত আসনে ইভিএম ব্যবহার করায় প্রশিক্ষণ খাতে চলতি অর্থবছরে বাড়তি ৮ কোটি ৭৫ লাখ চায় নির্বাচনি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (ইটিআই)। সংশোধিত বাজেটে বর্তমান বরাদ্দ ৪০ কোটি ৪৭ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৪৯ কোটি ২২ লাখ টাকা বরাদ্দ চায় প্রতিষ্ঠানটি।
একই সঙ্গে ‘নির্বাচন ব্যয়’ খাতে অতিরিক্ত ১১ কোটি বাড়তি বরাদ্দ চায় কমিশন। বর্তমানে বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ২২৮ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ২৩৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা চাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়াও বিদ্যুৎ, গাড়ির জ্বালানি, মনিহারি, ভবন সংস্কারসহ কয়েকটি খাতে বাজেটে বাড়তি বরাদ্দ চাওয়া হচ্ছে।
ব্যয় কমানোর নির্দেশনা শিথিল বা স্থগিত চেয়ে চিঠি : আপ্যায়ন, ভ্রমণ, জ্বালানি, মনিহারিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমানোর সরকারি নির্দেশনা নির্বাচন কমিশনের জন্য শিথিল বা স্থগিত চেয়ে ১ জানুয়ারি অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিবকে চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সরকারের এ নির্দেশনা ইসির জন্য কতটা প্রযোজ্য, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয় ওই চিঠিতে।
এতে বলা হয়, ‘সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করতে ৮৮ অনুচ্ছেদ এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইনের ৭, ৮ ও ১৬তে নির্দেশনা রয়েছে।’ সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কথা বলা আছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, সারা দেশে ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম চলছে। জাতীয় সংসদের শূন্য আসনের উপনির্বাচন, সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সরকারের ওই পরিপত্রের নির্দেশনার ফলে নির্বাচন, ভোটার তালিকা তৈরি ও জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন কার্যক্রমে সমস্যা হচ্ছে।
