বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স

শেয়ারবাজার কারসাজিতে ম খা আলমগীরের নাম

 মনির হোসেন 
০৪ মার্চ ২০২৩, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শেয়ারবাজারে কারসাজিতে এবার চাঁদপুর-১ আসনের সংসদ-সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান (ম খা) আলমগীরের নাম এসেছে। বাজারে বহুল সমালোচিত আবুল খায়ের হিরু চক্রের সঙ্গে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার কারসাজিতে জড়িয়েছেন পদ্মা (ফারমার্স) ব্যাংকের সাবেক এ চেয়ারম্যান।

এর সঙ্গে আবারও সামনে এসেছে তারকা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের নাম। আবুল খায়ের হিরুর স্ত্রী কাজী সাদিয়া হাসানের নেতৃত্বে চক্রটি এই কারসাজি করে।

সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ২ মাসে তারা কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৭২ শতাংশ বাড়িয়েছে। আর এই প্রক্রিয়ায় চক্রটি ৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। এসব তথ্য উঠে এসেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তদন্ত প্রতিবেদনে। এটি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) পাঠানো হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

আরও জানা গেছে, ইতোমধ্যে এই চক্রকে ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা জরিমানা করেছে বিএসইসি। তবে জরিমানার ক্ষেত্রে মহীউদ্দীন খান আলমগীর কিংবা সাকিব আল হাসানের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। এর আগে আরও ৬টি কোম্পানির শেয়ারে কারসাজিতে সাকিবের নাম এসেছে।

জানতে চাইলে ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমার জানামতে, এই শেয়ারের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। এসব শেয়ার আমি কিনিনি। আমার এজেন্ট দু-একটি শেয়ার কিনে থাকতে পারে। তবে পরিষ্কারভাবে বলছি, আমি জানি না।’

তবে সাকিব আল হাসানের সঙ্গে শুক্রবার রাতে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি। পাশাপাশি একই ফোন নাম্বারে এই প্রতিবেদক নিজের পরিচয় দিয়ে মন্তব্য চেয়ে এসএমএস (খুদে বার্তা) পাঠান। কিন্তু রাত ১০টায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো জবাব পাঠাননি তিনি।

সূত্র জানায়, গত ৩ বছরে শেয়ারবাজারে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। ২০১৬ সালে এটি ডিএসইতে তালিকাভুক্ত হয়। তুলনামূলকভাবে এর মৌলভিত্তি দুর্বল। কিন্তু শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ তদন্ত করেছে ডিএসই। এরপর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিতে পাঠানো হয়।

স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে বিএসইসিতে পাঠানো তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারের দাম ছিল ২১ টাকা। দুই মাসের ব্যবধানে ২০২০ সালের ২৯ ডিসেম্বর তা ৭১ টাকায় উন্নীত হয়। এ আলোচ্য সময়ে কোম্পানির শেয়ারের দাম ৭২ শতাংশ বেড়েছে।

এ সময়ে যারা কোম্পানিটির শেয়ার সবচেয়ে বেশি লেনদেন করেছেন এরমধ্যে রয়েছেন-সমবায় অধিদপ্তরের ডেপুটি রেজিস্ট্রার আবুল খায়ের হিরুর স্ত্রী কাজী সাদিয়া হাসান, বাজারে বহুল সমালোচিত সাইফ উল্লাহ মিজান, এজি মাহমুদ, ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান এবং ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর অন্যতম। এক্ষেত্রে মহীউদ্দীন খান আলমগীর বিডি সানলাইফ সিকিউরিটিজ লিমিটেডের মাধ্যমে ৪৬০০১ নম্বর গ্রাহক কোড থেকে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮১টি শেয়ার লেনদেন করেন। এরমধ্যে ৪ লাখ ৫৪০টি শেয়ার ক্রয় করেন। বিক্রি করেন ২ লাখ ১৬ হাজার ১৪১টি শেয়ার। এক্ষেত্রে মহীউদ্দীন খান আলমগীর ১২০৫৬৭০০৬৫০৩৩৭১২ নম্বর বিও অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেছেন। আলোচ্য ২ মাসে কোম্পানির ৮৪ লাখ ৩৯ হাজার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এরমধ্যে দশমিক ৮০ শতাংশ ছিল ম খা আলমগীরের।

২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামার তথ্য অনুসারে মহীউদ্দীন খান আলমগীরের মোট সম্পদের পরিমাণ ৫৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা। আর বার্ষিক আয় ১৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। ব্যয় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। তবে হলফনামার তথ্য বলছে তার ঋণ বা দায়ের পরিমাণ ৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।

এদিকে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার কারসাজিতে আবারও সামনে এসেছে তারকা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের নাম। ইবিএল সিকিউরিটিজ লিমিটেডের মাধ্যমে ৪৫ হাজার ৫০ নম্বর গ্রাহক কোড দিয়ে কোম্পানিটির ৯ লাখ ৯০ হাজার ৭৪৩টি শেয়ার লেনদেন করেছেন। যা কোম্পানির লেনদেনকৃত মোট শেয়ারের ১ দশমিক ১৭ শতাংশ।

এক্ষেত্রে সাকিব আল হাসান ১২০১৯৫০০৬৪৯৭৬২৩৭ নম্বর বিও অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেছেন। এছাড়া আরও ৬টি কোম্পানির শেয়ার কারসাজিতে সাকিব আল হাসানের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। এগুলো হলো-এশিয়া ইস্যুরেন্স, ওয়ান ব্যাংক, ফরচুন সুজ, বিডি কম, আইপিডিসি এবং এনআরবিসি ব্যাংক।

এছাড়া বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারে অস্বাভাবিক লেনদেনে ব্যক্তিগতভাবে আরও যারা জড়িত ছিলেন তারা হলেন- বাজারে বেশ কয়েকটি কোম্পানির কারসাজিতে জড়িত থাকা মো. এজি মাহমুদ। আরও রয়েছেন-হোসাম মো. সিরাজ, মো. সাইদুর রহমান মনির, কবির আহমেদ, নওয়াফেল বিন রেজা, মো. হাবিবুর রহমান (বাশার), আলহাজ সাঈদ আহমেদ, সাইফুল ইসলাম, আলমগীর হোসেন, মাকসুদা বেগম এবং মো. আবদুল কাদির। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীরা বাইরেও কিছু প্রতিষ্ঠান শীর্ষ লেনদেনের তালিকায় ছিল। এর মধ্যে রয়েছে-প্রতিষ্ঠান হিসাবে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স, প্রিমিয়ার ব্যাংক এবং ডিআইটি কো-অপারেটিভ লিমিটেড।

রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, চক্রটি নিয়মিত ও ব্লক মার্কেট মিলিয়ে দুই মাসে ২৫ শতাংশ শেয়ার লেনদেন করেছে। ডিএসইর ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে বর্তমানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে কোম্পানির ৩৪ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। অর্থাৎ কোম্পানিটির বেশিরভাগ শেয়ার কিনে তারা বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে কোম্পানিটির দাম বাড়িয়েছে। এভাবে ২১ টাকা থেকে ২ মাসেই ৭১ টাকায় নিয়ে আসে কোম্পানির শেয়ারের দাম। তবে তদন্তে যে সময়কাল উল্লেখ করা হয়েছে, তারপরেও কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। ২০২১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর শেয়ারটির দাম ১৬৩ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। আর কোম্পানির প্রতিটি শেয়ারের সর্বশেষ মূল্য ৫৭ টাকা।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, কাজী সাদিয়া হাসান, সাইফ উল্লাহ মিজান এবং এজি মাহমুদের নেতৃত্বাধীন চক্রটি দুই মাসে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারের মাধ্যমে ৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। এর মধ্যে আবুল খায়ের হিরু ও সাদিয়া হাসান ৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে রিয়ালাইজড (শেয়ার বিক্রি হয়েছে) মুনাফা ৩ কোটি ৪১ লাখ এবং (আনরিয়ালাইজড শেয়ার বিক্রি হয়নি) ৫৬ লাখ টাকা। অন্যদিকে সাইফ উল্লাহ মিজান ও এজি মাহমুদ ১ কোটি ২১ লাখ টাকা মুনাফা করেছে।

সব মিলিয়ে চক্রটিকে ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা জরিমানা করে কমিশন। এরমধ্যে কাজী সাদিয়া হাসান চক্র ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা, সাইফ উল্লাহ মিজানকে ৫০ লাখ টাকা, ডিআইটি কো-অপারেটিভকে ৩৫ লাখ টাকা এবং এজি মাহমুদকে ১৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। ৩০ দিনের মধ্যে জরিমানার অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

জানা গেছে, শেয়ার কারসাজিতে সাম্প্রতিক সময়ে বেশকিছু হাইপ্রোফাইল লোকের নাম এলেও এসব ঘটনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন সমবায় অধিদপ্তরের ডেপুটি রেজিস্ট্রার আবুল খায়ের হিরু। প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার পোর্টফোলিও ম্যানেজ করছে এ চক্র। ইতোমধ্যে ২০টির বেশি কোম্পানির শেয়ার কারসাজিতে হিরু, এজি মাহমুদ এবং সাইফ উল্লাহ মিজানের নাম এসেছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন