ইসলামাবাদ হাইকোর্টের আদেশ
ইমরান খানকে গ্রেফতার করা যাবে না
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) পার্টির চেয়ারম্যান ইমরান খানকে ৯ মের পর দায়ের করা কোনো মামলায় আগামী ১৫ মে পর্যন্ত গ্রেফতার না করার নির্দেশ দিয়েছেন ইসলামাবাদ হাইকোর্ট।
হাইকোর্টে ইমরান খান জামিন পেলেও তাকে আবারও গ্রেফতার করা হতে পারে বলে জল্পনার পরিপ্রেক্ষিতেই শুক্রবার বিচারপতি মিয়াঁগুল হাসান আওরঙজেব এ নির্দেশনা দেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইমরান খানকে গ্রেফতারের প্রত্যয় ব্যক্ত করার পরপরই পাকিস্তানজুড়ে তাকে গ্রেফতারের জল্পনা শুরু হয়।
এর আগে আল কাদির ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় জামিনের আবেদন দু সপ্তাহের জন্য মঞ্জুর করেছে ইসলামাবাদ হাইকোর্ট। পাশাপাশি তোষাখানা মামলায় আইনি প্রক্রিয়ার ওপরও স্থগিতাদেশ জারি করা হয়েছে। খবর দ্য ডন, জিও নিউজ, এক্সপ্রেস ট্রিবিউন। শুক্রবার কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ ইমরানকে আদালতে হাজির করা হয়।
আদালতে হাজির হওয়ার পর বিচার বিভাগীয় বিধি মেনে তাকে বায়োমেট্রিক পরীক্ষার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ইসলামাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি মিয়াঁগুল হাসান আওরঙ্গজেব ও বিচারপতি সামান রাফাত ইমতিয়াজ শুনানি শেষে ইমরান খানের জামিন মঞ্জুর করেন। তাকে দু’সপ্তাহের অন্তর্র্বর্তী জামিন দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন বিদেশি রাষ্ট্রনেতাদের কাছ থেকে পাওয়া উপহার সরকারি তোষাখানা থেকে নিয়ম ভেঙে বিক্রি করার অভিযোগসংক্রান্ত মামলার আইনি প্রক্রিয়াও শুক্রবার স্থগিত রাখতে বলেছেন আদালত। তোষাখানা মামলায় অভিযুক্ত ইমরান মার্চ মাসে নিম্ন আদালত থেকে জামিন পেয়েছিলেন। এদিকে পিটিআইয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দলের চেয়ারম্যান ইসলামাবাদ হাইকোর্ট থেকে বের হয়ে তিনি লাহোরে তার জামান পার্ক বাসভবন যাবেন।
বিচার বিভাগের প্রতি ইমরানের কৃতজ্ঞতা : দেশের বিচার বিভাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। শুক্রবার আদালতের ভেতরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইমরানকে জামিন দেওয়ায় দেশের জনতার পক্ষ থেকে তিনি এ কৃতজ্ঞতা জানান।
তিনি বলেন, আদালতে বাইরে ‘জঙ্গলের আইন’ বহাল রয়েছে। সেখানে এক ব্যক্তিই সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ইমরান খান বলেন, তিনি আবার ক্ষমতা ফিরে পেলে সেনাপ্রধান জেনারেল অসীম মুনিরের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেবেন না। ইমরান বলেন, তিনি (সেনাপ্রধান) ভাবছেন আমি ক্ষমতায় ফিরে এলে তিনি পদ হারাবেন। আমি তাকে কিছুই করব না। তার এমন আশঙ্কার কারণ হলো, সমগ্র দেশই ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
ইমরান খান বলেন, গ্রেফতার করার পর তার সঙ্গে তদন্তকারী সংস্থা ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টেবিলিটি ব্যুরোর (এনএবি) সদস্যরা ভালো ব্যবহার করেছেন। তবে গ্রেফতারের সময় তার মাথায় আঘাত করা হয়েছিল।
আবারও গ্রেফতারের আশঙ্কা : ইমরান খানের ওপর চলমান কয়েকটি মামলার কারণে তিনি এবং তার আইনজীবী পুনরায় গ্রেফতার হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। কোর্টরুমে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের ইমরান বলেন, আমি শতভাগ উদ্বিগ্ন যে আমাকে আবারও গ্রেফতার করা হতে পারে।
তিনি আরও জানান, তাকে গ্রেফতার করা হলে চলমান অস্থিরতা থামবে না। ইমরান খানের আইনজীবী বাবর আওয়ান দাবি করেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেফতার করতে ইসলামাবাদের উদ্দেশ্যে লাহোর এবং পাঞ্জাব পুলিশ রওনা হয়েছিল। রয়টার্সের কাছে বাবর আওয়ান বলেন, তারা ইমরানকে গ্রেফতার করতে এত অনড় কেন? আমি বলতে চাই, ইমরান খানকে গ্রেফতারের যেকোনো প্রচেষ্টাই হবে অসাংবিধানিক।
ইমরানের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের দীর্ঘ বৈঠক : প্রেসিডেন্ট ড. আরিফ আলভি পিটিআই চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দীর্ঘ সময় বৈঠক করেছেন। বৃহস্পতিবার সুপ্রিমকোর্ট ইমরান খানের গ্রেফতার অবৈধ ঘোষণা করার পর সন্ধ্যায় তিনি পুলিশ লাইনের গেস্ট হাউজে গিয়ে ইমরানের সঙ্গে বৈঠক করেন।
দ্য নিউজ জানিয়েছে, সাক্ষাতের সময় প্রেসিডেন্ট ইমরান খানকে দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানান এবং গ্রেফতারের পর সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার যোগাযোগের কথাও উল্লেখ করেন। ইমরান খান এরপর ওই বৈঠকে গিলগিট বালতিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খালিদ খুরশিদকেও ডেকে নেন।
মধ্যরাত পর্যন্ত দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলমান ওই বৈঠকে তিনিও অংশ নেন। এখানে উল্লেখ্য, ইমরান খানের গ্রেফতারের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছিলেন।
সব মামলায় জামিন না হলে, গ্রেফতার করা হবে : ইমরান খানের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলায় জামিন না পেলে সরকার সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেফতার করবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রানা সানাউল্লাহ। জিও নিউজের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, আমি গতকাল স্পষ্ট করে বলেছিলাম, ইমরানের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলায় যদি তিনি জামিন পান, তাহলে আমরা তাকে গ্রেফতার করব না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা তার জামিন বাতিল করার চেষ্টা করব। তিনি যদি কিছু মামলায় জামিন পান, আর কিছু মামলায় জামিনের বাইরে থাকেন, তবে আমরা তাকে গ্রেফতার করব।
সুপ্রিমকোর্টকে প্রধানমন্ত্রীর কটাক্ষ : ইমারানের মুক্তি নিয়ে আদালতের অবস্থানকে কটাক্ষ করে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ইসলামাবাদে শুক্রবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিচারালয় ইমরান খানের জন্য লৌহবর্ম হিসাবে কাজ করছে। তিনি আদালতকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনারা যদি এভাবেই তাকে (ইমরান খান) সহায়তা দিতে থাকেন, তাহলে দেশের কারাগারে যেসব ডাকাত রয়েছে তাদেরও মুক্তি দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, পিটিআই সমর্থকরা যেভাবে আমাদের শহিদদের অসম্মান করেছে, সেটা আমাদের শত্রুরাও করেনি।
আমাদের সামরিক স্থাপনাতে হামলা করা হয়েছে। দেশে এর চেয়ে বড় সন্ত্রাসবাদ আর হতে পারে না। ইমরানকে মুক্তি দেওয়ার সুপ্রিমকোর্টের ভূমিকার নিন্দা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের দ্বৈত নীতির কারণে পাকিস্তানে ন্যায়বিচারের সমাধি হয়েছে। পিটিআই কর্মীদের সহিংসতার তীব্র নিন্দা করে শাহবাজ শরিফ বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর মৃত্যুর পরও বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। কিন্তু কেই সামরিক স্থাপনাতে হামলা চালায়নি।
প্রধান বিচারপতিকে পিটিআইতে যোগ দেওয়ার পরামর্শ : ইমরান খানের মুক্তিতে সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশের তীব্র সমালোচনা করেছেন পাকিস্তান মুসলিম লীগ নওয়াজ (পিএমএলএন)-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মরিয়ম নওয়াজ। তিনি প্রধান বিচারপতি বান্দিয়ালকে বিচারপতির আসন ছেড়ে বিরোধী দল পিটিআইতে যোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, যে অপরাধী রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ৬০ বিলিয়ন রুপি তছরুপ করেছেন, তার সঙ্গে দেখা হওয়ায় প্রধান বিচারপতি খুব খুশি হয়েছেন।
তাকে ছেড়ে দিতে পেরে তো তিনি আরও খুশি হয়েছেন। ১৩ রাজনৈতিক দলের জোট পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির (পিডিএম) গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মরিয়ম নওয়াজ ইমরানকে গ্রেফতারের পর রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় হামলা এবং সহিংসতার জন্য প্রধান বিচারপতিকেই দায়ী করেন।
পিটিআই কর্মীদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের আহ্বান : পার্টি চেয়ারম্যানের নিরাপদে ফিরে না আসা পর্যন্ত কর্মী সমর্থকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বিক্ষোভ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে পিটিআই। এক টুইটার বার্তায় পিটিআই বলেছে, ইমরান সাহেব একটি নিরাপদ স্থানে না পৌঁছানো পর্যন্ত, আপনারা সবাই শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ অব্যাহত রাখুন।
সুপ্রিমকোর্টর সামনে বিক্ষোভ সোমবার : সুপ্রিমকোর্টের আচরণের প্রতিবাদে এর সামনে সোমবার বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন জেইউআই-এফ প্রধান ফজলুর রহমান। ইসলামাবাদে তিনি মিডিয়ার সঙ্গে আলাপকালে এ বিক্ষোভের ডাক দিয়ে বলেন, পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির (পিডিএম) প্রতিনিধি হিসাবে আমি সমগ্র জাতিকে সোমবার ইসলামাবাদ আসার আহ্বান জানাচ্ছি।
সুপ্রিমকোর্টের সামনে সেদিন বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশ করা হবে। তিনি বলেন, সারা দেশে সহিংসতা আর সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালানো হচ্ছে। আর আদালত সেই কার্যকলাপকে সুরক্ষা দিচ্ছেন।
দুষ্কৃতকারীদের না ধরা পর্যন্ত ইন্টারনেট বন্ধ : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রানা সানাউল্লাহ বলেছেন, বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ এবং সরকারি সম্পত্তির ক্ষতিসাধনকারী দুষ্কৃতকারীদের গ্রেফতার না করা পর্যন্ত দেশে ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিত থাকবে। শুক্রবার জিও নিউজকে এ তথ্য জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত অনেককে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তাদের গ্রেফতারে কিছুটা সময় লাগতে পারে। ততক্ষণ পর্যন্ত ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ থাকবে। সানাউল্লাহ বলেন, বিক্ষোভের সময় যারা ভবনের ক্ষতি করেছে তারা প্রত্যেকে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যুক্ত রয়েছে। তাদের পুরো কাজ ইন্টারনেটে করা হয়। পরিকল্পনা এবং সহিংসতার বাস্তবায়ন এ সবই সামাজিক মিডিয়ার মাধ্যমে করা হয়েছে।
জরুরি আইন জারির খবর প্রত্যাখ্যান : দেশে জরুরি আইন জারির খবর প্রত্যাখ্যান করেছেন তথ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ। শুক্রবার তিনি বলেছেন, আজকের মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন পিটিভি নিউজ তথ্যমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে বলেছে : দেশে জরুরি অবস্থা জারির বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ভিত্তিহীন। জরুরি অবস্থা জারির বিষয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। যাচাই না করে কোনো খবর প্রচার না করার জন্য তিনি গণমাধ্যমকে অনুরোধ করেন।
