ঘাটতি পূরণে নির্ভরশীলতা বাড়ছে বিদেশি ঋণে
ত্রিমুখী চাপে বাজেট চূড়ান্ত
আইএমএফ’র শর্তে বাড়ছে কর রাজস্ব, কমছে সঞ্চয়পত্রের ঋণ * বাড়ছে মূলধনি ব্যয়ও
Advertisement
মিজান চৌধুরী
প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বৈশ্বিক সংকট, আইএমএফ-এর ঋণের শর্ত ও সীমিত রাজস্ব আয়-এই ত্রিমুখী চাপে চূড়ান্ত হয়েছে আগামী (২০২৩-২৪) অর্থবছরের বাজেট। সেখানে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা।
এটি চলতি সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ১ লাখ ১ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা বেশি। বড় অঙ্কের ব্যয় মেটাতে ৫ লাখ ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকার মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এটি অর্জন করতে ২০২২-২৩ অর্থবছরের চেয়ে ৬৭ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায় করতে হবে।
এরপরও মোট আয় ও ব্যয়ের মধ্যে যে ব্যবধান (ঘাটতি), তা নতুন অর্থবছরের জিডিপির ৫ দশমিক ২ শতাংশের ঘরে রাখা হয়েছে। টাকার অঙ্কে ঘাটতি বাজেট (অনুদানসহ) ২ লাখ ৫৭ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা।
আগামী অর্থবছরের (২০২৩-২৪) জন্য উল্লিখিত বাজেট চূড়ান্ত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এটি ১ জুন মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর জাতীয় সংসদে পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, যা প্রস্তাবিত বাজেট হিসাবে দীর্ঘ আলোচনার পর ২৫ জুন পাশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর সেটি কার্যকর হবে ১ জুলাই থেকে।
এ বছর বাজেটে বড় চাপ হচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত। এগুলো ঋণ দেওয়ার প্রথম বছরেই বাস্তবায়ন করতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে কর রাজস্ব আদায়ের অঙ্ক চলতি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬২ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে।
কারণ, আইএমএফ-এর হিসাবে আগামী অর্থবছরে কর রাজস্ব বাড়াতে হবে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া শর্ত অনুযায়ী সঞ্চয়পত্র থেকে চলতি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা কম ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে।
পর্যায়ক্রমে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ কমানোর শর্ত রয়েছে আইএমএফ-এর। অপরদিকে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমানোর ফলে সরকারের ঋণের যে ঘাটতি হবে, সেটি পূরণ করতে ব্যাপক হারে বাড়ানো হচ্ছে বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা।
দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৮ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা বেশি বৈদেশিক ঋণ আগামী অর্থবছরে নেওয়া হবে। আর ঋণগ্রস্ত বেশি হওয়ায় অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য বেশি টাকা গুনতে হবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে। এছাড়া বাড়ছে সরকারের মূলধনি ব্যয়ও।
আসন্ন বাজেটের মূল শিরোনাম হচ্ছে ‘উন্নয়নের দীর্ঘ অগ্রযাত্রা পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের অভিমুখে’। ডিজিটাল বাংলাদেশের আরেক ধাপ ওপরে হচ্ছে স্মার্ট বাংলাদেশ। বর্তমান নানা ধরনের সংকটের মধ্যেও স্মার্ট বাংলাদেশ ভিশন ২০৪১-এর স্বপ্ন দেখাবেন অর্থমন্ত্রী।
যদিও সেখানে পৌঁছতে রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ। এছাড়া উচ্চপ্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা নিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে জিডিপি। আগামী বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসাবে থাকছে। অর্থ বিভাগ ধারণা করছে, ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে অনেক পণ্যের দাম কমছে। আগামী দিনে জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য পণ্যের মূল্য কমবে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে মূল্যস্ফীতিতে।
এ প্রসঙ্গে ড. আতিউর রহমান যুগান্তরকে বলেন, আমার মনে হয়, মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জটিই আগামী বাজেটে সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হবে। এটি নিয়ন্ত্রণে বাজেটে দিকনির্দেশনা থাকতে হবে।
এমনিতে বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাবে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনায় টানাপোড়েন চলছে। এজন্য নিজস্ব উৎস থেকে বাড়তি রাজস্ব আহরণের প্রস্তাব বাজেটের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হতে পারে। আমাদের কর-জিডিপির শতাংশ এমনিতেই বেশ কম। সেটি বাড়ানোর উদ্যোগ থাকতে হবে।
এদিকে আইএমএফ বাংলাদেশকে দেওয়া ঋণের শর্ত হিসাবে বলেছে, প্রথম বছর অর্থাৎ আগামী অর্থবছরে মোট জিডিপির শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ অতিরিক্ত কর বেশি আদায় করতে হবে।
সংস্থাটির শর্ত হিসাবে চলতি অর্থবছরের তুলনায় এ খাতে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা বেশি আদায় করতে হবে। ওই হিসাব মাথায় রেখে ৬২ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত আদায়ের হিসাব কষে মোট কর রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা ধার্য করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট কর রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৩ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। এক্ষেত্রে আইএমএফ-এর শর্ত পুরোপুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে।
মানুষের সীমিত আয়, মূল্যস্ফীতির কারণে ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, বৈশ্বিক সংকটসহ নানা ধরনের সমস্যার কারণে চলতি অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হচ্ছে। এমন বাস্তবতার মধ্যেও আগামী অর্থবছরে মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে ৫ লাখ ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।
এ আয়ের প্রধান উৎস জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা এবং এনবিআরবহির্ভূত কর ২০ হাজার কোটি টাকা আদায় করা হবে। এছাড়া কর ব্যতীত প্রাপ্তি (এনটিআর) আদায়ের লক্ষ্য হচ্ছে ৫০ হাজার কোটি টাকা।
পাশাপাশি বৈদেশিক অনুদান থেকে ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। বৈদেশিক অনুদান সরকারকে পরিশোধ করতে হয় না। ফলে এ খাত থেকে আয়কে রাজস্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আগামী অর্থবছরে প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে। এ আদায় নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে সম্প্রতি ঢাকা সফর করে যাওয়া আইএমএফ প্রতিনিধিদল। তবে রাজস্ব আদায় বাড়াতে সর্বজনীন করব্যবস্থা, পুরোনো করছাড় পদ্ধতি বাতিল এবং নতুন আওতা বাড়ানোসহ বেশকিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আয় পর্যাপ্ত না থাকায় আগামী অর্থবছরে ব্যয়ের আকার বাস্তবতার নিরিখে বাড়ানো যায়নি বলে জানান অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। এরপরও আসন্ন বাজেটে চূড়ান্ত ব্যয়ের মধ্যে সরকারের পরিচালন খাতে ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৮১ কোটি টাকা। পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে আবর্তক ব্যয় হবে ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৪৭ কোটি এবং মূলধনি ব্যয় ৩৯ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ব্যয় হবে ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা।
জানতে চাইলে সাবেক অর্থসচিব (সিনিয়র) মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাজেটের আকার অনেক বেড়েছে। কিন্তু তা জিডিপির ১৫ শতাংশের আশপাশেই ঘুরপাক খাচ্ছে।
স্বাভাবিক অবস্থায় একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে বাজেটের আকার জিডিপির ২৫-৩০ শতাংশের মধ্যে হওয়া বাঞ্ছনীয়। সুষ্ঠুভাবে রাষ্ট্রপরিচালনা ও উন্নয়ন কার্যক্রম চালু রাখতে হলে সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। পরনির্ভশীলতা ত্যাগ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হলে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের বিকল্প নেই।
আইএমএফ-এর শর্ত অনুযায়ী জিডিপির অনুপাতে ঘাটতি বাজেট কমানো হয়েছে। এই ঘাটতি বাজেট পূরণে দুটি খাত থেকে ঋণ করতে হয়। প্রথম হচ্ছে বৈদেশিক ঋণ এবং দ্বিতীয় অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ঋণ ।
আগামী অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হবে ১ লাখ ২ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৮৩ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা। এছাড়া অভ্যন্তরীণ খাত থেকে নেওয়া হচ্ছে ১ লাখ ১৫ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা।
