বিদ্যমান আইনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব কিনা জানতে চায় ইইউ
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধিরা তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের কাছে জানতে চেয়েছেন নির্বাচনে তার মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা কী। তারা আইন ও বিচার বিভাগের সচিব গোলাম সারওয়ারকে জিজ্ঞাসা করেছেন, বিদ্যমান আইনি কাঠামোতে দেশে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন সম্ভব কিনা। নির্বাচনের কয়েক মাস আগে হঠাৎ কেন গণপ্রতিনিধিত্ব আধ্যাদেশ সংশোধন করা হলো। এই সংশোধনীর ফলে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বেড়েছে না কমেছে। তারা জানতে চেয়েছেন ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের সংশোধন হচ্ছে কিনা। বুধবার ইইউর সফরকারী দলটি সচিবালয়ে আলাদাভাবে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এবং আইন ও বিচার বিভাগের সচিবের সঙ্গে বৈঠক করে। দুই বৈঠকেই ইইউ প্রতিনিধিদলে ছিলেন জ্যেষ্ঠ নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষক রিকোর্ডো চেলেরি, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ দিমিত্রি আইওনাও ও আইন বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা ডোস রামোস আলভেস। কোনো বৈঠকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আলোচনা হয়নি।
তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ইইউ প্রতিনিধিদলের বৈঠক : তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, ইইউ প্রতিনিধিরা নির্বাচনে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা কী তা জানতে চেয়েছেন। আমরা বলেছি, বাংলাদেশের মিডিয়া হচ্ছে প্রাইভেট। বাংলাদেশে বিটিভি একটি সরকারি চ্যানেল, আর ৩৫টি প্রাইভেট চ্যানেল সম্প্রচারে আছে। তাদের বলেছি, ইউরোপের মতো বাংলাদেশে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো নিবন্ধিত নয়। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে যখন কোনো গুজব ছড়ানো হয়, তা নিয়ন্ত্রণ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এই চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলোর রেসপনসিবিলিটি (দায়িত্বশীলতা) আছে। মন্ত্রী সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা জানেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এ বছরে আইন সংশোধন করেছে। তারা বলেছে, প্রতিটি সামাজিক মাধ্যমকে ইউরোপে নিবন্ধিত হতে হবে। যা আমরা বহুদিন ধরে বলে আসছি। ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবসহ সব সামাজিক মাধ্যমকে আমরা সরকারের পক্ষ থেকে বলে এসেছি, বাংলাদেশের আইন অনুসারে এখানে নিবন্ধিত হওয়ার জন্য। কিন্তু কেউ এখনো হয়নি। ইউরোপে আইন সংশোধন করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি ফ্রেমওয়ার্ক ল’ তৈরি করেছে। সব সামাজিক মাধ্যমকে ইউরোপে নিবন্ধিত হতে হবে। আইন অনুসারে তারা এটি করতে বাধ্য।
তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, আরেকটি বিষয় আমি তাদের বলেছি, ইউরোপের যেসব দেশ থেকে তারা এসেছেন, একজন গ্রিস, আরেকজন ইতালি ও আরেকজন পর্তুগাল থেকে। সেখানেও যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, তারাই নির্বাচন পরিচালনা করে। আইন অনুসারে আমাদের দেশেও তা-ই হবে। আমরা তাদের সেটি জানিয়েছি। কিন্তু নির্বাচনের সময় সরকারের রুটিন কাজ করা ছাড়া আর কোনো ক্ষমতা থাকে না। সরকারের সব প্রতিষ্ঠান যারা নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তাদের চাকরি নির্বাচন কমিশনের হাতে ন্যস্ত হয়। বিষয়টি তাদের বলেছি। নির্বাচন কমিশন খুবই শক্তিশালী, তারা খুবই সক্রিয়।
হাছান মাহমুদ বলেন, গাইবান্ধা-৫ আসনে যে উপনির্বাচন হয়েছে, তাতে ২০-২৫টি কেন্দ্রে গণ্ডগোল হয়েছে, আইন অনুসারে এসব কেন্দ্রের ভোট বাতিল করার কথা। কিন্তু পুরো নির্বাচন বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। সে বিষয়টি আলোচনা করেছি। এর অর্থ হচ্ছে, নির্বাচন কমিশনের সেই ক্ষমতা আছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা-এ প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
বিরোধী দলকে নির্বাচনে আনা নিয়ে কোনো কথা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, আমি তাদের বলেছি। তাদের পর্যবেক্ষক মিশন আসার ব্যাপারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেই এসেছে। বিরোধী দলকে নির্বাচনে আনতে তারা এখানে আসেনি। আমি তাদের বলেছি, আমরা চাই, বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা দেশে কাউকে বিশৃঙ্খলা করতে দেব না। বিএনপির উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা। সাপের খোলস বদলানোর মতো।
আইন সচিবের সঙ্গে ইইউ প্রতিনিধিদের বৈঠক : আইন ও বিচার বিভাগের সচিব গোলাম সারওয়ার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের আইনগত কাঠামো সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য যথেষ্ট কিনা সে বিষয়ে জানতে চেয়েছে। আমরা বলেছি, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আমাদের দেশের যে আইনগত কাঠামো আছে, তা যথেষ্ট। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইন সচিব বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে যে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) পাশ হয়েছে, সেখানে ৯১ (এ) ধারায় নির্বাচন বন্ধ করার ব্যবস্থা আছে। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৯১ (এ)(এ) ধারা যুক্ত করে নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী করেছেন। এতে তারা (ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা) সন্তুষ্ট হয়েছেন।
তিনি বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে সম্প্রতি যে আইন হয়েছে তা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, এই উপমহাদেশে এমন আর কোনো আইন নেই। আমরা বলেছি, সার্চ কমিটির যে ফরমেশন আছে, সেখানে আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি, যিনি প্রধান বিচারপতির মাধ্যমে মনোনীত হবেন। এছাড়া মহাহিসাব নিয়ন্ত্রক, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান এবং দুজন সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, যাদের একজন নারী থাকবেন। ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের কাছে আমরা আইনও দিয়েছি। এ বিষয়ে তারা আমাদের কাছ থেকে সঠিক তথ্য পেয়েছেন। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এমন কোনো আলোচনা হয়নি।
তারা কোনো পর্যবেক্ষণ দিয়েছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, তারা আমাদের কাছে জানতে চেয়েছেন, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এই আইনটা যথেষ্ট কিনা। আমরা বলেছি, হ্যাঁ। আমাদের যে মেকানিজম আছে, সেটা যথেষ্ট। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে অন্য কিছু করার দরকার নেই। আরপিও নিয়ে ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের কোনো পর্যবেক্ষণ ছিল কিনা জানতে চাইলে আইন সচিব বলেন, আমাদের আইনগত কাঠামোর কথা তাদের বলেছি। তাদের জানানো হয়েছে, দেশে বিচার বিভাগ স্বাধীন। ২০০৭ সালের নভেম্বরে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ আলাদা হয়। ভোটের সময় আরপিও ৯১(এ) ধারা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন আমাদের কাছে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট চায়। তারা (ইসি) জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের জন্য রিকুইজিশন দিলে, আমরা সুপ্রিমকোর্টের সম্মতি নিয়ে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্বাচন কমিশনে ন্যস্ত করি। এরপর তারা নির্বাচন কমিশনের অধীন চলে যায়। সবকিছু ইলেকশন কমিশনের সুপারভিশনে তারা করেন। অর্থাৎ নির্বাচনের আগের ও পরের দুদিন এবং নির্বাচনের দিন তারা ইসির অধীন দায়িত্ব পালন করেন। তখন নির্বাচনে কোনো অনিয়ম হলে তারা সামারি ট্রায়াল করেন। আরপিওর বিধান অনুসারে তারা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এই বিধানের তারিফ করেছে ইউরোপীয় প্রতিনিধিরা।
