নিবন্ধন বিতর্কে যৌথ সংবাদ সম্মেলন
নির্বাচন কমিশন ঘেরাও করবে বিক্ষুব্ধ ১০ দল
আন্দোলনের পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চলতি মাসেই নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘেরাও করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে নিবন্ধন না পাওয়া ১০টি রাজনৈতিক দল। তাদের অভিযোগ, মূলত সরকারি দলের সুপারিশ অনুযায়ী ইসি তাদের নিবন্ধন দেয়নি। সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ হুঁশিয়ারি দেন নিবন্ধন না পাওয়া দলগুলোর নেতারা। নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনে পরিণত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তারা।
এদিকে নিবন্ধন না পাওয়া কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতা যুগান্তরকে জানান, ইসির বিরুদ্ধে আন্দোলনের পাশাপাশি আইনগত পদক্ষেপও নেবেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়ালের সঙ্গে দেখা করে নিবন্ধন না পাওয়ার বিষয়ে ব্যাখ্যাও জানতে চাইবেন। তারা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি) নিবন্ধন দিতে ইসির সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
প্রসঙ্গত, কঠোর গোপনীয়তায় যাচাই-বাছাই ও আলোচনা শেষে রোববার নির্বাচন কমিশনের সভায় দুটি অচেনা দলকে নিবন্ধন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দল দুটি হলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি)। ইসির সংক্ষিপ্ত তালিকায় ১২ দল ছিল। দুটি দলকে নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত দেওয়ায় বাকি ১০টি আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেছে। ইসির এ সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা চলছে।
ইসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জাতীয় প্রেস ক্লাবে যৌথ সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সদস্য সচিব মজিবুর রহমান মঞ্জু। এ সময় নিবন্ধন না পাওয়া ১০টি দলের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বলেন, এতগুলো সুপরিচিত, সক্রিয় এবং রাজপথে সংগ্রামরত রাজনৈতিক দল বাদ দিয়ে যাদের নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে তাদের নাম আপনারা কয়জন শুনেছেন? তাদের কি আপনারা চেনেন? তাদের কি আদৌ কোনো অফিস, নেতাকর্মী আছে?
নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনে পরিণত হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত কিছু সরকারি কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করার জন্য এখানে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও বড় পুরস্কারের লোভে তারা দালালের মতো ফ্যাসিস্টদের স্বার্থে যে কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকে। বাংলাদেশে জনপ্রতিনিধিত্বশীল একটি সরকার গঠন করতে না পারা এর অন্যতম কারণ।
সংবাদ সম্মেলনে ১০টি দলের নেতারা অভিযোগ করে বলেন, গত এক বছর ধরে যাচাই-বাছাইয়ের নোটিশ দিয়ে আসছে ইসি। এর মধ্যে কোথাও কোথাও আচমকা দলগুলোর কেন্দ্রীয় অফিস, জেলা-উপজেলা অফিস পরিদর্শন করেছেন ইসির প্রতিনিধিরা। পরিদর্শনের নামে ইসি কর্মকর্তারা আমাদের তৃণমূল অফিসের দলিল, সাইন বোর্ড ও ১০টি দলের নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। পরিস্থিতি দেখে মনে হয়েছে, তারা যেন রাজনৈতিক দল নয় বরং আসামিদের তালিকা হালনাগাদ করছেন।
সংবাদ সম্মেলনে নুরুল হক নুর, মজিবুর রহমান মঞ্জু, মুস্তাফিজুর রহমান ইরান নিজ নিজ দলের নিবন্ধন না পাওয়ায় ইসি কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচির কথা জানান। পরে অন্যরাও তাতে সুর মেলান। সংবাদ সম্মেলনে গণঅধিকার পরিষদের একাংশের সভাপতি নুরুল হক নুর, বিএলডিপির চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন আল আজাদ, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান বাবুল সর্দার চাখারী, গণঅধিকার পরিষদের অপর অংশের নেতা ফারুক হোসেন, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির (বিএমজেপি) সভাপতি সুকৃতি কুমার মন্ডল ও ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি আশিক বিল্লাহ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
আইনি পদক্ষেপ নেবে কয়েকটি দল : নিবন্ধন না পাওয়া এবি পার্টি, বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-বিএলডিপি ও লেবার পার্টির নেতারা ইসির বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আমাদের নিবন্ধন দেয়নি নির্বাচন কমিশন। ধাপে ধাপে যাচাইয়ে আমরা টিকেছি বলেই ইসির ১২টি দলের তালিকায় ছিলাম। এমন কী হলো আমাদেরকে হঠাৎ বাদ দিয়ে দিল।
তিনি বলেন, ইসির সিদ্ধান্তে আমরা ন্যায়বিচার বঞ্চিত হয়েছি। আমাদের অধিকার হরণ হয়েছে। ইসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে যাব। প্রায় একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-বিএলডিপির চেয়ারম্যান এম নাজিম উদ্দীন আল আজাদ। তিনি বলেন, আমরা নিবন্ধনের সব শর্ত পূরণ করেছি। তবুও হঠাৎ কেন নিবন্ধন পেলাম না, বুঝতে পারছি না। ইসির সিদ্ধান্তে হতবাক। তিনি বলেন, সিইসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিবন্ধন না পাওয়ার বিষয়ে কথা বলব। একই সঙ্গে ইসির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপও নেব।
রাজনৈতিক কারণে নির্বাচন কমিশন এবি পার্টির নিবন্ধন দেয়নি বলে মন্তব্য করেছেন দলটির সদস্য সচিব মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি যুগান্তরকে বলেন, যতটুকু জেনেছি নির্বাচন কমিশনের প্রতিবেদনেও আমাদের দল নিবন্ধন পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু রুদ্ধধার বৈঠকে সরকারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী আমাদের দলকে নিবন্ধন দেওয়া হয়নি।
এমন দুটি দলকে নিবন্ধন দিয়েছে যারা একতরফা নির্বাচনে যাওয়ার জন্য গোপনে আঁতাত করেছে। তিনি বলেন, নিবন্ধন পাওয়ার জন্য ২২টি জেলা ও ১০০ উপজেলায় কমিটি থাকার শর্ত রয়েছে। অথচ আমার দলের ৩৬টি জেলা ও মহানগর এবং ১০৪টি উপজেলার কমিটির তালিকা নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছি।
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার পতনে এক দফার আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বৈঠকে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়ার বক্তব্য দিয়েছি। এসব কারণেই আমাদের দলের নিবন্ধন দেয়নি। নির্বাচন কমিশনের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও আইনগত সব পদক্ষেপ নেবেন বলেও জানান।
বর্তমান নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতন্ত্রের অন্তরায় হিসাবে কাজ করছে বলেও আন্তর্জাতিক মহলে জানাব। বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টির (বিএইচপি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, নিবন্ধন পাওয়ার সব শর্ত পূরণ করেছি। তবুও নির্বাচন কমিশন কী কারণে নিবন্ধন দেয়নি তা জানি না। আপাতত এর বেশি মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে গণঅধিকার পরিষদের দুই পক্ষের হট্টগোল : নিবন্ধন না পাওয়া ১০ রাজনৈতিক দলে সংবাদ সম্মেলনে হট্টগোল করে গণঅধিকার পরিষদের দুই পক্ষ। এর ফলে সংবাদ সম্মেলনে কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রথমে আসেন ড. রেজা কিবরিয়ার নেতৃত্বাধীন গণঅধিকার পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হাসান। এরপর আসেন নুরুল হক নুরের নেতৃত্বাধীন গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা। ড. রেজা কিবরিয়ার প্রতিনিধি ওই সংবাদ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানোর প্রতিবাদ করেন নুরুল হক নুরের সমর্থকরা। একপর্যায়ে তারা সংবাদ সম্মেলন স্থল ছেড়ে যেতে উদ্যত হন। পরে অন্য নেতারা তাদের নিবৃত্ত করেন।
