পাঁচ বছরের মধ্যে ডেঙ্গুতে একদিনে রেকর্ড ১৩ মৃত্যু
২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত ১ হাজার ৫৩৩ জন * মুগদা হাসপাতালের মেঝেতেও ঠাঁই মিলছে না * স্যালাইন সংকট
Advertisement
জাহিদ হাসান
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। দিনকে দিন রোগীর চাপ বাড়ছে। অনেক হাসপাতালে শয্যার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি ভর্তি। কোনো কোনো হাসপাতালের মেঝে এবং বারান্দায়ও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এতে করে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরাও। জ্যামিতিক হারে রোগী বৃদ্ধির এই ধারায় গত একদিনে ১৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৩৩ জন।
এদিকে ডেঙ্গু রোগের ইতিহাস বলছে, গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড মৃত্যু দেখল বাংলাদেশ। এমন খবরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর মশাবাহিত এ রোগে মৃতের সংখ্যা পৌঁছাল ১২৭ জনে। যার মধ্যে ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে চলতি জুলাই মাসের ১৭ দিনেই।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, নতুন রোগীসহ এ বছর হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা পৌঁছেছে ২৪ হাজারে। এর মধ্যে জুলাই মাসের ১৭ দিনেই ভর্তি হয়েছেন ১৬ হাজার ২২ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ৭৭৯ জন এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ৭৫৪ জন ভর্তি হয়েছেন। যে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে ৯ জন ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। বাকি ৪ জন ঢাকার বাইরে মারা গেছেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৫ হাজার ৫৬৯ জন ডেঙ্গু রোগী। তাদের মধ্যে ঢাকায় ৩ হাজার ৪৪৩ জন এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ২ হাজার ১২৬ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে। জুন মাসে ৫ হাজার ৯৫৬ জন রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, মারা যান ৩৪ জন। জুলাইয়ের প্রথম ১৭ দিনেই সেই সংখ্যা বেড়ে তিনগুণ হয়েছে। মাসের হিসাবে জানুয়ারিতে আক্রান্ত ৫৬৬ জন, মৃত্যু ৬ জন, ফেব্রুয়ারিতে আক্রান্ত ১৬৬ জন, মৃত্যু ৩ জন, মার্চে আক্রান্ত ১১১ জন, এপ্রিলে ১৪৩ আক্রান্ত জন, মৃত্যু ২ জন, মে মাসে আক্রান্ত ১ হাজার ৩৬ জন, মৃত্যু ২ জন, জুন মাসে আক্রান্ত ৫ হাজার ৯৫৬ এবং মৃত্যু ৩৪ জনের। জুলাই মাসে এসে ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়ানকভাবে বেড়ে যায়। যার ফলে প্রথম ১৭ দিনেই আক্রান্ত হয়ে পড়েন ১৬ হাজার ২২ জন এবং মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ৮০ জন।
সরকারের রোগতত্ত্ব ও রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) সূত্রে জানা গেছে, দেশে ২০০০ সালে ৫ হাজার ৫৫১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ওই বছর ৯৩ জন মারা যান। এরপর ২০০১ সালে ২ হাজার ৪৩০ জন আক্রান্ত ও ৪৪ জনের মৃত্যু হয়। ২০০২ সালে ৬ হাজার ২৩২ আক্রান্ত ও ৫৮ জনের মৃত্যু, ২০০৩ সালে আক্রান্ত ৪৮৬ ও ১০ জনের মৃত্যু হয়। ২০০৪ সালে ৩ হাজার ৪৩৪ জন আক্রান্ত ও ১৩ জনের মৃত্যু, ২০০৫ সালে ১ হাজার ৪৮ জন আক্রান্ত ৪ জনের মৃত্যু হয়, ২০০৬ সালে ২ হাজার ২০০ জন আক্রান্ত ১১ জনের মৃত্যু, ২০০৭ সালে ৪৬৮ জন, ২০০৮ সালে ১ হাজার ১৫৩ জন আক্রান্ত, ২০০৯ সালে ৪৭৪ জন আক্রান্ত, ২০১০ সালে ৪০৯ জন আক্রান্ত হন। তবে ২০০৮, ২০০৯ ও ২০১০ ও ২০১৪ সালে ডেঙ্গুতে কেউ মারা যায়নি। এরপর ২০১১ সালে আক্রান্ত হন ১ হাজার ৩৫৯ জন, মারা যান ৬ জন, ২০১২ সালে আক্রান্ত ৭৬১ ও একজন মারা যান, ২০১৩ সালে আক্রান্ত হন ১ হাজার ৭৭৯ জন, মৃত্যু ২ জন, ২০১৪ সালে ৩৭৫ জন আক্রান্ত হলেও কেউ মারা যাননি। ২০১৫ সালে আক্রান্ত হন ৩ হাজার ১৬২ জন মারা যান ৬ জন, ২০১৬ সালে আক্রান্ত হন ৬ হাজার ০৬০ জন মারা যান ১৪ জন, ২০১৭ সালে আক্রান্ত হন ২ হাজার ৭৬৯ জন এবং মারা যান ৮ জন, ২০১৮ সালে আক্রান্ত হন ১০ হাজার ১৪৮ জন মারা যান ২৬ জন, ২০১৯ সালে আক্রান্ত হন ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন, মারা যান ১৭৯ জন, ২০২০ সালে আক্রান্ত ১ হাজার ৪০৫ জন, মারা যান ৭ জন, ২০২১ সালে আক্রান্ত হন ২৮ হাজার ৪২৯ জন, মারা যান ১০৫ জন। এ ছাড়া ২০২২ সালে আক্রান্ত হন ৪ হাজার ৪৮২ জন এবং ১৮২ জন মারা যান। আর চলতি বছরের ১৮ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ২৪ হাজার রোগী। এদের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৮ হাজার ৩০৪ জন। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৫ হাজার ৫৫৯ জন। চলতি বছর মারা গেছেন ১২৭ জন।
মুগদা হাসপাতালের মেঝেতেও ঠাঁই মিলছে না ডেঙ্গু রোগীর : এদিকে রোগীর চাপে মুগদা মেডিকেল হাসপাতালের রোগীদের বেহাল অবস্থা। মঙ্গলবার সরেজমিন মুগদা হাসাপতালের ৩, ৮, ৯, ১০, ১১, ১২নং তলায় ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দিতে দেখা যায়।
জরুরি বিভাগের রোগীদের বেশিরভাগেরই জ্বর। তবে শরীরে র্যাশ, পেটব্যথা, পেটে পানি জমা, চোখের পেছন দিকে ব্যথার কথা বলছেন অনেক রোগী। চিকিৎসা নিতে আসা প্রায় ৯০ ভাগ রোগী বমি, ডায়রিয়ার মতো পাতলা পায়খানার কথা বলছে। অন্যান্য বছর এই উপসর্গগুলো তেমন দেখা যায়নি। প্রায় সব বয়সিদের ক্ষেত্রেই এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখা যায়।
ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে হাসপাতালের তিনতলার সিঁড়িসংলগ্ন বারান্দার মেঝের একটি বিছানায় ভর্তি থাকতে দেখা যায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌসকে (২৬)। তিনি যুগান্তরকে বলেন, রোববার বিকালে তার জ্বর আসে। ডেঙ্গু আক্রান্তের ভয়ে সেদিন রাতেই সায়েদাবাদ ধলপুর থেকে এই হাসপাতালে চলে আসি। চিকিৎসকরা ৯ তলার তিন নম্বর মেডিসিন ওয়ার্ডের ১১৫ নম্বর বিছানায় ভর্তি নেন। এ সময় শয্যা পেতে হাসপাতালের এক স্টাফকে ২০০ টাকা দিতে হয় বলে জানান তিনি। অথচ ভর্তির পর হাসপাতাল থেকে মাত্র এক ব্যাগ স্যালাইনের সঙ্গে জ্বরের প্যারাসিটামল ওষুধ দেওয়া হয়। বাকি ৬ ব্যাগ স্যালাইন বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। তিনি জানান, ১৬ জুলাই রাতে ভর্তির পর রক্তের স্যাম্পল (নমুনা) দিলেও রিপোর্ট পেয়েছেন মঙ্গলবার বিকালে। রিপোর্টে ডেঙ্গু পজিটিভ আসায় ৯ তলা থেকে এখানে পাঠানো হয়েছে। শয্যা না থাকায় সিঁড়ির পাশে বিছানা পেতে থাকতে হচ্ছে। ওয়ার্ডের বাইরে এই মেঝেতে তার মতো অন্তত একশ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন। কিন্তু কোনো বিছানাতেই মশারি দেওয়া হয়নি।
৮ তলার শিশু বিভাগের বিছানার বাইরে একশ জনের বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি থাকতে দেখা যায়। মাথার ওপর হাতেগোনা দুয়েকটি ফ্যান থাকলেও সেগুলো ধীরগতিতে ঘুরছে। ভ্যাপসা গরমে ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের কান্নার চিৎকার চারদিকে। বাচ্চাদের নানাভাবে সান্ত্বনা দিতে দেখা যায় বাবা-মা কিংবা অভিভাবকদের।
এই ওয়ার্ডের বারান্দার দরজার সঙ্গে লাগোয়া বিছানায় ভর্তি থাকতে দেখা যায় সাত বছর বয়সি আলি ও তার ২০ মাস বয়সি ভাই হাসানকে। হাতে ক্যানুলা পরিহিত দুই ভাইয়ের স্যালাইন ব্যাগ একটি স্ট্যান্ডে ঝোলানো। আলি নেতিয়ে শুয়ে থাকলেও হাসানের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। বারবার শিশুটির খিঁচুনি দেখে তার বাবা আল আমিনকে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি জানান, তিনি ঢাকা-কক্সবাজার রুটে বাস চালান। পরিবার নিয়ে সায়েদাবাদ এলাকায় ভাড়া থাকেন। বেশিরভাগ সময় বাসার বাইরে থাকেন। সপ্তাহখানেক আগে বড় ছেলে আলির জ্বর আসে। তিন দিন পর ছোট ছেলে হাসানও জ্বরে আক্রান্ত হন। কিন্তু ওদের মা শুরুতে জ্বরের কথা গোপন রেখে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাওয়ায়। জ্বর কমা ও বাড়ার মধ্যে থাকলেও সুস্থ হচ্ছিল না। শনিবার ভর্তির পর চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ছোট ছেলে হাসানের অবস্থা বেশি খারাপ। বাচ্চাটির পেটে পানি জমছে, খিঁচুনি হচ্ছে, মুখে ঘা ও শরীর সাদা হয়ে গেছে। সুস্থ হতে আরও সময় লাগবে।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. নিয়াতুজ্জামান জানান, চলতি বছর মুগদা হাসপাতালটিতে ডেঙ্গু নিয়ে মোট ভর্তি হয়েছেন ৪ হাজার ১১৫ জন রোগী। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন ১৫১ জন। বর্তমানে ভর্তি আছেন ৫৪০ জন। এর মধ্যে শিশু ১২৩ জন। মুগদায় এখন পর্যন্ত মারা গেছে ২৭ জন। জুনে ১৫ এবং জুলাইয়ে ১২ জন।
জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. মুন্নু ফারজানা যুগান্তরকে জানান, জরুরি বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৬০০ রোগী আসছে। শারীরিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে যাদের ৫০ থেকে ৬০ ভাগই রোগীকেই ভর্তি নিতে হচ্ছে। জ্বরের রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ৯০ ভাগের বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে।
