তারেক রহমানের বক্তব্য সরানোর নির্দেশ
আদালতে হইচই-হট্টগোল এজলাস ছাড়লেন দুই বিচারপতি
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য অনলাইন থেকে সরানোর নির্দেশকে কেন্দ্র করে হাইকোর্টের এজলাস কক্ষে বিএনপিপন্থি ও আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের মধ্যে চরম হট্টগোলের ঘটনা ঘটেছে। টানা ২০ মিনিটের হইচই ও হট্টগোলের একপর্যায়ে এজলাস ছেড়ে খাসকামরায় চলে যান দুই বিচারপতি। এর প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পর এজলাসে ফেরেন তারা।
সোমবার বিচারপতি মো. খসরুজ্জামান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় কোর্টে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। বিচারপতিরা চলে যাওয়ার সময় বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা শেইম-শেইম বলে চিৎকার করতে থাকেন। পরে দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে দুই বিচারপতি এজলাসে আসন গ্রহণ করে বিচারকাজ শুরু করেন।
এর আগে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আইনের দৃষ্টিতে পলাতক অবস্থায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত রুলে সম্পূরক আবেদনের শুনানি হয়। আইনজীবী কামরুল ইসলাম, সানজিদা খানম, অ্যাডভোকেট নাসরিন সিদ্দিকা লিনা এ আবেদন করেন। শুনানি শেষে তারেক রহমানের সাম্প্রতিক দেওয়া সব বক্তব্য অনলাইন থেকে সরানোর জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এরপর আদালতে উপস্থিত হয়ে এ নিয়ে আপত্তি জানান বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা।
সকাল ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা আদালতের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা আপনার বিরুদ্ধে প্রধান বিচারপতির কাছে অনাস্থা জানিয়েছি। আপনি বায়াসড-পক্ষপাতদুষ্ট বিচারক। আপনার থেকে আমরা ন্যায়বিচার পাব না। এ কারণে আপনার কোর্টে তারেক রহমানের কোনো মামলা চলতে পারে না।’
এ সময় বিচারপতি মো. খসরুজ্জামান বলেন, ‘আপনাদের ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলকে শুনেছি।’ কোর্টে উপস্থিত থাকা ব্যারিস্টার কাজল সঙ্গে সঙ্গে বিচারপতির বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, আপনি আমাকে শুনানি করতে দেননি। আপনি ৩০ সেকেন্ড সময় নিয়ে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে আদেশ দিলেন। এটা আপনি করতে পারেন না।
এ সময় বিএনপির আরেক আইনজীবী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘আমাদের বক্তব্য আপনার শুনতে হবে। আমাদের বক্তব্য না নিয়ে কোনো অর্ডার পাশ করতে পারেন না। আপনি কি তারেক রহমানের বিরুদ্ধে নীলনকশার রায় দেওয়ার জন্য বিচারকের আসনে বসেছেন?’
শুনানির একপর্যায়ে রিট আবেদনকারীর পক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিটিআরসির আইনজীবী কথা বলেন, ‘এটি কী? কী হচ্ছে?’
এরপর আবেদন মঞ্জুর করা নিয়ে আবার আপত্তি জানাতে শুরু করেন বিএনপিপন্থি কয়েকজন আইনজীবী। তখন আদালত বলেন, ‘আপনাদের সবার বলা শেষ হলে কিছু বলব।’ এ সময় বিএনপিপন্থি একজন আইনজীবী বলেন, ‘ইটস লাইক আ গেম শো।’ আদালত বলেন, ‘আমরা একটু বলি।’ তখন বিএনপিপন্থি একাধিক আইনজীবী বলেন, ‘না, মাই লর্ড।’
একপর্যায়ে বেঞ্চের নেতৃত্বদানকারী বিচারপতির উদ্দেশে বিএনপিপন্থি এক আইনজীবী বলেন, ‘আমরা না বললে মানুষ ভুল বুঝবে।’ তখন আদালত বলেন, ‘ভুল বুঝবে না। প্রধান বিচারপতির কাছে দেওয়া আবেদন সম্পর্কে আপনি অবহিত নন? দরখাস্তটি আপনি দেখবেন না, অথচ আবেদন সম্পর্কে আপনি অবগত।’
এর একপর্যায়ে হইচই শুরু হয়। আদালত বলেন, ‘আপনাদের বলা শেষ হলে আমরা বলব।’ বেঞ্চের নেতৃত্বদানকারী বিচারপতিকে উদ্দেশ করে বিএনপিপন্থি এক আইনজীবী বলেন, ‘আপনাকে বলতে হবে যে আপনি দরখাস্ত সম্পর্কে জানেন কি না? আপনি বলে দেন আমরা যা-ই বলি না কেন, আপনি রায় দেবেন। তাহলে আমরা এখানে দাঁড়াব না। মিডিয়াতে যাব।’ একপর্যায়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, তারা মিডিয়া ট্রায়াল চাচ্ছেন।
আদালত বলেন, ‘আদেশ দেওয়ার আগে যদি আপনারা একটু বলতেন।’ এ সময় উচ্চৈস্বরে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা বলেন, বলা হয়েছে। বলা হয়েছে। কোর্টের সামনে পুলিশ মোতায়েন করা রয়েছে।
এ সময় একাধিক আইন কর্মকর্তা বলেন, এটি কোর্ট, এখানে শাউটিং করা যাবে না। তখন বিএনপিপন্থি একজন আইনজীবী বলেন, ‘হু ইজ হি?’ এর পরপরই আবার শুরু হয় হইচই ও হট্টগোল।
এজলাস ত্যাগ ও বিএনপিপন্থিদের অবস্থান : হইচইয়ের মধ্যে একপর্যায়ে আদালত বলেন, ‘আদেশ দেওয়া হয়েছে, সংক্ষুব্ধ হলে আপনারা আপিল বিভাগে যেতে পারেন।’ একপর্যায়ে ১০টা ৫৫ মিনিটের দিকে এজলাস ত্যাগ করেন দুই বিচারপতি। এ সময় বিচারপতির দিকে একজন আইনজীবী কার্যতালিকা ছুড়ে মারেন।
প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালের ৬ জানুয়ারি সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী নাসরিন সিদ্দিকী লিনা হাইকোর্টে একটি রিট করেন। রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে পরদিন হাইকোর্ট রুলসহ আদেশ দেন। আইনের দৃষ্টিতে পলাতক অবস্থায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কোনো ধরনের বক্তব্য বা বিবৃতি সব ধরনের গণমাধ্যমে প্রচার ও প্রকাশ নিষিদ্ধ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। সম্প্রতি রুল শুনানির উদ্যোগ নেয় রিট আবেদনকারীপক্ষ। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি মাসের শুরুতে বিষয়টি আদালতের কার্যতালিকায় ওঠে।
হট্টগোলের ঘটনা অস্বীকার : এদিকে হাইকোর্টে হট্টগোলের ঘটনা ‘অস্বীকার’ করেছেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা। তাদের দাবি, আদালতে শান্তিপূর্ণভাবেই অপেক্ষা করছিলেন তারা। এরপর হঠাৎ করেই এজলাস থেকে নেমে চলে গেছেন বিচারপতিরা। এরপর দুপুর ১টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন তারা। এরপর জানতে পারেন বিচারক আর আদালতে বসবেন না। সোমবার দুপুরে আদালত প্রাঙ্গণে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন বিএনপির আইন সম্পাদক ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের মহাসচিব ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
আদালতে বিচারপতির ওপর কজলিস্ট বা ফাইল ছুড়ে মারার অভিযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন, আওয়ামীপন্থি আইনজীবী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম ফাইল ছুড়ে মারার যে অভিযোগ করেছেন তা সম্পূর্ণ বানোয়াট। তিনি না জেনেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই অভিযোগ করেছেন, কারণ তখন তিনি আদালতে ছিলেন না। অন্তিম মুহূর্তে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম রিট পিটিশনটি নিয়ে গেছেন। এতে আপনারা সহজেই বুঝতে পারেন কেন তিনি এ রিট পিটিশন নিয়ে গেছেন। তারা জানেন তারেক রহমানের বক্তব্য দেশের কোটি কোটি মানুষকে অনুপ্রাণিত করছে। বর্তমানে গণতন্ত্রপন্থি মুক্তিকামী মানুষের আন্দোলনের স্পৃহাকে তারেক রহমানের বক্তব্য শানিত করছে। এজন্য তিনি যেন তার বক্তব্য প্রচার করতে না পারেন, সেই ব্যবস্থাই করছেন আদালত।
তারেক রহমানের বক্তব্য সরিয়ে ফেলতে কাজ শুরু করবে বিটিআরসি : এদিকে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারেক রহমানের বক্তব্য সরিয়ে ফেলতে কাজ শুরু করবে বিটিআরসি। হাইকোর্ট বেঞ্চে আদেশের পর বিটিআরসি আইনজীবী ব্যারিস্টার রেজা ই রাকিব গণমাধ্যমকে এ কথা জানান।
