তিন দলের কাছে লু’র চিঠি
রাজনীতিতে সংলাপের আবহ
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার আগমুহূর্তে দেশের রাজনীতিতে হঠাৎ করেই সংলাপের আবহ বিরাজ করছে। সরকার সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন করতে অনড়। বিএনপি-জামায়াতসহ কিছু দল সরকার পতনের একদফা দাবিতে অবরোধের মতো কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। এদিকে নির্বাচন কমিশন ভোটের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করে ফেলেছে।
জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার আজ তফশিল ঘোষণা করতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু একটি চিঠি দিয়েছেন দেশের প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দলকে। এতে বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনে দলগুলোকে শর্তহীন সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছেন।
এরপর থেকেই রাজনীতিতে ঘুরেফিরে সংলাপের বিষয়টি চলে আসছে। কেউ বলছেন এবার সংলাপ হবে, কেউ বলছেন হবে না, সে পরিস্থিতি এবং সময় কোনোটিই নেই। আবার কেউ বলছেন সংলাপে না বসলে যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নয়ন সহযোগীরা ফের চাপ দিতে পারে। তাই তারা চিঠিতে মার্কিন ভিসানীতির বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
ডোনাল্ড লু’র চিঠির পর দল তিনটির কেউ সংলাপে বসবেন না-সরাসরি এমন কথা বলেননি। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি স্পষ্টও করেনি যে, তারা সংলাপে বসবেন। মঙ্গলবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন মন্তব্য করেন যে, সংলাপে সরকারের আপত্তি নেই। তবে কার সঙ্গে সংলাপ হবে সে বিষয়ে প্রশ্ন আছে বলে তিনি জানান।
একই বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান বলেছেন, বিএনপি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই চিঠির বিষয়ে জানাবে। অন্যদিকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের বিশেষ দূত ও দলটির আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা মাশরুর মাওলা বলেছেন, সংলাপ হলে জাতীয় পার্টি যোগ দেবে। তবে সংলাপের উদ্যোগটি সরকারকেই নিতে হবে।
তফশিল ঘোষণার আগমুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সংলাপের বিষয়ে চিঠি এলেও এ নিয়ে কাজ চলছে বেশ কয়েকদিন ধরেই। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনীতিকরা পর্দার আড়ালে তিনটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এছাড়া প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন তারা।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার হাবিবুল আউয়ালের সঙ্গে বৈঠকের পর মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস সাংবাদিকদের বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র শর্তহীন সংলাপ দেখতে চায়। তারপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের সঙ্গে বৈঠক করেন ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক। সংলাপ প্রশ্নে তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, সংলাপ হতে হবে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে।
বিএনপি নেতা আব্দুল মঈন খান ও জাতীয় পার্টির নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন কুক। সেখানেও আলোচনায় এসেছে সংলাপ। মঙ্গলবার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাব দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শর্তহীন সংলাপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানের বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চাওয়া হয় তার কাছে। জবাবে তিনি বলেন, আমাদের সংলাপে আপত্তি নেই। আমরা গণতন্ত্র ধ্বংস করতে চাই না।
গণতন্ত্র সমুন্নত করতে যা যা করা দরকার আমরা তাই করব। সেখানে যদি সংলাপের প্রয়োজন হয় আমরা সেটা করব। কিন্তু কার সঙ্গে করব, সেটা বিবেচনার বিষয় আছে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এ সময় সংলাপ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া বক্তব্য তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ট্রাম্প সাহেব আর বাইডেন সাহেব যদি সংলাপ করেন, আমিও রাজি।
বন্ধু দেশগুলো কোনো ভালো পরামর্শ দিলে সরকার সেটাকে আমলে নেয় জানিয়ে মোমেন বলেন, সবাই নিজ নিজ মতামত দিচ্ছেন। আমরা এটা মাইন্ড করছি না। আমাদের বন্ধু দেশ যদি আমাদের কোনো পরামর্শ দেয় আমরা ওটাকে খুব ভালোভাবে নিই, সেটাকে মূল্যায়ন করি। দেশের মঙ্গলের জন্য আমরা সেটাকে গ্রহণ করি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ রকম পরামর্শ বহু আসে। আসুক, আমরা দেখি পরামর্শ যেগুলো আসে সেগুলো প্রয়োগ করা যায় কিনা, বাস্তবতা দেখতে হবে। ডিএসএ’র (ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন) ক্ষেত্রে বিদেশিরা বলেছেন, আমরা ওটা গ্রহণ করেছি। আমরা খুব বাস্তবসম্মত দেশ, খুব বাস্তববাদী সরকার। মানুষের সত্যিকারের কোনো অভিযোগ থাকলে সেটা আমরা গ্রহণের চেষ্টা করি।
দেশের তিন রাজনৈতিক দলকে চিঠি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার উদ্যোগ নিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মোমেন বলেন, ওদের জিজ্ঞেস করেন। তারা কি কারণে করেছে তাদের জিজ্ঞেস করেন। তারা ভালো উত্তর দিতে পারবেন। আওয়ামী লীগ দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সৃষ্টি করেছে। আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে চায়। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া যেন কোথাও বিঘ্নিত না হয়। আগেও বিএনপি সরকার এবং তাদের উত্তরসূরিরা মানুষের ভোট দেওয়ার অধিকার নষ্ট করেছে।
সম্প্রতি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ভলকার টুর্কের উদ্দেশে প্রশ্ন রেখে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, উনাকে বলেন উনার দেশে বন্দিকে, অপরাধীকে, দণ্ডিত অপরাধীকে অন্য দেশে পাঠায় কিনা?
দেশের প্রধান তিন রাজনৈতিক দলের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শর্তহীন সংলাপে বসার আহ্বানকে গুরুত্বের সঙ্গেই দেখছে বিএনপি।
এ বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই চিঠির বিষয়ে জানাবে। সেটি তাদের চিঠির মাধ্যমেই হোক, আর যেভাবেই হোক। তিনি বলেন, ওরা (মার্কিনিরা) চেষ্টা করছে বাংলাদেশে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে। মনে হচ্ছে এটা তাদের এই মুহূর্তের উদ্দেশ্য। দলের এই অন্যতম নীতিনির্ধারক বলেন, যা-ই হোক, বিএনপি সব সময়ই সংলাপ পছন্দ করে। কিন্তু সেই সংলাপ হতে হবে যৌক্তিক তথা রিলেভেন্ট বিষয় নিয়ে।
আর সেজন্য একটা উপযোগী পরিবেশও দরকার। আমাদের দলের পক্ষ থেকে যারা কথা বলবেন কিংবা সংলাপে অংশ নেবেন তারা প্রায় সবাই কারান্তরীণ। বেশিরভাগ সিনিয়র নেতাকর্মীকেই বর্তমানে মিথ্যা ও গায়েবি মামলায় কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছে। কারাগারের ভেতরেও তাদের অত্যন্ত মানবেতরভাবে রাখা হয়েছে। সারা দেশে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর ‘ক্র্যাকডাউন’ চলছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়ে যাওয়ার পর এখনো পর্যন্ত অনেক নেতাকর্মীর কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। এমন একটা শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় সরকার বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের কারাগারে বন্দি করে রেখে একটি একতরফা নির্বাচনের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।
এজন্য তারা নির্বাচনের তফশিল ঘোষণারও পাঁয়তারা করছে। এই অবস্থায় বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলাপ-আলোচনা শেষে দলের হাইকমান্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে এটুকু বলা যায়, বিএনপি এ ব্যাপারে জানাবে।
তবে বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, সংলাপের বিষয়ে তারাও ইতিবাচক। তার আগে কারাগারে থাকা সিনিয়র নেতাদের মুক্তি চায় দলটি। একই সঙ্গে যেসব দাবিতে চলমান আন্দোলন চলছে তা-ও বাস্তবায়ন চায়। দলটি এসব দাবিকে শর্ত হিসাবে মনে করে না।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শর্তহীন সংলাপে বসার আহ্বানের বিষয়ে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের বিশেষ দূত ও দলটির আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা মাশরুর মাওলা যুগান্তরকে বলেন, সংলাপ আমরা অবশ্যই চাই। আমরা এতে যোগও দেব। কিন্তু সংলাপের উদ্যোগটি নিতে হবে সরকারকে।
এদিকে শর্তহীন সংলাপ করতে হলে বিএনপিকে সরকার পতনের একদফা প্রত্যাহার করতে হবে বলে উল্লেখ করেছেন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা রাশেদ খান মেনন। তিনি আরও বলেছেন, বিএনপিকে একদফা প্রত্যাহারের পাশাপাশি সহিংসতা পরিত্যাগ করতে হবে।
