শীর্ষ সন্ত্র্রাসী বদরুল এখন বিসমিল্লাহ আলী
২৪ বছর পর প্রকাশ্যে টপ টেরর, এলাকায় আতঙ্ক
‘সরকারকে প্রতিশ্রুতি দিয়েই দেশে এসেছি’ * ২৫ বছরেও শেষ হয়নি আলম হত্যার বিচার
সিরাজুল ইসলাম
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম টপ টেরর দেওয়ান মো. বদরুল আলম। সন্ত্রাসী গ্রুপ সেভেন স্টারের পৃষ্ঠপোষক তিনি। সরকার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রারী সুব্রত বাইন ছিলেন তার সহযোগী। সোহেল, হারুন, মতিন এবং আলমসহ বেশ কয়েকটি হত্যা মামলার আসামি বদরুলের বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় রয়েছে অসংখ্য সন্ত্রাসী কার্যকলাপের অভিযোগ। কুখ্যাত সন্ত্রাসী এরশাদ শিকদারের ক্যাডার ছিলেন বদরুল।
টার্গেট কিলিংয়ের আগে বদরুল বৈধ পাসপোর্ট নিয়ে চলে যেতেন ভারতে। পরে চোরাই পথে দেশে ঢুকে নেতৃত্বে দিতেন হত্যাকাণ্ডে। মিশন শেষে আবার চোরা পথেই চলে যেতেন ভারত। কয়েকদিন পর আবার বৈধ পাসপোর্টে দেশে ফিরতেন। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা হলে তিনি আদালতে তথ্য-উপাত্ত দিতেন যে, ‘ঘটনার সময় তিনি দেশেই ছিলেন না।’ আদালতও কাগজপত্র দেখে তাকে জামিন দিয়ে দিতেন।
একের পর এক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে এভাবেই তিনি পার পেয়ে যেতেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০ বছর তিনি ছিলেন দেশের বাইরে। সরকারের সঙ্গে ‘সমঝোতা’ করেই তিনি সম্পতি দেশে ফিরেছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৯৯ সালে বদরুল ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করেন খিলগাঁও-সবুজবাগের ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন আলমকে। আলমের বাবা তখন ছিলেন ঢাকা সিটি করপোরেশন ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। আলম ছিলেন খিলগাঁও (তালতলা) মার্কেট পরিচালনা কমিটির সভাপতি। আলমকে হত্যার আগে বদরুল চিকিৎসার নাম করে মা-বাবাকে নিয়ে ভারতে যান। মা-বাবাকে সেখানে রেখে তিনি অবৈধভাবে দেশে ঢোকেন। ১৯৯৯ সালের ১৯ জুন আলমকে বনানীতে ডেকে নিয়ে সহযোগীদের নিয়ে নৃশংসভাবে খুন করেন। এরপর অবৈধভাবে চলে যান ভারতে। সেখান থেকে কয়েক দিন কাটিয়ে পরে তিনি মা-বাবাকে নিয়ে দেশে ফিরে পলাতক থাকেন। কারণ আলম হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি ছিলেন তিনি। ওই মামলায় গ্রেফতার বাতেনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তার নাম উঠে আসে। বাতেনের চেহলামের দিন আদালত থেকে তিনি জামিন পান। এ জামিন পাওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি পুরোনো কৌশল (ভারতে অবস্থানের প্রমাণপত্র) অবলম্বন করেন।
এদিকে আলমের চেহলামে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এবং আওয়ামী লীগ নেতা সাবের হোসেন চৌধুরীসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। সেখানে বদরুলের জামিনের খবর পৌঁছার পর নাসিম-সাবের চৌধুরীসহ আওয়ামী লীগ নেতারা বিস্ময় প্রকাশ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেন-বদরুলকে যেখানেই পাওয়া যাবে সেখান থেকেই যেন গ্রেফতার করা হয়। এ কারণে জামিনে থাকার পরও তিনি পলাতক ছিলেন। চলে যান ভারতে। ওই সময় তার নামে জারি করা হয় গ্রেফতারি পারোয়ানা (ওয়ারেন্ট)। তার বাসায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ সব মালামাল ক্রোক করে। এর কয়েক মাস পর দেশে ফিরলে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর এক বছর কারাদণ্ড ভোগের পর জামিন পান। পরে তিনি গোপনে চলে যান ইকুয়েডর। দীর্ঘদিন তিনি সেখানে ছিলেন বিসমিল্লাহ আলী নামে। তার ফেসবুক আইডিও এখন ওই নামেই আছে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি দেশে ফেরেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে ফেরার পর কিছুদিন আত্মগোপনে থাকলেও বদরুল ইদানীং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। তবে কোনো অনুষ্ঠানেই তিনি দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন না। কয়েক মিনিট অবস্থান করেই তিনি অনুষ্ঠান ত্যাগ করেন। বদরুলকে এখন আশ্রয় দিচ্ছেন সিটি করপোরেশনের দুজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর। তারা তাকে সরকারদলীয় নেতাদের কাছে নিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় রাজনীতিবিদদের সঙ্গে বদরুল ছুবি তুলে তা আপলোড করছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম-ফেসবুকেও। এতে আতঙ্কিত এলাকাবাসী। আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বদরুল বাহিনীর হাতে নিহতের স্বজন ও নির্যাতিতদের মধ্যেও।
অন্যদিকে যে আলম হত্যার ঘটনায় বদরুল বিদেশে পলাতক ছিলেন সেটির বিচার এখনো শেষ হয়নি। এ বিষয়ে আলমের স্ত্রী বীনা আলম যুগান্তরকে বলেন, আমার স্বামীকে হত্যা করেছে বদরুল ও তার সহযোগীরা। বদরুল, মোস্তাক, বাতেন এবং মতিসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। মামলাটি এখনো বিচারাধীন। ২৫ বছরেও মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ায় আমি হতাশ। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলেও বিচারের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছি। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর বদরুল এলাকায় ফেরায় আমি পুরো পরিবার নিয়ে আতঙ্কে আছি। বদরুল নিজেই এখন বলে বেড়াচ্ছে যে, আলমকে সে হত্যা করেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা যুগান্তরকে বলেন, সন্ত্রাসী বদরুল এলাকায় ফেরায় আমরা খুবই ভয়ে আছি। যদি সে জানতে পারে যে, আমরা মিডিয়া তার বিরুদ্ধে কথা বলেছি, তাহলে আমাদের সব শেষ হয়ে যাবে। আগে বদরুল বাহিনীর প্রধান হিসাবে এলাকার সন্ত্রাসী কাজে নেতৃত্ব দিত। এখন নিজের নাম পালটে বিসমিল্লাহ আলী হিসাবে এলাকায় পরিচয় দিচ্ছে।
খিলগাঁও তালতলা এলাকার বাসিন্দা খালেদ মাহমুদ জনি জানান, আগে এলাকাবাসী বদরুল বাহিনীর আতঙ্কে ছিল। গত দুই যুগের বেশি সময় বদরুল পলাতক থাকায় এলাকার মানুষ কিছুটা স্বস্তিতে ছিল। বদরুল এলাকায় ফেরায় ফের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বদরুলের নেতৃত্ব গঠিত বিসমিল্লাহ বাহিনী প্রায়ই এলাকায় মহড়া দিচ্ছে। মিন্টুর নামের স্থানীয় একজন বলেন, আলম হত্যার পর দীর্ঘদিন পলাতক থাকায় আমরা ভেবেছিলাম, বদরুল আর দেশে ফিরতে পারবে না। এখন সে কীভাবে দেশে ফিরল, তা বুঝতে পারছি না। এলাকায় ফিরে বদলুল আবারও আগের অবস্থায় ফেরার চেষ্টা করছে। এতে আমরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় আছি।
আলম হত্যা মামলার আইনজীবী হাবিবুর রহমান বলেন, এই মামলায় যাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছিল তাদের মধ্যে মিয়া মজনু ইতোমধ্যে মারা গেছেন। বদরুল, মোস্তাক এবং বাতেনসহ অন্যরা জীবিত আছেন। তিনি বলেন, বদরুলের নামে অনেক আগে ওয়ারেন্ট হয়েছে। পলাতক থাকায় দীর্ঘদিনেও ওই ওয়ারেন্ট তামিল হয়নি। এখন প্রকাশ্যে থাকলেও হয়তো থানায় ওই ওয়ারেন্টের কপি খুঁজেও পাওয়া যাবে না। তারপরও পুলিশ চাইলে ৫৪ ধারায় তাকে গ্রেফতার করে আলম হত্যাসহ সে যেসব মামলার আসামি ওই সসব মামলায় দেখাতে পারেন। তিনি বলেন, আলম হত্যা মামলাটি ঢাকা মহানগর অতিরিক্ত দায়রা জজ ১৩-তে বিচারাধীন। এর পরবর্তী তারিখ আগামী ৩০ জুন।
দেওয়ান মো. বদরুল আলম ওরফে বিসমিল্লাহ আলী যুগান্তরকে বলেন, আমি ২০ বছর দেশের বাইরে ছিলাম। আমি দেশে এসেছি প্রায় দুই বছর আগে। আমি এখন শারীরিকভাবে অসুস্থ। এখন ওইসব কাজে আর সংশ্লিষ্ট না। সরকারের সঙ্গে মিলেমিশে টুকটাক কাজ করি। স্থানীয় এমপির সঙ্গেও আমার ভালো সম্পর্ক। এছাড়া একজন মন্ত্রীর সঙ্গেও আমি নিয়মিত মিটিং করি। আমার প্রতি সরকারের সাপোর্ট আছে। তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে যেসব মামলা ছিল সেগুলো শেষ হয়ে গেছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মানুষের পরিবর্তন হয়। আমার এখন ৭০ বছর বয়স। ওপেন হার্ট সার্জারী হয়েছে। শারীরিকভাবে আনফিট। তাই চাইলেও আগের অবস্থায় ফিরতে পারবো না। আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্য ডাক্তারের পরামর্শে আমি দেশে এসেছি। সরকারের পক্ষ থেকে আমাকে বলা হয়েছে, আমি যদি তাদের সহযোগিতা করি, তাহলে আগের মতো মামলায় আমাকে হয়রানি করা হবে না। এ প্রতিশ্রুতির পরই দেশে এসেছি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, কেবল বদরুলই নয়, অনেক সন্ত্রাসীই আমাদের নজরদারিতে আছে। গত ছয় মাসে আমরা অনেকেকেই গ্রেফতার করেছি। যারা নাম পরিবর্তন করে ছদ্মবেশে আছে তাদের শিগগিরই আইনের আওতায় আনা হবে।
