Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

হিসাব মেলায় মিশনে রাজি আমানুল্লাহ

মৃত্যুর আগে সঞ্জীবায় স্বর্ণের দাবি

স্বর্ণ চাওয়ার পরই খেপে যায় ঘাতকরা * ডিবির তদন্ত দল কলকাতায় * দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকেই টুকরো টুকরো করা হয় লাশ

Advertisement

Icon

সিরাজুল ইসলাম ও ইমন রহমান

প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মৃত্যুর আগে সঞ্জীবায় স্বর্ণের দাবি

Advertisement

ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ-সদস্য মো. আনোয়ারুল আজিম আনার খুন হওয়ার আগে সঞ্জীবায় ঘাতকদের কাছে স্বর্ণের দাবি করেন। তিনি বলেন, যে স্বর্ণ দেওয়ার কথা বলে আমাকে এখানে ডেকে আনা হয়েছে সেই স্বর্ণ কোথায়। আমাকে দ্রুত স্বর্ণ দিয়ে দাও, আমি চলে যাব। আমার অন্য কাজ আছে, দ্রুত সেখানে যেতে হবে। তার একথা শুনে ঘাতকরা খেপে গিয়ে তার সঙ্গে অশোভন আচরণ করে। একপর্যায়ে গালাগাল দিলে এমপি আনারও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। তখন ঘাতক দলের ফয়সাল তার গলায় ছুরি ধরে। 

এ অবস্থাতেও এমপি নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করেন। ঘাতক দলের সঙ্গে তার হাতাহাতিও হয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ঘাতকরা তার মুখে চেতনানাশক দিলে তিনি জ্ঞান হারান। এরপর আর জ্ঞান ফেরেনি। এদিকে ঘটনা তদন্তে ডিবির তিন সদস্যের একটি দল রোববার সকালে ভারতে পৌঁছেছে। 

সংসদ-সদস্য মো. আনোয়ারুল আজিম আনারকে নৃশংসভাবে হত্যা করে লাশ গুমের পেছনে শুধু পূর্ববিরোধ, স্বর্ণ ব্যবসা বা চোরাচালানই যথেষ্ট কারণ নয়। এর পেছনে আরও অনেক বড় কারণ আছে। 

যেগুলো নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) রিমান্ডে থাকা আসামিরা। 
তবে রিমান্ডপ্রাপ্ত আসামিদের কাছ পাওয়া বক্তব্য আরও যাচাই করা হচ্ছে। কারণ তারা একেক সময় একেক কথা বলছে। তবে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছেন, ‘দুইয়ে দুইয়ে চার’ মেলাতেই হত্যাকাণ্ডে রাজি হয় চরমপন্থি নেতা শিমুল ভূঁইয়া ওরফে আমানুল্লাহ। 

১৩ মে এমপি আনারকে স্বর্ণ ব্যবসার নাম করে বন্ধু গোপালের বাড়ি থেকে সঞ্জীবা গার্ডেনের ফ্ল্যাটে ডেকে আনা হয়। এখানে এসে তিনি স্বর্ণ দাবি করেন কিন্তু তাকে কিছুই দেওয়া হয়নি। ঘাতকরা তাকে যে মিথ্যা কথা বলে ডেকে এনেছে তা বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে আসার পর বুঝতে পারেন তিনি। তবে তখন তার কিছুই করার ছিল না। 

এদিকে চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের পলাতক আসামি সিয়াম, ফয়সাল এবং মোস্তাফিজের বিষয়ে ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি) মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের মূল সমন্বয়কারী পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল-লাল পতাকা) শীর্ষ নেতা আমানুল্লাহ ডিবিকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিতে শুরু করেছে। সে জানিয়েছে, ২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তাদের অসংখ্য নেতাকর্মীকে হত্যা করেছে এমপি আনার। 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন অনেক নেতা। তাদের মধ্যে ছিলেন চরমপন্থিদের আধ্যাত্মিক নেতা ডা. মিজানুর রহমান টুটুলও। এই টুটুল হলেন আমানুল্লাহর বোনজামাই। শিমুল ভূঁইয়াসহ অন্যান্য চরমপন্থিদের ধারণা এমপি আনারের ইন্ধনেই তাদের নেতাকর্মীদের হত্যা করা হয়েছে। এ কারণে এমপি আনারের ওপর আমানুল্লাহর দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ছিল। 

এছাড়া নিজের দল চালাতে অনেক টাকারও প্রয়োজন ছিল শিমুল ভূঁইয়ার। এ পরিস্থিতিতে হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড আক্তারুজ্জামান শাহীনের কাছ থেকে এমপি আনারকে খুনের বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকার প্রস্তাব আসে। এতে একদিকে বোনজামাই হত্যার প্রতিশোধ, অন্যদিকে মোটা অঙ্কের টাকার প্রলোভন-এ দুটি বিষয় সামনে আসায় হত্যা মিশন সফল করতে রাজি হয় আমানুল্লাহ। 

আর বোনজামাই হত্যার প্রতিশোধ নিতেই লাশ টুকরো টুকরো করার পরিকল্পনা তার মাথায় আসে বলে ডিবিকে জানিয়েছে আমানুল্লাহ। আরও জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়াদের বেশিরভাগই পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকর্মী। এমপি আনারের ওপর তাদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ছিল। এ কারণেই লাশ টুকরো টুকরো করে কেটে হাড় থেকে মাংস আলাদা করে গুম করা হয়েছে। 

আমানুল্লাহ ডিবিকে জানিয়েছে, এমপি আনার ছিলেন অর্থলোভী। স্বর্ণ চোরাচালের বিষয়ে অলোচনা করতে এবং তাকে স্বর্ণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সঞ্জীবা ভবনের সেই ফ্ল্যাটে নেওয়া হয়। শাহীন এমপি আনারকে ফোনে বলেছিল, ‘আমার লোক রিসিভ করে ফ্ল্যাটে নিয়ে যাবে, তুমি যাও। সেখানে সব আলাপ হবে।’ 

সে অনুযায়ী কলকাতার নিউটাউন এলাকার সঞ্জীবা ভবনের ওই ফ্লাটে যান এমপি আনার। সেখানে যাওয়ার পর প্রথমে নাস্তা দিয়ে আপ্যায়ন করা হয় এমপিকে। শুরুতে তার সঙ্গে অনেক ভালো ব্যবহার করে খুনিরা। তারা স্বর্ণ ব্যবসার বিষয়ে আলাপও করে। 

এমপি তাদের কাছে স্বর্ণ চান। এ সময় এমপিকে তুই বলে সম্বোধন করে ফয়সাল। এতে এমপি আনার অপমান বোধ করে প্রতিক্রিয়া দেখান এবং রুম থেকে বের হয়ে যেতে চান। তখনই ফয়সাল তার গলায় চাকু ধরে মুখে চেতনানাশক প্রয়োগ করে। এ সময় প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, পরে মৃত্যু হয় এমপি আনারের। এরপরই লাশের ওপর চলে গা শিউরে উঠার মতো নির্মমতা।

এর আগে ১২ মে ভারতে যান এমপি আনার। কলকাতার ব্যারাকপুরসংলগ্ন মণ্ডলপাড়ায় বন্ধু গোপাল বিশ্বাসের বাড়িতে ওঠেন তিনি। ১৩ মে চিকিৎসার কথা বলে বাসা থেকে বের হন আনার। পরে কলকাতার দমদম বিমানবন্দর লাগোয়া নিউটাউন এলাকার সঞ্জীবা গার্ডেনের একটি ফ্ল্যাটে খুন হন এমপি আনার। 

বাসাটি খুনিরা ভাড়া নেয় ১১ মাসের জন্য। এমপি খুনের ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে ২২ মে। ওইদিনই রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় আনারের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন (২৪) বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা করেন। এছাড়া ভারতে একটি হত্যা মামলা হয়েছে।

এমপি আনার হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত আটজনের সম্পৃক্ততা পেয়েছে বাংলাদেশ ও ভারতের পুলিশ। এদের মধ্যে তিনজনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তারা হলেন চরমপন্থি নেতা শিমুল ভূঁইয়া ওরফে আমানুল্লাহ, তার চাচাতো ভাই তানভীর ভূঁইয়া ও শাহীনের গার্লফ্রেন্ড সেলেস্তি রহমান। তারা ডিবিতে ৮ দিনের রিমান্ডে আছে। 

শুক্রবার আদালত তাদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রোববার দ্বিতীয় দিনের রিমান্ডে হত্যার আগে ও পরের নানা তথ্য দিয়েছে তারা। এছাড়া কলকাতা পুলিশের কাছে গ্রেফতার আরেক আসামি জিহাদ হাওলাদার ওরফে কসাই জিহাদকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ভারতের পুলিশ। 

অপর চারজন পলাতক রয়েছে। তাদের মধ্যে সিয়াম নেপালে, শাহীন যুক্তরাষ্ট্রে এবং মোস্তাফিজ ও ফয়সাল বাংলাদেশেই রয়েছে বলে ডিবি মনে করছে। তারপরও তাদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাতে ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে এনসিবিতে আবেদন করা হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্টরাই মনে করছেন, তিনবারের নির্বাচিত সংসদ-সদস্যকে এমন নির্মমভাবে হত্যার পরিকল্পনাকারী শুধু শাহীন একা নয়। টাকার জন্যই শাহীন এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তা বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। কারণ, শাহীন প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা ওড়াতেন। তার বিভিন্ন স্থানের বাসার ভাড়া ও নারীর পেছনে প্রতি মাসে অর্ধকোটি টাকা ব্যয় হয়। 

গুলশানের বাসাকে ঘিরেই প্রতি মাসে তার ৫০ লাখ টাকা খরচ হয়। সেই শাহীন কেন শুধু টাকার জন্য এমপিকে খুন করাবে? আর্থিক লেনদেন ছাড়াও এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো রাজনৈতিক কারণ রয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। 

ডিবি সূত্র জানায়, সঞ্জীবা ভবনে যাওয়ার আগে ঘাতকরা এমপি আনারকে অনেক টাকা (রুপি) নিয়ে যেতে বলেছিল। এ কারণে আনার তার কলকাতার বন্ধু গোপালের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা চান। তখন গোপাল জানায়, এখন কলকাতায় নির্বাচন চলছে। এই সময় বড় অঙ্কের টাকা বহনে ঝুঁকি আছে। তারপরও গোপাল তার ম্যানেজারকে দিয়ে ৪ লাখ ২০ হাজার রুপি পাঠান এমপি আনারের কাছে। 

এমপি নিজেই বিধাননগর স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে ওই টাকা রিসিভি করেন। এরপর একটি সাদা গাড়িতে উঠে তিনি (এমপি) চলে যান। ওই গাড়িটি কিছুদূর যাওয়ার পর একটি লাল গাড়ির সামনে গিয়ে থেমে যায়। এমপি আনারকে রিসিভ করে ওই লাল গাড়িতে তোলে আমানুল্লাহ। পরে গাড়িটি প্রবেশ করে সঞ্জীবা ভবনে।

ডিবির তদন্ত টিম ভারতে : ঘটনা তদন্তে ডিবির তিন সদস্যের একটি দল রোববার সকালে ভারতে পৌঁছেছে। ডিবির এ টিমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। টিমের অন্য দুই সদস্য হলেন ডিবি ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মো. আ. আহাদ ও অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. শাহিদুর রহমান। 

হারুন অর রশীদ রাতে বলেন, এমপি আনোয়ারুল আজিম আনার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে সরকারের নির্দেশে আজ (রোববার) সকালে ভারতে এসেছি। তদন্তের অংশ হিসাবে দুপুরে নিউটাউন থানা পরিদর্শন করেছি। 

থানায় এডিশনাল ডিআইজি সোমা দাস ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আমাদের তদন্তে সহযোগিতা করেছেন। সন্ধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও অপরাধ তদন্ত বিভাগের প্রধান ড. আর রাজাশেকরনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তার সঙ্গে তদন্ত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। 

তিনি জানান, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ যথেষ্ট আন্তরিকতা ও গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের কাজ করছেন। এমপি আনার হত্যায় জড়িত সবাইকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে পারবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এর আগে ভারতীয় পুলিশের চার সদস্যের একটি টিম বাংলাদেশে এসে কয়েক দফায় আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। 

সংসদীয় আসন ‘শূন্য’ ঘোষণা নিয়ে জটিলতা : এমপি আনারের লাশের সন্ধান পায়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ নিয়ে সংসদে তার আসন শূন্য ঘোষণা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান জানিয়েছেন, এমপি আনার কলকাতায় খুন হয়েছেন। তবে তার লাশ পাওয়া না গেলে সংসদে তার আসন শূন্য ঘোষণা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। 

এদিকে জাতীয় সংসদের পক্ষ থেকে আনারের আসনটি শূন্য ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করার কথা। 
নির্বাচন কমিশনেরও ৯০ দিনের মধ্যে উপনির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আনার একাধারে সংসদ-সদস্য ও পরিবহণ ব্যবসায়ী। 

তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও ব্যাংক হিসাব পরিচালনার জন্যও মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
 

Advertisement

আনার খুন

Advertisement

আরও পড়ুন

নিমতলী থেকে টুপটুপ রিসোর্ট ট্র্যাজেডি এত মৃত্যুর দায় কার

এত মৃত্যুর দায় কার

জ্বালানি অনিশ্চয়তা ও ঋণের উচ্চ সুদসহ নানা কারণ বিনিয়োগের ইঞ্জিন থমকে আছে

বিনিয়োগের ইঞ্জিন থমকে আছে

পর্যটননগরী কক্সবাজারে হোটেল-রিসোর্ট ছয়শ ফায়ার ছাড়পত্র মাত্র ২৩

ফায়ার ছাড়পত্র মাত্র ২৩

‘সি বিচে আছি, বাচ্চারা খেলা করছে’

‘সি বিচে আছি, বাচ্চারা খেলা করছে’

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম