Logo
Logo
×
   

প্রথম পাতা

এমপি আনার হত্যা

শাহীনকে না পেলে মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

সেলেস্তির পর তানভীরের জবানবন্দি

Icon

সিরাজুল ইসলাম 

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

শাহীনকে না পেলে মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আনোয়ারুল আজিম আনার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অধরাই থাকতে পারে মাস্টারমাইন্ড আক্তারুজ্জামান শাহীন। তাকে আইনের আওতায় আনতে না পারলে চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ডুবে যাওয়ার শঙ্কা আছে। এদিকে সেলেস্তির পর হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে অপর আসামি তানভীর ভূঁইয়া আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। মঙ্গলবার আদালতে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র যুগান্তরকে জানিয়েছে, এমপি আনার ভারতে খুন হওয়ায় হত্যা মামলাটি সেখানে হয়েছে। আর ঢাকার ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আনারকে খুঁজে না পাওয়ার কারণে বাংলাদেশে অপহরণ মামলা হয়। এ কারণে দুই দেশেই তদন্ত হচ্ছে। তদন্তের শুরুতে দুই দেশ একে অপরকে দারুণভাবে সহযোগিতা করেছে। সংশ্লিষ্ট এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, আমরা তদন্ত করে যা পাব তা কলকাতা পুলিশকে দিয়ে দেব। প্রয়োজনে আমাদের কাছে গ্রেফতারকৃত আসামিকেও কলকাতায় হস্তান্তর করব। তদন্তের স্বার্থে তারা আমাদের কাছে কোনো ধরনের সহযোগিতা চাইলে আমরা তা করব। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শাহীনকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরিয়ে আনতে না পারলে এই হত্যাকাণ্ডের জট খুলবে না। বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দিবিনিময় চুক্তি নেই। এ কারণে সেখান থেকে শাহীনকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা খুবই কম। ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দিবিনিময় চুক্তি থাকার পরও তাকে ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না। ভারত সরকার সহসাই শাহীনকে চাইতে পারবে না। মামলার তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দাখিলের পর শাহীনের সাজা হলেই তাকে ফেরত আনার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে চিঠি লিখতে পারবে দেশটি। এটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ভারত উদ্যোগ নিলেই যে যুক্তরাষ্ট্র শাহীনকে তাদের কাছে দিয়ে দেবে, এটার কোনো নিশ্চয়তা নেই। 

সূত্র জানায়, হত্যাকাণ্ড কারা ঘটিয়েছে, ‘কীভাবে ঘটিয়েছে তা পরিষ্কার। কিন্তু কেন ঘটেছে সে বিষয়ে যা জানা গেছে তা পুরোপুরি বিশ্বসযোগ্য নয়। গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে ডিবির উচ্চপদস্থ সূত্র জানিয়েছে, পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (চরমপন্থি) সঙ্গে এমপির রাজনৈতিক বিরোধ এবং শাহীনের সঙ্গে ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে। তবে শাহীনের সঙ্গে এমপির কী ধরনের ব্যবসায়িক বিরোধ ছিল সে বিষয়ে গ্রেফতারকৃতরা সুস্পষ্ট করে কিছুই জানাতে পারেনি। ডিবি শুরু থেকেই মনে করছে, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিশ্চয়ই একটি বড় কারণ আছে। কিন্তু শাহীনকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে না পারার কারণে এখনো ওই কারণ জানা যাচ্ছে না। ডিবি আরও মনে করে, এই হত্যাকাণ্ডে শাহীনকে নিশ্চয়ই কেউ ব্যবহার করেছে। কী শর্তে তাকে ব্যবহার করা হয়েছে, তা শুধু শাহীনই জানে।

আনার হত্যার তদন্তে নিয়োজিত এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ‘আনার হত্যার আসামি সিয়াম নেপালে ধরা পড়ে আমাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী। নেপালে সিয়াম আটক হওয়ার পরই কাঠমান্ডু ইন্টারপোল বিষয়টি আমাদের জানায়। আসামিকে আমাদের কাছে হস্তান্তর করবে বলেও জানায়। আমরা এয়ারপোর্টে নামার পরপরই দেশটির পুলিশ প্রশ্ন করে, তোমাদের উচ্চপদস্থরা কিছু জানায়নি? 

আমরা বলেছি, আপনাদের সঙ্গে কথা বলার পর হাই অফিসিয়ালদের অনুমতি নিয়েই আমরা আসামি নিতে এসেছি। কিন্তু তারা অযথা কালক্ষেপণ করতে থাকেন। পরে সিয়ামকে আমাদের কাছে হস্তান্তর করার জন্য কূটনৈতিক চেষ্টা চালাই। নেপালের পুলিশ সরি বলে দেওয়ার পর অনেকটা খালি হাতেই আমরা আজ (মঙ্গলবার) দেশে ফিরে আসি।

গত ১২ মে ভারতে যান এমপি আনার। পরদিন ১৩ মে কলকাতার নিউটাউন এলাকার সঞ্জীবা গার্ডেনের একটি ফ্ল্যাটে খুন হন তিনি। তবে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে ২২ মে। ওইদিন রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় আনারের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন (২৪) বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা করেন। দুই দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত হিসাবে এ পর্যন্ত আটজনের নাম বেরিয়ে এসেছে। এছাড়া আরও তিনজনের নাম এসেছে, যারা হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত নয়। 

এদিকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত হিসাবে গ্রেফতারকৃত শিমুল ভূঁইয়া ওরফে আমানুল্লাহ, তানভীর ভূঁইয়া ও সেলেস্তি রহমানকে দুই দফায় ১৩ দিনের রিমান্ডে নেয় ডিবি। রিমান্ড শেষে তানভীর এবং সেলেস্তি এরই মধ্যে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। রিমান্ড শেষে আজ (বুধবার) আদালতে জবানবন্দি দেওয়ার কথা রয়েছে আমানুল্লাহর। 

আদালতে আসামি তানভীরের দায় স্বীকার : এমপি আনারকে খুনের উদ্দেশ্যে অপহরণের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন আসামি তানভীর ভূঁইয়া (৩০)। 
মঙ্গলবার আসামি তানভীর স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মত হওয়ায় তা রেকর্ড করার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি ওয়ারী বিভাগের সহকারী কমিশনার (এসি) মাহফুজুর রহমান। ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তোফাজ্জল হোসেনের আদালত তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। আদালতে শেরেবাংলা নগর থানার সাধারণ নিবন্ধন শাখার কর্মকর্তা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) জালাল উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। 

নেপাল থেকে ফিরে যা জানালেন ডিবির হারুন : মঙ্গলবার নেপাল থেকে দেশে ফিরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। তিনি বলেছেন, আনার হত্যার মূল ঘাতক শিমুল ভূঁইয়ার মাধ্যমে গত ২৫ মে খবর পায় সিয়াম কাঠমন্ডুতে আছে। ওইদিনই বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত আমরা পুলিশ হেডকোয়াটার্সে পাঠাই। সেখান থেকে কাঠমান্ডু পুলিশকে অবহিত করা হয়। 

আমাদের দেওয়া তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সিয়ামকে কাঠমান্ডু পুলিশ গ্রেফতার করেছে এ কথা আমাদের আন-অফিসিয়ালি বলেছে। আমরা সেখানে গিয়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছি। সিয়ামকে বাংলাদেশে আনার ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা আছে কিনা জানতে চাইলে ডিবির হারুন বলেন, আমরা তাদের (নেপালের পুলিশ) সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছি। কোনো দেশের নাগরিক অবৈধভাবে সেখানে থাকলে কান্ট্রি অব অরেজিনে তাকে পাঠিয়ে দিতে পারে। 

আমরা এ বিষয়টি নিয়েও কথা বলেছি। তবে আমাদের সঙ্গে নেপালের বন্দিবিনিময় চুক্তি নেই। সিয়াম ভারতের কাছেও মোস্ট ওয়ান্টেড। ভারতও সিয়ামকে চেয়েছে। এমপি আনার হত্যা মামলাও ভারতে হয়েছে। আমাদের এখানে হয়েছে অপহরণ মামলা। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েছে নেপাল। তারা বলেছে, একই অপরাধীকে যদি দুটি দেশ দাবি করে তাহলে অপরাধের ধরন বিবেচনা করে কোন দেশের কাছে দেবে সেই সিদ্ধান্ত নেবে। এক্ষেত্রে সিয়ামকে ভারতের কাছে দিলেও তদন্তে ব্যাঘাত ঘটবে না। 

শাহীনকে আনতে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সুযোগ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেহেতু ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রর বন্দিবিনিময় চুক্তি আছে, সেক্ষেত্রে তারাও উদ্যোগ নেবে। আমরাও এ বিষয়ে বাংলাদেশের আমেরিকান দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসব। আক্তারুজ্জামান শাহীনকে আমরা ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করব। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ থেকে অনেকেই অপরাধ করে, হত্যা বা বিভিন্ন মামলার আসামিরা কখনো ভারত দিয়ে আবার কখনো বাংলাদেশ থেকে সরাসরি নেপালের কাঠমান্ডু চলে যায়। এমপি আনার হত্যার মাস্টারমাইন্ড শাহীনও ঢাকা থেকে দিল্লি. দিল্লি থেকে কাঠমান্ডু গিয়ে অবস্থান করেছেন। 

আক্তারুজ্জামান শাহীনের যে মূল সহচর সিয়ামও এক থেকে দেড় মাস আগে যান ভারতে। সেখানে গিয়ে বোম্বে থেকে জিহাদ হাওলাদারকে খবর দিয়ে আনে। হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পর পৈশাচিকভাবে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে জিহাদ এবং সিয়াম বিভিন্ন জায়গায় আলামত ফেলে দেয়। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দৃষ্টিভঙ্গি চেঞ্জ করার জন্য সিয়াম মোজাফরবাদ বিহারে গিয়ে চারটি সিম থেকে বিভিন্ন জনকে রিং করে সে আবার অবৈধভাবে কাঠমন্ডু চলে যায়।


 

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম