সংকট কাটাতে অর্থমন্ত্রীকে চিঠি
পাঁচ হাজার কোটি টাকা ঋণ চায় বিকেএমইএ
মিজান চৌধুরী
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংকটময় পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের কাছে স্বল্প সুদে ঋণ এবং বেশকিছু নীতি সহায়তা চেয়েছে বিকেএমইএ। শ্রমিকদের এক মাসের (জুলাই) বেতন পরিশোধের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণসহ চার দফা প্রস্তাব জানিয়ে রোববার অর্থমন্ত্রীকে চিঠি দেওয়া হয়। অন্যান্য প্রস্তাবের মধ্যে এ শিল্পে চলমান ঋণের কিস্তি ছয় মাসের (জানুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত) জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক স্থগিত, বন্দরে জটের কারণে কনটেইনার খালাস বিলম্ব চার্জ এক মাসের জন্য মওকুফ এবং ইন্টারনেট সেবা দ্রুত পুরোপুরি চালু করার দাবি জানানো হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বিকেএমইএ সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।
প্রসঙ্গত, টানা চারদিন (২০ থেকে ২৩ জুলাই) বন্ধ থাকার পর তৈরি পোশাকশিল্প খাত এবং বন্দরের কার্যক্রম চালু হয়েছে বুধবার থেকে। বন্ধের দিনগুলোয় এ শিল্পের ক্ষতির অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৫০ কোটি টাকা, দাবি বিজিএমইএ-এর। এর বাইরে তিন হাজার কোটি টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে ওয়াশিংসহ লিংকেজ খাতের প্রতিষ্ঠানের।
সূত্র আরও জানায়, কোটা আন্দোলন পরিস্থিতিতে পোশাকশিল্পের ক্ষয়ক্ষতি তুলে ধরে ২৮ জুলাই অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীকে এ চিঠি দেওয়া হয়। পাশাপাশি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রীর শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা, বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী; ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী; নৌ প্রতিমন্ত্রী, শ্রম প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখ্যসচিব, বাণিজ্য সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং চট্টগ্রাম, মোংলা ও বেনাপোল বন্দর কর্তৃপক্ষকেও এ চিঠি দেওয়া হয়েছে।
বিকেএমইএ-এর সভাপতি একেএম সেলিম ওসমান জানান, প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ‘দেশের চলমান এই অনভিপ্রেত পরিস্থিতি প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বে দ্রুতই উপশম হবে। আর অর্থনৈতিক শক্তির মূল অনুঘটক হিসাবে আমাদের উপরিউক্ত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করা হলে দেশের অর্থনৈতিক চিত্র পালটে যাবে। আমরা আবারও বলতে চাই, আমরা দেশের সঙ্গে আছি, সরকারের সঙ্গে আছি, দেশের অর্থনীতির সঙ্গে আছি।’ সূত্রমতে, বিকেএমইএ-এর প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে দেখছে অর্থ বিভাগের বাজেট শাখা। এরপর সেটি নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনার পরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে-এমনটি জানিয়েছেন এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা।
জানতে চাইলে বিকেএমইএ-এর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, বিদেশ শিপমেন্টগুলো পৌঁছলে এবং সে ডকুমেন্ট ব্যাংকে এলেই কেবল আমরা টাকা পেয়ে থাকি। কিন্তু কোটা সংস্কার আন্দোলনের কারণে ক্রেতাদের কাছে পাওয়া অর্ডারের বিপরীতে শিপমেন্ট সম্ভব হয়নি। অনেক শিপমেন্ট ফেরত এনে বিমান কার্গোতে পাঠাতে হচ্ছে। এসব কারণে খরচ একদিকে বাড়ছে, অন্যদিকে টাকা আসছে না। এরই মধ্যে আগামী সপ্তাহে শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার সময়। এ অস্থিতিশীল সময়ে বেতন না দেওয়া হলে তার সুযোগ অনেকে নিতে পারে। মূলত অর্থ সংকট মোকাবিলার জন্য শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার জন্য ব্যাংক ঋণ চাওয়া হয়েছে। এটি কোনো প্রণোদনা নয়। তার হিসাবে সব মিলে পোশাকশিল্পে এক মাসের শ্রমিকদের বেতনভাতা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিলের জন্য ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে।
তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাওয়ার কয়েকটি কারণ তুলে ধরে অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো প্রস্তাবে বলা হয়, গেল দুই সপ্তাহের অরাজক পরিস্থিতির কারণে রপ্তানি খাতের দৃশ্য-অদৃশ্য ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানো যাবে না। লিড টাইম অনুযায়ী শিপমেন্ট করা যায়নি, অর্ডার বাতিল করেছেন ক্রেতারা, শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমেছে, কারখানাগুলোয় শ্রমিকদের অনুপস্থিতি এবং কাঁচামালের সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এসব ঘটনায় এক ভয়াবহ কঠিন সময় পার করছে পোশাকশিল্প। ইতোমধ্যে উদ্যোক্তাদের ওপর চলতি জুলাইয়ের শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের চাপ তৈরি হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি কারখানার চলতি মাসের বেতনভাতার বিপরীতে প্রয়োজনীয় মোট অঙ্ক ব্যাংক ঋণ হিসাবে সর্বোচ্চ ২ শতাংশ হারে সুদে এক বছর মেয়াদে (১২ কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য) দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তবেই এ শিল্পের মালিকদের পক্ষে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। বিপরীতে শ্রমিকদের বেতনভাতা পরিশোধে ব্যত্যয় ঘটতে পারে, যা প্রকান্তরে ভিন্ন একটি বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি জুলাইয়ের কারখানার গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিলও ঋণের আওতায় নিয়ে একই সুবিধায় সমন্বয় করতে হবে।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়, চলমান পরিস্থিতিতে ক্রমাগত লোকসানে থাকা রপ্তানিমুখী পোশাক খাতের পক্ষে এ মুহূর্তে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা অত্যন্ত কঠিন। এজন্য এ শিল্পের অনুকূলে ঋণের কিস্তি আগামী ৬ মাস (২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত) সুদবিহীন স্থগিত রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে অনুরোধ করা হয়।
ইন্টারনেটে ধীরগতি প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো প্রস্তাবে বলা হয়, ইন্টারনেট সেবা পুরোপুরি চালু করা গেলে আমরা নিজেরাই অনেক সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারব। দ্রুত সময়ের মধ্যে ইন্টারনেট সেবা চালু করতে হবে। সেজন্য ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের প্রস্তাব দেওয়া হয় অর্থমন্ত্রীকে। সেখানে বলা হয়, মনে রাখতে হবে, বর্তমান যুগে ব্যবসা পরিচালনার সব ক্ষেত্রে ইন্টারনেট একটি অপরিহার্য অংশ।
বন্দর পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরে বলা হয়, গত দুই সপ্তাহে পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রামসহ অন্যান্য বন্দরে আসা কনটেইনারগুলো নির্ধারিত সময়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ খালাস করতে পারেনি। ফলে কনটেইনার জট সৃষ্টি হয়েছে, যা স্বাভাবিক হতে এক থেকে দেড় মাস সময় লাগতে পারে। কিন্তু এ সময় বন্দর কর্তৃপক্ষ জটকৃত কনটেইনার খালাসে পোর্ট ডেমারেজ চার্জ ধার্য করেছে। এটি ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বাড়তি বিড়ম্বনা। এ বিড়ম্বনা মুক্ত করতে ১৫ জুলাই থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত পোর্ট চার্জ আরোপ না করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। নৌ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে এটি সমাধানের জন্য অনুরোধ জানানো হয় অর্থমন্ত্রীকে।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়, দেশ বর্তমান এক সংকটকাল অতিক্রম করছে। দুই সপ্তাহ ধরে বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সরকার ও দেশের জনগণ অতিবাহিত করছে, তা বর্ণনাতীত। ভীতিকর ধ্বংসযজ্ঞ, নাশকতা ও আগুনসন্ত্রাস থেকে শুরু করে নিরীহ মানুষ ও ছাত্রদের প্রাণহানি সবই দেখছি আমরা। এই কঠিন সময়ে সরকারের সীমাহীন ধৈর্য ও মানবিক আচরণের প্রশংসা জানায় বিকেএমইএ। সেখানে আরও বলা হয়, যেভাবে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র দেশের বহুমাত্রিক উন্নয়ন কার্যক্রমকে স্থবির করার জন্য ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তা পরিত্রাণের জন্য কারফিউ জারি ও সেনাবাহিনী মোতায়েন ছাড়া সরকারের কোনো বিকল্প ছিল না। বিকেএসইএ-এর প্রস্তাবে বলা হয়, বিগত দিনগুলোয় কোভিড-উত্তর বিশ্ববাজারের অর্থনৈতিক দুর্দশার সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন ও ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি সংকট সৃষ্টি করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববাজারে সৃষ্টি হয় এক অস্থিরতা। কমতে থাকে বাংলাদেশের পোশাক খাতের রপ্তানির আদেশ। এর সঙ্গে যোগ হয় গ্যাস ও বিদ্যুতের চরম সংকট, ৫৬ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি এবং ব্যাংক কর্তৃক নানা ধরনের অসহযোগিতা ও সুদহার বৃদ্ধি। এছাড়া আমদানি ও রপ্তানিতে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা এবং দীর্ঘদিনের চলমান নগদ সহায়তা দুই দফা হ্রাস করার কারণে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি কমতে থাকে। চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে যায় এ খাতের উদ্যোক্তারা।
বিজিএমইএ-এর তথ্য অনুযায়ী, পোশাক খাতে গড়ে প্রতি মাসে ৪৫০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এ হিসাবে প্রতিদিন রপ্তানির পরিমাণ ১৫ কোটি ডলার বা ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। সহিংসতা-কারফিউর কারণে সময়মতো যেসব পণ্যের জাহাজীকরণ (শিপমেন্ট) সম্ভব হয়নি, এখন সেসব পণ্য আকাশপথে পাঠাতে গেলে ১০ লাখ ডলার ক্ষতি হবে।
উল্লেখ্য, কোটা সংস্কারের আন্দোলনকে ঘিরে সংঘাত বাড়াতে থাকলে ১৯ জুলাই মধ্যরাত থেকে কারফিউ জারি করা হয়। পরে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। চারদিন পর কারফিউ শিথিলের সময় বাড়তে শুরু করলে ২৪ জুলাই থেকে দেশে কলকারখানায় কাজ শুরু হয়।
