বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন ও বিতর্কশিল্প
jugantor
বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন ও বিতর্কশিল্প

  রাজীব সরকার  

০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ষোড়শ শতকে ইউরোপের মানুষের মাঝে জাগরণ এসেছিল। প্রচলিত নিয়মনীতি, ধর্মবিশ্বাসকে সেদিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এ জিজ্ঞাসার মূলে ছিল বিভিন্ন বিজ্ঞানী, দার্শনিকের অনুসন্ধিৎসু রচনাসম্ভার। এ জাগরণের যে ফসল ইউরোপকে সমৃদ্ধ করেছিল তা রেনেসাঁস নামে পরিচিত। রেনেসাঁসের হাত ধরেই ইউরোপে আবির্ভাব ঘটে ‘এনলাইটেনমেন্ট’ যুগের। মুক্তবুদ্ধির জাদুবলে অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটে ইউরোপের চিন্তাজগতে, সমাজ কাঠামোতে। রুশো, ভলতেয়ারের মতো চিন্তাবিদের রচনায় অনুপ্রাণিত হয় ফরাসি বিপ্লব। যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়ে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল ইউরোপের রেনেসাঁস যা মুক্তবুদ্ধির দ্বার উন্মোচন করেছিল।

ভারতীয় উপমহাদেশে জাগরণ এসেছিল ঊনবিংশ শতাব্দীতে। সেই জাগরণ বা রেনেসাঁস ছিল খণ্ডিত। কারণ বৃহৎ মুসলিম সমাজকে সেই রেনেসাঁস স্পর্শ করেনি। মূলত হিন্দু মধ্যবিত্তের বিকাশ সাধিত হয়েছিল এ জাগরণে। ডিরোজিওর নেতৃত্বে একদল প্রগতিশীল ছাত্র প্রচলিত সংস্কার, রীতি-নীতির প্রতি বিদ্রোহ ঘোষণা করে। হিন্দু কলেজ ও সংস্কৃত কলেজ হয়ে ওঠে নতুন চিন্তা ও দর্শনচর্চার ক্ষেত্র। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, বিবেকানন্দ প্রমুখ ছিলেন এ নবজাগরণের অগ্রদূত। তাদের সাবলীল বিতর্কে, তৎপরতায় শাণিত হয়ে উঠেছিল সেই সময়ের চিন্তাধারা।

বাঙালি মুসলমান সমাজে মুক্তবুদ্ধির প্রসারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত। তখন ঢাকায় ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ গড়ে ওঠে মুসলিম সাহিত্য সমাজের নেতৃত্বে। কাজী আব্দুল ওদুদ, আবুল হুসেন, কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল ফজলের মতো ম্ক্তুচিন্তার বাহকেরা ছিলেন এই আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তাদের একটি মুখপত্র বের হতো ‘শিখা’ নামে। এর প্রত্যেক সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠায় লেখা থাকত, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ এই অসাধারণ উক্তির ভেতর স্পষ্ট হয়ে যায় তাদের জীবনদর্শন। মুক্তবুদ্ধি, প্রগতি ও আধুনিকতার প্রতি তাদের আগ্রহ আজও আমাদের বিস্মিত করে।

‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’-এর সংগঠকদের প্রচণ্ড প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। কারণটি দুর্বোধ্য নয়। মানুষ জন্মসূত্রে একটি ধর্মীয় পরিচয় লাভ করে। এত তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো ভূমিকা নেই। এক বিশেষ ঈশ্বর, বিশেষ ধর্মগ্রন্থ, বিশেষ প্রার্থনা ও চাপিয়ে দেয়া বিশ্বাস নিয়ে সে বড় হয়। এভাবে জন্ম থেকেই সে একটা আরোপিত ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়, যা তার জীবনের অনেক মৌলবিশ্বাস, আচরণবিধি, সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিচিতি এমনকি তার আর্থরাজনৈতিক পরিস্থিতিকেও নির্দিষ্ট ছকে নিয়ন্ত্রণ করে। এ ছক অতিক্রম করার উদ্যোগ নিলে নানা ধরনের নিপীড়ন শুরু হয়। সক্রেটিস, ব্রুনো, গ্যালিলিও, কোপার্নিকাস প্রমুখ মনীষীর প্রতি তৎকালীন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিগ্রহ এ ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। কাজী আব্দুল ওদুদ ও তার সহচরদেরও তৎকালীন সামাজিক নিগ্রহ সহ্য করতে হয়েছে।

রেনেসাঁস স্নাত মুক্ত চিন্তার বিকাশে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছে যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানমনস্কতা। প্রাচ্যে যুক্তিবাদিতার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় চিন্তানায়করা শাস্ত্রকে বিশ্বাসের বদলে যুক্তিতর্কের কষ্টিপাথরে যাচাই করে নেয়ার তাগিদ দিয়েছিলেন। ‘বৃহস্পতি সংহিতা’য় বলা হয়েছে কেবল শাস্ত্রকে আশ্রয় করেই কর্তব্য-অকর্তব্য নির্ধারণ করা যাবে না। যুক্তি-বিচারে যা গ্রাহ্য হয় না তেমন কর্মের অনুষ্ঠান অধর্মাচরণ ছাড়া কিছুই নয়। এমনও বলা হয়েছে যে, স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাও যদি যুক্তিবিরোধী কথা বলেন তবে তাও হবে না। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘যাহা বিশ্বাস্য তাহাই শাস্ত্র যাহা শাস্ত্র তাহাই বিশ্বাস্য নহে’- এখানেও তো যুক্তিরই জয়গান শোনা যায়। এ যুক্তিনির্ভর ঐতিহ্যেরই একান্ত অনুসারী ছিলেন বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক মোতাহের হোসেন চৌধুরী। এমনকি জীবনবিরোধী নৈতিকতাকেও তিনি বর্জন করেছিলেন যুক্তিনিষ্ঠার অনমনীয় শক্তিবলে। তাই অসীম সাহসিকতায় তিনি বলতে পেরেছিলেন-

‘বিবাহিত নর-নারীর প্রেমহীন স্থূল যৌনসম্ভোগে সমাজের আপত্তি নেই, কিন্তু অবিবাহিত প্রেমিক-প্রেমিকা যদি একটু হাতে হাত রাখে অথবা ঠোঁটে ঠোঁট ঠেকায় তবেই যত আপত্তি। প্রীতিকে বড় করে না দেখে নীতিকে বড় করে দেখায় এই স্থূল পরিণতি। বলা যাবে সমাজকে রক্ষা করতে হলে এই স্থূলতার প্রয়োজন আছে- অতএব, তা দোষাবহ নয়। উত্তরে বলব হ্যাঁ সমাজের কাজ তো এ পর্যন্তই। নিজের কাঠামোটুকু টিকিয়ে রাখাই তার কাজ, তার বেশি কিছু নয়। ব্যক্তির বিকাশের কথা সে যতটুকু ভাবে তার চেয়ে অনেক বেশি ভাবে নিজেকে টিকিয়ে রাখার কথা আর সমাজকে টিকিয়ে রাখা মানে সমাজের মোড়লদের টিকিয়ে রাখা, তাদের স্বার্থকে অক্ষত রাখা। মানুষ গোল্লায় যাক তবু মোড়লদের জবরদস্তি বজায় থাক এই তো সমাজের কাম্য। সমাজ মানুষের বৃদ্ধি চায় না, চায় একটা ছাঁচের মধ্যে ফেলে কোন ধরনের টিকিয়ে রাখতে, তার চূড়ান্ত বৃদ্ধিতে বাধা দিতে।’

এ দীর্ঘ উদ্ধৃতি থেকে যে কোনো সচেতন মানুষই উপলব্ধি করবেন অর্ধশতাব্দীরও আগের এ মূল্যায়ন আমাদের বর্তমান সামাজিক ব্যবস্থা ও জীবনব্যবস্থার ক্ষেত্রে সমান তাৎপর্যপূর্ণ। আবার ভারতীয় ঐতিহ্যের দিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক। জীবন সম্পর্কে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বহুদিন যাবৎ এখানে চলে এসেছে। একদিকে রয়েছে চার্বাকপন্থী ভোগবাদী চিন্তা; অন্যদিকে বুদ্ধের সংযম সাধনের শিক্ষা। আবার গীতা অতিভোগ ও অতিসংযম দুটোকেই সাধনার পক্ষে ক্ষতিকর বলে বর্ণনা করেছে। ভোগের সামঞ্জস্যের কথাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে গীতা। মোতাহের হোসেন চেীধুরী এ সামঞ্জস্যেই আস্থাবান ছিলেন। এখানেও তিনি যুক্তির পূজারি। তার মতে-

‘জীবন ভোগ-ত্যাগ বা বর্জন নয়। ভোগহীনতা উদাসীনতা, সুতরাং উচ্ছৃঙ্খলতার জনয়িত্রী। ভোগকে মেনে নিলেই ভোগের ইতরবিশেষ সম্বন্ধে সচেতন হওয়া যায়, আর তা হতে পারলেও মুক্তির স্বাদ তথা জীবনের প্রভু হওয়ার স্বাদ লাভ করা যায়। যুক্তি বিচারের আলোকেই তা সম্ভব, অতএব যুক্তি বিচারের প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য। যুক্তি বিচার অথবা বুদ্ধির শান্ত আলোকেই আমরা বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে পারি, আবেগের উনকানিতে নয়। আত্মকেন্দ্রিকতার ভয়াবহতা বুদ্ধির ইঙ্গিতে উপলব্ধি হয়।’

যুক্তিবাদের সঙ্গে অচ্ছেদ্যরূপে যুক্ত বিজ্ঞানমনস্কতা। বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারই মানুষকে কুসংস্কার থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করেছে। সবকিছুই যে কার্যকারণ সংশ্লিষ্ট অর্থাৎ কারণ ছাড়া কিছুই ঘটে না- এই ইহজাগতিক ব্যাখ্যাও দিন দিন শক্তিশালী হয়েছে বিজ্ঞানের প্রসারের ফলেই। এ বিজ্ঞান নিছক কতগুলো যান্ত্রিক সুবিধা প্রতিষ্ঠা নয়। বিজ্ঞানের প্রকৃত অবয়ব হচ্ছে মানুষের বৈজ্ঞানিক চেতনা যা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বর্তমানকে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চায় না, সৃষ্টি করতে চায় নতুন সম্ভাবনার ভবিষ্যৎ। বিজ্ঞানমনস্কতাই তাকে মানুষের অনন্য সাধারণ সৃষ্টিশীলতা সম্পর্কে সচেতন করে। বিজ্ঞানবিমুখতা বরং মানুষকে অতীতচারী করে জন্মসূত্রে অর্জিত সম্পদ ও বিশ্বাস নিয়ে তৃপ্ত থাকতে প্ররোচিত করে। তাই বিজ্ঞানবিমুখতা মানুষের অগ্রগামিতার পক্ষে প্রধান প্রতিবন্ধক এবং আলোর পরিবর্তে অন্ধকারের দিকেই তার পক্ষপাত। যুক্তিবাদী মোতাহের হোসেন চৌধুরী খুব সহজেই মানব বিকাশের অন্যতম শর্ত বিজ্ঞানমনস্কতাকে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। প্রগতি ও পশ্চাৎপদতা একসঙ্গে চলতে পারে না। তাই তার চেতনায় ধরা পড়েছে-

‘পিতৃপুরুষের দেশ ঠিক আমাদের দেশ নয়, আমাদের দেশ নিজেদের সৃষ্টি করে নিতে হবে। সে জন্য অন্ধকার দেয়াল ভেঙে মানুষে মানুষে মিলনের পথ খোলাসা করা দরকার এবং সর্বপ্রকার অভিমান ত্যাগ করে বিজ্ঞানশ্রয়ী হওয়া প্রয়োজন।’

তার এই উদ্ধৃতি থেকে বোঝা যায় যথার্থ বিজ্ঞান-চেতনার অভাব মানুষকে শুধু পশ্চাদ্গামীই করে না, তাকে বিভক্তও করে। বস্তুত মানুষের মধ্যে বিকৃত বিভাজন তৈরি ও তাকে লালন করার কুদৃষ্টান্ত তো আমাদের চারপাশে এখনও বিরাজমান। এ কুদৃষ্টান্তগুলো উঠে আসে ধর্মীয় কুসংস্কার ও ধর্মের অপব্যবহার থেকে নজরুল যাকে বলেছিলেন জাতের নামে বজ্জাতি। বিজ্ঞানাশ্রয়ী মনোভাবই আমাদের এ সর্বনাশা কুসংস্কার থেকে মুক্ত করতে পারে এবং মানবতাবাদের পথকে প্রশস্ত করতে পারে। যুক্তিবাদী তথা বিজ্ঞানাশ্রয়ী মানসিকতাকে মোতাহের হোসেন চৌধুরী আজীবন লালন করেছেন। এ জীবনাদর্শ তিনি ত্যাগ করেননি।

বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন আবুল হোসেন। যে বৈশিষ্ট্যের কারণে আবুল হোসেন তার পূর্বসূরিদের চেয়ে স্বতন্ত্র, সেটি হল তিনি অন্ধ শাস্ত্রানুগত্যকে বর্জন করার কথা বলেছিলেন যুক্তি ও মানবকল্যাণের তাগিদ থেকে। ধর্মের মৌল সত্যকে ছাপিয়ে ধর্মতন্ত্র ও অন্ধবিশ্বাস বড় হয়ে উঠলে মানুষের বিকশিত হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। তাই কেবল শাস্ত্রীয় বিধানের মধ্যে মুক্তির উপায় সন্ধান যে অরণ্যে রোদনের নামান্তর তা কোনো সচেতন ও বিবেকবান মানুষের অজানা থাকে না। আবুল হুসেনও উপলব্ধি করেছিলেন অন্ধমোহ ত্যাগ করে, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে শিক্ষিত না হয়ে বাঙালি মুসলমান কখনও অগ্রসর হতে পারবে না। তাই ‘আদেশের নিগ্রহ’ প্রবন্ধে তিনি বলেন-

‘কোরআন শরিফ পাঠ (তেলাওয়াত) করার হুকুম আজ যেরূপভাবে পালন করা হচ্ছে, তাতে মনে হয়, তেলাওয়াত বন্ধ করে দিলেই মন ও মস্তিষ্কের পক্ষে পরম মঙ্গলকর হবে। সকালে মসজিদের মধ্যে কেরাত করে দলে দলে এক বর্ণও না বুঝে শুধু সওয়াবের লোভে যারা তেলাওয়াত করে তাদের বুদ্ধি যে সিকেয় তোলা থাকে তা বলাই বাহুল্য। এ হুকুমের নিগ্রহ প্রকাশ পায় ওইসব তেলাওয়াতকারীর মূর্খতা ও অজ্ঞতার ভেতর দিয়ে।’

বোঝাই যাচ্ছে স্পষ্ট, জোরালো ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তিনি অন্ধ ধর্মাচরণকে আক্রমণ করেছেন। তাই এ প্রবন্ধের বক্তব্য ও তাকে নিয়ে ঢাকার শিক্ষিত মুসলমান সমাজে চরম বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে। স্থানীয় উর্দুভাষীদের কাছেও প্রবন্ধের বক্তব্য বিকৃত করে পৌঁছানো হয়। বিষয়টি ফয়সালার জন্য ১৯২৯ সালে ৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৭টায় আহসান মঞ্জিলসহ ‘ইসলামিয়া আঞ্জুমান’-এর অফিসে এক বিচার সভা বসে।

সেখানে চাপের মুখে আবুল হুসেন একটি স্বীকারোক্তিপত্রে লিখেন, ‘ঐ প্রবন্ধের ভাষা দ্বারা মুসলমান ভ্রাতৃবৃন্দের মনে যে বিশেষ আঘাত দিয়েছি সে জন্য আমি অপরাধী।’ রোমান ধর্ম আদালতের সামনে গ্যালিলিওর স্বীকারোক্তির কথা মনে করিয়ে দেয় এ ঘটনা।

নিজের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে গিয়ে এ নতি স্বীকারকে আবুল হুসেন নিজের নৈতিক পরাজয় বলে মনে করেছেন। বিবেকের এ গ্লানিবোধের কারণে তিনি নিজেকে আর সম্পাদক পদে উপযুক্ত মনে করেননি। পরদিনই সাহিত্য সমাজের সম্পাদকের পদত্যাগ করেন। এ উপলক্ষে লেখা পদত্যাগপত্রে তিনি বলেন-

“সম্প্রতি ‘আদেশের নিগ্রহ’ নিয়ে যে আন্দোলন হয়েছে তাতে আমি এটুকু বুঝতে পেরেছি যে, সমাজের প্রকৃত কল্যাণাকাক্সক্ষী দার্শনিকের কথায় কেউ কর্ণপাত করবে না, বরং তার কথার উল্টা অর্থ করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করবে।” আবুল হুসেনসহ শিখাগোষ্ঠীর অন্য লেখকদের শাস্ত্রবিরোধী বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বাঙালি মুসলমান সমাজে যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়, তার সঙ্গে শত বছর আগে হিন্দু কলেজে ডিরোজিও ও ‘ইয়ংবেঙ্গল’ নামে পরিচিত তার শিষ্যদের ভূমিকার ফলে কলকাতার হিন্দু সমাজে সৃষ্ট আলোড়নের মিল খুঁজে পেয়েছেন শিবনারায়ণ রায়।

পূর্বোক্ত আন্দোলন কিংবা সংগঠনের মতো কোনো কার্যক্রম এখন আমাদের চোখে পড়ে না। সেই আন্দোলন কিংবা সংগঠন অনুপস্থিত থাকলেও থেমে নেই সেই লক্ষ্য- মুক্ত বুদ্ধিসম্পন্ন জীবনদর্শন নির্মাণের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য পূরণে কাজ করে যাচ্ছে বিতর্ক শিল্প। বিতর্ক আমাদের কিছু প্রশ্ন ও সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা আমরা বিতর্কের কাছ থেকে পাই- পরমতের প্রতি শ্রদ্ধা। এক অসহিষ্ণু মানসিকতা গড়ে উঠেছে এ দেশে। ‘আমিই ঠিক, অন্য সবাই ভুল’- এ মানসিকতায় আক্রান্ত কমবেশি সবাই। বিতর্ক এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে আমাদের মুক্তি দেয়। নিজের বিশ্বাসকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ দেয়। ‘An unexamined life

is not worthliving.’- সক্রেটিসের এই বাণী একজন বিতার্কিকেরও বিশ্বাস। অসত্য ও অসুন্দরের বিরুদ্ধে বিতর্ক শৈল্পিক প্রতিবাদ। কুসংস্কার, কূপমণ্ডূকতা ও অন্ধকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হলে ম্ক্তুবুদ্ধি চর্চার কোনো বিকল্প নেই। সেই মুক্তবুদ্ধির অনিবার্য অনুষঙ্গ বিতর্ক।

ভলতেয়ার বলেছিলেন, ‘তোমার মতের সঙ্গে আমি একমত না হতে পারি, কিন্তু তোমার মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য আমি জীবন দিতে পারি।’ বিতর্কের মূল চেতনাই এ উক্তিতে ফুটে উঠেছে। শুধু ব্যক্তিজীবনে নয়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও যুক্তির অনুশীলন অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে যুক্তিবর্জিত হলে কী ভয়ংকর পরিণতি দেখা দেয় তার উদাহরণ বিশ্বময় ছড়িয়ে রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়েছিল হিটলারের অযৌক্তিক ও একগুঁয়ে মনোভাবের কারণে। এরপর যত যুদ্ধ বিগ্রহ দেখা দিয়েছে তার কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে কোনো পক্ষের যুক্তিবর্জিত চিন্তাধারা ও পেশিশক্তির প্রদর্শনের প্রবণতা। যুদ্ধের বদলে যখন শান্তির আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হয়, রণাঙ্গনের বদলে যখন কূটনীতির টেবিলে সমস্যার সমাধান হয়, তখন যুক্তিরই জয় হয়।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটটি স্মরণ করা যাক। ১৯৭০-এর নির্বাচনে জয়ী জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অনীহাই কিন্তু সংঘর্ষের বীজ বপন করেছিল। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করলে সেটাই হতো যৌক্তিক ও গণতান্ত্রিক আচরণ। কিন্তু তা না করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নির্বোধের মতো বাঙালি জাতির ওপর গণহত্যা চাপিয়ে দেয়। তাদের এ নৃশংসতাই মুক্তিযুদ্ধের ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করে এ দেশের মানুষকে। এরই পরিণতিতে স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্ম। বলা যায় ইতিহাসের যৌক্তিক পরিণতিতেই বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে। তাই এ দেশে একটি যুক্তিবাদী ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা খুব তীব্র। এ তীব্রতাকেই ধারণ করছে এ যুগের বিতার্কিক।

মুক্তচিন্তা, বিতর্ক ও গণতন্ত্র অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। গণতন্ত্রের মূলমন্ত্রই হচ্ছে পরমতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহনশীল আচরণ। বিতর্ক আমাদের এই অনুশীলনই করায়। পছন্দ হোক বা না হোক, প্রতিপক্ষের বক্তব্য একজন বিতার্কিককে মন দিয়ে শুনতে হয়। এরপর নিজের অকাট্য যুক্তি দিয়ে তিনি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে, তার বক্তব্য অধিকতর যৌক্তিক, তবেই তিনি বিজয়ী। অর্থাৎ পেশিশক্তি নয়, যুক্তির শক্তি দিয়ে এখানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হচ্ছে। জোরের যুক্তি নয়, যুক্তির জোর এখানে প্রাধান্য পাচ্ছে। এটিই গণতান্ত্রিক চেতনা। যা যৌক্তিক ও সঙ্গত, যেদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সমর্থন সেদিকেই বিজয়।

তাই প্রত্যেক বিতার্কিক একজন খুদে রেনেসাঁস মানব। মানব সভ্যতার আলোকায়নের যে সুদীর্ঘ যাত্রা, সেই যাত্রায় আজ নেতৃত্ব দিতে হবে বিতার্কিককে। আমরা প্রায়ই শুনি শক্তিশালী গণতন্ত্র ও কার্যকর সংসদের গুরুত্বের কথা। যুক্তিস্নাত সেই রাঙা প্রভাতটি বিতার্কিকরাই এনে দিতে পারেন।

বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন ও বিতর্কশিল্প

 রাজীব সরকার 
০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ষোড়শ শতকে ইউরোপের মানুষের মাঝে জাগরণ এসেছিল। প্রচলিত নিয়মনীতি, ধর্মবিশ্বাসকে সেদিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এ জিজ্ঞাসার মূলে ছিল বিভিন্ন বিজ্ঞানী, দার্শনিকের অনুসন্ধিৎসু রচনাসম্ভার। এ জাগরণের যে ফসল ইউরোপকে সমৃদ্ধ করেছিল তা রেনেসাঁস নামে পরিচিত। রেনেসাঁসের হাত ধরেই ইউরোপে আবির্ভাব ঘটে ‘এনলাইটেনমেন্ট’ যুগের। মুক্তবুদ্ধির জাদুবলে অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটে ইউরোপের চিন্তাজগতে, সমাজ কাঠামোতে। রুশো, ভলতেয়ারের মতো চিন্তাবিদের রচনায় অনুপ্রাণিত হয় ফরাসি বিপ্লব। যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়ে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল ইউরোপের রেনেসাঁস যা মুক্তবুদ্ধির দ্বার উন্মোচন করেছিল।

ভারতীয় উপমহাদেশে জাগরণ এসেছিল ঊনবিংশ শতাব্দীতে। সেই জাগরণ বা রেনেসাঁস ছিল খণ্ডিত। কারণ বৃহৎ মুসলিম সমাজকে সেই রেনেসাঁস স্পর্শ করেনি। মূলত হিন্দু মধ্যবিত্তের বিকাশ সাধিত হয়েছিল এ জাগরণে। ডিরোজিওর নেতৃত্বে একদল প্রগতিশীল ছাত্র প্রচলিত সংস্কার, রীতি-নীতির প্রতি বিদ্রোহ ঘোষণা করে। হিন্দু কলেজ ও সংস্কৃত কলেজ হয়ে ওঠে নতুন চিন্তা ও দর্শনচর্চার ক্ষেত্র। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, বিবেকানন্দ প্রমুখ ছিলেন এ নবজাগরণের অগ্রদূত। তাদের সাবলীল বিতর্কে, তৎপরতায় শাণিত হয়ে উঠেছিল সেই সময়ের চিন্তাধারা।

বাঙালি মুসলমান সমাজে মুক্তবুদ্ধির প্রসারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত। তখন ঢাকায় ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ গড়ে ওঠে মুসলিম সাহিত্য সমাজের নেতৃত্বে। কাজী আব্দুল ওদুদ, আবুল হুসেন, কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল ফজলের মতো ম্ক্তুচিন্তার বাহকেরা ছিলেন এই আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তাদের একটি মুখপত্র বের হতো ‘শিখা’ নামে। এর প্রত্যেক সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠায় লেখা থাকত, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ এই অসাধারণ উক্তির ভেতর স্পষ্ট হয়ে যায় তাদের জীবনদর্শন। মুক্তবুদ্ধি, প্রগতি ও আধুনিকতার প্রতি তাদের আগ্রহ আজও আমাদের বিস্মিত করে।

‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’-এর সংগঠকদের প্রচণ্ড প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। কারণটি দুর্বোধ্য নয়। মানুষ জন্মসূত্রে একটি ধর্মীয় পরিচয় লাভ করে। এত তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো ভূমিকা নেই। এক বিশেষ ঈশ্বর, বিশেষ ধর্মগ্রন্থ, বিশেষ প্রার্থনা ও চাপিয়ে দেয়া বিশ্বাস নিয়ে সে বড় হয়। এভাবে জন্ম থেকেই সে একটা আরোপিত ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়, যা তার জীবনের অনেক মৌলবিশ্বাস, আচরণবিধি, সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিচিতি এমনকি তার আর্থরাজনৈতিক পরিস্থিতিকেও নির্দিষ্ট ছকে নিয়ন্ত্রণ করে। এ ছক অতিক্রম করার উদ্যোগ নিলে নানা ধরনের নিপীড়ন শুরু হয়। সক্রেটিস, ব্রুনো, গ্যালিলিও, কোপার্নিকাস প্রমুখ মনীষীর প্রতি তৎকালীন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিগ্রহ এ ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। কাজী আব্দুল ওদুদ ও তার সহচরদেরও তৎকালীন সামাজিক নিগ্রহ সহ্য করতে হয়েছে।

রেনেসাঁস স্নাত মুক্ত চিন্তার বিকাশে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছে যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানমনস্কতা। প্রাচ্যে যুক্তিবাদিতার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় চিন্তানায়করা শাস্ত্রকে বিশ্বাসের বদলে যুক্তিতর্কের কষ্টিপাথরে যাচাই করে নেয়ার তাগিদ দিয়েছিলেন। ‘বৃহস্পতি সংহিতা’য় বলা হয়েছে কেবল শাস্ত্রকে আশ্রয় করেই কর্তব্য-অকর্তব্য নির্ধারণ করা যাবে না। যুক্তি-বিচারে যা গ্রাহ্য হয় না তেমন কর্মের অনুষ্ঠান অধর্মাচরণ ছাড়া কিছুই নয়। এমনও বলা হয়েছে যে, স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাও যদি যুক্তিবিরোধী কথা বলেন তবে তাও হবে না। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘যাহা বিশ্বাস্য তাহাই শাস্ত্র যাহা শাস্ত্র তাহাই বিশ্বাস্য নহে’- এখানেও তো যুক্তিরই জয়গান শোনা যায়। এ যুক্তিনির্ভর ঐতিহ্যেরই একান্ত অনুসারী ছিলেন বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক মোতাহের হোসেন চৌধুরী। এমনকি জীবনবিরোধী নৈতিকতাকেও তিনি বর্জন করেছিলেন যুক্তিনিষ্ঠার অনমনীয় শক্তিবলে। তাই অসীম সাহসিকতায় তিনি বলতে পেরেছিলেন-

‘বিবাহিত নর-নারীর প্রেমহীন স্থূল যৌনসম্ভোগে সমাজের আপত্তি নেই, কিন্তু অবিবাহিত প্রেমিক-প্রেমিকা যদি একটু হাতে হাত রাখে অথবা ঠোঁটে ঠোঁট ঠেকায় তবেই যত আপত্তি। প্রীতিকে বড় করে না দেখে নীতিকে বড় করে দেখায় এই স্থূল পরিণতি। বলা যাবে সমাজকে রক্ষা করতে হলে এই স্থূলতার প্রয়োজন আছে- অতএব, তা দোষাবহ নয়। উত্তরে বলব হ্যাঁ সমাজের কাজ তো এ পর্যন্তই। নিজের কাঠামোটুকু টিকিয়ে রাখাই তার কাজ, তার বেশি কিছু নয়। ব্যক্তির বিকাশের কথা সে যতটুকু ভাবে তার চেয়ে অনেক বেশি ভাবে নিজেকে টিকিয়ে রাখার কথা আর সমাজকে টিকিয়ে রাখা মানে সমাজের মোড়লদের টিকিয়ে রাখা, তাদের স্বার্থকে অক্ষত রাখা। মানুষ গোল্লায় যাক তবু মোড়লদের জবরদস্তি বজায় থাক এই তো সমাজের কাম্য। সমাজ মানুষের বৃদ্ধি চায় না, চায় একটা ছাঁচের মধ্যে ফেলে কোন ধরনের টিকিয়ে রাখতে, তার চূড়ান্ত বৃদ্ধিতে বাধা দিতে।’

এ দীর্ঘ উদ্ধৃতি থেকে যে কোনো সচেতন মানুষই উপলব্ধি করবেন অর্ধশতাব্দীরও আগের এ মূল্যায়ন আমাদের বর্তমান সামাজিক ব্যবস্থা ও জীবনব্যবস্থার ক্ষেত্রে সমান তাৎপর্যপূর্ণ। আবার ভারতীয় ঐতিহ্যের দিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক। জীবন সম্পর্কে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বহুদিন যাবৎ এখানে চলে এসেছে। একদিকে রয়েছে চার্বাকপন্থী ভোগবাদী চিন্তা; অন্যদিকে বুদ্ধের সংযম সাধনের শিক্ষা। আবার গীতা অতিভোগ ও অতিসংযম দুটোকেই সাধনার পক্ষে ক্ষতিকর বলে বর্ণনা করেছে। ভোগের সামঞ্জস্যের কথাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে গীতা। মোতাহের হোসেন চেীধুরী এ সামঞ্জস্যেই আস্থাবান ছিলেন। এখানেও তিনি যুক্তির পূজারি। তার মতে-

‘জীবন ভোগ-ত্যাগ বা বর্জন নয়। ভোগহীনতা উদাসীনতা, সুতরাং উচ্ছৃঙ্খলতার জনয়িত্রী। ভোগকে মেনে নিলেই ভোগের ইতরবিশেষ সম্বন্ধে সচেতন হওয়া যায়, আর তা হতে পারলেও মুক্তির স্বাদ তথা জীবনের প্রভু হওয়ার স্বাদ লাভ করা যায়। যুক্তি বিচারের আলোকেই তা সম্ভব, অতএব যুক্তি বিচারের প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য। যুক্তি বিচার অথবা বুদ্ধির শান্ত আলোকেই আমরা বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে পারি, আবেগের উনকানিতে নয়। আত্মকেন্দ্রিকতার ভয়াবহতা বুদ্ধির ইঙ্গিতে উপলব্ধি হয়।’

যুক্তিবাদের সঙ্গে অচ্ছেদ্যরূপে যুক্ত বিজ্ঞানমনস্কতা। বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারই মানুষকে কুসংস্কার থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করেছে। সবকিছুই যে কার্যকারণ সংশ্লিষ্ট অর্থাৎ কারণ ছাড়া কিছুই ঘটে না- এই ইহজাগতিক ব্যাখ্যাও দিন দিন শক্তিশালী হয়েছে বিজ্ঞানের প্রসারের ফলেই। এ বিজ্ঞান নিছক কতগুলো যান্ত্রিক সুবিধা প্রতিষ্ঠা নয়। বিজ্ঞানের প্রকৃত অবয়ব হচ্ছে মানুষের বৈজ্ঞানিক চেতনা যা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বর্তমানকে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চায় না, সৃষ্টি করতে চায় নতুন সম্ভাবনার ভবিষ্যৎ। বিজ্ঞানমনস্কতাই তাকে মানুষের অনন্য সাধারণ সৃষ্টিশীলতা সম্পর্কে সচেতন করে। বিজ্ঞানবিমুখতা বরং মানুষকে অতীতচারী করে জন্মসূত্রে অর্জিত সম্পদ ও বিশ্বাস নিয়ে তৃপ্ত থাকতে প্ররোচিত করে। তাই বিজ্ঞানবিমুখতা মানুষের অগ্রগামিতার পক্ষে প্রধান প্রতিবন্ধক এবং আলোর পরিবর্তে অন্ধকারের দিকেই তার পক্ষপাত। যুক্তিবাদী মোতাহের হোসেন চৌধুরী খুব সহজেই মানব বিকাশের অন্যতম শর্ত বিজ্ঞানমনস্কতাকে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। প্রগতি ও পশ্চাৎপদতা একসঙ্গে চলতে পারে না। তাই তার চেতনায় ধরা পড়েছে-

‘পিতৃপুরুষের দেশ ঠিক আমাদের দেশ নয়, আমাদের দেশ নিজেদের সৃষ্টি করে নিতে হবে। সে জন্য অন্ধকার দেয়াল ভেঙে মানুষে মানুষে মিলনের পথ খোলাসা করা দরকার এবং সর্বপ্রকার অভিমান ত্যাগ করে বিজ্ঞানশ্রয়ী হওয়া প্রয়োজন।’

তার এই উদ্ধৃতি থেকে বোঝা যায় যথার্থ বিজ্ঞান-চেতনার অভাব মানুষকে শুধু পশ্চাদ্গামীই করে না, তাকে বিভক্তও করে। বস্তুত মানুষের মধ্যে বিকৃত বিভাজন তৈরি ও তাকে লালন করার কুদৃষ্টান্ত তো আমাদের চারপাশে এখনও বিরাজমান। এ কুদৃষ্টান্তগুলো উঠে আসে ধর্মীয় কুসংস্কার ও ধর্মের অপব্যবহার থেকে নজরুল যাকে বলেছিলেন জাতের নামে বজ্জাতি। বিজ্ঞানাশ্রয়ী মনোভাবই আমাদের এ সর্বনাশা কুসংস্কার থেকে মুক্ত করতে পারে এবং মানবতাবাদের পথকে প্রশস্ত করতে পারে। যুক্তিবাদী তথা বিজ্ঞানাশ্রয়ী মানসিকতাকে মোতাহের হোসেন চৌধুরী আজীবন লালন করেছেন। এ জীবনাদর্শ তিনি ত্যাগ করেননি।

বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন আবুল হোসেন। যে বৈশিষ্ট্যের কারণে আবুল হোসেন তার পূর্বসূরিদের চেয়ে স্বতন্ত্র, সেটি হল তিনি অন্ধ শাস্ত্রানুগত্যকে বর্জন করার কথা বলেছিলেন যুক্তি ও মানবকল্যাণের তাগিদ থেকে। ধর্মের মৌল সত্যকে ছাপিয়ে ধর্মতন্ত্র ও অন্ধবিশ্বাস বড় হয়ে উঠলে মানুষের বিকশিত হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। তাই কেবল শাস্ত্রীয় বিধানের মধ্যে মুক্তির উপায় সন্ধান যে অরণ্যে রোদনের নামান্তর তা কোনো সচেতন ও বিবেকবান মানুষের অজানা থাকে না। আবুল হুসেনও উপলব্ধি করেছিলেন অন্ধমোহ ত্যাগ করে, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে শিক্ষিত না হয়ে বাঙালি মুসলমান কখনও অগ্রসর হতে পারবে না। তাই ‘আদেশের নিগ্রহ’ প্রবন্ধে তিনি বলেন-

‘কোরআন শরিফ পাঠ (তেলাওয়াত) করার হুকুম আজ যেরূপভাবে পালন করা হচ্ছে, তাতে মনে হয়, তেলাওয়াত বন্ধ করে দিলেই মন ও মস্তিষ্কের পক্ষে পরম মঙ্গলকর হবে। সকালে মসজিদের মধ্যে কেরাত করে দলে দলে এক বর্ণও না বুঝে শুধু সওয়াবের লোভে যারা তেলাওয়াত করে তাদের বুদ্ধি যে সিকেয় তোলা থাকে তা বলাই বাহুল্য। এ হুকুমের নিগ্রহ প্রকাশ পায় ওইসব তেলাওয়াতকারীর মূর্খতা ও অজ্ঞতার ভেতর দিয়ে।’

বোঝাই যাচ্ছে স্পষ্ট, জোরালো ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তিনি অন্ধ ধর্মাচরণকে আক্রমণ করেছেন। তাই এ প্রবন্ধের বক্তব্য ও তাকে নিয়ে ঢাকার শিক্ষিত মুসলমান সমাজে চরম বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে। স্থানীয় উর্দুভাষীদের কাছেও প্রবন্ধের বক্তব্য বিকৃত করে পৌঁছানো হয়। বিষয়টি ফয়সালার জন্য ১৯২৯ সালে ৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৭টায় আহসান মঞ্জিলসহ ‘ইসলামিয়া আঞ্জুমান’-এর অফিসে এক বিচার সভা বসে।

সেখানে চাপের মুখে আবুল হুসেন একটি স্বীকারোক্তিপত্রে লিখেন, ‘ঐ প্রবন্ধের ভাষা দ্বারা মুসলমান ভ্রাতৃবৃন্দের মনে যে বিশেষ আঘাত দিয়েছি সে জন্য আমি অপরাধী।’ রোমান ধর্ম আদালতের সামনে গ্যালিলিওর স্বীকারোক্তির কথা মনে করিয়ে দেয় এ ঘটনা।

নিজের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে গিয়ে এ নতি স্বীকারকে আবুল হুসেন নিজের নৈতিক পরাজয় বলে মনে করেছেন। বিবেকের এ গ্লানিবোধের কারণে তিনি নিজেকে আর সম্পাদক পদে উপযুক্ত মনে করেননি। পরদিনই সাহিত্য সমাজের সম্পাদকের পদত্যাগ করেন। এ উপলক্ষে লেখা পদত্যাগপত্রে তিনি বলেন-

“সম্প্রতি ‘আদেশের নিগ্রহ’ নিয়ে যে আন্দোলন হয়েছে তাতে আমি এটুকু বুঝতে পেরেছি যে, সমাজের প্রকৃত কল্যাণাকাক্সক্ষী দার্শনিকের কথায় কেউ কর্ণপাত করবে না, বরং তার কথার উল্টা অর্থ করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করবে।” আবুল হুসেনসহ শিখাগোষ্ঠীর অন্য লেখকদের শাস্ত্রবিরোধী বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বাঙালি মুসলমান সমাজে যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়, তার সঙ্গে শত বছর আগে হিন্দু কলেজে ডিরোজিও ও ‘ইয়ংবেঙ্গল’ নামে পরিচিত তার শিষ্যদের ভূমিকার ফলে কলকাতার হিন্দু সমাজে সৃষ্ট আলোড়নের মিল খুঁজে পেয়েছেন শিবনারায়ণ রায়।

পূর্বোক্ত আন্দোলন কিংবা সংগঠনের মতো কোনো কার্যক্রম এখন আমাদের চোখে পড়ে না। সেই আন্দোলন কিংবা সংগঠন অনুপস্থিত থাকলেও থেমে নেই সেই লক্ষ্য- মুক্ত বুদ্ধিসম্পন্ন জীবনদর্শন নির্মাণের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য পূরণে কাজ করে যাচ্ছে বিতর্ক শিল্প। বিতর্ক আমাদের কিছু প্রশ্ন ও সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা আমরা বিতর্কের কাছ থেকে পাই- পরমতের প্রতি শ্রদ্ধা। এক অসহিষ্ণু মানসিকতা গড়ে উঠেছে এ দেশে। ‘আমিই ঠিক, অন্য সবাই ভুল’- এ মানসিকতায় আক্রান্ত কমবেশি সবাই। বিতর্ক এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে আমাদের মুক্তি দেয়। নিজের বিশ্বাসকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ দেয়। ‘An unexamined life

is not worthliving.’- সক্রেটিসের এই বাণী একজন বিতার্কিকেরও বিশ্বাস। অসত্য ও অসুন্দরের বিরুদ্ধে বিতর্ক শৈল্পিক প্রতিবাদ। কুসংস্কার, কূপমণ্ডূকতা ও অন্ধকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হলে ম্ক্তুবুদ্ধি চর্চার কোনো বিকল্প নেই। সেই মুক্তবুদ্ধির অনিবার্য অনুষঙ্গ বিতর্ক।

ভলতেয়ার বলেছিলেন, ‘তোমার মতের সঙ্গে আমি একমত না হতে পারি, কিন্তু তোমার মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য আমি জীবন দিতে পারি।’ বিতর্কের মূল চেতনাই এ উক্তিতে ফুটে উঠেছে। শুধু ব্যক্তিজীবনে নয়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও যুক্তির অনুশীলন অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে যুক্তিবর্জিত হলে কী ভয়ংকর পরিণতি দেখা দেয় তার উদাহরণ বিশ্বময় ছড়িয়ে রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়েছিল হিটলারের অযৌক্তিক ও একগুঁয়ে মনোভাবের কারণে। এরপর যত যুদ্ধ বিগ্রহ দেখা দিয়েছে তার কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে কোনো পক্ষের যুক্তিবর্জিত চিন্তাধারা ও পেশিশক্তির প্রদর্শনের প্রবণতা। যুদ্ধের বদলে যখন শান্তির আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হয়, রণাঙ্গনের বদলে যখন কূটনীতির টেবিলে সমস্যার সমাধান হয়, তখন যুক্তিরই জয় হয়।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটটি স্মরণ করা যাক। ১৯৭০-এর নির্বাচনে জয়ী জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অনীহাই কিন্তু সংঘর্ষের বীজ বপন করেছিল। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করলে সেটাই হতো যৌক্তিক ও গণতান্ত্রিক আচরণ। কিন্তু তা না করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নির্বোধের মতো বাঙালি জাতির ওপর গণহত্যা চাপিয়ে দেয়। তাদের এ নৃশংসতাই মুক্তিযুদ্ধের ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করে এ দেশের মানুষকে। এরই পরিণতিতে স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্ম। বলা যায় ইতিহাসের যৌক্তিক পরিণতিতেই বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে। তাই এ দেশে একটি যুক্তিবাদী ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা খুব তীব্র। এ তীব্রতাকেই ধারণ করছে এ যুগের বিতার্কিক।

মুক্তচিন্তা, বিতর্ক ও গণতন্ত্র অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। গণতন্ত্রের মূলমন্ত্রই হচ্ছে পরমতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহনশীল আচরণ। বিতর্ক আমাদের এই অনুশীলনই করায়। পছন্দ হোক বা না হোক, প্রতিপক্ষের বক্তব্য একজন বিতার্কিককে মন দিয়ে শুনতে হয়। এরপর নিজের অকাট্য যুক্তি দিয়ে তিনি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে, তার বক্তব্য অধিকতর যৌক্তিক, তবেই তিনি বিজয়ী। অর্থাৎ পেশিশক্তি নয়, যুক্তির শক্তি দিয়ে এখানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হচ্ছে। জোরের যুক্তি নয়, যুক্তির জোর এখানে প্রাধান্য পাচ্ছে। এটিই গণতান্ত্রিক চেতনা। যা যৌক্তিক ও সঙ্গত, যেদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সমর্থন সেদিকেই বিজয়।

তাই প্রত্যেক বিতার্কিক একজন খুদে রেনেসাঁস মানব। মানব সভ্যতার আলোকায়নের যে সুদীর্ঘ যাত্রা, সেই যাত্রায় আজ নেতৃত্ব দিতে হবে বিতার্কিককে। আমরা প্রায়ই শুনি শক্তিশালী গণতন্ত্র ও কার্যকর সংসদের গুরুত্বের কথা। যুক্তিস্নাত সেই রাঙা প্রভাতটি বিতার্কিকরাই এনে দিতে পারেন।