পেঁয়াজের ঝাঁজ কমছে না নানা উদ্যোগেও
jugantor
দু’দিন ধরে উচ্চমূল্য অপরিবর্তিত
পেঁয়াজের ঝাঁজ কমছে না নানা উদ্যোগেও

  ইয়াসিন রহমান  

২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারের নানা উদ্যোগেও কমছে না পেঁয়াজের ঝাঁজ। গত দু’দিন ধরে পাইকারি ও খুচরা বাজারে দেশি ও আমদানি করা পেঁয়াজের উচ্চমূল্য অপরিবর্তিত আছে। দুর্বল তদারকির কারণেই মূলত এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভারত রফতানি বন্ধ ঘোষণার পরদিন (১৫ সেপ্টেম্বর) প্রতি কেজি পেঁয়াজ দেশের খুচরা বাজারে বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ ১২০ টাকা। সোমবার ছয় দিনের ব্যবধানে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটি কেজিতে ৩৫ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে ৮৫ টাকা। যা গত দু’দিন ধরে বহাল আছে। তবে গত ৩০ আগস্ট খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ৪০ টাকা। ফলে পণ্যটি কিনতে ভোক্তার এখন বাড়তি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে।

সোমবার রাজধানীর সর্ববৃহৎ পাইকারি আড়ত শ্যামবাজারে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৬৫-৭০ টাকা। যা রোববার একই দাম ছিল। এ ছাড়া আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৫০-৫৫ টাকা কেজি। যা আগের দিন একই ছিল। এ ছাড়া রাজধানীর খুচরা বাজারেও গত দু’দিন একই দামে বিক্রি হয়েছে। প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৮০-৮৫ টাকা এবং আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৬০-৭০ টাকা কেজি।

এদিকে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ট্রাক সেলে ন্যায্যমূল্যে পেঁয়াজ বিক্রির পাশাপাশি অনলাইনে বিক্রিতে প্রথমদিনই ব্যাপক সাড়া পড়েছে। ন্যায্যমূল্যে পণ্যটি কিনতে ক্রেতাদের হিড়িক পড়েছে উত্তরা, ধানমণ্ডি, গুলশান ও বনশ্রীতে।

সোমবার দুটি প্রতিষ্ঠান-স্বপ্ন অনলাইন ও চালডাল ডটকম সোমবার দুপুর ১২টার পর থেকে টিসিবির পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করে। এরপরই অনলাইনে হুমড়ি খেয়ে পড়েন ক্রেতারা। টিসিবি সূত্র বলছে, রোববার সন্ধ্যায় সুপারশপ স্বপ্ন অনলাইন ও চালডাল ডটকমকে দেড় হাজার কেজি করে পেঁয়াজ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

অন্যদিকে পেঁয়াজ আমদানির ক্ষেত্রে ঋণপত্র (এলসি) খোলার বিশেষ সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে সর্বোচ্চ ৯০ দিন পর্যন্ত বাকিতে এলসি খুলে পেঁয়াজ আমদানি করতে পারবেন ব্যবসায়ীরা। আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সুযোগ বলবৎ থাকবে। সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে।

এর আগে পেঁয়াজ আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। আর পেঁয়াজ আমদানির এলসি মার্জিন ন্যূনতম রাখার নির্দেশ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক টিম বাজার তদারকি করছে। পাশাপাশি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের পক্ষ থেকে তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

ভারতে আটকে থাকা কিছু সংখ্যক পেঁয়াজবাহী ট্রাক এবং মিয়ানমার থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ দেশে ঢুকলেও এখনও বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, বাজার মনিটরিং টিম পেঁয়াজের দাম কমাতে পাইকারি ও খুচরা বাজারে এসে তদারকি করছে। নানা অজুহাতে জরিমানা করছে।

তবে আমদানিকারক পর্যায়ে তদারকি করা না হলে পেঁয়াজের দর কমবে না। বরং ভোক্তার বেশি দরেই পেঁয়াজ কিনতে হবে। কারণ, ভারতের রফতানি বন্ধের ঘোষণার পর আমদানি পর্যায়ে পেঁয়াজের দাম বাড়ানো হয়েছে। সেখান থেকে বেশি দরে এনে পাইকারি বিক্রেতাদের বেশি দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে।

শিবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, এদিন নতুন করে ভারত থেকে কোনো ট্রাক বাংলাদেশে ছাড় করা হয়নি। সোনামসজিদ স্থলবন্দরে যেসব ট্রাক আটকে ছিল সেখান থেকে ১০টি ট্রাক বাদে অন্যান্য ট্রাক ভারতের নাসিক অঞ্চলে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে। কারণ, সেগুলোয় পেঁয়াজ পুরোপুরি পচে গেছে। এ ছাড়া সোমবার পর্যন্ত যে ১০টি ট্রাক ভারতে স্থলবন্দরে আছে সেগুলো আজ (মঙ্গলবার) ফিরিয়ে নেয়া হবে।

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, সোমবার ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে আরও ৪ ট্রাকে ১০০ টন পেঁয়াজ দেশে প্রবেশ করেছে। সব মিলিয়ে ভারত থেকে তিনটি স্থলবন্দর দিয়ে শনিবার ১২০৬ টন পেঁয়াজ ভারত থেকে দেশে ঢোকে। রোববার এসেছে ১০৮ টন এবং সোমবার আরও ১০০ টন মিলে মোট ১৪১৪ টন পেঁয়াজ দেশে ঢুকেছে। যার মান অনেক খারাপ। প্রায় অর্ধেকের বেশি পচে গেছে।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনসাস কনজুমার্স সোসাইটির (সিসিএস) নির্বাহী পরিচালক পলাশ মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, বাজারে আমদানিকারকদের কারসাজিতেই পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। তবে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদেরও দোষ আছে। কিন্তু সরকারের উদ্যোগ ও ক্রেতারা পণ্যটি কেনা থেকে বিরত থাকায় কয়েকদিন ধরে পেঁয়াজের দাম কমেছে।

তবে গত আগস্টে যে পেঁয়াজ ভোক্তা প্রতি কেজি ৪০ টাকা দরে কিনেছে, তা এখন ৮০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। যা দুই দিন ধরে একই দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে এটা বলা যায়, উচ্চমূল্যে বাজার স্থিতিশীল আছে। কারণ, একাধিক সংস্থার দুর্বল মনিটরিং এর জন্য দায়ী। তারা দাম কমাতে লোকদেখানো বাজার তদারকি করছে। পণ্যের দাম বাড়ার পর পাইকারি ও খুচরা বাজার তদারকিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। কিন্তু যে বা যারা দাম বাড়িয়ে অতি মুনাফা করে ভোক্তার পকেট কাটছে, তাদের ধরা থেকে বিরত থাকছে।

কারওয়ান বাজারের পাইকারি বিক্রেতা মো. আসরাফ যুগান্তরকে বলেন, যখনই পেঁয়াজের দাম বাড়ে সরকারের বাজার তদারকি টিম কারওয়ান বাজারের পেঁয়াজের আড়তে অভিযান পরিচালনা করে। আমাদের কাছে কেনার রসিদ দেখতে চান। আর কত দামে বিক্রি করছি তা দেখতে চায়। কিন্তু এই কেনার রসিদ দেখে কী হবে? আমরা বেশি দরে আনলে রসিদে বেশি দামই উল্লেখ থাকে।

কিন্তু কোনো কারণে সেই রসিদ নিয়ে একটু সমস্যা হলে জরিমানা করা হয়। তবে যেসব আমদানিকারকের কাছে আমরা একদিনের ব্যবধানে ৩০-৪০ টাকা বেশি দরে পেঁয়াজ আনলাম বা যারা বাজার অস্থিতিশীল করল, তাদের কোনো জেল-জরিমানা করছে না। তাহলে কি সেসব আমদানিকারক অনেক প্রভাবশালী?

তিনি বলেন, আমাদের মতো দিন এনে দিন বিক্রি করা বিক্রেতাদের স্থলে তদারকি না করে যারা কলকাঠি নাড়ছে, সেখানে তদারকি করা দরকার। তাহলে দাম বাড়ানোর পেছনে আসল হোতারা বের হয়ে আসবে। এতে পেঁয়াজের দাম কমবে। ভোক্তারাও সুফল পাবেন। এখন যে তদারকি করা হচ্ছে এতে ভোক্তা কোনো ধরনের সুফল পাচ্ছেন না।

শ্যামবাজারের পাইকারি বিক্রেতা মো. আলাউদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, পেঁয়াজের দাম কমাতে হলে আমদানি পর্যায়ে অভিযান পরিচালনা করা দরকার। তিনি বলেন, বিষয়টি খুব সহজ। একজন আমদানিকারক তার পেঁয়াজ কবে দেশে এনেছেন, ক’টাকায় এনেছেন, কত টাকায় বিক্রি করেছেন, আর ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের ঘোষণার দিন কত টাকায় বিক্রি করেছেন।

সেখানেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে কারা পেঁয়াজের বাজার অস্থিতিশীল করে রেখেছেন। আর আমরা সাধারণ বিক্রেতারা যদি বেশি দরে কিনে আনি, তাহলে বেশি দরেই বিক্রি করতে হবে। এর প্রভাব অবশ্যই খুচরা বাজারে পড়বে। তবে শুরুতে দাম যা বাড়ানোর আমদানিকারক পর্যায় থেকেই বাড়ানো হয়েছে। আর ধরা হচ্ছে আমাদের। জরিমানা গুনতে হচ্ছে আমাদের।

জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মাসুম আরেফিন বলেন, পেঁয়াজের দাম কমাতে অধিদফতরের একাধিক টিম বাজারে কাজ করছে। কোনো অনিয়ম পেলে সঙ্গে সঙ্গে ভোক্তা আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। অনেক সময় সচেতন করা হচ্ছে। তবে যে বা যারা দাম বাড়িয়েছে তাদের ছাড় দেয়া হবে না।

অনলাইনে পেঁয়াজ : অনলাইনে টিসিবির পেঁয়াজ কিনতে ক্রেতাদের হিড়িক পড়েছে। সবচেয়ে বেশি হিড়িক পড়েছে ধানমণ্ডি, গুলশান ও বনশ্রীতে। স্বপ্ন অনলাইন ও চালডাল ডটকম সোমবার দুপুর ১২টার পর থেকে টিসিবির পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করে। এরপরই হুমড়ি খেয়ে পড়েন ক্রেতারা। টিসিবি সূত্র বলছে, রোববার সন্ধ্যায় সুপারশপ স্বপ্ন অনলাইন ও চালডাল ডটকমকে দেড় হাজার কেজি করে পেঁয়াজ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান চালডাল ডটকম ও স্বপ্ন অনলাইন সূত্র বলছে, অনলাইনে বিক্রি শুরুর পর থেকে বিভিন্ন স্থান থেকে পেঁয়াজের অর্ডার পেয়েছেন। তবে অভিজাত এলাকা ধানমণ্ডি, গুলশান, উত্তরা ও বনশ্রী এলাকা থেকে অর্ডার বেশি আসছে। এ ছাড়া মিরপুর, মিরপুর ডিওএইচএস, রাজারবাগ থেকেও অর্ডার পাওয়া যাচ্ছে।

বাকিতে পেঁয়াজ আমদানি : পেঁয়াজ আমদানির ক্ষেত্রে ঋণপত্র (এলসি) খোলার বিশেষ সুযোগ দিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে সর্বোচ্চ ৯০ দিন পর্যন্ত বাকিতে এলসি খুলে পেঁয়াজ আমদানি করতে পারবেন ব্যবসায়ীরা। আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সুযোগ বলবৎ থাকবে। সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে।

দেশে কার্যরত সব অথরাইজড ডিলারের কাছে পাঠানো সার্কুলারে বলা হয়: আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত অথরাইজড ডিলার ব্যাংকগুলোয় বাকিতে পেঁয়াজ আমদানির জন্য ডেফার্ড এলসি খুলতে পারবেন আমদানিকারকরা। পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে সার্কুলারে বলা হয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মোহাম্মদ খুরশীদ ওয়াহাব যুগান্তরকে বলেন, পেঁয়াজ আমদানিতে কিছুটা ছাড় দেয়া হয়েছে। এখন থেকে আমদানিকারকরা ৯০ দিনের বাকিতে পেঁয়াজ আমদানি করতে পারবেন।

দু’দিন ধরে উচ্চমূল্য অপরিবর্তিত

পেঁয়াজের ঝাঁজ কমছে না নানা উদ্যোগেও

 ইয়াসিন রহমান 
২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারের নানা উদ্যোগেও কমছে না পেঁয়াজের ঝাঁজ। গত দু’দিন ধরে পাইকারি ও খুচরা বাজারে দেশি ও আমদানি করা পেঁয়াজের উচ্চমূল্য অপরিবর্তিত আছে। দুর্বল তদারকির কারণেই মূলত এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভারত রফতানি বন্ধ ঘোষণার পরদিন (১৫ সেপ্টেম্বর) প্রতি কেজি পেঁয়াজ দেশের খুচরা বাজারে বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ ১২০ টাকা। সোমবার ছয় দিনের ব্যবধানে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটি কেজিতে ৩৫ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে ৮৫ টাকা। যা গত দু’দিন ধরে বহাল আছে। তবে গত ৩০ আগস্ট খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ৪০ টাকা। ফলে পণ্যটি কিনতে ভোক্তার এখন বাড়তি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে।

সোমবার রাজধানীর সর্ববৃহৎ পাইকারি আড়ত শ্যামবাজারে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৬৫-৭০ টাকা। যা রোববার একই দাম ছিল। এ ছাড়া আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৫০-৫৫ টাকা কেজি। যা আগের দিন একই ছিল। এ ছাড়া রাজধানীর খুচরা বাজারেও গত দু’দিন একই দামে বিক্রি হয়েছে। প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৮০-৮৫ টাকা এবং আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৬০-৭০ টাকা কেজি।

এদিকে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ট্রাক সেলে ন্যায্যমূল্যে পেঁয়াজ বিক্রির পাশাপাশি অনলাইনে বিক্রিতে প্রথমদিনই ব্যাপক সাড়া পড়েছে। ন্যায্যমূল্যে পণ্যটি কিনতে ক্রেতাদের হিড়িক পড়েছে উত্তরা, ধানমণ্ডি, গুলশান ও বনশ্রীতে।

সোমবার দুটি প্রতিষ্ঠান-স্বপ্ন অনলাইন ও চালডাল ডটকম সোমবার দুপুর ১২টার পর থেকে টিসিবির পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করে। এরপরই অনলাইনে হুমড়ি খেয়ে পড়েন ক্রেতারা। টিসিবি সূত্র বলছে, রোববার সন্ধ্যায় সুপারশপ স্বপ্ন অনলাইন ও চালডাল ডটকমকে দেড় হাজার কেজি করে পেঁয়াজ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

অন্যদিকে পেঁয়াজ আমদানির ক্ষেত্রে ঋণপত্র (এলসি) খোলার বিশেষ সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে সর্বোচ্চ ৯০ দিন পর্যন্ত বাকিতে এলসি খুলে পেঁয়াজ আমদানি করতে পারবেন ব্যবসায়ীরা। আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সুযোগ বলবৎ থাকবে। সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে।

এর আগে পেঁয়াজ আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। আর পেঁয়াজ আমদানির এলসি মার্জিন ন্যূনতম রাখার নির্দেশ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক টিম বাজার তদারকি করছে। পাশাপাশি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের পক্ষ থেকে তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

ভারতে আটকে থাকা কিছু সংখ্যক পেঁয়াজবাহী ট্রাক এবং মিয়ানমার থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ দেশে ঢুকলেও এখনও বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, বাজার মনিটরিং টিম পেঁয়াজের দাম কমাতে পাইকারি ও খুচরা বাজারে এসে তদারকি করছে। নানা অজুহাতে জরিমানা করছে।

তবে আমদানিকারক পর্যায়ে তদারকি করা না হলে পেঁয়াজের দর কমবে না। বরং ভোক্তার বেশি দরেই পেঁয়াজ কিনতে হবে। কারণ, ভারতের রফতানি বন্ধের ঘোষণার পর আমদানি পর্যায়ে পেঁয়াজের দাম বাড়ানো হয়েছে। সেখান থেকে বেশি দরে এনে পাইকারি বিক্রেতাদের বেশি দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে।

শিবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, এদিন নতুন করে ভারত থেকে কোনো ট্রাক বাংলাদেশে ছাড় করা হয়নি। সোনামসজিদ স্থলবন্দরে যেসব ট্রাক আটকে ছিল সেখান থেকে ১০টি ট্রাক বাদে অন্যান্য ট্রাক ভারতের নাসিক অঞ্চলে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে। কারণ, সেগুলোয় পেঁয়াজ পুরোপুরি পচে গেছে। এ ছাড়া সোমবার পর্যন্ত যে ১০টি ট্রাক ভারতে স্থলবন্দরে আছে সেগুলো আজ (মঙ্গলবার) ফিরিয়ে নেয়া হবে।

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, সোমবার ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে আরও ৪ ট্রাকে ১০০ টন পেঁয়াজ দেশে প্রবেশ করেছে। সব মিলিয়ে ভারত থেকে তিনটি স্থলবন্দর দিয়ে শনিবার ১২০৬ টন পেঁয়াজ ভারত থেকে দেশে ঢোকে। রোববার এসেছে ১০৮ টন এবং সোমবার আরও ১০০ টন মিলে মোট ১৪১৪ টন পেঁয়াজ দেশে ঢুকেছে। যার মান অনেক খারাপ। প্রায় অর্ধেকের বেশি পচে গেছে।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনসাস কনজুমার্স সোসাইটির (সিসিএস) নির্বাহী পরিচালক পলাশ মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, বাজারে আমদানিকারকদের কারসাজিতেই পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। তবে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদেরও দোষ আছে। কিন্তু সরকারের উদ্যোগ ও ক্রেতারা পণ্যটি কেনা থেকে বিরত থাকায় কয়েকদিন ধরে পেঁয়াজের দাম কমেছে।

তবে গত আগস্টে যে পেঁয়াজ ভোক্তা প্রতি কেজি ৪০ টাকা দরে কিনেছে, তা এখন ৮০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। যা দুই দিন ধরে একই দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে এটা বলা যায়, উচ্চমূল্যে বাজার স্থিতিশীল আছে। কারণ, একাধিক সংস্থার দুর্বল মনিটরিং এর জন্য দায়ী। তারা দাম কমাতে লোকদেখানো বাজার তদারকি করছে। পণ্যের দাম বাড়ার পর পাইকারি ও খুচরা বাজার তদারকিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। কিন্তু যে বা যারা দাম বাড়িয়ে অতি মুনাফা করে ভোক্তার পকেট কাটছে, তাদের ধরা থেকে বিরত থাকছে।

কারওয়ান বাজারের পাইকারি বিক্রেতা মো. আসরাফ যুগান্তরকে বলেন, যখনই পেঁয়াজের দাম বাড়ে সরকারের বাজার তদারকি টিম কারওয়ান বাজারের পেঁয়াজের আড়তে অভিযান পরিচালনা করে। আমাদের কাছে কেনার রসিদ দেখতে চান। আর কত দামে বিক্রি করছি তা দেখতে চায়। কিন্তু এই কেনার রসিদ দেখে কী হবে? আমরা বেশি দরে আনলে রসিদে বেশি দামই উল্লেখ থাকে।

কিন্তু কোনো কারণে সেই রসিদ নিয়ে একটু সমস্যা হলে জরিমানা করা হয়। তবে যেসব আমদানিকারকের কাছে আমরা একদিনের ব্যবধানে ৩০-৪০ টাকা বেশি দরে পেঁয়াজ আনলাম বা যারা বাজার অস্থিতিশীল করল, তাদের কোনো জেল-জরিমানা করছে না। তাহলে কি সেসব আমদানিকারক অনেক প্রভাবশালী?

তিনি বলেন, আমাদের মতো দিন এনে দিন বিক্রি করা বিক্রেতাদের স্থলে তদারকি না করে যারা কলকাঠি নাড়ছে, সেখানে তদারকি করা দরকার। তাহলে দাম বাড়ানোর পেছনে আসল হোতারা বের হয়ে আসবে। এতে পেঁয়াজের দাম কমবে। ভোক্তারাও সুফল পাবেন। এখন যে তদারকি করা হচ্ছে এতে ভোক্তা কোনো ধরনের সুফল পাচ্ছেন না।

শ্যামবাজারের পাইকারি বিক্রেতা মো. আলাউদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, পেঁয়াজের দাম কমাতে হলে আমদানি পর্যায়ে অভিযান পরিচালনা করা দরকার। তিনি বলেন, বিষয়টি খুব সহজ। একজন আমদানিকারক তার পেঁয়াজ কবে দেশে এনেছেন, ক’টাকায় এনেছেন, কত টাকায় বিক্রি করেছেন, আর ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের ঘোষণার দিন কত টাকায় বিক্রি করেছেন।

সেখানেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে কারা পেঁয়াজের বাজার অস্থিতিশীল করে রেখেছেন। আর আমরা সাধারণ বিক্রেতারা যদি বেশি দরে কিনে আনি, তাহলে বেশি দরেই বিক্রি করতে হবে। এর প্রভাব অবশ্যই খুচরা বাজারে পড়বে। তবে শুরুতে দাম যা বাড়ানোর আমদানিকারক পর্যায় থেকেই বাড়ানো হয়েছে। আর ধরা হচ্ছে আমাদের। জরিমানা গুনতে হচ্ছে আমাদের।

জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মাসুম আরেফিন বলেন, পেঁয়াজের দাম কমাতে অধিদফতরের একাধিক টিম বাজারে কাজ করছে। কোনো অনিয়ম পেলে সঙ্গে সঙ্গে ভোক্তা আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। অনেক সময় সচেতন করা হচ্ছে। তবে যে বা যারা দাম বাড়িয়েছে তাদের ছাড় দেয়া হবে না।

অনলাইনে পেঁয়াজ : অনলাইনে টিসিবির পেঁয়াজ কিনতে ক্রেতাদের হিড়িক পড়েছে। সবচেয়ে বেশি হিড়িক পড়েছে ধানমণ্ডি, গুলশান ও বনশ্রীতে। স্বপ্ন অনলাইন ও চালডাল ডটকম সোমবার দুপুর ১২টার পর থেকে টিসিবির পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করে। এরপরই হুমড়ি খেয়ে পড়েন ক্রেতারা। টিসিবি সূত্র বলছে, রোববার সন্ধ্যায় সুপারশপ স্বপ্ন অনলাইন ও চালডাল ডটকমকে দেড় হাজার কেজি করে পেঁয়াজ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান চালডাল ডটকম ও স্বপ্ন অনলাইন সূত্র বলছে, অনলাইনে বিক্রি শুরুর পর থেকে বিভিন্ন স্থান থেকে পেঁয়াজের অর্ডার পেয়েছেন। তবে অভিজাত এলাকা ধানমণ্ডি, গুলশান, উত্তরা ও বনশ্রী এলাকা থেকে অর্ডার বেশি আসছে। এ ছাড়া মিরপুর, মিরপুর ডিওএইচএস, রাজারবাগ থেকেও অর্ডার পাওয়া যাচ্ছে।

বাকিতে পেঁয়াজ আমদানি : পেঁয়াজ আমদানির ক্ষেত্রে ঋণপত্র (এলসি) খোলার বিশেষ সুযোগ দিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে সর্বোচ্চ ৯০ দিন পর্যন্ত বাকিতে এলসি খুলে পেঁয়াজ আমদানি করতে পারবেন ব্যবসায়ীরা। আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সুযোগ বলবৎ থাকবে। সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে।

দেশে কার্যরত সব অথরাইজড ডিলারের কাছে পাঠানো সার্কুলারে বলা হয়: আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত অথরাইজড ডিলার ব্যাংকগুলোয় বাকিতে পেঁয়াজ আমদানির জন্য ডেফার্ড এলসি খুলতে পারবেন আমদানিকারকরা। পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে সার্কুলারে বলা হয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মোহাম্মদ খুরশীদ ওয়াহাব যুগান্তরকে বলেন, পেঁয়াজ আমদানিতে কিছুটা ছাড় দেয়া হয়েছে। এখন থেকে আমদানিকারকরা ৯০ দিনের বাকিতে পেঁয়াজ আমদানি করতে পারবেন।

 

ঘটনাপ্রবাহ : পেঁয়াজের বাজার আবারও অস্থির

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০