নৌকার মাঝি শামীম ওসমানই বিএনপিতে একাধিক প্রার্থী
jugantor
নৌকার মাঝি শামীম ওসমানই বিএনপিতে একাধিক প্রার্থী

  রাজু আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ  

০৯ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ফতুল্লা আসন

জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে এলেই দেশের অন্যতম শিল্পাঞ্চল ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ নিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনটি আলোচনায় চলে আসে।

দেশের রফতানি আয়ের বৃহত্তম নিট সেক্টরের প্রধান কেন্দ্র ফতুল্লায়। কালের সাক্ষী বিলুপ্ত আদমজী জুট মিল এখন আদমজী ইপিজেড রূপে- এটিও সিদ্ধিরগঞ্জে।

শ্রমঘন এ অঞ্চলে নৌকা, ধানের শীষ ও লাঙ্গলের ভোটযুদ্ধ জমে ওঠে প্রতিবারই। সিদ্ধিরগঞ্জের একটি বড় অংশ নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন।

আগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের টিকিটে ভোটযুদ্ধে নামবেন বর্তমান এমপি শামীম ওসমান। তিনিই আওয়ামী লীগের একমাত্র প্রার্থী।

এদিক থেকে আওয়ামী লীগ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও মনোনয়ন-যুদ্ধে বিএনপির একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে।

তবে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে দলীয় কোন্দল। এ আসনে জয়ের তালিকায় আওয়ামী লীগের পাল্লাই ভারি। ১৯৯৭০ সালের ভোটে এমএলএ হন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য একেএম সামসুজ্জোহা।

১৯৭৩ সালে এমপি হন আওয়ামী লীগের আফজাল হোসেন। ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে এমপি হন জাতীয় পার্টির তৎকালীন পাটমন্ত্রী আবদুস সাত্তার। নব্বইয়ের পটপরিবর্তনের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ১৯৯১ সালে এমপি হন বিএনপির প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম।

১৯৯৬ সালের ভোটে সিরাজুলকে হারিয়ে এমপি হন একেএম শামীম ওসমান। ২০০১ সালের ভোটে বিজয়ী হন কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সহসভাপতি পদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেয়া গিয়াস উদ্দিন।

২০০৮ সালের ভোটে একটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় প্রার্থী হতে পারেননি শামীম ওসমান। তখন শামীম ওসমানের চাচি ও চিত্র নায়িকা সারাহ বেগম কবরী আওয়ামী লীগের টিকিটে এমপি হন। তবে ২০১৪ সালের ভোটে ছিটকে পড়েন কবরী, ফের এমপি হন শামীম ওসমান।

১৯৯৬ সালে শামীম ওসমান এমপি হওয়ার পর এলাকার চেহারা পাল্টে যেতে শুরু করে। দুর্গম চরাঞ্চল বক্তাবলী ইউনিয়নকে উপশহরে রূপ দেয়া হয়।

ফতুল্লায় খান সাহেব ওসমান আলী ক্রিকেট স্টেডিয়াম, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডসহ প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয় শামীম ওসমানের প্রচেষ্টায়।

আওয়ামী লীগ ব্যাপক শক্তিশালী হয়ে ওঠে। যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে নারায়ণগঞ্জে নিষিদ্ধ ঘোষণা, দেশে সর্বপ্রথম যুদ্ধাপরাধীদের প্রতীকী ফাঁসি দেয়াসহ টানবাজার পতিতাপল্লী উচ্ছেদ করে শামীম ওসমান প্রতিক্রিয়াশীলদের চক্ষুশূল হন।

ফলে ২০০১ সালের ১৬ জুন তাকে হত্যা করতে চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলা করা হয়। ২০০১ সালের ভোটে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে উপরের নির্দেশে তিনি দেশত্যাগ করেন।

প্রবাস থেকেও নারায়ণগঞ্জে সক্রিয় ছিলেন শামীম ওসমান। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালের ভোটে শামীম ওসমানের কর্মী-সমর্থকদের সহযোগিতা নিয়ে বিজয়ী হন কবরী।

কিন্তু জয়ী হওয়ার পরদিনই জেলে ঢোকানো হয় ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী, ফতুল্লা থানা যুবলীগের সভাপতি মীর সোহেলসহ কয়েক জনকে।

সমালোচিত হন কবরী। দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতারা চলে যান আড়ালে। বিসিকের ঝুট সেক্টরে মহড়া দেয়া, প্রকাশ্যে টেন্ডারবাজি, মার্কেট দখল, বালুমহালের দখল নিয়ে শ্রমিকদের ওপর গুলিবর্ষণের মতো ঘটনায় কবরীর ‘মিষ্টি মেয়ে’র ইমেজ ক্ষুণ্ণ হতে থাকে। অপরদিকে ৯ম সংসদ নির্বাচনে সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকাটি সোনারগাঁ আসনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় নিগ্রহ আর অবহেলার শিকার হন সিদ্ধিরগঞ্জ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।

তবে দল ক্ষমতায় থাকাবস্থায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বৈরী সময় পার করলেও দলের ভিতকে দুর্বল হতে দেননি শামীম ওসমান। দলের নেতাকর্মীরা বলছেন, শামীম ওসমানের রাজনৈতিক ক্যারিশমায় এ আসনে তার বিকল্প নেই।

কথা হয় ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাইফ উল্লাহ বাদল, সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুজিবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিনের সঙ্গে।

তারা অভিন্ন সুরে যুগান্তরকে বলেন, দল ও নেত্রীর প্রশ্নে আপস করেন না বলেই শামীম ওসমানের পক্ষে নেতাকর্মীরা অবিচল। এলাকায় কোনো কোন্দল নেই।

বর্তমান এমপি এলাকার উন্নয়নকে সর্বাগ্রে অবস্থান দিয়েছেন বলেই সাধারণ মানুষ তার পক্ষে। তিনি শুধু রাজনৈতিক সভা-সমাবেশই নয়, বছরে কমপক্ষে শতাধিক ওয়াজ মাহফিলে অংশ নেন। সেখানে ইসলামী ব্যাখ্যা দিয়ে মাদক ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখছেন।

শ্রমিক লীগ নেতা কাউসার আহম্মেদ পলাশের মনোনয়ন প্রত্যাশার ব্যাপারে তারা বলেন, আমাদের মনে হচ্ছে পলাশকে তৃতীয় কোনো পক্ষ উসকে দিচ্ছে।

বিশেষ করে দলের এক শীর্ষ নেতা পলাশের বাড়িতে যাওয়ার পর থেকেই এ প্রপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে। তবে সাধারণের মাঝে পলাশকে নিয়ে কোনো আলোচনা নেই।

আগামী নির্বাচন নিয়ে কথা হয় শামীম ওসমানের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ১৯৯৬ সালের পর আমি ২০১৪ সালে নির্বাচিত হয়েছি।

মাঝখানে দীর্ঘ ১২ বছর এলাকার কাক্সিক্ষত উন্নয়ন হয়নি। এ শূন্যতা পূরণে অনেক বেশি শ্রম দিতে হয়েছে। ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছায় প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ করতে পেরেছিলাম যা ছিল রেকর্ড।

এবার তার চেয়েও বেশি টাকার কাজ হয়েছে। এর মধ্যেই ডিএনডির স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প, ঢাকা নারায়ণগঞ্জে ডাবল ট্রেন লাইনের জন্য প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প রয়েছে। তিনি বলেন, আমার মাতৃতুল্য জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে শিখেছি মানুষকে সেবা করার নামই রাজনীতি।

আমি মনে করি রাজনীতি হল ইবাদতের মতো। বড় বিষয় হচ্ছে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনা। তাহলে দেশ এগিয়ে যাবে, জঙ্গিবাদ থাকবে না, মানুষের মুখে হাসি ফুটবে।

শামীম ওসমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাকে সেবা করার সুযোগ দিলে নির্বাচন করব। এদিকে আগামী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি আসনটি পুনরুদ্ধার করতে চাইলেও মনোনয়ন নিয়েই দলে ত্রিমুখী প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।

মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছেন- সাবেক এমপি ও দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য গিয়াস উদ্দিন, কল্যাণ পার্টির সাবেক কেন্দ্রীয় কোষাধ্যক্ষ ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শিল্পপতি শাহ আলম এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ।

দলীয় সূত্র জানায়, এমপি হওয়ার আগে জাতীয় পার্টি থেকে সদরে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন গিয়াস উদ্দিন। ২০০১ সালে এমপি হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসে মদদ দেয়ার অভিযোগ ওঠে।

খোদ তৎকালীন বিআরটিসির চেয়ারম্যান ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারের ছোট ভাই ব্যবসায়ী নেতা সাব্বির আলম খন্দকার হত্যা, চুন ব্যবসায়ী সুন্দর আলী, আওয়ামী লীগ নেতা কফিল উদ্দিনসহ বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ড নিয়ে সমালোচিত হন গিয়াস উদ্দিন।

এমপি থাকার সময় ডেমরার ‘দুর্ধর্ষ’ সন্ত্রাসী জামান ও সেলিমকে সার্বক্ষণিক সঙ্গী রাখার অভিযোগ ওঠে এমপি গিয়াস উদ্দিনের বিরুদ্ধে।

বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান, গিয়াস উদ্দিনকে দলের কর্মসূচিতে পাওয়া যায় না। উল্টো তিনি ১৫ আগস্ট পালন করে এবং সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচিত মেয়র আইভীকে মিষ্টি খাইয়ে সমালোচিত হয়েছেন।

গিয়াস উদ্দিন বলেন, তৃণমূল থেকে রাজনীতি করে আজ আমি এ পর্যায়ে উঠে এসেছি। এ আসনের প্রতিটি এলাকা আমার চেনা। প্রতিটি মানুষ আমার পরিচিত।

সাধারণ ভোটারদের সমর্থনের বিষয়টি চিন্তায় রেখে মনোনয়ন দেয়া হলে ইতিবাচক হবে। মনোনয়নের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।

অপরদিকে ২০০৮ সালের নির্বাচনে কল্যাণ পার্টি থেকে বিএনপিতে আসা শাহ আলম অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হওয়ার পর ফতুল্লার নেতাকর্মীরা তার ওপর নির্ভরশীল হতে শুরু করলেও শাহ আলম সব সময় মাঠের রাজনীতি থেকে দূরে আছেন।

ফতুল্লা বিএনপি ও সহযোগী দলের নেতাকর্মীরা জানান, দলের কোনো কর্মসূচিতে শাহ আলমকে আমরা কাছে পাই না। তিনি রাজনীতিকেও ব্যবসা মনে করেন।

শাহ আলম জানান, ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলাম। ওই নির্বাচনে আমাকে জোর করে হারানো হয়েছিল। আমার জয় ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল।

শাহ আলম বলেন, আমি সুস্থধারার রাজনীতি করি। আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়ন চাইব। মনোনয়ন পেলে এবং জনগণ নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারলে জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।

অধ্যাপক মামুন মাহমুদ বলেন, জেলা যুবদলের সভাপতি থেকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়ে দল তাকে মূল্যায়ন করেছে। আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়ে দল তাকে আরেকবার মূল্যায়ন করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করছেন।

নৌকার মাঝি শামীম ওসমানই বিএনপিতে একাধিক প্রার্থী

 রাজু আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ 
০৯ এপ্রিল ২০১৮, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
ফতুল্লা আসন
শামীম ওসমান, শাহ আলম, গিয়াস উদ্দিন ও মামুন মাহমুদ

জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে এলেই দেশের অন্যতম শিল্পাঞ্চল ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ নিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনটি আলোচনায় চলে আসে।

দেশের রফতানি আয়ের বৃহত্তম নিট সেক্টরের প্রধান কেন্দ্র ফতুল্লায়। কালের সাক্ষী বিলুপ্ত আদমজী জুট মিল এখন আদমজী ইপিজেড রূপে- এটিও সিদ্ধিরগঞ্জে।

শ্রমঘন এ অঞ্চলে নৌকা, ধানের শীষ ও লাঙ্গলের ভোটযুদ্ধ জমে ওঠে প্রতিবারই। সিদ্ধিরগঞ্জের একটি বড় অংশ নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন।

আগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের টিকিটে ভোটযুদ্ধে নামবেন বর্তমান এমপি শামীম ওসমান। তিনিই আওয়ামী লীগের একমাত্র প্রার্থী।

এদিক থেকে আওয়ামী লীগ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও মনোনয়ন-যুদ্ধে বিএনপির একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে।

তবে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে দলীয় কোন্দল। এ আসনে জয়ের তালিকায় আওয়ামী লীগের পাল্লাই ভারি। ১৯৯৭০ সালের ভোটে এমএলএ হন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য একেএম সামসুজ্জোহা।

১৯৭৩ সালে এমপি হন আওয়ামী লীগের আফজাল হোসেন। ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে এমপি হন জাতীয় পার্টির তৎকালীন পাটমন্ত্রী আবদুস সাত্তার। নব্বইয়ের পটপরিবর্তনের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ১৯৯১ সালে এমপি হন বিএনপির প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম।

১৯৯৬ সালের ভোটে সিরাজুলকে হারিয়ে এমপি হন একেএম শামীম ওসমান। ২০০১ সালের ভোটে বিজয়ী হন কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সহসভাপতি পদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেয়া গিয়াস উদ্দিন।

২০০৮ সালের ভোটে একটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় প্রার্থী হতে পারেননি শামীম ওসমান। তখন শামীম ওসমানের চাচি ও চিত্র নায়িকা সারাহ বেগম কবরী আওয়ামী লীগের টিকিটে এমপি হন। তবে ২০১৪ সালের ভোটে ছিটকে পড়েন কবরী, ফের এমপি হন শামীম ওসমান।

১৯৯৬ সালে শামীম ওসমান এমপি হওয়ার পর এলাকার চেহারা পাল্টে যেতে শুরু করে। দুর্গম চরাঞ্চল বক্তাবলী ইউনিয়নকে উপশহরে রূপ দেয়া হয়।

ফতুল্লায় খান সাহেব ওসমান আলী ক্রিকেট স্টেডিয়াম, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডসহ প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয় শামীম ওসমানের প্রচেষ্টায়।

আওয়ামী লীগ ব্যাপক শক্তিশালী হয়ে ওঠে। যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে নারায়ণগঞ্জে নিষিদ্ধ ঘোষণা, দেশে সর্বপ্রথম যুদ্ধাপরাধীদের প্রতীকী ফাঁসি দেয়াসহ টানবাজার পতিতাপল্লী উচ্ছেদ করে শামীম ওসমান প্রতিক্রিয়াশীলদের চক্ষুশূল হন।

ফলে ২০০১ সালের ১৬ জুন তাকে হত্যা করতে চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলা করা হয়। ২০০১ সালের ভোটে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে উপরের নির্দেশে তিনি দেশত্যাগ করেন।

প্রবাস থেকেও নারায়ণগঞ্জে সক্রিয় ছিলেন শামীম ওসমান। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালের ভোটে শামীম ওসমানের কর্মী-সমর্থকদের সহযোগিতা নিয়ে বিজয়ী হন কবরী।

কিন্তু জয়ী হওয়ার পরদিনই জেলে ঢোকানো হয় ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী, ফতুল্লা থানা যুবলীগের সভাপতি মীর সোহেলসহ কয়েক জনকে।

সমালোচিত হন কবরী। দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতারা চলে যান আড়ালে। বিসিকের ঝুট সেক্টরে মহড়া দেয়া, প্রকাশ্যে টেন্ডারবাজি, মার্কেট দখল, বালুমহালের দখল নিয়ে শ্রমিকদের ওপর গুলিবর্ষণের মতো ঘটনায় কবরীর ‘মিষ্টি মেয়ে’র ইমেজ ক্ষুণ্ণ হতে থাকে। অপরদিকে ৯ম সংসদ নির্বাচনে সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকাটি সোনারগাঁ আসনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় নিগ্রহ আর অবহেলার শিকার হন সিদ্ধিরগঞ্জ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।

তবে দল ক্ষমতায় থাকাবস্থায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বৈরী সময় পার করলেও দলের ভিতকে দুর্বল হতে দেননি শামীম ওসমান। দলের নেতাকর্মীরা বলছেন, শামীম ওসমানের রাজনৈতিক ক্যারিশমায় এ আসনে তার বিকল্প নেই।

কথা হয় ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাইফ উল্লাহ বাদল, সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুজিবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিনের সঙ্গে।

তারা অভিন্ন সুরে যুগান্তরকে বলেন, দল ও নেত্রীর প্রশ্নে আপস করেন না বলেই শামীম ওসমানের পক্ষে নেতাকর্মীরা অবিচল। এলাকায় কোনো কোন্দল নেই।

বর্তমান এমপি এলাকার উন্নয়নকে সর্বাগ্রে অবস্থান দিয়েছেন বলেই সাধারণ মানুষ তার পক্ষে। তিনি শুধু রাজনৈতিক সভা-সমাবেশই নয়, বছরে কমপক্ষে শতাধিক ওয়াজ মাহফিলে অংশ নেন। সেখানে ইসলামী ব্যাখ্যা দিয়ে মাদক ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখছেন।

শ্রমিক লীগ নেতা কাউসার আহম্মেদ পলাশের মনোনয়ন প্রত্যাশার ব্যাপারে তারা বলেন, আমাদের মনে হচ্ছে পলাশকে তৃতীয় কোনো পক্ষ উসকে দিচ্ছে।

বিশেষ করে দলের এক শীর্ষ নেতা পলাশের বাড়িতে যাওয়ার পর থেকেই এ প্রপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে। তবে সাধারণের মাঝে পলাশকে নিয়ে কোনো আলোচনা নেই।

আগামী নির্বাচন নিয়ে কথা হয় শামীম ওসমানের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ১৯৯৬ সালের পর আমি ২০১৪ সালে নির্বাচিত হয়েছি।

মাঝখানে দীর্ঘ ১২ বছর এলাকার কাক্সিক্ষত উন্নয়ন হয়নি। এ শূন্যতা পূরণে অনেক বেশি শ্রম দিতে হয়েছে। ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছায় প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ করতে পেরেছিলাম যা ছিল রেকর্ড।

এবার তার চেয়েও বেশি টাকার কাজ হয়েছে। এর মধ্যেই ডিএনডির স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প, ঢাকা নারায়ণগঞ্জে ডাবল ট্রেন লাইনের জন্য প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প রয়েছে। তিনি বলেন, আমার মাতৃতুল্য জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে শিখেছি মানুষকে সেবা করার নামই রাজনীতি।

আমি মনে করি রাজনীতি হল ইবাদতের মতো। বড় বিষয় হচ্ছে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনা। তাহলে দেশ এগিয়ে যাবে, জঙ্গিবাদ থাকবে না, মানুষের মুখে হাসি ফুটবে।

শামীম ওসমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাকে সেবা করার সুযোগ দিলে নির্বাচন করব। এদিকে আগামী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি আসনটি পুনরুদ্ধার করতে চাইলেও মনোনয়ন নিয়েই দলে ত্রিমুখী প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।

মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছেন- সাবেক এমপি ও দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য গিয়াস উদ্দিন, কল্যাণ পার্টির সাবেক কেন্দ্রীয় কোষাধ্যক্ষ ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শিল্পপতি শাহ আলম এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ।

দলীয় সূত্র জানায়, এমপি হওয়ার আগে জাতীয় পার্টি থেকে সদরে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন গিয়াস উদ্দিন। ২০০১ সালে এমপি হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসে মদদ দেয়ার অভিযোগ ওঠে।

খোদ তৎকালীন বিআরটিসির চেয়ারম্যান ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারের ছোট ভাই ব্যবসায়ী নেতা সাব্বির আলম খন্দকার হত্যা, চুন ব্যবসায়ী সুন্দর আলী, আওয়ামী লীগ নেতা কফিল উদ্দিনসহ বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ড নিয়ে সমালোচিত হন গিয়াস উদ্দিন।

এমপি থাকার সময় ডেমরার ‘দুর্ধর্ষ’ সন্ত্রাসী জামান ও সেলিমকে সার্বক্ষণিক সঙ্গী রাখার অভিযোগ ওঠে এমপি গিয়াস উদ্দিনের বিরুদ্ধে।

বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান, গিয়াস উদ্দিনকে দলের কর্মসূচিতে পাওয়া যায় না। উল্টো তিনি ১৫ আগস্ট পালন করে এবং সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচিত মেয়র আইভীকে মিষ্টি খাইয়ে সমালোচিত হয়েছেন।

গিয়াস উদ্দিন বলেন, তৃণমূল থেকে রাজনীতি করে আজ আমি এ পর্যায়ে উঠে এসেছি। এ আসনের প্রতিটি এলাকা আমার চেনা। প্রতিটি মানুষ আমার পরিচিত।

সাধারণ ভোটারদের সমর্থনের বিষয়টি চিন্তায় রেখে মনোনয়ন দেয়া হলে ইতিবাচক হবে। মনোনয়নের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।

অপরদিকে ২০০৮ সালের নির্বাচনে কল্যাণ পার্টি থেকে বিএনপিতে আসা শাহ আলম অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হওয়ার পর ফতুল্লার নেতাকর্মীরা তার ওপর নির্ভরশীল হতে শুরু করলেও শাহ আলম সব সময় মাঠের রাজনীতি থেকে দূরে আছেন।

ফতুল্লা বিএনপি ও সহযোগী দলের নেতাকর্মীরা জানান, দলের কোনো কর্মসূচিতে শাহ আলমকে আমরা কাছে পাই না। তিনি রাজনীতিকেও ব্যবসা মনে করেন।

শাহ আলম জানান, ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলাম। ওই নির্বাচনে আমাকে জোর করে হারানো হয়েছিল। আমার জয় ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল।

শাহ আলম বলেন, আমি সুস্থধারার রাজনীতি করি। আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়ন চাইব। মনোনয়ন পেলে এবং জনগণ নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারলে জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।

অধ্যাপক মামুন মাহমুদ বলেন, জেলা যুবদলের সভাপতি থেকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়ে দল তাকে মূল্যায়ন করেছে। আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়ে দল তাকে আরেকবার মূল্যায়ন করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করছেন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন