চলল স্বপ্নের মেট্রোরেল
সমালোচনা করবে, আমরা কাজ করে যাব : ওবায়দুল কাদের
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২১, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ছয়টি বগিতে যাত্রী নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে চলল দেশের প্রথম মেট্রোরেল। উত্তরা দিয়াবাড়ি থেকে যাত্রা শুরু করে পল্লবী হয়ে ঘুরে আবার ডিপোয় ফিরে যায় ট্রেন। এ পথে চারটি স্টেশন পারাপার হতে হয়েছে ট্রেনটিকে। ১০০ কিলোমিটার গতি সম্পন্ন এ মেট্রোরেল ভায়াডাক্টে (ট্রেন লাইন) ২৫ কিলোমিটার গতিতে চলেছে। রোববার সকালে মেট্রোরেলের ডিপোতে উপস্থিত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পরীক্ষামূলক চলাচলের উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
মেট্রোরেলের পরীক্ষামূলক চলাচলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন রাজধানীবাসী। রুটের আশপাশের বাসা-বাড়ি ও সড়ক থেকে মানুষ মেট্রোরেল চলাচলের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেন। কেউ ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেছেন। আবার কেউ সেলফি তুলেছেন। হাজার হাজার মানুষ ফেসবুক, ইউটিউবে এ দৃশ্য সরাসরি প্রচার করেছেন।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, মেট্রোরেল এখন আর স্বপ্ন নয়। মেট্রোরেল এখন দৃশ্যমান, বাস্তবতা। আজ পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু হলো আগামী ৬ মাস পরীক্ষামূলকভাবে চলাচল করবে। আর আগামী বছরের ডিসেম্বরে মেট্রোরেল আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রী পরিবহণ শুরু করবে। তিনি বলেন, সমালোচকরা সমালোচনা করবে, অপপ্রচার করবে। কিন্তু আমরা জবাব দেব কাজ দিয়ে। জুনে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হবে, এরপর কর্ণফুলী শেখ মুজিবুর রহমান টানেল এবং বছর শেষে ইনশাআল্লাহ তরুণ প্রজন্মের ড্রিম (স্বপ্ন) প্রজেক্ট মেট্রোরেলের (এমআরটি-৬) উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
মন্ত্রী বলেন, আমার আজও মনে পড়ে মেট্রোরেলের ডিপো উন্নয়ন কার্যক্রম দেখতে এসে এখানে ঝড় ও প্রচণ্ড বৃষ্টির মুখে পড়েছিলাম। পরে আমি ৩ দিন জ্বরে ভুগেছি। অনেক দুর্গম পথ, অনেক কষ্টসংকুল পথ অতিক্রম করে আমরা এ পর্যন্ত এসেছি।
ওবায়দুল কাদের, মেট্রোরেলের উন্নয়ন কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর ও নিরাপদ করতে ২০৩০ সালের মধ্যে ১২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ৬টি মেট্রোরেল চালু করা হবে। ১০৪টি স্টেশন বিশিষ্ট একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে সরকার।
উত্তরার দিয়াবাড়ি মেট্রোরেলের ডিপোতে পরীক্ষামূলক চলাচলের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ঘটনাস্থলে পৌঁছে ১১টা ১২ মিনিটে মেট্রোরেলের বগিতে চড়েন। কয়েকটি বগি ঘুরে দেখেন। সিটেও কিছু সময় বসেন। এরপর নেমে এসে নির্ধারিত ‘ভায়াডাক্টের ওপর প্রথম মেট্রো ট্রেন চলাচল পরীক্ষণের আনুষ্ঠানিক শুভ সূচনা’ অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। এরপর তিনি উত্তরা দিয়াবাড়িতে অবস্থিত ১ নম্বর মেট্রো স্টেশনে পৌঁছান। সেখানে দুপুর ১২টা ৫৩ মিনিটে সবুজ পতাকা নেড়ে দেশের প্রথম মেট্রোরেল চলার সংকেত দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের জাপান অ্যাম্বাসির মিনিস্টার অ্যান্ড ডেপুটি চিফ অফ দ্য মিশন হিরোইওকি ইয়ামায়া, বাংলাদেশের জাইকা অফিসের চিফ রিপ্রেজেন্টেটিভ ইহুও হায়েকাওয়া, ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি ব্যবস্থাপনা (ডিএমটিসিএল) পরিচালক এমএএন ছিদ্দিক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, মেট্রোরেল প্রকল্পের সার্বিক কাজের অগ্রগতি ৬৮ দশমিক ৪৯ ভাগ। আটটি প্যাকেজের মাধ্যমে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ চলমান রয়েছে। ৩১ জুলাই পর্যন্ত প্যাকেজ ভিত্তিক কাজের অগ্রগতির চিত্র প্রকাশ করেছে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। সেখানে বলা হয়েছে, প্যাকেজ-১ এর আওতায় মেট্রো রেলের ডিপো এলাকার ভূমি উন্নয়ন কাজ করার টার্গেট ছিল। ইতোমধ্যে সে কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ২০১৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি কাজ শেষ হয়েছে। এতে ৭০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। প্যাকেজ-২ এর ডিপো এলাকার পূর্ত কাজ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এ প্যাকেজের পূর্ত কাজের ৯৯ ভাগ, স্থাপত্যশৈলী ও নির্মাণ কাজের ৯৫ ভাগ, মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল এবং প্লাম্বিং কাজের ৮১ ভাগ শেষ হয়েছে। এ প্যাকেজের সার্বিক অগ্রগতি ৯৫ দশমিক ৫০ ভাগ।
পাকেজ-৩ ও ৪ এর আওতায় উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার ও ৯টি স্টেশন নির্মাণ কাজ রয়েছে। উভয় প্যাকেজের কাজ ২০১৭ সালের ১ আগস্ট শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে পরিষেবা স্থানান্তর, চেকবোরিং, টেস্ট পাইল, মূল পাইল, পাইল ক্যাপ, আই-গার্ডার প্রভৃতি নির্মাণ করা হয়েছে। এ প্যাকেজর সার্বিক অগ্রগতি ৮২ দশমিক ৮০ ভাগ।
পাকেজ-৫ এর আওতায় কাজ আগারগাঁও থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত ৩ দশমিক ১৯৫ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট ও ৩টি স্টেশন নির্মাণ করা। এ প্যাকেজের সার্বিক কাজের অগ্রগতি ৭১ দশমিক ১৪ ভাগ। প্যাকেজ-৬ এর আওতায় কাজ কারওয়ান বাজার থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ৪ দশমিক ৯২২ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট ও ৪টি স্টেশন নির্মাণ করা। এ প্যাকেজের সার্বিক অগ্রগতি ৭১ দশমিক ৮৬ ভাগ। প্যাকেজ-৭ এর আওতায় কাজ ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল সিস্টেম ডেভেলপ করা। এ প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৭৪ ভাগ। প্যাকেজ-৮ এর আওতায় কাজ রেল কোচ ও ডিপো ইক্যুইপমেন্ট সংগ্রহ করা। এ প্যাকেজের সার্বিক অগ্রগতি ৫০ দশমিক ৩৫ ভাগ।
মেট্রোরেল প্রকল্প একনেকে অনুমোদ পায় ২০১২ সালের ১৮ ডিসেম্বর। প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ২০২৪ সালের ৬ জুন। এ প্রকল্পের দৈর্ঘ্য ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার। ২৪ সেট ট্রেন থাকছে, প্রত্যেক সেটে ৬টি করে বগি থাকবে। ঘণ্টায় গতিবেগ ১০০ কিলোমিটার। উভয় দিকে ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহণ করবে এ মেট্রোরেল। প্রকল্প ব্যয় প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন ৫ হাজার ৩৯০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) কাছ থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে ১৬ হাজার ৫৯৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য-ঢাকা মহানগরীতে দক্ষ ও কার্যকরী দ্রুতগামী পরিবহণ ব্যবস্থা চালু করা। সর্বসাধারণের জন্য গণপরিবহণের সুবিধার আধুনিকায়ন করা এবং নগর গণপরিবহণ ব্যবস্থা অধিকতর নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব করা।
রুট: উত্তরা দিয়াবাড়ি থেকে পল্লবী, রোকেয়া সরণির পশ্চিম পার্শ্ব দিয়ে ফার্মগেট, সোনারগাঁও-শাহবাগ-টিএসসি-দোয়েল চত্বর, তোপখানা হয়ে ব্যাংক পর্যন্ত।
স্টেশন: মেট্রোরেলের (এমআরটি-৬) স্টেশন সংখ্যা ১৬টি। এগুলো হলো-উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার, উত্তরা দক্ষিণ, পল্লবী, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সচিবালয় এবং মতিঝিল।
