কর্মসংস্থানের গতি শ্লথ কমেছে বিনিয়োগ
jugantor
করোনায় বেকার ৫৩ লাখ
কর্মসংস্থানের গতি শ্লথ কমেছে বিনিয়োগ
করোনায় কাজ হারিয়েছেন ১৭ লাখ, গত দেড় বছরে শ্রমের বাজারে নতুন এসেছে প্রায় ৩৬ লাখ

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

০৯ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত প্রায় দেড় বছর ধরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দেশে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে। আলোচ্য সময়ে শ্রমের বাজারে নতুন আসা কর্মীদের যেমন চাকরির সংস্থান হয়নি, তেমনি আগের চাকরিজীবীদের অনেকে কর্মচ্যুত হয়েছেন।

সব মিলিয়ে বেকারত্বের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৩ লাখ। এদের কর্মসংস্থানের জন্য যেভাবে বিনিয়োগ দরকার সেভাবে বিনিয়োগ বাড়ছে না। চাঙ্গা হচ্ছে না বেসরকারি খাতও।

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম খান বলেন, কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো হচ্ছে, প্রবাসীদের ঋণ দেওয়া হচ্ছে। শিল্প, কৃষি ও ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ বাড়ানো হচ্ছে। এসব পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে আগামী জুনের মধ্যেই যারা চাকরি হারিয়েছেন তারা আগের কাজ ফিরে পাবেন। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থানও স্বাভাবিক মাত্রায় হতে থাকবে।

তিনি আরও বলেন, অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় কর্মসংস্থান বাড়ানোর নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এতে আগামী ৩-৪ মাসের মধ্যেই অর্থনীতিতে আরও গতি বাড়বে। ইতোমধ্যে অর্থনীতির সূচকগুলোর মধ্যে আমদানি, রপ্তানি বাড়তে শুরু করেছে। এর প্রভাব সব খাতেই পড়বে।

গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংক সহযোগী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনার কারণে অর্থনীতি যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগবে। করোনার আর যদি নতুন কোনো আঘাত না আসে তবে ২০২৩ সালের মধ্যে অর্থনীতি গতিশীল হবে। এর আগে হবে না। আর নতুন করে করোনার আঘাত এলে অর্থনীতিতে গতি আসতে আরও বেশি সময় লাগবে। কেননা বেসরকারি খাত এখনো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে বাণিজ্য ও সেবা খাত স্বল্প পরিসরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। মৌলিক শিল্প খাতে এখনো আস্থাহীনতা বিদ্যমান। কেননা, করোনায় যেভাবে মানুষের আয় কমেছে, এখন তা বেড়ে আগের পর্যায়ে যায়নি।

সরকার করোনার নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা করতে দুই দফায় প্রণোদনা প্যাকেজের আকার বাড়িয়ে ১ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা করেছে। প্রণোদনার কারণে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

গত ৩ অক্টোবর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনায় যেভাবে অর্থনীতিতে আঘাত আনার কথা সেভাবে আনতে পারেনি। সরকারের বহুমুখী তৎপরতার মাধ্যমে একদিকে যেমন শিল্প ও কৃষি খাতে কম সুদে ও সহজ শর্তে চলতি মূলধন, মেয়াদি ঋণের জোগান দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থের প্রবাহ বাড়িয়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। তবে করোনাকালীন সময়ে নতুন বিনিয়োগ কম হয়েছে।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বেশি কর্মসংস্থান হয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। সরকার এখন পর্যন্ত বড়দের নিয়েই বেশি কাজ করছে। কিন্তু ছোটরা ঋণ পাচ্ছে না। তাদের জন্য তহবিল বরাদ্দ করা হলেও তারা ব্যাংকে পৌঁছতে পারছে না। ছোট খাতকে ঋণ দিয়ে চাঙ্গা করা গেলে এর ইতিবাচক প্রভাব সব খাতে পড়বে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের মোট জনশক্তি ১৬ কোটি ৮২ লাখ। এর মধ্যে কর্ম উপযোগী মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি ৯১ লাখ। কর্মে নিয়োজিত রয়েছেন ৬ কোটি ৮ লাখ মানুষ। বাকি ৪ কোটি ১১ লাখ কর্মের বাইরে রয়েছেন। যারা কর্মে আছেন, তাদের মধ্যে কৃষি ক্ষেত্রে নিয়োজিত ২ কোটি ৪৭ লাখ। এদের বেশির ভাগই সারা বছর কাজ পান না।

শিল্পে নিয়োজিত ১ কোটি ২৪ লাখ এবং সেবা খাতে নিয়োজিত ২ কোটি ৩৭ লাখ। করোনার এই তিনটি খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে কৃষি খাতের শ্রমিকরা নিজ কর্মে মৌসুমি ভিত্তিতে ফিরে যেতে পারলে সেবা ও শিল্প খাতের কর্মীরা সবাই কাজে ফিরে যেতে পারেননি।

বিভিন্ন সংখ্যার জরিপে বলা হয়েছে, বড় শিল্প ও সেবা খাতে কাজ সংখ্যা কম হলেও কুটির, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র, ও মাঝারি শিল্প খাতের প্রায় ৩৬ শতাংশ কর্মী কাজ হারিয়েছেন। এর মধ্যে ১৮ শতাংশ কাজে ফিরে যেতে পেরেছেন। বাকি ১৮ শতাংশ এখনো কাজ ফিরে পাননি।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মতে, বাংলাদেশে করোনায় ১৬ লাখ ৭৫ হাজার কর্মী কাজ হারিয়েছেন।

বিবিএসের হিসাবে প্রতি বছর গড়ে শ্রমের বাজারে যুক্ত হচ্ছে ২৪ লাখ ৩৪ হাজার মানুষ। এ হিসাবে গড়ে দেড় বছরে শ্রমের বাজারে নতুন এসেছেন সাড়ে ৩৬ লাখ কর্মী। যাদের বেশির ভাগের পক্ষেই কর্মের সংস্থান করা সম্ভব হয়নি। কেননা করোনার কারণে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ যেমন কম হয়েছে, তেমনি সেরকারি খাতে নিয়োগ হয়নি বললেই চলে। ফলে ওই সাড়ে ৩৬ লাখের বেশির ভাগই বেকার। এছাড়া নতুন করে কাজ হারানোর তালিকায় আছেন ১৬ লাখ ৭৫ হাজার। এ দুটি মিলে শুধু করোনাকালীন সময়ে দেশে বেকারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৫৩ লাখ।

বিবিএসের হিসাবে প্রতি বছর কর্মের বাজারে আসে ২৪ লাখের বেশি কর্মী। এর মধ্যে কাজের সংস্থান করতে পারেন মাত্র ৬ লাখ কর্মী। বাকি ১৮ লাখের মধ্যে কিছু নিজ উদ্যোগে ব্যবসাবাণিজ্য করেন। বাকিদের সামান্য অংশ বিদেশে যায়। আর সবই বেকার থাকে। এভাবে প্রতি বছরই বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। এ হিসাবে দেশে বেকারের সংখ্যা ৩ থেকে সাড়ে ৩ কোটির বেশি হবে।

আইএলও এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা ৩ কোটি। করোনার কারণে তা দ্বিগুণ হয়ে ৬ কোটিতে দাঁড়াতে পারে। কেননা আগামী ২০২৩ সাল পর্যন্ত কাজের বাজারে করোনার প্রভাব থাকবে। এর মধ্যে নতুন কাজ মিলবে খুবই কম। বরং কাজ হারানোর সংখ্যা আরও বাড়বে। কমবে নতুন কর্মসংস্থানের হার। বাড়বে দারিদ্র্য।

এদিকে গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিআইডিএস জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্মাতক পাশ করা শিক্ষার্থীর মধ্যে একটি জরিপ করে। গত ১০ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্মাতক পাশ করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬৬ শতাংশই বেকার। ৭ শতাংশ অন্য শিক্ষা নিচ্ছেন। ৩ শতাংশ নিজ উদ্যোগে কিছু করছেন। গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত তাদের অপর এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে এসএসসি থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী তরুণদের ৩৩ দশমিক ১৯ শতাংশই বেকার।

বিবিএসের জরিপেও দেখা যায়, দেশে স্নাতক বেকারের সংখ্যা বেড়েছে। এটি করোনার আগে থেকেই। করোনার কারণে এ খাতে এ খাতে বেকারত্ন আরও বেড়েছে। ২০১৫ সালে স্নাতক বেকার ছিল ৩২ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা বেড়ে বেড়ে ৩৯ শতাংশে, ২০১৭ সালে ৪১ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে ৪৩ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০১৯ সালে এ হার আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭ শতাংশে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, করোনার কারণে এখন এ হার ৮০ শতাংশের কাছাকাছি হবে।

বিবিএএসের তথ্য থেকে জানা যায়, প্রতি বছর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর মিলে গড়ে সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষার্থী কর্মের বাজারে আসে।

বিশ্বব্যাংক সহযোগী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, করোনার কারণে দেশের অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত ৩৭ শতাংশ মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন। বাংলাদেশের মোট জিডিপি প্রায় ২০ শতাংশ আসে এসএমই খাত থেকে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের জরিপে বলা হয়, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর আগে গত মার্চে নতুন দরিদ্রের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ। অর্থাৎ তাদের বাসস্থান, খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার সামর্থ্য কমেছে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে মানুষের সংখ্যা ২০১৯ সালে ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। করোনার কারণে এ হার বেড়ে প্রায় ৪১ শতাংশে চলে যাবে। কাজ হারানো, নতুন কাজের সংস্থান না হওয়া ও আয় কমার কারণে এমনটি হবে।

করোনার ক্ষতি মোকাবিলা করে কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। কর্মসংস্থানের ৮০ শতাংশ হচ্ছে বেসরকারি খাতে, বাকি ২০ শতাংশ সরকারি খাতে। এ কারণে বেসরকারি খাতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবাহ বাড়ানোর জন্য মুদ্রানীতিতে উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাড়ছে না। শিল্প খাতে মেয়াদি ঋণের হার কমেছে ৬০ শতাংশ। বিদেশি বিনিয়োগ অর্থবছরে কমলেও চলতি অর্থবছরের জুলাই বেড়েছে ৯ কোটি ডলার।

তবে বৈদেশিক ঋণ বাড়ছে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না বাড়ায় ঋণের চাহিদা বাড়ছে না। এতে নতুন কর্মসংস্থানের গতিও শ্লথ হয়ে পড়েছে। এ খাতে গতি আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নতুন উদ্যোক্তা চিহ্নিত করে তাদেরকে ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

করোনায় বেকার ৫৩ লাখ

কর্মসংস্থানের গতি শ্লথ কমেছে বিনিয়োগ

করোনায় কাজ হারিয়েছেন ১৭ লাখ, গত দেড় বছরে শ্রমের বাজারে নতুন এসেছে প্রায় ৩৬ লাখ
 যুগান্তর প্রতিবেদন 
০৯ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত প্রায় দেড় বছর ধরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দেশে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে। আলোচ্য সময়ে শ্রমের বাজারে নতুন আসা কর্মীদের যেমন চাকরির সংস্থান হয়নি, তেমনি আগের চাকরিজীবীদের অনেকে কর্মচ্যুত হয়েছেন।

সব মিলিয়ে বেকারত্বের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৩ লাখ। এদের কর্মসংস্থানের জন্য যেভাবে বিনিয়োগ দরকার সেভাবে বিনিয়োগ বাড়ছে না। চাঙ্গা হচ্ছে না বেসরকারি খাতও।

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম খান বলেন, কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো হচ্ছে, প্রবাসীদের ঋণ দেওয়া হচ্ছে। শিল্প, কৃষি ও ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ বাড়ানো হচ্ছে। এসব পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে আগামী জুনের মধ্যেই যারা চাকরি হারিয়েছেন তারা আগের কাজ ফিরে পাবেন। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থানও স্বাভাবিক মাত্রায় হতে থাকবে।

তিনি আরও বলেন, অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় কর্মসংস্থান বাড়ানোর নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এতে আগামী ৩-৪ মাসের মধ্যেই অর্থনীতিতে আরও গতি বাড়বে। ইতোমধ্যে অর্থনীতির সূচকগুলোর মধ্যে আমদানি, রপ্তানি বাড়তে শুরু করেছে। এর প্রভাব সব খাতেই পড়বে।

গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংক সহযোগী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনার কারণে অর্থনীতি যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগবে। করোনার আর যদি নতুন কোনো আঘাত না আসে তবে ২০২৩ সালের মধ্যে অর্থনীতি গতিশীল হবে। এর আগে হবে না। আর নতুন করে করোনার আঘাত এলে অর্থনীতিতে গতি আসতে আরও বেশি সময় লাগবে। কেননা বেসরকারি খাত এখনো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে বাণিজ্য ও সেবা খাত স্বল্প পরিসরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। মৌলিক শিল্প খাতে এখনো আস্থাহীনতা বিদ্যমান। কেননা, করোনায় যেভাবে মানুষের আয় কমেছে, এখন তা বেড়ে আগের পর্যায়ে যায়নি।

সরকার করোনার নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা করতে দুই দফায় প্রণোদনা প্যাকেজের আকার বাড়িয়ে ১ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা করেছে। প্রণোদনার কারণে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

গত ৩ অক্টোবর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনায় যেভাবে অর্থনীতিতে আঘাত আনার কথা সেভাবে আনতে পারেনি। সরকারের বহুমুখী তৎপরতার মাধ্যমে একদিকে যেমন শিল্প ও কৃষি খাতে কম সুদে ও সহজ শর্তে চলতি মূলধন, মেয়াদি ঋণের জোগান দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থের প্রবাহ বাড়িয়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। তবে করোনাকালীন সময়ে নতুন বিনিয়োগ কম হয়েছে।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বেশি কর্মসংস্থান হয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। সরকার এখন পর্যন্ত বড়দের নিয়েই বেশি কাজ করছে। কিন্তু ছোটরা ঋণ পাচ্ছে না। তাদের জন্য তহবিল বরাদ্দ করা হলেও তারা ব্যাংকে পৌঁছতে পারছে না। ছোট খাতকে ঋণ দিয়ে চাঙ্গা করা গেলে এর ইতিবাচক প্রভাব সব খাতে পড়বে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের মোট জনশক্তি ১৬ কোটি ৮২ লাখ। এর মধ্যে কর্ম উপযোগী মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি ৯১ লাখ। কর্মে নিয়োজিত রয়েছেন ৬ কোটি ৮ লাখ মানুষ। বাকি ৪ কোটি ১১ লাখ কর্মের বাইরে রয়েছেন। যারা কর্মে আছেন, তাদের মধ্যে কৃষি ক্ষেত্রে নিয়োজিত ২ কোটি ৪৭ লাখ। এদের বেশির ভাগই সারা বছর কাজ পান না।

শিল্পে নিয়োজিত ১ কোটি ২৪ লাখ এবং সেবা খাতে নিয়োজিত ২ কোটি ৩৭ লাখ। করোনার এই তিনটি খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে কৃষি খাতের শ্রমিকরা নিজ কর্মে মৌসুমি ভিত্তিতে ফিরে যেতে পারলে সেবা ও শিল্প খাতের কর্মীরা সবাই কাজে ফিরে যেতে পারেননি।

বিভিন্ন সংখ্যার জরিপে বলা হয়েছে, বড় শিল্প ও সেবা খাতে কাজ সংখ্যা কম হলেও কুটির, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র, ও মাঝারি শিল্প খাতের প্রায় ৩৬ শতাংশ কর্মী কাজ হারিয়েছেন। এর মধ্যে ১৮ শতাংশ কাজে ফিরে যেতে পেরেছেন। বাকি ১৮ শতাংশ এখনো কাজ ফিরে পাননি।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মতে, বাংলাদেশে করোনায় ১৬ লাখ ৭৫ হাজার কর্মী কাজ হারিয়েছেন।

বিবিএসের হিসাবে প্রতি বছর গড়ে শ্রমের বাজারে যুক্ত হচ্ছে ২৪ লাখ ৩৪ হাজার মানুষ। এ হিসাবে গড়ে দেড় বছরে শ্রমের বাজারে নতুন এসেছেন সাড়ে ৩৬ লাখ কর্মী। যাদের বেশির ভাগের পক্ষেই কর্মের সংস্থান করা সম্ভব হয়নি। কেননা করোনার কারণে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ যেমন কম হয়েছে, তেমনি সেরকারি খাতে নিয়োগ হয়নি বললেই চলে। ফলে ওই সাড়ে ৩৬ লাখের বেশির ভাগই বেকার। এছাড়া নতুন করে কাজ হারানোর তালিকায় আছেন ১৬ লাখ ৭৫ হাজার। এ দুটি মিলে শুধু করোনাকালীন সময়ে দেশে বেকারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৫৩ লাখ।

বিবিএসের হিসাবে প্রতি বছর কর্মের বাজারে আসে ২৪ লাখের বেশি কর্মী। এর মধ্যে কাজের সংস্থান করতে পারেন মাত্র ৬ লাখ কর্মী। বাকি ১৮ লাখের মধ্যে কিছু নিজ উদ্যোগে ব্যবসাবাণিজ্য করেন। বাকিদের সামান্য অংশ বিদেশে যায়। আর সবই বেকার থাকে। এভাবে প্রতি বছরই বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। এ হিসাবে দেশে বেকারের সংখ্যা ৩ থেকে সাড়ে ৩ কোটির বেশি হবে।

আইএলও এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা ৩ কোটি। করোনার কারণে তা দ্বিগুণ হয়ে ৬ কোটিতে দাঁড়াতে পারে। কেননা আগামী ২০২৩ সাল পর্যন্ত কাজের বাজারে করোনার প্রভাব থাকবে। এর মধ্যে নতুন কাজ মিলবে খুবই কম। বরং কাজ হারানোর সংখ্যা আরও বাড়বে। কমবে নতুন কর্মসংস্থানের হার। বাড়বে দারিদ্র্য।

এদিকে গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিআইডিএস জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্মাতক পাশ করা শিক্ষার্থীর মধ্যে একটি জরিপ করে। গত ১০ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্মাতক পাশ করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬৬ শতাংশই বেকার। ৭ শতাংশ অন্য শিক্ষা নিচ্ছেন। ৩ শতাংশ নিজ উদ্যোগে কিছু করছেন। গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত তাদের অপর এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে এসএসসি থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী তরুণদের ৩৩ দশমিক ১৯ শতাংশই বেকার।

বিবিএসের জরিপেও দেখা যায়, দেশে স্নাতক বেকারের সংখ্যা বেড়েছে। এটি করোনার আগে থেকেই। করোনার কারণে এ খাতে এ খাতে বেকারত্ন আরও বেড়েছে। ২০১৫ সালে স্নাতক বেকার ছিল ৩২ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা বেড়ে বেড়ে ৩৯ শতাংশে, ২০১৭ সালে ৪১ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে ৪৩ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০১৯ সালে এ হার আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭ শতাংশে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, করোনার কারণে এখন এ হার ৮০ শতাংশের কাছাকাছি হবে।

বিবিএএসের তথ্য থেকে জানা যায়, প্রতি বছর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর মিলে গড়ে সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষার্থী কর্মের বাজারে আসে।

বিশ্বব্যাংক সহযোগী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, করোনার কারণে দেশের অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত ৩৭ শতাংশ মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন। বাংলাদেশের মোট জিডিপি প্রায় ২০ শতাংশ আসে এসএমই খাত থেকে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের জরিপে বলা হয়, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর আগে গত মার্চে নতুন দরিদ্রের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ। অর্থাৎ তাদের বাসস্থান, খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার সামর্থ্য কমেছে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে মানুষের সংখ্যা ২০১৯ সালে ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। করোনার কারণে এ হার বেড়ে প্রায় ৪১ শতাংশে চলে যাবে। কাজ হারানো, নতুন কাজের সংস্থান না হওয়া ও আয় কমার কারণে এমনটি হবে।

করোনার ক্ষতি মোকাবিলা করে কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। কর্মসংস্থানের ৮০ শতাংশ হচ্ছে বেসরকারি খাতে, বাকি ২০ শতাংশ সরকারি খাতে। এ কারণে বেসরকারি খাতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবাহ বাড়ানোর জন্য মুদ্রানীতিতে উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাড়ছে না। শিল্প খাতে মেয়াদি ঋণের হার কমেছে ৬০ শতাংশ। বিদেশি বিনিয়োগ অর্থবছরে কমলেও চলতি অর্থবছরের জুলাই বেড়েছে ৯ কোটি ডলার।

তবে বৈদেশিক ঋণ বাড়ছে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না বাড়ায় ঋণের চাহিদা বাড়ছে না। এতে নতুন কর্মসংস্থানের গতিও শ্লথ হয়ে পড়েছে। এ খাতে গতি আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নতুন উদ্যোক্তা চিহ্নিত করে তাদেরকে ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন