অনেকের দেহে লোহার হাজারো ক্ষুদ্র টুকরো
jugantor
নাঙ্গলকোটে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ
অনেকের দেহে লোহার হাজারো ক্ষুদ্র টুকরো
অধিকাংশের অবস্থা আশঙ্কাজনক * ঢাকায় পাঁচজনকে ভর্তি * বেলুনেই চুপসে গেল একটি পরিবার

  কুমিল্লা ব্যুরো  

১৫ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নাঙ্গলকোট উপজেলায় বেলুনে গ্যাস ভরার সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দগ্ধ অধিকাংশের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বিস্ফোরণের ঘটনায় অনেকের শরীরে লোহার হাজারো টুকরো ঢুকেছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। বিস্ফোরণে সিলিন্ডারের কিছু অংশ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হওয়ায় এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আহতদের মধ্যে তিনজনকে নাঙ্গলকোট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং ১৭ জনকে কুমেক হাসপাতালে, পাঁচজনকে সদর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া গুরুতর আহত পাঁচজনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। বিস্ফোরণের ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলার বিরুলিয়া গ্রামে বেলুন বিক্রেতা আনোয়ার হোসেনের বাড়িতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে ওই গ্রামের শিশুসহ ৪১ জন আহত হয়।

বিরুলিয়ায় অনুষ্ঠেয় বাৎসরিক ‘ঠান্ডাকালি মেলা’কে কেন্দ্র করে আনোয়ার বেলুন তৈরির কাজ করছিলেন। তার বানানো বেলুন দেখতে গ্রামের বিপুলসংখ্যক শিশু-কিশোরসহ এলাকার উৎসুক লোকজন বাড়িতে ভিড় জমায়। সন্ধ্যায় আকস্মিক একটি গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরিত সিলিন্ডারের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণার আঘাতে অনেকের মাথা ও চোখ জখম হয়। মুহূর্তের মধ্যে বাড়িটি রক্তে ভেসে যায়।

বিস্ফোরণের ঘটনা তদন্তে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেন-উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশরাফুল হক, নাঙ্গলকোট থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাকিবুল ইসলাম ও উপজেলা ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা। আগামী দুই কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

দুর্ঘটনায় আহত আলাউদ্দিন জানান, প্রায় ২০০ বছর ধরে বিরুলিয়ায় পহেলা মাঘ মেলা হয়ে আসছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এখানে আসেন। আনোয়ার ভাইয়ের কাছ থেকে বেলুন নিয়ে আমিও মেলায় বিক্রি করি। ওই দিন বিকালে গিয়েছিলাম কিছু বেলুন আনতে। হঠাৎ বিস্ফোরণটি ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাড়ি রক্তে লাল হয়ে যায়।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের (কুমেক) বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মির্জা মুহাম্মদ তাইয়েবুল ইসলাম জানান, বিস্ফোরণে সিলিন্ডারের অনেক অংশ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হওয়ায় সেগুলো দগ্ধদের শরীরে ঢুকেছে। তিনি আরও বলেন, কয়েকজনের শরীরে হাজারেরও বেশি লোহার ক্ষুদ্র কণার চিহ্ন রয়েছে। তবে অগ্নিদগ্ধ পাঁচ-ছয়জনের সবচেয়ে বেশি স্পি­ন্টার ইনজুরি রয়েছে। অনেকে ব্লাস্ট ইনজুরিতে আহত হয়েছেন। অনেকের হাত-পা ভেঙে গেছে। অন্তত ১০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। যাদের অবস্থা ভালো তাদের রিলিজ দেওয়া হয়েছে। তারা বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কুমেক হাসপাতালের পরিচালক মহিউদ্দিন জানান, গুরুতর আহত ১৪ জনকে এখানে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে। দুজনকে স্বজনরা নিজ দায়িত্বে অন্য হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। কুমেক হাসপাতালের সিভিল সার্জন মীর মোবারক হোসাইন বলেন, এ ঘটনায় আহতদের যথাযথভাবে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে, বিষয়টি জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ মনিটরিং করছে। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে গুরুতর আহত পাঁচজনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন-বিরুলিয়া গ্রামের শাহ আলমের ছেলে আবদুর রব (২৭), সালাউদ্দীনের ছেলে সাব্বির হোসেন, ওমর ফারুলের ছেলে সাইফুল, পাশের পশ্চিম বামপাড়া গ্রামের শাহ আলমের ছেলে ইমন হোসেন (১৫)।

বেলুনেই চুপসে গেল পরিবারটি : নাঙ্গলকোট উপজেলার মৌকারা ইউনিয়নের বিরুলিয়া গ্রামের কালা মিয়ার ছেলে আনোয়ার। রাজমিস্ত্রির পাশাপাশি মৌসুমি বেলুন বিক্রি করে তার পরিবারের ভরণপোষণ চলে। সেই বেলুনের মতোই চুপসে গেল তার পরিবার। বেলুনে গ্যাস ভরার জন্য তার নিজের তৈরি গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণে তার পরিবারেরও ছয়জন দগ্ধ হয়েছে।

কুমেক হাসপাতালে দেখা যায়, একপাশে অর্ধদগ্ধ আনোয়ারের ছয় বছরের মেয়েকে নিয়ে বসে আছেন আনোয়ারের বোন ফারহানা আক্তার। ফারহানা জানান, বেশ কয়েক বছর ধরে তার ভাই মাঘের মেলা উপলক্ষ্যে বেলুন তৈরি করে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করে আসছেন। সিলিন্ডার বিস্ফোরণে তার ভাইয়ের পরিবারের ছয়জন দগ্ধ হয়েছে। ছয়জনের চারজনই শিশু। তারা হলো-আনোয়ারের বড় মেয়ে আপনান আক্তার (৮), ছোট মেয়ে মরিয়ম আক্তার (৬), তার বোনের ছেলে নাজমুল (৭) ও বোনের মেয়ে নুসরাত (৩)। এছাড়া আনোয়ারের বোন নাছরিনও (২৮) রয়েছেন। বিস্ফোরণে আনোয়ার ও মরিয়মের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তিনি জানান, আনোয়ার মেলার সিজনে বেলুন ফুলিয়ে পাইকারদের কাছে বিক্রি করত। বৃহস্পতিবার বেলুনের একটি বড় অর্ডার আসে। একইসঙ্গে শনিবার (১ মাঘ) বিরুলিয়া গ্রামে ঠান্ডাকালি মেলা হওয়ার কথা রয়েছে। এ ঐতিহ্যবাহী মেলায় হাজার হাজার বেলুন বিক্রি হয়। এর কারণে আনোয়ার বেলুন ফুলিয়ে জমা করছিল।

নাঙ্গলকোটে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ

অনেকের দেহে লোহার হাজারো ক্ষুদ্র টুকরো

অধিকাংশের অবস্থা আশঙ্কাজনক * ঢাকায় পাঁচজনকে ভর্তি * বেলুনেই চুপসে গেল একটি পরিবার
 কুমিল্লা ব্যুরো 
১৫ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নাঙ্গলকোট উপজেলায় বেলুনে গ্যাস ভরার সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দগ্ধ অধিকাংশের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বিস্ফোরণের ঘটনায় অনেকের শরীরে লোহার হাজারো টুকরো ঢুকেছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। বিস্ফোরণে সিলিন্ডারের কিছু অংশ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হওয়ায় এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আহতদের মধ্যে তিনজনকে নাঙ্গলকোট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং ১৭ জনকে কুমেক হাসপাতালে, পাঁচজনকে সদর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া গুরুতর আহত পাঁচজনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। বিস্ফোরণের ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলার বিরুলিয়া গ্রামে বেলুন বিক্রেতা আনোয়ার হোসেনের বাড়িতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে ওই গ্রামের শিশুসহ ৪১ জন আহত হয়।

বিরুলিয়ায় অনুষ্ঠেয় বাৎসরিক ‘ঠান্ডাকালি মেলা’কে কেন্দ্র করে আনোয়ার বেলুন তৈরির কাজ করছিলেন। তার বানানো বেলুন দেখতে গ্রামের বিপুলসংখ্যক শিশু-কিশোরসহ এলাকার উৎসুক লোকজন বাড়িতে ভিড় জমায়। সন্ধ্যায় আকস্মিক একটি গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরিত সিলিন্ডারের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণার আঘাতে অনেকের মাথা ও চোখ জখম হয়। মুহূর্তের মধ্যে বাড়িটি রক্তে ভেসে যায়।

বিস্ফোরণের ঘটনা তদন্তে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেন-উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশরাফুল হক, নাঙ্গলকোট থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাকিবুল ইসলাম ও উপজেলা ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা। আগামী দুই কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

দুর্ঘটনায় আহত আলাউদ্দিন জানান, প্রায় ২০০ বছর ধরে বিরুলিয়ায় পহেলা মাঘ মেলা হয়ে আসছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এখানে আসেন। আনোয়ার ভাইয়ের কাছ থেকে বেলুন নিয়ে আমিও মেলায় বিক্রি করি। ওই দিন বিকালে গিয়েছিলাম কিছু বেলুন আনতে। হঠাৎ বিস্ফোরণটি ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাড়ি রক্তে লাল হয়ে যায়।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের (কুমেক) বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মির্জা মুহাম্মদ তাইয়েবুল ইসলাম জানান, বিস্ফোরণে সিলিন্ডারের অনেক অংশ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হওয়ায় সেগুলো দগ্ধদের শরীরে ঢুকেছে। তিনি আরও বলেন, কয়েকজনের শরীরে হাজারেরও বেশি লোহার ক্ষুদ্র কণার চিহ্ন রয়েছে। তবে অগ্নিদগ্ধ পাঁচ-ছয়জনের সবচেয়ে বেশি স্পি­ন্টার ইনজুরি রয়েছে। অনেকে ব্লাস্ট ইনজুরিতে আহত হয়েছেন। অনেকের হাত-পা ভেঙে গেছে। অন্তত ১০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। যাদের অবস্থা ভালো তাদের রিলিজ দেওয়া হয়েছে। তারা বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কুমেক হাসপাতালের পরিচালক মহিউদ্দিন জানান, গুরুতর আহত ১৪ জনকে এখানে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে। দুজনকে স্বজনরা নিজ দায়িত্বে অন্য হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। কুমেক হাসপাতালের সিভিল সার্জন মীর মোবারক হোসাইন বলেন, এ ঘটনায় আহতদের যথাযথভাবে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে, বিষয়টি জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ মনিটরিং করছে। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে গুরুতর আহত পাঁচজনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন-বিরুলিয়া গ্রামের শাহ আলমের ছেলে আবদুর রব (২৭), সালাউদ্দীনের ছেলে সাব্বির হোসেন, ওমর ফারুলের ছেলে সাইফুল, পাশের পশ্চিম বামপাড়া গ্রামের শাহ আলমের ছেলে ইমন হোসেন (১৫)।

বেলুনেই চুপসে গেল পরিবারটি : নাঙ্গলকোট উপজেলার মৌকারা ইউনিয়নের বিরুলিয়া গ্রামের কালা মিয়ার ছেলে আনোয়ার। রাজমিস্ত্রির পাশাপাশি মৌসুমি বেলুন বিক্রি করে তার পরিবারের ভরণপোষণ চলে। সেই বেলুনের মতোই চুপসে গেল তার পরিবার। বেলুনে গ্যাস ভরার জন্য তার নিজের তৈরি গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণে তার পরিবারেরও ছয়জন দগ্ধ হয়েছে।

কুমেক হাসপাতালে দেখা যায়, একপাশে অর্ধদগ্ধ আনোয়ারের ছয় বছরের মেয়েকে নিয়ে বসে আছেন আনোয়ারের বোন ফারহানা আক্তার। ফারহানা জানান, বেশ কয়েক বছর ধরে তার ভাই মাঘের মেলা উপলক্ষ্যে বেলুন তৈরি করে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করে আসছেন। সিলিন্ডার বিস্ফোরণে তার ভাইয়ের পরিবারের ছয়জন দগ্ধ হয়েছে। ছয়জনের চারজনই শিশু। তারা হলো-আনোয়ারের বড় মেয়ে আপনান আক্তার (৮), ছোট মেয়ে মরিয়ম আক্তার (৬), তার বোনের ছেলে নাজমুল (৭) ও বোনের মেয়ে নুসরাত (৩)। এছাড়া আনোয়ারের বোন নাছরিনও (২৮) রয়েছেন। বিস্ফোরণে আনোয়ার ও মরিয়মের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তিনি জানান, আনোয়ার মেলার সিজনে বেলুন ফুলিয়ে পাইকারদের কাছে বিক্রি করত। বৃহস্পতিবার বেলুনের একটি বড় অর্ডার আসে। একইসঙ্গে শনিবার (১ মাঘ) বিরুলিয়া গ্রামে ঠান্ডাকালি মেলা হওয়ার কথা রয়েছে। এ ঐতিহ্যবাহী মেলায় হাজার হাজার বেলুন বিক্রি হয়। এর কারণে আনোয়ার বেলুন ফুলিয়ে জমা করছিল।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন