যাত্রীচাপ ব্যাপক, তবুও ধুঁকছে ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ রেলপথ
jugantor
যাত্রীচাপ ব্যাপক, তবুও ধুঁকছে ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ রেলপথ
নতুন ইঞ্জিন ও বগি এলেই এ রুটে ট্রেনের সংখ্যা বাড়বে -রেলপথ সচিব * ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ যাত্রী নিয়ে চলাচল করছে প্রতিটি ট্রেন * ভাওয়াল এক্সপ্রেস ২ বগি নিয়ে চলছে!

  শিপন হাবীব  

০১ জুন ২০১৮, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রেলের যতগুলো রুট আছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি যাত্রী চলাচল করে ঢাকা-ময়মনসিংহ-গফরগাঁও-জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জ লাইনে। অথচ এই রুটটিই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। এটা স্বীকার করছেন রেলের খোদ বড় কর্তা ব্যক্তিরাও। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের দক্ষিণাঞ্চল হিসেবে পরিচিত এই রুট নিয়ে এক রেল কর্মকর্তার বক্তব্যেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। তিনি বলেছেন, ‘রেলওয়ের দক্ষিণাঞ্চল কি কোনো দাক্ষিণ্যই পাবে না। চিরকাল কি অনাদরে অবহেলায় পড়ে থাকবে।’ বর্তমান সরকারের আমলে রেলের ব্যাপক উন্নয়ন হলেও এই রুটে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। আশ্চর্যের বিষয় এই রুটের ভাওয়াল এক্সপ্রেস ট্রেনটি মাত্র ২/৩টি বগি নিয়ে চলাচল করছে। এ মধ্যে একটি বগি থাকে রেলের নিরাপত্তাবাহিনীর দখলে। অথচ এ রুটে চলাচলকারী সব ট্রেন ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি যাত্রী নিয়ে চলাচল করছে। অবহেলায় অনেক রুট বন্ধও হয়ে গেছে। রেল সূত্রে জানা যায়, ১৮৮৫ সালে মূলত কাঁচা পাট কলকাতায় নেয়ার জন্য ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ১৪৪ কিলোমিটার দীর্ঘ মিটারগেজ রেললাইন স্থাপন করা হয়। পরে সম্প্রসারিত হয়ে দেওয়ানগঞ্জ-বাহদুরাবাদঘাট হয়ে দিনাজপুর পর্যন্ত লাইন সম্প্রসারিত হয়। এছাড়া জয়দেবপুর-টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ-গফরগাঁও, জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জ-জামালপুর-তারাকান্দি রেলওয়ে স্টেশনসহ এ পথের প্রায় সবগুলো স্টেশনের অবস্থাও নাজুক। স্টেশনগুলোতে বসা যায় না দুর্গন্ধে। যাত্রী ছাউনি ফুটো, অপরিষ্কার প্লাটফর্মগুলোতে নেই টয়লেট, কোনোটিতে টয়লেট থাকলেও নেই পানি। লাইট না থাকায় রাতেরবেলা বেশিরভাগ স্টেশনই ভুতুড়ে অবস্থা। কয়েকটি আবার মাদকাসক্তদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে।

রেলওয়ে মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন যুগান্তরকে জানান, ঢাকা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত ডাবল লাইন আছে। এ পথের দেওয়ানগঞ্জ পর্যন্ত ডাবল ও ব্রডগেজ লাইন স্থাপন করা হবে। এ সরকার পুরো রেলওয়েতে ব্যাপক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। আমাদের ইঞ্জিন ও বগির স্বল্পতা রয়েছে। এগুলো আমদানি করা হচ্ছে। এ পথে নতুন ট্রেন দেয়াসহ পুরাতন ট্রেনগুলোতে পরিবর্তন করা হবে। এ পথে যাত্রীদের চাপ রয়েছে স্বীকার করে তিনি বলেন, যাত্রীদের কল্যাণে জয়দেবপুর থেকে ময়মনসিংহ হয়ে জামালপুর পর্যন্ত সমান্তরাল দ্রুতগতির ১৬৬ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়।

এ রুটে রেলযাত্রার দুর্ভোগ নিয়ে কথা হয় জামালপুর উপজেলা চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন মল্লিকের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, রেলের উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু কোন অপরাধে আমাদের এই লাইনে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। জেলা পরিষদের উন্নয়ন ও আইন-শৃঙ্খলা মিটিংয়ে শতবার বলেছি, এ অঞ্চলে চলা ট্রেন, স্টেশন, লাইন সংস্কার করতে। কেউ কর্ণপাত করেনি। আমি বিএনপি করি, তাই কেউ আমাদের কথা কানে দেয় না।

জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট বাকী বিল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, চারিদিকে যখন দেখি রেলের উন্নয়ন হচ্ছে তখন খুবই হিংসা হয়। স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের এ অঞ্চলে রেলপথের তেমন উন্নয়ন হয়নি।

কথা হয় রেল পরিচালনার সঙ্গে জড়িত একাধিক চালক, গার্ড ও স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে। তারা সবাই একই সুরে যুগান্তরকে বলেন, নড়বড়ে লাইন দিয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন, বগি দিয়ে ট্রেন চালাতে হচ্ছে। তার ওপর অতিরিক্ত যাত্রী। ট্রেনের ছাদ, দু’বগির সংযোগস্থল ও ইঞ্জিন কোথাও যাত্রী ছাড়া নেই। ঢাকা থেকে ১৭০ কিলোমিটার রেলপথে যেতে লাগার কথা ৪-৫ ঘণ্টা। অথচ লাগছে ৮-৯ ঘণ্টা। অথচ এই রুটে দিনে ৭০-৭৫ হাজার যাত্রী চলাচল করে। সঠিক সময়ে ট্রেন না পৌঁছায় এবং গভীর রাতে ট্রেনগুলো প্রান্তিক রেলস্টেশনে পৌঁছানোর কারণে যাত্রীদের ছিনতাই, অজ্ঞান ও মলম পার্টির শিকার হয়ে সর্বশান্ত হতে হচ্ছে প্রায়ই। তাছাড়া ট্রেনগুলোতে নেই লাইটিং, পানি ও টয়লেট। নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে কালোবাজারে টিকিট-তো আছেই। এই রুটে ট্রেনের লাইনচ্যুতি হচ্ছে অহরহ। এরুটে ৭৫ শতাংশ রেল গেট অবৈধ। ফলে হরহামেশাই ঘটছে দুর্ঘটনা। যাত্রী হত্যাসহ চলন্ত ট্রেন থেকে যাত্রী ফেলে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে বহুবার।

কথা হয় জামালপুর রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, এ পথে যাত্রীদের চাপ সব সময়ই বেশি থাকে। সে তুলনায় ট্রেন নেই, ট্রেন থাকলেও অনেক ট্রেন স্বল্প বগি নিয়ে চলাচল করে। ডাবল লাইন না থাকায় সিডিউল বিপর্যয় হচ্ছে। ডাবল লাইন হলে সমস্যা থাকবে না। তিনি বলেন, এই স্টেশন প্রায় ২৫ জন স্টাফ কম নিয়ে চলছে। স্টেশন আধুনিকায়নের বিকল্প নেই। শত শত যাত্রী ট্রেনে দাঁড়িয়ে, ছাদে উঠে চলাচল করছে। ভাওয়াল এক্সপ্রেস ট্রেনটি কখনও ২টি আবার কখনও ৩টি বগি নিয়ে চলাচল করছে।

ঢাকা কন্ট্রোল রুম সূত্রে জানা যায়, এ পথে চলা তিস্তা এক্সপ্রেস শুরুতে ২২ বগি নিয়ে চলাচল করত, এখন ১৬টি নিয়ে চলছে। বহ্মপুত্র এক্সপ্রেস ১৮ বগি নিয়ে শুরু করলেও বর্তমানে ১১ বগি নিয়ে চলছে। এটিতে কোনো এসি চেয়ার কিংবা কেবিন নেই। হাওর এক্সপ্রেসটি ১৮ বগি নিয়ে চলাচল শুরু করে বর্তমানে ১২টি নিয়ে চলছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন রেল কর্মকর্তা জানান, সরকারি ট্রেনগুলোতে বগি স্বল্পতা পরিকল্পিতভাবে করা হচ্ছে। বেসরকারি কমিউটার ট্রেনগুলোতে পর্র্যাপ্ত বগি দেয়া হচ্ছে।

দেওয়ানগঞ্জের স্টেশন ম্যানেজার মোহাম্মদ রফিক বলেন ‘এ পথের শেষ স্টেশন হচ্ছে এটি। স্টেশনটির দিকে তাকানো যায় না। মনে হচ্ছে এর কোনো মা-বাবা নেই। অথচ হাজার হাজার ট্রেনযাত্রীর একমাত্র অবলম্বন হচ্ছে এটি। এ স্টেশন হয়ে জামালপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার যাত্রীরা ঢাকায় যাতায়াত করে। লালমনিরহাট, বগুড়া, গাইবান্দা, কুড়িগ্রাম, কাউনিয়ার শত শত গ্রামের মানুষ ট্রেনে ভ্রমণ করতে চায়। বগি স্বল্পতায় তা হচ্ছে না।

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে ভাওয়াল এক্সপ্রেস ট্রেনটি রাত ৯টা ২০ মিনিটে দেওয়ানগঞ্জের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ট্রেন চালক জানান, আমি এ ট্রেনটি প্রায়ই চালাই। আমার কাছে মনে হয় এটি একটি খেলনা গাড়ি। প্রশ্ন করতেই বললেন, বর্তমানে এ ট্রেনটি মাত্র ২টি বগি নিয়ে চলাচল করছে। তারমধ্যে একটির অর্ধেকে জেনারেটর বসানো হয়েছে। এটি শুধুমাত্র নামেই চলছে। এ ট্রেনটি ছোট্ট একটি জেনারেটর দিয়ে চালানো হচ্ছে। ভাবা যায়!

ভাওয়াল ট্রেনটিতে প্রায় ৮ বছর ধরে কাজ করছেন আমজাদ হোসেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ট্রেনটিতে মৌমাছির মতো যাত্রী উঠে। কিন্তু কোন কারণে বগি বাড়েনি। একটি টয়লেটও ঠিক নেই। পানি নেই, বাতি নেই। অনেক সিট ভাঙা, ছেঁড়া।

কথা হয় রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের এক প্রকৌশলীর সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, এই রুটে সিঙ্গেল লাইন হওয়ায় একটি ট্রেনকে সাইট দিতে গিয়ে সিডিউল বিপর্যয় হচ্ছে। অধিকাংশ লাইন ক্ষয় হয়ে গেছে। মূলত এটি জোড়াতালি দিয়ে চালাতে হচ্ছে। পাথর স্বল্পতা তো আছেই, তার উপর এ পথে অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলো খুবই ভয়ানক। রেলপথমন্ত্রী পুরো রেলপথটি ডাবল লাইন করার একটা উদ্যোগ নিয়েছেন। তখন ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি গতিও বাড়বে।

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার সীতাংশু চক্রবর্ত্তী যুগান্তরকে বলেন, এ অঞ্চলে চলাচলকারী সবক’টি ট্রেনে যাত্রী সংখ্যা সবচেয়ে বেশি থাকে। ঢাকা, জামালপুর, ময়মনসিংহ দেওয়ানগঞ্জ রুটে সবচেয়ে বেশি যাত্রী চলাচল করে। এ পথে চলাচলকারী ট্রেনগুলোতে বগি বাড়ানো জরুরি বলে স্বীকার করেন।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ রুটে কিছু কিছু স্টেশন সংস্কার করা হয়েছে। সম্প্রতি রেলপথমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক এ রুটে চলাচলকারী তিস্তা এক্সপ্রেসের মেয়াদোত্তীর্ণ বগি বদল করে নতুন বগি লাগিয়ে ট্রেনটি উদ্বোধন করেছেন। বাকি ট্রেনগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। এই রুটে তিস্তা ছাড়াও ব্রহ্মপুত্র, হাওর, মোহনা, জামালপুর কমিউটার ট্রেন চলাচল করে। এ পথে তিস্তা ছাড়াও অন্য কোনো ট্রেনই সিডিউল টাইমে যাতায়াত করে না।

জানতে চাইলে রেলপথ সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন যুগান্তরকে জানান, বর্তমান সরকার রেলওয়েতে ব্যাপক উন্নয়ন করছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকা-ময়মনসিংহ-দেওয়ানগঞ্জ রেলপথসহ রেলওয়ে স্টেশন, সিগনাল ব্যবস্থা অত্যাধুনিক করার প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। ডাবল লাইন নির্মাণসহ নতুন লাইন নির্মাণের সমীক্ষা চলমান রয়েছে। এ লাইনটির যেমন যথাযথ উন্নয়ন হয়নি, তেমনি এ লাইনে পর্যাপ্ত ট্রেনও দেয়া সম্ভব হয়নি। তবে রেলপথ মন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে নতুন ইঞ্জিন ও বগি এলেই এ পথে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হবে। স্টেশনগুলো আধুনিকায়ন করা হবে। চলমান লাইনগুলো সংস্কারের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ পথে অবহেলা নয়, আধুনিকায়নে একটি চূড়ান্ত ড্রাফ করা হয়েছে। জরাজীর্র্ণ লাইন ও স্টেশনগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে সংস্কার করা হবে।

যাত্রীচাপ ব্যাপক, তবুও ধুঁকছে ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ রেলপথ

নতুন ইঞ্জিন ও বগি এলেই এ রুটে ট্রেনের সংখ্যা বাড়বে -রেলপথ সচিব * ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ যাত্রী নিয়ে চলাচল করছে প্রতিটি ট্রেন * ভাওয়াল এক্সপ্রেস ২ বগি নিয়ে চলছে!
 শিপন হাবীব  
০১ জুন ২০১৮, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রেলের যতগুলো রুট আছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি যাত্রী চলাচল করে ঢাকা-ময়মনসিংহ-গফরগাঁও-জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জ লাইনে। অথচ এই রুটটিই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। এটা স্বীকার করছেন রেলের খোদ বড় কর্তা ব্যক্তিরাও। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের দক্ষিণাঞ্চল হিসেবে পরিচিত এই রুট নিয়ে এক রেল কর্মকর্তার বক্তব্যেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। তিনি বলেছেন, ‘রেলওয়ের দক্ষিণাঞ্চল কি কোনো দাক্ষিণ্যই পাবে না। চিরকাল কি অনাদরে অবহেলায় পড়ে থাকবে।’ বর্তমান সরকারের আমলে রেলের ব্যাপক উন্নয়ন হলেও এই রুটে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। আশ্চর্যের বিষয় এই রুটের ভাওয়াল এক্সপ্রেস ট্রেনটি মাত্র ২/৩টি বগি নিয়ে চলাচল করছে। এ মধ্যে একটি বগি থাকে রেলের নিরাপত্তাবাহিনীর দখলে। অথচ এ রুটে চলাচলকারী সব ট্রেন ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি যাত্রী নিয়ে চলাচল করছে। অবহেলায় অনেক রুট বন্ধও হয়ে গেছে। রেল সূত্রে জানা যায়, ১৮৮৫ সালে মূলত কাঁচা পাট কলকাতায় নেয়ার জন্য ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ১৪৪ কিলোমিটার দীর্ঘ মিটারগেজ রেললাইন স্থাপন করা হয়। পরে সম্প্রসারিত হয়ে দেওয়ানগঞ্জ-বাহদুরাবাদঘাট হয়ে দিনাজপুর পর্যন্ত লাইন সম্প্রসারিত হয়। এছাড়া জয়দেবপুর-টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ-গফরগাঁও, জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জ-জামালপুর-তারাকান্দি রেলওয়ে স্টেশনসহ এ পথের প্রায় সবগুলো স্টেশনের অবস্থাও নাজুক। স্টেশনগুলোতে বসা যায় না দুর্গন্ধে। যাত্রী ছাউনি ফুটো, অপরিষ্কার প্লাটফর্মগুলোতে নেই টয়লেট, কোনোটিতে টয়লেট থাকলেও নেই পানি। লাইট না থাকায় রাতেরবেলা বেশিরভাগ স্টেশনই ভুতুড়ে অবস্থা। কয়েকটি আবার মাদকাসক্তদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে।

রেলওয়ে মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন যুগান্তরকে জানান, ঢাকা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত ডাবল লাইন আছে। এ পথের দেওয়ানগঞ্জ পর্যন্ত ডাবল ও ব্রডগেজ লাইন স্থাপন করা হবে। এ সরকার পুরো রেলওয়েতে ব্যাপক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। আমাদের ইঞ্জিন ও বগির স্বল্পতা রয়েছে। এগুলো আমদানি করা হচ্ছে। এ পথে নতুন ট্রেন দেয়াসহ পুরাতন ট্রেনগুলোতে পরিবর্তন করা হবে। এ পথে যাত্রীদের চাপ রয়েছে স্বীকার করে তিনি বলেন, যাত্রীদের কল্যাণে জয়দেবপুর থেকে ময়মনসিংহ হয়ে জামালপুর পর্যন্ত সমান্তরাল দ্রুতগতির ১৬৬ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়।

এ রুটে রেলযাত্রার দুর্ভোগ নিয়ে কথা হয় জামালপুর উপজেলা চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন মল্লিকের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, রেলের উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু কোন অপরাধে আমাদের এই লাইনে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। জেলা পরিষদের উন্নয়ন ও আইন-শৃঙ্খলা মিটিংয়ে শতবার বলেছি, এ অঞ্চলে চলা ট্রেন, স্টেশন, লাইন সংস্কার করতে। কেউ কর্ণপাত করেনি। আমি বিএনপি করি, তাই কেউ আমাদের কথা কানে দেয় না।

জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট বাকী বিল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, চারিদিকে যখন দেখি রেলের উন্নয়ন হচ্ছে তখন খুবই হিংসা হয়। স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের এ অঞ্চলে রেলপথের তেমন উন্নয়ন হয়নি।

কথা হয় রেল পরিচালনার সঙ্গে জড়িত একাধিক চালক, গার্ড ও স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে। তারা সবাই একই সুরে যুগান্তরকে বলেন, নড়বড়ে লাইন দিয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন, বগি দিয়ে ট্রেন চালাতে হচ্ছে। তার ওপর অতিরিক্ত যাত্রী। ট্রেনের ছাদ, দু’বগির সংযোগস্থল ও ইঞ্জিন কোথাও যাত্রী ছাড়া নেই। ঢাকা থেকে ১৭০ কিলোমিটার রেলপথে যেতে লাগার কথা ৪-৫ ঘণ্টা। অথচ লাগছে ৮-৯ ঘণ্টা। অথচ এই রুটে দিনে ৭০-৭৫ হাজার যাত্রী চলাচল করে। সঠিক সময়ে ট্রেন না পৌঁছায় এবং গভীর রাতে ট্রেনগুলো প্রান্তিক রেলস্টেশনে পৌঁছানোর কারণে যাত্রীদের ছিনতাই, অজ্ঞান ও মলম পার্টির শিকার হয়ে সর্বশান্ত হতে হচ্ছে প্রায়ই। তাছাড়া ট্রেনগুলোতে নেই লাইটিং, পানি ও টয়লেট। নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে কালোবাজারে টিকিট-তো আছেই। এই রুটে ট্রেনের লাইনচ্যুতি হচ্ছে অহরহ। এরুটে ৭৫ শতাংশ রেল গেট অবৈধ। ফলে হরহামেশাই ঘটছে দুর্ঘটনা। যাত্রী হত্যাসহ চলন্ত ট্রেন থেকে যাত্রী ফেলে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে বহুবার।

কথা হয় জামালপুর রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, এ পথে যাত্রীদের চাপ সব সময়ই বেশি থাকে। সে তুলনায় ট্রেন নেই, ট্রেন থাকলেও অনেক ট্রেন স্বল্প বগি নিয়ে চলাচল করে। ডাবল লাইন না থাকায় সিডিউল বিপর্যয় হচ্ছে। ডাবল লাইন হলে সমস্যা থাকবে না। তিনি বলেন, এই স্টেশন প্রায় ২৫ জন স্টাফ কম নিয়ে চলছে। স্টেশন আধুনিকায়নের বিকল্প নেই। শত শত যাত্রী ট্রেনে দাঁড়িয়ে, ছাদে উঠে চলাচল করছে। ভাওয়াল এক্সপ্রেস ট্রেনটি কখনও ২টি আবার কখনও ৩টি বগি নিয়ে চলাচল করছে।

ঢাকা কন্ট্রোল রুম সূত্রে জানা যায়, এ পথে চলা তিস্তা এক্সপ্রেস শুরুতে ২২ বগি নিয়ে চলাচল করত, এখন ১৬টি নিয়ে চলছে। বহ্মপুত্র এক্সপ্রেস ১৮ বগি নিয়ে শুরু করলেও বর্তমানে ১১ বগি নিয়ে চলছে। এটিতে কোনো এসি চেয়ার কিংবা কেবিন নেই। হাওর এক্সপ্রেসটি ১৮ বগি নিয়ে চলাচল শুরু করে বর্তমানে ১২টি নিয়ে চলছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন রেল কর্মকর্তা জানান, সরকারি ট্রেনগুলোতে বগি স্বল্পতা পরিকল্পিতভাবে করা হচ্ছে। বেসরকারি কমিউটার ট্রেনগুলোতে পর্র্যাপ্ত বগি দেয়া হচ্ছে।

দেওয়ানগঞ্জের স্টেশন ম্যানেজার মোহাম্মদ রফিক বলেন ‘এ পথের শেষ স্টেশন হচ্ছে এটি। স্টেশনটির দিকে তাকানো যায় না। মনে হচ্ছে এর কোনো মা-বাবা নেই। অথচ হাজার হাজার ট্রেনযাত্রীর একমাত্র অবলম্বন হচ্ছে এটি। এ স্টেশন হয়ে জামালপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার যাত্রীরা ঢাকায় যাতায়াত করে। লালমনিরহাট, বগুড়া, গাইবান্দা, কুড়িগ্রাম, কাউনিয়ার শত শত গ্রামের মানুষ ট্রেনে ভ্রমণ করতে চায়। বগি স্বল্পতায় তা হচ্ছে না।

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে ভাওয়াল এক্সপ্রেস ট্রেনটি রাত ৯টা ২০ মিনিটে দেওয়ানগঞ্জের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ট্রেন চালক জানান, আমি এ ট্রেনটি প্রায়ই চালাই। আমার কাছে মনে হয় এটি একটি খেলনা গাড়ি। প্রশ্ন করতেই বললেন, বর্তমানে এ ট্রেনটি মাত্র ২টি বগি নিয়ে চলাচল করছে। তারমধ্যে একটির অর্ধেকে জেনারেটর বসানো হয়েছে। এটি শুধুমাত্র নামেই চলছে। এ ট্রেনটি ছোট্ট একটি জেনারেটর দিয়ে চালানো হচ্ছে। ভাবা যায়!

ভাওয়াল ট্রেনটিতে প্রায় ৮ বছর ধরে কাজ করছেন আমজাদ হোসেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ট্রেনটিতে মৌমাছির মতো যাত্রী উঠে। কিন্তু কোন কারণে বগি বাড়েনি। একটি টয়লেটও ঠিক নেই। পানি নেই, বাতি নেই। অনেক সিট ভাঙা, ছেঁড়া।

কথা হয় রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের এক প্রকৌশলীর সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, এই রুটে সিঙ্গেল লাইন হওয়ায় একটি ট্রেনকে সাইট দিতে গিয়ে সিডিউল বিপর্যয় হচ্ছে। অধিকাংশ লাইন ক্ষয় হয়ে গেছে। মূলত এটি জোড়াতালি দিয়ে চালাতে হচ্ছে। পাথর স্বল্পতা তো আছেই, তার উপর এ পথে অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলো খুবই ভয়ানক। রেলপথমন্ত্রী পুরো রেলপথটি ডাবল লাইন করার একটা উদ্যোগ নিয়েছেন। তখন ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি গতিও বাড়বে।

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার সীতাংশু চক্রবর্ত্তী যুগান্তরকে বলেন, এ অঞ্চলে চলাচলকারী সবক’টি ট্রেনে যাত্রী সংখ্যা সবচেয়ে বেশি থাকে। ঢাকা, জামালপুর, ময়মনসিংহ দেওয়ানগঞ্জ রুটে সবচেয়ে বেশি যাত্রী চলাচল করে। এ পথে চলাচলকারী ট্রেনগুলোতে বগি বাড়ানো জরুরি বলে স্বীকার করেন।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ রুটে কিছু কিছু স্টেশন সংস্কার করা হয়েছে। সম্প্রতি রেলপথমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক এ রুটে চলাচলকারী তিস্তা এক্সপ্রেসের মেয়াদোত্তীর্ণ বগি বদল করে নতুন বগি লাগিয়ে ট্রেনটি উদ্বোধন করেছেন। বাকি ট্রেনগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। এই রুটে তিস্তা ছাড়াও ব্রহ্মপুত্র, হাওর, মোহনা, জামালপুর কমিউটার ট্রেন চলাচল করে। এ পথে তিস্তা ছাড়াও অন্য কোনো ট্রেনই সিডিউল টাইমে যাতায়াত করে না।

জানতে চাইলে রেলপথ সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন যুগান্তরকে জানান, বর্তমান সরকার রেলওয়েতে ব্যাপক উন্নয়ন করছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকা-ময়মনসিংহ-দেওয়ানগঞ্জ রেলপথসহ রেলওয়ে স্টেশন, সিগনাল ব্যবস্থা অত্যাধুনিক করার প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। ডাবল লাইন নির্মাণসহ নতুন লাইন নির্মাণের সমীক্ষা চলমান রয়েছে। এ লাইনটির যেমন যথাযথ উন্নয়ন হয়নি, তেমনি এ লাইনে পর্যাপ্ত ট্রেনও দেয়া সম্ভব হয়নি। তবে রেলপথ মন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে নতুন ইঞ্জিন ও বগি এলেই এ পথে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হবে। স্টেশনগুলো আধুনিকায়ন করা হবে। চলমান লাইনগুলো সংস্কারের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ পথে অবহেলা নয়, আধুনিকায়নে একটি চূড়ান্ত ড্রাফ করা হয়েছে। জরাজীর্র্ণ লাইন ও স্টেশনগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে সংস্কার করা হবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন