বিরোধিতা করা যাবে না
চেয়ারম্যানদের কুরআন ছুঁয়ে শপথ করালেন এমপি ফারুক
Advertisement
রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
নিজের পক্ষে থাকতে জনপ্রতিনিধিদের কুরআনে হাত রেখে শপথ করাচ্ছেন রাজশাহী-১ আসনের সংসদ-সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী। জাতীয় সংসদ ভবন কার্যালয়ে শনিবার রাতে -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কেউ তার বিরুদ্ধে যাবেন না, বিরুদ্ধে কথা বলবেন না, তার আদেশ অমান্য করবেন না-কুরআন ছুঁয়ে এমন শপথ করতে বাধ্য করেছেন রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের সরকারদলীয় সংসদ-সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী।
গোদাগাড়ী উপজেলার ৯ ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র অয়েজুদ্দিন বিশ্বাসকে এ শপথ পড়ানো হয়।
জানা যায়, উল্লিখিত ১১ জনকে ঢাকায় ডেকে নিয়ে শনিবার সংসদ ভবনে নিজের অফিসে কুরআন ছুঁয়ে শপথ পড়ানো হয়। এ সময় এমপি ফারুক চৌধুরী তার মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করেন। রোববার বিভিন্ন মাধ্যমে চেয়ারম্যানদের শপথের এই ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ৯ ইউপি চেয়ারম্যানের মধ্যে চারজন গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। এছাড়া দুজন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। কুরআন ছুঁয়ে শপথ পড়ানোর কিছু ভিডিও ও স্থিরচিত্র যুগান্তরের হাতেও এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ইউপি চেয়ারম্যান জানান, ১০ ফেব্রুয়ারি এমপি ফারুক উন্নয়ন প্রকল্পের বিষয়ে আলাপ-আলোচনার কথা বলে তাদের ঢাকায় ডাকেন। ঢাকায় পৌঁছে ওইদিন সন্ধ্যার পর ৯ চেয়ারম্যান সংসদ ভবনে এমপি ফারুকের অফিসে যান। সেখানে তাদের প্রত্যেককে নানারকম হুমকিমূলক কথাবার্তা বলা হয়। ‘কাকে কীভাবে কখন সাইজ করতে হয়, সেটা তার ভালোই জানা আছে’ বলে সতর্ক করেন ফারুক। পরে তাদের কুরআন ছুঁয়ে শপথ করতে হবে বলে জানিয়ে দেওয়া হয়।
এমপি ফারুকের এমন আদেশের বিরোধিতা করেন মাটিকাটা ইউপি চেয়ারম্যান সোহেল রানা। তিনি এমপিকে বলেন, আমরা আপনার সঙ্গে আছি, থাকব। আমরা নৌকার হয়ে কাজ করব। কিন্তু আপনি যদি মনোনয়ন না পান? তখন তো আমরা আপনার সঙ্গে থাকতে পারব না। আমাদের নৌকার পক্ষেই থাকতে হবে। কিন্তু এসব বিষয়ে কুরআন ছুঁয়ে শপথ করতে হবে কেন। এ সময় সোহেল চেয়ারম্যানকে ধমক দেন এমপি ফারুক। এরপর গোদাগাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অয়েজুদ্দিন বিশ্বাসকে পরের দিন সন্ধ্যার আগে ফার্মগেট থেকে একটি কুরআন কিনে আনতে নির্দেশ দেন।
ইউপি চেয়ারম্যানরা আরও জানান, ১১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার পর তারা নির্ধারিত সময়ে আবারও ফারুকের অফিসে যান। চেয়ারম্যানরা উপস্থিত হলে তাদের অজু করে পবিত্র হওয়ার নির্দেশ দেন ফারুক। প্রথমে শপথ নিতে ডাকা হয় চর আষাড়িয়াদহের চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম ভোলাকে। ভোলা বিএনপি করেন জানিয়ে শপথ নিতে আপত্তি করেন। তবে এমপির ধমকে শেষ পর্যন্ত তাকে শপথ নিতে হয়। একে একে ৯ চেয়ারম্যানকে কুরআন ছুঁয়ে শপথ নিতে বাধ্য করা হয়। শপথ পড়ান অয়েজুদ্দিন বিশ্বাস। পরে তিনি নিজেও শপথ নেন। এ সময় ফারুক নিজের মোবাইলে ভিডিও ধারণ করেন এবং শপথ পর্যবেক্ষণ করেন। কেউ শপথে গড়িমসি করলেই ধমক দেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চেয়ারম্যান বলেন, চেয়ারম্যান সোহেল রানা কুরআন না ছুঁয়ে উপরে হাত রেখে শপথ পড়ছিলেন। এ সময় এমপি ফারুক তাকে ধমক দিয়ে বলেন, উপরে হাত দিলে হবে না, কুরআন ছুঁতে হবে। পরে সোহেল রানাও কুরআন ছুঁয়ে শপথ পড়েন। একজন চেয়ারম্যান মনে মনে শপথ পড়ছিলেন। তখন তাকে জোরে জোরে উচ্চারণ করে শপথ পড়ানো হয়। সবশেষ শপথ নেন গোদাগাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম এবং পৌর মেয়র অয়েজুদ্দিন বিশ্বাস। পরে চেয়ারম্যানরা দ্রুত এমপি ফারুকের অফিস ত্যাগ করে নিজ নিজ গন্তব্যে চলে যান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন চেয়ারম্যান বলেন, এসব পুরোপুরি জবরদস্তি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, দলকে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করতে তাদের শপথ পড়ানো হয়েছে। দলের বৃহত্তর স্বার্থেই এই কাজ করা হয়েছে। এতে সাংবাদিকদের সমস্যা কোথায়।
দলীয় সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও আচরণের কারণে গোদাগাড়ীর ইউপি চেয়ারম্যানদের অনেকেই এমপি ফারুকের বিরোধিতা করে আসছিলেন। এছাড়া কলেজ অধ্যক্ষকে পেটানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রকল্পের টাকার সিংহ ভাগ তুলে নেওয়া ছাড়াও নেতা ও চেয়ারম্যানদের কটুক্তি, গালাগালির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব কারণে সংসদীয় এলাকার দলীয় নেতা ও চেয়ারম্যানরা গেল এক বছর ধরে তাকে এড়িয়ে চলেছেন।
