নরকে এক ঋতু

  লীনা দিলরুবা ২৪ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

র‌্যাঁবোকে গুরুত্বপূর্ণ কবি মনে করা হয় আধুনিক সাহিত্যে তার প্রভাবের কারণে।

সারিয়ালিজম আন্দোলনের ওপর তার প্রভাব অনস্বীকার্য এবং আদ্রে ব্রেতো থেকে শুরু করে আদ্রে ফেনার্ড পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক কবি র‌্যাঁবোর কাছে নিজেদের ঋণ স্বীকার করেছেন। ফরাসি সাহিত্যের ইঁচড়ে পাকা বালক ছিলেন র‌্যাঁবো, ছিলেন প্রতীকবাদী সাহিত্যের অন্যতম প্রাণপুরুষও। এখনও নানা ভাষায় ব্যাপকভাবে পঠিত হচ্ছে তার সাহিত্য। স্যামুয়েল বেকেট ও জন অ্যাশবুরির মতো ইংরেজ লেখকরা র‌্যাঁবোর লেখা অনুবাদ করেছেন এবং তার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন।

তিনি নিজে একজন পয়গম্বর বা স্বপ্নদর্শীর ভূমিকা পালন করতে চেয়েছিলেন। ব্যবহার করেছেন ‘দেখক’ (seer) শব্দটি। র‌্যাঁবো সর্বজনীন একটি জীবনীশক্তিতে বিশ্বাস করতেন যেটি সব কিছু জানে ও অনুধাবন করে। এ আধ্যাত্মিক শক্তির নাম তিনি দিয়েছিলেন ‘অজ্ঞাত’- যাকে হাতেগোনা কিছু মানুষই কেবল বুঝতে পারে। র‌্যাঁবো চেয়েছিলেন অজানা এ আধ্যাত্মিক সত্তাকে দেখতে। তার চাওয়া ছিল, তার চেতনা যেন ওই সত্তার অধিকারে চলে যায় ও তার ক্রীড়নকে পরিণত হয়। তাহলেই তার পক্ষে সম্ভব হবে কবিতার মাধ্যমে মহাবিশ্বের সঙ্গীতকে মানুষের কাছে পৌঁছানো, তাদের আধ্যাত্মিকভাবে জাগিয়ে তোলা এবং সামাজিক প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। নিজের সামাজিক আদর্শকে জলাঞ্জলি দেননি র‌্যাঁবো, কেবল চেয়েছিলেন কবিতার মাধ্যমে সেগুলোকে অনুধাবন করতে। এজন্য প্রথমে দরকার ছিল এ কাজের যোগ্যতা অর্জনের এবং তিনি ‘সকল ইন্দ্রিয়ের বিশৃঙ্খলতা’ (the derangement of all the senses) নামে একটি নতুন অন্বয় উদ্ভাবন করেছিলেন। র‌্যাঁবো চেয়েছিলেন তার সমস্ত ইন্দ্রিয়ের স্বাভাবিক কাজকে পদ্ধতিগতভাবে দুর্বল করে দিতে, যাতে করে তিনি ‘অজ্ঞাত’কে দেখতে পারেন। স্বেচ্ছায় আত্মবিসর্জন দানের অংশ হিসেবে তিনি অনাহার এবং যন্ত্রণাকে বরণ করে নেন, গা ভাসিয়ে দেন মদ ও মাদকে। চেতনার পরিধিকে সম্প্রসারণ করার উদ্দেশ্যে তিনি এমনকি সম্মোহন ও উন্মাদনার কাছেও আত্মসমর্পণ করেছিলেন। পাঠকের কাছে নিজের ভাবনাদর্শনকে স্পষ্ট করার জন্য র‌্যাঁবো প্রথাগত ছান্দসিক কাঠামো ও কাব্যরচনার যেসব বৈশিষ্ট্য চমৎকারভাবে আয়ত্ত করেছিলেন সেগুলোকেও ভেঙে ফেলেছিলেন। চেয়েছিলেন তার কবিতার আকার নির্ধারণ করবে তার কল্পনাশক্তি, কল্পনাশক্তি যদি আকারহীন হয় তাহলে কবিতাও তাই হোক।

র‌্যাঁবোর অসাধারণ জীবন, অল্প বয়সে পেয়ে যাওয়া খ্যাতি, অজস্র কেলেঙ্কারি, সাহিত্য সাধনায় অব্যাখ্যাত বিরতি এখনও জনমনে বিস্ময়ের উদ্রেক করে। কবিতার শহীদ ও সন্ত, চিরকালে বিদ্রোহী ও ষন্ডা মাস্তান- সমালোচকদের কাছে নানা পরিচয়ে পরিচিত র‌্যাঁবো। তার কবিতার ডায়োনিসিয়াস-সুলভ শক্তিতে প্রভাবিত হয়েছেন বিশ শতকের অনেক কবি। ভাষাকে সমস্ত ফর্মের শৃঙ্খলমুক্ত করায় তার দক্ষতাও প্রভাব ফেলেছে অনেকের লেখায়। র‌্যাঁবোর সুদূরপ্রসারী আদর্শও আকর্ষক বলে প্রতিভাত হয়েছে অনেকের কাছে। যে অজ্ঞাতের সাধনা তিনি করেছেন, সেটিও সারিয়ালিস্টদের কাব্যচর্চার উর্বর জমিতে পরিণত হয়েছে। ভাষা নিয়ে তার কারিকুরিও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। শিশু প্রতিভা র‌্যাঁবো- যার প্রতিভার কোনো কুল বা কিনারা ছিল না, আবির্ভূত হয়েছেন আধুনিকতাবাদের প্রতিষ্ঠাতা জনকদের একজন হিসেবে।

ফর্মুলায় বেঁধে কবিতা লেখেননি। ‘নরকে এক ঋতু’, ‘মাতাল তরণী’, ‘ইল্যুমিনেশান্স’ জ্যঁ আর্তুর র‌্যাঁবোর (১৮৫৪-৯১) মতো কবিরা পৃথিবীতে জন্মান হাতেগোনা। ঈশ্বরে বিশ্বাস নেই, জাগতিক ধর্মের ধারে কাছেও যাননি, ‘নরকে এক ঋতু’ দেখেছেন কেবল।

জন্মদাত্রী ভিতালি কুইফও তার কবিসত্তাকে অস্বীকার করেছিলেন, প্যারির কবিসমাজ তো বটেই। কিন্তু আগুন যখন নিজেই নিজের অস্তিত্বের বড় প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়, তৃতীয় পক্ষের স্বীকৃতির তখন কি প্রয়োজন? আর্তুর বয়স যখন ছয় বছর, তার পিতা তাদের পরিবারকে ছেড়ে চলে যান। আর্তুর মধ্যে ওই বীজ ছিল, পলায়নের। বার বার পালিয়েছেন। জীবন থেকে অন্তিমভাবে পালান পর্যন্ত, বহুবার। ইজামবার শৈশবের শিক্ষক : প্রথম তাকে চিনেছিলেন। এরপর সমকামিতার হাত ধরে আফিম, হ্যাসিসসহ কবি ভেরলেনের কাছে উন্মোচিত হলেন সমস্ত প্রতিভা উজাড় করে। ভেরলেনও সঁপে দিয়েছিলেন মন-প্রাণ, নিজের স্ত্রী-পুত্রকে রেখেই ঘর ছেড়েছেন র‌্যাঁবোর হাত ধরে। স্ত্রী মাতিলদে, পুত্র গেয়র্গে কারও হাতছানিই তাকে সংসারে ফেরাতে পারেনি। শেষে ডিভোর্সও হয়ে যায় তাদের। বন্ধু বা সঙ্গী আর্তুরকে সঙ্গে করে ভেরলেন বেলজিয়াম, লন্ডন চষে বেড়িয়েছেন। আর্তুর লিখে গেছেন তার কবিতা। ভেরলেনের পাশে থাকলেন লম্বা সময়, র‌্যাঁবো লিখছেন তার ‘নরকে এক ঋতু’র কবিতাগুলো।

‘নরকে এক ঋতু’র মৌল লক্ষণগুলো গতানুগতিক চিত্রণ পরিহার করা। ভূমেন্দ্র গুহের অনুবাদে এ কাব্যগ্রন্থটিতে র‌্যাঁবোর বিচ্ছিন্নতা, নিঃসঙ্গতাকে লক্ষ্য করা যায়। তথাকথিত ভালোত্বের চক্র ছিন্ন করে, রিচুয়ালের মালা ছিঁড়ে র‌্যাঁবো উন্মোচন করলেন অন্য এক সত্য।

গ্রন্থভুক্ত কবিতাগুলো বেশিরভাগ গদ্যধর্মী।

ততদিনে তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, তার কোনো পূর্বসূরি নেই। কারণ আর্তুর তখন লিখেছেন অস্তিত্বকে ছাপিয়ে যাওয়ার মতো কবিতা। দেহের পবিত্রতাকে অস্বীকার করেছেন, ইন্দ্রিয় তৃপ্তিকে প্রাধান্য দিয়ে অস্বীকার করেছেন সমাজকে। নোংরা জামাকাপড় পরতেন। স্নান নেই, দাঁত মাজতেন না, নখ কাটাও ভুলে গিয়েছিলেন: অ্যালকেমিস্ট দর্শন অনুযায়ী নরকে পতনের মতোই নিজের অভ্যন্তরে পতনের রাস্তা খুঁজেছেন কেবল। তাকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফরাসি কবি বলা হয়; অতিশয়োক্তিকে উপেক্ষা করেই। তার কালে তাকে সবাই অস্বীকার করেছেন, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা হল; তাকে বাদ দিলে ফরাসি কবিতার তেজই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

‘বদ রক্ত’ কবিতার এক জায়গায় লেখা-

‘ইউরোপে এমন একটা পরিবার নেই, যা আমি চিনি-জানি না। সে-সব পরিবার, আমি বলতে চাইছি, আমার পরিবারের মতনই, মানুষের বৈধ অধিকার বিষয়ে ঘোষণা মোতাবেক যাদের টিকে থাকা, আর-কী। প্রতিটি পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্রটিকে আমি চিনি।

‘ফরাসি ইতিহাসে আমার যদি এক জন মাত্রও পূর্বসূরি থাকতেন!

কিন্তু না, কেউ নেই’।

র‌্যাঁবো জানতেন তিনি যা লিখছেন তা একদিন ইতিহাস হবে। জানতেন তার আগে যা লেখা হয়েছে ওসবের বেশিরভাগই বাতিল হয়ে যাবে।

‘পুরোনো ঘরানার কবিতাকর্মের পোকায়-কাটা ধ্যান-ধারণাগুলি আমার শব্দের অপরসায়নে খুব একটা স্বাস্থ্যকর ভূমিকায় অংশগ্রহণ করেছিল’।

আমি চেষ্টা করেছিলুম নতুন সব ফুল, নতুন সব গ্রহ, নতুন মাংস, নতুন সব ভাষা উদ্ভাবন করতে...

আবার তিনি এ-ও জানেন, সবকিছু মূল্যবান। তাই লেখেন-

‘কিছুই নিরর্থক নয়; জ্ঞানের অভিমুখে, এবং জ্ঞানের বাইরে’।

এই অনুশীলনে র্যাঁবো দেখেন, তার জগৎ থেকে রহস্য লুপ্ত হয়ে গেছে। তিনি যেন কেবল বাস্তব রূঢ়তাকে অনুভব করে নিজের অস্তিত্বকে বিশ্বাসযোগ্যরূপে তুলে ধরতে চান। বস্তুত তিনি নতি স্বীকার করতে চান না জাগতিক চাওয়া-পাওয়ার কাছেও। লিখেছেন-

‘কার কাছে আমি ভাড়া খাটাব আমাকে? কোন পশুকে পুজো করতে হবেই? কোন-কোন পবিত্র মূর্তিকে আক্রমণ করা চাই? কার-কার হৃদয় আমাকে ভেঙে দিতে হবেই? কোন-কোন মিথ্যাকে আমাকে তুলে ধরতে হবে- এবং কার রক্তের ভিতর দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে?’

তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন। এরপর আবিষ্কার করেছেন এক মহা সত্য-

‘যে-সব মানুষজনের সঙ্গে দেখা হল আমার, তারা আমাকে হয়তো দেখেইনি আদৌ।’

আর্তুর মৃত্যুটা ছিল কল্পনাতীত কষ্টের। পায়ে টিউমার দেখা দেয়, ফলে ডান পা অসম্ভব ফুলে গিয়েছিল, শেষাবধি পা-টা কেটে বাদ দিতে হয়। এরপরই ডান হাত অসার হয়ে যায় তার। একসময় জ্ঞান হারান আর্তুর। মারা যান ওই অবস্থায়। ১০ নভেম্বর ১৮৯১ সালে।

আনুষ্ঠানিক এপিটাফ লেখেননি। কিন্তু কবির এপিটাফ তো কবিতায় লুকিয়ে থাকে-

‘আমাকে ছাড়াই চ’লে যাবে তোমাদের। আমার নিজের কাজ রয়েছে, এবং আমি কাজটা পাশে সরিয়ে রেখে আর পাঁচ জনের ধাঁচে গর্বিত বোধ করব।

আমার জীবন ব্যবহারে-ব্যবহারে জীর্ণ হয়ে গেছে।’

‘নরকে এক ঋতু’র শেষ কবিতার নাম ‘বিদায়’।

আর্তুর লিখেছেন- আত্মার জন্য যে-যুদ্ধ, তা মানুষের যুদ্ধের মতোই অমানুষিক; কিন্তু ন্যায়-বিচারের যে-দৃশ্য, তা ঈশ্বরের একার আনন্দ।

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত