বজ্রপাতে বাড়ছে প্রাণহানি

নদীবন্দরে ২ নম্বর সতর্ক সংকেত

  যুগান্তর রিপোর্ট ২২ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গত কয়েকদিন ধরে দেশে চলছে কালবৈশাখীর তাণ্ডব। সেই সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে বজ্রপাতের পরিমাণ বেড়েছে। এ দুই কারণে বাড়ছে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির সংখ্যা। শনিবারও কালবৈশাখীর একই ধারা অব্যাহত ছিল। এমনকি দেশের বিভিন্ন স্থানে আগামী ১২ ঘণ্টার মধ্যে কালবৈশাখী আঘাত হানতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলার নদীবন্দরে ২ নম্বর সতর্ক সংকেত জারি করা হয়েছে। এদিন বজ্রপাতে কিশোরগঞ্জে একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

দেশি-বিদেশি গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে কালবৈশাখীর পাশাপাশি বজ্রপাতের হার বেড়েছে ব্যাপক হারে। ২০১০ থেকে ২০১৫ সালে শুধু এপ্রিল-মে মাসেই বাংলাদেশে বজ্রপাত বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। হাওর এবং উপকূলীয় এলাকায় এর মাত্রা আরও কয়েক গুণ।

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বিশ্বে বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয় বাংলাদেশে। পৃথিবীতে যত মানুষ মারা যান তার এক-চতুর্থাংশ মারা যান এ দেশে। আর বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগে যত মানুষ মারা যান তার দ্বিতীয় কারণ বজ্রপাত। গত কয়েক দিনে বজ্রপাতে অন্তত ৩০ জন মারা গেছেন। অথচ এ সময়ে অন্য কোনো দুর্যোগে এত মানুষ মারা যাননি। তবে সচেতনতা, সতর্কতা, বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা জনিত ঝুঁকি মোকাবেলায় যথাযথ পদক্ষেপ নিলে ক্ষতি কমানো সম্ভব। বুয়েটের এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ২০১৬ সালে বজ্রপাতে মৃত্যুকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। ওই বছর ১১ ও ১২ মে বজ্রপাতে সারা দেশে ৫৭ জন মারা যান। এখানেই শেষ নয়, ওই বছর এর আগে-পরে আরও বেশকিছু মানুষ মারা যান। এমন পরিস্থিতিতে সরকার ১৭ মে বজ্রপাতকে ১৩তম প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা দেয়।

বজ্রপাত বা এ ঘটনায় মৃত্যু নিয়ে একক কোনো কারণ চিহ্নিত করতে পারছেন না বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, আবহাওয়া অধিদফতর (বিএমডি) সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগে অনেকটাই ধারণা নির্ভর তথ্য জানা গেছে। তারা মনে করছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বাতাসে সিসার পরিমাণ বাড়া, জনজীবনে ধাতব পদার্থের ব্যবহারের আধিক্য, মোবাইল ফোন ব্যবহার ও এর টাওয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধি, বনভূমি বা গ্রামাঞ্চলে উঁচু গাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস, জলাভূমি ভরাট ও নদী শুকিয়ে যাওয়া ইত্যাদি বজ্রপাত বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, এসব কারণের প্রায় সবগুলোর সঙ্গে উষ্ণায়নের সম্পর্ক আছে। বুয়েটের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, বিশ্বখ্যাত সায়েন্স পত্রিকার এক নিবন্ধে ১ ডিগ্রি তাপমাত্রা বেড়ে গেলে বজ্রপাতের আশঙ্কা ১২ শতাংশ বেড়ে যায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিশেষজ্ঞ বলেন, বজ্রপাতের কারণ বায়ুদূষণ। বাতাসে সিসার পরিমাণ বেড়ে গেছে। সাধারণত ধাতব পদার্থ থাকলে তাতে বজ্রপাত আকর্ষণ করে। মেঘে ইলেকট্রন-প্রোটন থাকে। তা সিসার কারণে আকর্ষিত হয়। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বাংলাদেশে সাধারণত বর্ষা আসার আগের মার্চ-এপ্রিল-মে মাসে তাপমাত্রা বেশি হারে বাড়ে। এতে এ সময়ে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। আর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর থেকে ভেসে আসা আর্র্দ্র বায়ু আর উত্তরে আরব সাগর থেকে আসা শুষ্ক বায়ুর মিলনে বজ্রঝড় সৃষ্টি হচ্ছে। এ ঝড় দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ধাবিত হয়। আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক যুগান্তরকে বলেন, এর বাইরে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বা ভারতের পূর্বাঞ্চল থেকেও জলীয় বাষ্প এবং বায়ু বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সেটি সিলেট হয়ে ঢাকা ও বরিশাল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এটিও বজ্রঝড় সৃষ্টি করে। বর্ষা মৌসুমের আগে হওয়া এ ঝড় কালবৈশাখী নামে পরিচিত। এ সময়ে মেঘ চলাচলের ফলে চার ধরনের বজ্রপাত সৃষ্টি হয়। এগুলোর একটি মেঘ থেকে ভূপৃষ্ঠে চলে আসে। এছাড়া মেঘে-মেঘে, একই মেঘের অভ্যন্তরে এবং মেঘ থেকে বাতাসে বজ্রপাত হয়। তবে প্রথম বজ্রপাতটিই মানুষের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বুয়েটের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, বজ্রপাত সাধারণত মাটির দিকে চলে আসে। এক সময় দেশের বেশির ভাগ গ্রাম এলাকায় বড় গাছ থাকত। তাল, নারিকেল, বটসহ নানা ধরনের বড় গাছ বজ্রপাতের আঘাত নিজের শরীরে নিয়ে নিত। ফলে মানুষের আঘাত পাওয়ার আশঙ্কা কমত। তিনি বলেন, সরকার সারা দেশে ১০ লাখ তালগাছ লাগানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। এটি বজ্রপাত হ্রাসের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। আবহাওয়া বিভাগের তথ্যমতে, মে মাসে নিয়মিত বজ্রপাতের পরিমাণ বাড়ছে। ১৯৮১ সালের মে মাসে গড়ে ৯ দিন বজ্রপাত হতো। ২০১৫ সাল তা বেড়ে হয়েছে ১২ দিন। ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত বজ্রপাতে মারা গেছেন ১ হাজার ৪৭৬ জন। ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালে বজ্রপাতে যেসব মৃত্যু হয়েছে এর এক-চতুর্থাংশ হয়েছে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরের ৯ জেলায়। ২০১৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ৮৮টি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২৭টিই হয়েছে হাওর অঞ্চলে। ২০১৭ সালের হিসাব পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×