পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি
আগামী বছর অভিন্ন পরীক্ষার চিন্তা
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২১ মার্চ ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আগামী বছর থেকে একটি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তির চিন্তা চলছে। ‘জিআরই’, ‘এসএটি’, জিএমএটি’ বা ‘আইইএলটিএস’-এর আদলে নেওয়া হবে এই পরীক্ষা। সোমবার বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষাসংক্রান্ত এক বৈঠকে এমন আলোচনা হয়েছে। এর আগে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ২৭ ফেব্রুয়ারি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের নিয়ে একটি বৈঠক করেন। সেখানে তিনি এমন প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
তবে এ বছরও সাধারণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (জিএসটি) গুচ্ছের ২২ বিশ্ববিদ্যালয় একটি পরীক্ষার মাধ্যমেই শিক্ষার্থী ভর্তি করবে। এছাড়া আগের মতোই ৮টি কৃষি এবং তিনটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা গুচ্ছে পরীক্ষা নেবে। এই তিন গুচ্ছ কয়েক বছর ধরে আলাদা পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করছে। ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট এবং সশস্ত্র বাহিনী পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আলাদা পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করে আসছে। দেশে বর্তমানে অর্ধশত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে।
ইউজিসিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এমদাদুল হক। তিনি যুগান্তরকে বলেন, আগামী বছর থেকে একটি গুচ্ছেই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। ইতোমধ্যে শিক্ষামন্ত্রী এ বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছেন। সেটির সক্রিয় বিবেচনা চলছে। জিএসটি গ্রুপের ২২ বিশ্ববিদ্যালয় একটি গুচ্ছে পরীক্ষা নিয়ে এমন ব্যবস্থা প্রবর্তনের পথ উন্মুক্ত করেছে। ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরোর’ (ভুল থেকে সংশোধন) তত্ত্বের অনুসরণে পদ্ধতিটা অনেকটাই শক্তিশালী হয়েছে। এছাড়া আরও দুটি গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা নিচ্ছে। এবারও একইভাবে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। সুতরাং, গুচ্ছ নিয়ে ভীতিটা কেটে গেছে।
একই বৈঠকে যোগ দেওয়া শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমদ যুগান্তরকে বলেন, শিক্ষার্থীদের কষ্ট লাঘব এবং অর্থসাশ্রয়ে অভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যাপারে চ্যান্সেলর তথা রাষ্ট্রপতি অনুশাসন দিয়েছেন। এ ব্যাপারে দেশবাসীরও আকাঙ্ক্ষা আছে। তাই আগামী বছর ‘ইউনিক এক্সাম’ (একটি পরীক্ষা) চালু করতে পারলে দুটিই পূর্ণ হবে। এজন্য নানান অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সফটওয়্যার প্রস্তুত হয়ে গেছে। তাই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এখন সহজ হবে। তিনি আরও বলেন, গত বছরের মতোই এ বছর ভর্তি পরীক্ষাগুলো হয়ে যাবে। অন্যদিকে জিএসটি গুচ্ছের বিষয়ে কিছু উদ্দেশ্যমূলক ও পরিকল্পিত অপপ্রচার হয়েছে। সেগুলো আমলে নেওয়া হবে না। তবে ভর্তি প্রক্রিয়া থেকে ক্লাস শুরু পর্যন্ত সময়ক্ষেপণ হওয়ার অভিযোগ সত্য। মূলত ৮-১০ বার মাইগ্রেশনের (বিশ্ববিদ্যালয় বা বিভাগ বদল) সুযোগ দেওয়ায় এমনটি হয়েছে। আগামী বছর থেকে ২ বারের বেশি এই সুযোগ রাখা হবে না। ফলে দ্রুত ক্লাস শুরু করা যাবে।
জানা যায়, একটি পরীক্ষার মাধ্যমে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির চিন্তা চললেও কীভাবে বা কোন কোন বিষয়ে তা (পরীক্ষা) নেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। বিশেষ করে এখনকার মতোই কৃষি, প্রকৌশল এবং সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা পরীক্ষা হবে কি না; কিংবা বিজনেস স্টাডিজের জন্য আলাদা পরীক্ষা প্রবর্তন করা হবে কি না, তা চূড়ান্ত হয়নি। তবে এ ব্যাপারে ২৭ ফেব্রুয়ারির বৈঠকে একটি ধারণা দিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেছিলেন, বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে একটি পরীক্ষা হয়। সেখানে হয়তো গণিত, বিজ্ঞান বা ভাষা-এ জাতীয় বিষয় এবং সাধারণজ্ঞানের ওপর পরীক্ষা হয়। সেই পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের দেশে যারা এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষা দিচ্ছে, তারাই বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে আবারও একই বিষয়ের ওপর পরীক্ষা দিচ্ছে। সেটি না করে ভাষা, গণিত, সাধারণজ্ঞানের ওপর একটি পরীক্ষা হওয়া উচিত। আর যতক্ষণ না সেটিতে যেতে পারছেন, ততক্ষণ বিদ্যমান গুচ্ছ পদ্ধতির পরীক্ষা ব্যবস্থাপনাকে আরও ভালো করতে হবে।
সূত্র জানায়, বিস্তারিত রোডম্যাপ তৈরি না হলেও এক্ষেত্রে ভারতের দৃষ্টান্ত অনুসরণের চিন্তা আছে। ভারতে ‘সিইউইট’ (কমন ইউনিভার্সিটি অ্যানট্রেন্স টেস্ট) এবং ‘এইইটি’ (ন্যাশনাল অ্যালিজিবিলিটি কাম অ্যান্ট্রেন্স টেস্ট) নামে পরীক্ষা নেওয়া হয়। বাংলাদেশে এ ধরনের পরীক্ষা নেওয়ার জন্য ‘এনটিএ’ (ন্যাশনাল টেস্টিং অথরিটি) গড়ে তোলার প্রস্তাব ইতোমধ্যে এসেছে।
এ প্রসঙ্গে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর বলেন, বর্তমানে ৮০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছবদ্ধ হয়ে পরীক্ষা নিচ্ছে। এমন বাস্তবতায় সব বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে ইউনিক এক্সামের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে এনটিএ গঠনের কথাও এসেছে। তবে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত উপাচার্যদের সঙ্গে করে বাস্তবায়ন করতে হবে। এ নিয়ে বছরব্যাপী কাজ করতে হবে। এ ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো কর্মপন্থা ঠিক করা হয়নি। তাই কয়টি পরীক্ষা নেওয়া হবে, এ কথা এখনই বলা সম্ভব নয়।
ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। সংস্থাটির তিন সদস্য ও জিএসটি গুচ্ছের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা এতে যোগ দেন। জানা যায়, এতে বিগত ভর্তির মতো ৬ মাস সময় নেওয়া হবে। এবার (২০২২) এইচএসসি উত্তীর্ণদের জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে বা আগস্টের প্রথম সপ্তাহে ক্লাস শুরু করা হবে। এ লক্ষ্যে এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে ভর্তির কাজ শেষ করা হবে। সিদ্ধান্ত নিতে দু-একদিনের মধ্যে জিএসসি গুচ্ছের স্টিয়ারিং কমিটির সভা ডাকা হবে বলে জানা গেছে।
আরও জানা যায়, জিএসসি গ্রুপ থেকে বেরিয়ে ঢাকা, রাজশাহীসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো আলাদা পরীক্ষা নিতে ব্যাপক চাপ তৈরি করেন ইসলামী ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলে সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। কিন্তু সোমবারে ইউজিসির বৈঠকে ২৭ ফেব্রুয়ারি শিক্ষামন্ত্রীর আহ্বানকে সম্মান জানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যেহেতু সবই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং চ্যান্সেলরের অনুশাসন ও সরকারের ইচ্ছা আছে গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার, তাই সবাইকে গুচ্ছবদ্ধ থাকতে আহ্বান জানায় ইউজিসি। বিষয়টি বিবেচনার জন্য উল্লিখিত দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলকে আহ্বানও জানানো হয়।
নাম প্রকাশ না করে বৈঠকে উপস্থিত একজন উপাচার্য যুগান্তরকে জানান, জিএসটি গ্রুপে ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে সময়ক্ষেপণ ছাড়া আর কোনো অভিযোগ সঠিক নয়। গুচ্ছ থেকে বেরিয়ে যেতে ইসলামী বা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসন শূন্য থাকার অজুহাত তুলেছে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রত্যেক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই প্রতিবছর প্রচুরসংখ্যক আসন শূন্য থাকে। উদাহরণস্বরূপ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা পরীক্ষা নেয়। কিন্তু ২০২১ সালে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৬২টি আসন শূন্য ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল ৩৭টি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২ লাখ আর ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৬১৭টি আসন শূন্য ছিল। আর যখন দুইবার ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ ছিল, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষে অর্ধেক আসনই শূন্য হয়ে যেত। সুতরাং খোঁড়া যুক্তি দেওয়া হয়েছে।
অতিরিক্ত খরচ প্রসঙ্গে আরেক উপাচার্য বলেন, যখন আলাদা ভর্তি পরীক্ষা দিতে হয়েছে, তখন একজন শিক্ষার্থীর প্রায় ১ লাখ টাকা খরচ হতো। গত বছর একজনের সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এরপরও এ বছর ফি কমানো হয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীর সঙ্গে ১ থেকে ২ জন করে অভিভাবক যেতেন। তারা বাস-রেল স্টেশন, মসজিদ, বারান্দায় ঘুমাতেন। এখন নিজের বাড়ির কাছে কেন্দ্রে পরীক্ষা দিয়ে দুপুরে বাড়িতে খাবার খেতে পারে। সুতরাং খরচ বা কষ্ট বৃদ্ধির অভিযোগ সঠিক নয়। তাই গুচ্ছ ভর্তি চলবে।
ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক মুহাম্মদ আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা প্রসঙ্গে অবশ্যই শিক্ষকদের অনুভূতিকে স্বাগত জানায় সরকার। কিন্তু তাদেরকে বিদ্যমান স্রোতের বাইরে চিন্তা করা ঠিক হবে না। এ বিষয়ে সরকারের আকাঙ্ক্ষা উপাচার্যদের অবহিত করা হয়েছে। ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে তিন গুচ্ছের কার্যক্রম শিগগিরই শুরু হবে। পরীক্ষা প্রক্রিয়া আরও সহজ ও শিক্ষার্থীবান্ধব করতে আহ্বান জানানো হয়েছে।
