বাংলাদেশে বুর্জোয়া শ্রেণীর ভূমিকা

  বদরুদ্দীন উমর ১৫ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

৩০ ডিসেম্বর ২০১৮-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ সব রাষ্ট্রীয় সংস্থার ওপর তার পূর্ণ কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করেছে। শুধু তাই নয়, যেভাবে এই কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ স্থাপিত হয়েছে সেটা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে এই সংস্থাগুলোকে অঘোষিতভাবে নিজেদের অঙ্গসংগঠনে পরিণত করে। এভাবে তারা এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যাতে তারা বলতে পারে ‘আমরাই রাষ্ট্র’। শুধু বলতে পারে তাই নয়, তাদের অনেক মুখপাত্র এ কথা প্রকাশ্যে নিজেদের সভা-সমিতি ও বিবৃতিতে বলেছেনও। নির্বাচন কমিশন, পুলিশসহ সব ধরনের সংস্থা, আমলাতন্ত্র এবং মধ্যবিত্ত লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ইত্যাদি বুদ্ধিজীবীর সব থেকে শক্তিশালী অংশ যেভাবে কাজ করেছে, তাতে তাদের একই অবস্থান সম্পর্কে কোনো সন্দেহ তারা আর রাখেনি।

এখানে মনে রাখা দরকার, সমাজে কোনো পার্টিই মূল নির্ধারক শক্তি নয়। মূল নির্ধারক হল শ্রেণী। কাজেই কোনো রাজনৈতিক দল যখন রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে নিজের অধীনস্থ করে তখন এটা বুঝতে হবে যে, কোনো না কোনো শ্রেণীর প্রতিনিধি হিসেবেই তারা সেটা করছে। বাংলাদেশও এদিক দিয়ে কোনো ব্যতিক্রম নয়। কাজেই আওয়ামী লীগও একটি শ্রেণীর প্রতিনিধি হিসেবেই কর্তৃত্বের অবস্থানে রয়েছে এবং এই শ্রেণীটি হল ব্যবসায়ী শ্রেণী। প্রকৃতপক্ষে ব্যবসায়ী শ্রেণীই অন্যসব শ্রেণীকে, এমনকি শিল্প পুঁজিকেও নিজের অধীনস্থ করে এখন ক্ষমতার শীর্ষদেশ অধিকার করেছে।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা করায়ত্ত করার এ প্রক্রিয়া ব্যবসায়ী বুর্জোয়া শ্রেণীর দ্বারা শুরু হয়েছে ১৯৭২ সাল থেকেই। সেই প্রক্রিয়া দ্রুত অগ্রসর হয়ে এখন তাকে বর্তমান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছে। ব্যবসায়ী বা বাণিজ্যিক পুঁজির এ অবস্থা এমন শক্তিশালী যে, তার আধিপত্য শুধু আওয়ামী লীগের ওপরই নেই; বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী ইত্যাদি প্রতিটি বুর্জোয়া পার্টির ওপরই তার কর্তৃত্ব আছে। জাতীয় পার্টি ও বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখনও তারাই ছিল বাংলাদেশের অধিপতি শ্রেণী। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলাদেশে যেভাবে এই শ্রেণী তার আধিপত্য স্থাপন ও বিস্তার করেছে, তাতে আওয়ামী লীগই পরিণত হয়েছে এই শ্রেণীর সব থেকে উপযোগী রাজনৈতিক হাতিয়ারে। এ বিষয়ে আমি বিস্তারিতভাবে অনেক লিখেছি। কাজেই ব্যবসায়ী শ্রেণীর আধিপত্য বাংলাদেশে সর্বগ্রাসী হলেও আওয়ামী লীগই হল ব্যবসায়ী বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রধান ও সব থেকে নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক প্রতিনিধি।

এদিক থেকে বিচার করলে বোঝা যাবে, বাংলাদেশে এখন আওয়ামী লীগের যে কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রায় নিরঙ্কুশভাবে স্থাপিত হয়েছে, সে নিয়ন্ত্রণ শ্রেণীগতভাবে হল ব্যবসায়ী বুর্জোয়ার। এর প্রমাণ জাতীয় সংসদের সদস্যদের শ্রেণীগত চরিত্রের মধ্যেও স্পষ্টভাবেই পাওয়া যায়। এই সংসদের প্রায় ৮০ শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের ব্যবসায়ী এবং বাকি ২০ শতাংশ ব্যবসার সঙ্গে বিভিন্ন সূত্রে সম্পর্কিত। বাংলাদেশ-পূর্ব আওয়ামী লীগের এই অবস্থা ছিল না। এমনকি ১৯৭৩ সালে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্যদের এই শ্রেণী চরিত্র ছিল না। কিন্তু এখন বহু ধনসম্পদের মালিক ছাড়া কারও পক্ষে জাতীয় সংসদের সদস্য হওয়া সম্ভব নয়। ব্যবসায়ী শ্রেণী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনব্যবস্থাই এভাবে গরিবদেরকে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। বস্তুতপক্ষে তারা এই প্রক্রিয়া থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে।

ব্যবসায়ী বুর্জোয়া শ্রেণী যখনই কোনো দেশে শাসন ক্ষেত্রে আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করে সেখানেই নৈরাজ্য দেখা যায়। যে পরিমাণে এই আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ থাকে, সে পরিমাণেই নৈরাজ্য থাকে। নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য চুরি-দুর্নীতি থেকে হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, গুম ইত্যাদি এ কারণেই ব্যবসায়ী বুর্জোয়া শ্রেণীর শাসনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশে এখন এগুলোর প্রতিটিই বড় আকারে দেখা যায়। এ সবের সমালোচকরা অনেকেই এর বিস্তারিত বিবরণ দেন, এর বিরুদ্ধে অনেক প্রতিবাদ হয়। এর জন্য আওয়ামী লীগ বা বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টিকে দোষারোপ করা হয়; কিন্তু এর পেছনে যে শ্রেণীটি কাজ করে, যে শ্রেণী এসব দল নিয়ন্ত্রণ করে, তার কোনো উল্লেখই প্রকৃতপক্ষে দেখা যায় না। এটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমালোচনার একটা বড় ঘাটতি, এমনকি বলা চলে একটা নেতিবাচক দিক।

বাংলাদেশে ব্যবসায়ী বুর্জোয়া এখন শিল্প থেকে নিয়ে ব্যাংক, বীমা ইত্যাদি অর্থ সংস্থার ওপর তার নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করেছে। সরকারি ব্যাংকগুলো আজ যেভাবে লুটপাট হচ্ছে এবং সরকার যেভাবে এই লুটপাট বন্ধ করতে অক্ষম হচ্ছে অথবা এ বিষয়ে কার্যত উদাসীন থাকছে, তার মধ্যেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। জাতীয় সংসদের সদস্যদের মধ্যেও হাজার ‘সতর্কতা’ সত্ত্বেও ঋণখেলাপির সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত। প্রকৃতপক্ষে সরকারি সহায়তাতেই সরকারি ব্যাংকগুলো এভাবে ব্যবসায়ী শ্রেণীর দ্বারা লুটপাট হচ্ছে। এরাই টাকার জোরে জাতীয় সংসদের প্রার্থী হচ্ছে, কোটি কোটি টাকা নির্বাচনে খরচ করছে এবং জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে ‘জনগণের প্রতিনিধিত্ব’ করছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যেভাবে কারচুপি, দুর্নীতি ও শক্তি প্রয়োগ করেছে, তার থেকেই বোঝা যায় একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে তারা নিজেদের পরাজয় সম্পর্কে নিশ্চিত ছিল। কারণ যারা বিজয় সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হয়, তাদের দিক থেকে কারচুপি, দুর্নীতি ও বলপ্রয়োগের প্রয়োজন হয় না। যেভাবে আওয়ামী লীগ নির্বাচন করেছে তাতে দেখা গেছে সংবিধানের পরোয়াও তারা করে না। বহুভাবে তারা সংবিধানবহির্ভূত কাজ করেই নির্বাচনে সাফল্য লাভ করেছে। এ কাজের পেছনে শুধু তাদের দলীয় স্বার্থই যে কাজ করেছে এমন নয়, এর পেছনে কাজ করেছে ব্যবসায়ী শ্রেণী। ব্যবসায়ী শ্রেণীই আসল শক্তি। তাদের প্রতিনিধিত্ব করার মধ্যেই আওয়ামী লীগের শক্তি নিহিত। এ বিষয়টি যদি বিবেচনা ও হিসাবের মধ্যে রাখা না হয়, তাহলে বর্তমানে যে পরিস্থিতি দেশে বিরাজ করছে তার স্বরূপ বোঝা যাবে না।

আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনগণের রোষ, ক্ষোভ ও বিক্ষোভের শেষ নেই। এ কারণে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তারা ভোটের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করতেন। কিন্তু যেভাবে আওয়ামী লীগ নির্বাচন সম্পন্ন করেছে তাতে তারা যতই বিক্ষুব্ধ হন, কার্যক্ষেত্রে তারা কিছুই করতে পারেননি। এর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ তারা গড়ে তুলতে পারেননি। এর কারণ বাংলাদেশ এখন কোনো সংগঠিত শক্তি নেই যারা জনগণের চিন্তাভাবনাকে ধারণ করতে, প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেন।

বিএনপি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বুর্জোয়া রাজনৈতিক দল হলেও তারা যে সাংগঠনিকভাবে কত দুর্বল এটা নির্বাচনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, যদিও সরকারি নির্যাতনও এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু যাই হোক, দেখা গেছে যে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী কারচুপি, দুর্নীতি ও শক্তি প্রয়োগ প্রতিহত করার ক্ষমতা জনগণের থাকেনি। এর থেকেই প্রমাণিত হয়, জনগণের মধ্যে ক্ষোভ-বিক্ষোভ যতই থাকুক, সংগঠন ছাড়া এর কোনো মূল্য নেই। সংগঠন ছাড়া জনগণের শক্তি শূন্য।

বিরোধী দল থেকে নির্বাচনে-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবে এখন আওয়াজ তোলার চেষ্টা হচ্ছে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন বাতিল করে নতুন নির্বাচন দেয়ার। এই দাবি যে একেবারে ভুয়া এতে সন্দেহ নেই। এর কোনো বাস্তব রাজনৈতিক কার্যকারিতাই নেই। কারণ আগেই বলেছি যে, আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রের সব সংস্থাকে নিজেদের অঙ্গীভূত করে এমন অবস্থা সৃষ্টি করেছে যে মনে হবে আওয়ামী লীগই রাষ্ট্র। বর্তমানে বিরোধী ঐক্যজোট থেকে নতুনে নির্বাচনের যে দাবি করা হচ্ছে, সে দাবি তাদের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধিতে এক ফোঁটাও অবদান রাখবে না।

আসলে বুর্জোয়াদের এই দলগুলো ব্যবসায়ী বুর্জোয়া শ্রেণীর আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে কোনো শক্তি সংগঠিত করার ক্ষমতা রাখে না। এ কাজ দেশের প্রগতিশীল ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক শক্তিকেই করতে হবে। তাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। গণতান্ত্রিক সুযোগ-সুবিধার (ডেমোক্রেটিক স্পেস) জন্য দেখা যাচ্ছে যে, সরকারের বিরুদ্ধে ফেসবুকে হাজার হাজার, এমনকি লাখ লাখ ব্যক্তি, যাদের বিপুল অধিকাংশ তরুণ ও যুবক, নিজেদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। এর একটা মূল্য অবশ্যই আছে। কিন্তু শুধু এর দ্বারা যে কার্যত বেশি অগ্রসর হওয়া যায় না, এটা বিগত নির্বাচনের মধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে। প্রয়োজন সংগঠনের, সাংগঠনিক শক্তির। এই সংগঠন গড়ে তোলা ও সাংগঠনিক শক্তি অর্জনই তাদের সামনে সব থেকে বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্তব্য। এ কর্তব্য সম্পাদনের জন্য এ দেশের তরুণ ও যুবশক্তিকেই এগিয়ে আসতে হবে।

১৪.০১.২০১৯

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×