Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

সরকারি চাকরিজীবীরা কি ‘বেশি সমান’?

Advertisement

Icon

ডা. জাহেদ উর রহমান

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০১৯, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারি চাকরিজীবীরা কি ‘বেশি সমান’?

Advertisement

কেউ কি হতে পারে বেশি কিংবা কম মৃত? কিংবা বেশি বা কম গর্ভবতী? পারে না। ইংরেজি ‘ডেড’ বা ‘প্রেগন্যান্ট’ শব্দগুলো একটা বিশেষ ধরনের বিশেষণ।

ইংরেজিতে এর নাম হচ্ছে ‘অ্যাবসোল্যুট এজেক্টিভ’। এ রকম শব্দ আছে কয়েক শত, যার মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে কমপ্লিট, পারফেক্ট, ট্র–, ফলস, সুপিরিয়র, ইনফেরিয়র, অ্যাবসেন্ট, ফ্যাটাল ইত্যাদি। এসব শব্দের চরিত্র হচ্ছে এগুলোর কম্পারেটিভ আর সুপারলেটিভ ডিগ্রি হয় না।

‘সরকারি চাকরি আইন-২০১৮’ কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এই আইনের ৪১(১) ধারাটি আলাদাভাবে গুরুত্ব পেয়েছে, তাই মিডিয়ায় সেটা নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। ধারাটা আগে দেখে নেয়া যাক।

৪১(১) ধারায় কোনো সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত অভিযোগে দায়েরকৃত ফৌজদারি মামলায় আদালত কর্তৃক অভিযোগপত্র গৃহীত হইবার পূর্বে, তাহাকে গ্রেফতার করিতে হইলে, সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি গ্রহণ করিতে হইবে।

হঠাৎ সরকারি চাকুরেরা তাদের কাজ করার সময় এর কোনো অভিযোগে অভিযুক্ত হলে তাদের বিরুদ্ধে যদি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়, তাহলে তাদের সরাসরি গ্রেফতারের এখতিয়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর থাকবে না। সেই ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা সরকারের অনুমতি নিতে হবে।

ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারাতেও সরকারি কর্মচারীদের আইনি সুরক্ষা দেয়া আছে। এটা অনুসারে সরকারি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেলে অভিযোগপত্র দেয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা দফতরের অনুমোদন লাগবে। তবে গ্রেফতারে বাধা নেই। কিন্তু নতুন আইনে অভিযোগপত্র আদালতে গৃহীত হওয়ার আগে গ্রেফতার করতে চাইলে সরকারের অনুমতি লাগবে।

আমরা মনে করতে পারব এর আগেও দুদকের আইনে গ্রেফতারের জন্য সরকারের অনুমতি নেয়ার বিধান রেখে আইন তৈরি করা হয়েছিল। হাইকোর্টে সেটা চ্যালেঞ্জ করার পর হাইকোর্ট সেই ধারাটি বাতিল ঘোষণা করেন। এরপর সরকার আর এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেনি। তাই অনুমান করা যায় সরকার এটি মেনে নিয়েছিল।

কিন্তু প্রশ্ন হল, সেই রায় যদি সরকার মেনে নিয়েই থাকে, তাহলে সরকারি চাকরি আইনে আবার একই ধারা রাখার উদ্দেশ্য কী? কেউ কেউ বলছেন, যেহেতু দুদক আইনে এটা আছে, সেহেতু এই আইনের এই ধারাটি সমস্যা করবে না। এটাও ঠিক কথা না।

কারণ সব সরকারি কর্মকর্তাকে দুদক আইনে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে, সেটা না-ও হতে পারে। আবার সরকারি কর্মচারী আইনে লেখা আছে- অন্য আইনে যা-ই থাকুক না কেন, এই আইন প্রাধান্য পাবে। কিন্তু তর্কের খাতিরে ধরে নেয়া যাক সব মামলা দুদকের আইনেই হবে, এবং দুদক আইনই সব আইনের ঊর্ধ্বে প্রাধান্য পাবে।

খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের সর্বোচ্চ আদালত যখন মনে করছে সরকারি কর্মচারীদের গ্রেফতারের জন্য এই ধরনের অতিরিক্ত কোনো সুবিধা থাকা চলবে না, তখনও আবার সরকারি কর্মচারী আইন-২০১৮তে এই ধরনের বিধান কেন রাখা হচ্ছে? প্রশ্নটা তো আদৌ দুদক আইন আর সাধারণ পেনাল কোডের না, প্রশ্নটা হচ্ছে রাষ্ট্রের নাগরিকদের আইনের দৃষ্টিতে সমান থাকা বা না থাকার।

দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর এরকম আরেকটা ধারা রেখে আইন তৈরি করা আমাদের কাছে এই বার্তা দেয়, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বিচারালয়ের রায়কেও যথাযোগ্য সম্মান দেখাতে আমাদের আমলারা মোটেও প্রস্তুত নয়।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন এই আইনের পক্ষে বলেন, সরকারকে সামনে এগিয়ে যেতে অনেক সময়, অনেক রকম সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যদি একজন কর্মকর্তা ঝামেলা বা ঝুঁকি মনে করেন, তাহলে এগোতে চাইবেন না। আবার জনস্বার্থে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতেও হবে।

এই যুক্তি হাস্যকর। কোনো অভিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা সাধারণ কোনো মানুষ জারি করবে না। এটা করবে রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ কিংবা অন্য কোনো সংস্থা। কোন মামলার মেরিট কী, কোন মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা যাবে বা কোনটায় যাবে না, এটুকু আস্থা কি আমরা এই রাষ্ট্রের বিচার বিভাগের উপরে রাখতে পারি না? যখন আমলারা কাজের গতির দোহাই দেন, তখন তারা আদতে এই রাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ওপর অনাস্থা জ্ঞাপন করেন।

অনেক প্রকল্পে তো জনপ্রতিনিধিরাও যুক্ত থাকেন। মজার ব্যাপার হল, তাদের গ্রেফতার করতে হলে কিন্তু কারও কোনো বিশেষ অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। তাহলে কি এখন আবার ‘কাজের গতি’র দোহাই দেখব তাদের পক্ষ থেকেও? যে যুক্তি সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য, সেটা জনপ্রতিনিধিদের জন্য প্রযোজ্য হবে না কেন?

এই প্রসঙ্গে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ের অবতারণা করেছে টিআইবি। তারা বলেছে, সরকারি চাকরি আইন নামটিই সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই আইনের নাম হওয়ার কথা ‘জনপ্রশাসন আইন’। সংস্থাটির মতে, আইনে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব কর্তৃত্ব সরকারের কাছে রাখা হয়েছে, যা ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী’ এই সাংবিধানিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এ দেশে প্রতিটি সরকারের একটা কমন চর্চা ছিল সরকার আর রাষ্ট্রকে একই বিষয় হিসেবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা। এজন্যই দেশের পাবলিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর (স্কুল, কলেজ) আগে ‘পাবলিক বা রাষ্ট্রীয়’ না লিখে ‘সরকারি’ লেখা হয়েছে। এতে মানুষের সামনে এটাই প্রতিষ্ঠিত হয় একটা সরকার আর রাষ্ট্র মূলত একই জিনিস। কোনো একটা সরকার যখন ক্ষমতায় আসে এবং যাচ্ছেতাই করে, তখন আমাদের সাধারণ মানুষের ধারণা হয় তারা তো করতেই পারে যে কোনো কিছু, কারণ তারাই তো দেশের মালিক।

এই প্রবণতার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হচ্ছে এই দেশে এখন সরকারের সমালোচনা করা প্রায় অসম্ভব বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের সমালোচনাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে দেখিয়ে হুমকি দেয়া কিংবা বিচারের আওতায় আনা আমাদের দেশে এখন খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।

এই পর্যায়ে আবার পড়ে নেয়া যাক আমাদের জানা সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদটি। সেটা আক্ষরিকভাবে এরকম- ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী’।

কিছুদিন আগে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের এক খবর মিডিয়ায় এসেছিল, যেটা আমাদের চোখ এড়িয়ে গেছে অনেকেরই, আবার যাদের নজরে এসেছে তারাও এসব খবরকে আর পাত্তা দেন না। জনাব মুহিত এবার আর সাংসদ নন, কিন্তু সাংসদদের জন্য শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির যে প্রাধিকার, সেটা তাকে দেয়া হয়েছে। এমনকি এটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, সাংসদদেরকে শুল্কমুক্ত গাড়ির সুবিধা দেয়াটাও আদৌ নৈতিক এবং সংবিধানসম্মত কিনা।

শুরু করেছিলাম ‘অ্যাবসোল্যুট এজেক্টিভে’র কথা দিয়ে। এরকম শব্দের আরেকটা উদাহরণ হচ্ছে ‘ইকুয়াল’। এই শব্দেরও কম্পারেটিভ বা সুপারলেটিভ হয় না। কিন্তু এটা নিয়েই খুব অসাধারণ একটা ফান করে এক অমর বাক্য তৈরি করেছেন সাহিত্যিক জর্জ অরওয়েল। তিনি তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘অ্যানিম্যাল ফার্মে’ লিখেছেন- ‘অল অ্যানিম্যালস আর ইকুয়াল, বাট সাম অ্যানিম্যালস আর মোর ইকুয়াল দ্যান আদার্স।’

এই রাষ্ট্রের সংবিধান আইনের চোখে যতই সবাইকে সমান বলুক না কেন, এই রাষ্ট্রে নানা সেক্টরে ‘বেশি সমান’ মানুষ আছে। নানা কারণে তারা ‘বেশি সমান’ হয়ে ওঠেন। একটা সরকার যখন একের পর এক মেয়াদ জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া ক্ষমতায় থাকে, তখন সেই সরকারের ক্ষমতায় টিকে থাকার ভিত্তি আর থাকে না জনগণ।

সরকারকে টিকে থাকতে হয় জনগণের ওপর অযৌক্তিক, মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করে। এই কারণেই সেই সরকার একেবারেই প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীনির্ভর হয়ে পড়ে। সরকারের ক্ষমতার ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায় এই গোষ্ঠীটিই।

এই লেখার শিরোনাম একটি প্রশ্নের আকারে লেখা হয়েছে, কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর এই দেশের মানুষ আসলে জানেন। অন্তত বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারটির সময়ে নানা রকম ‘বেশি সমান’ মানুষ এই রাষ্ট্রে আছে। আর বলাই বাহুল্য, সরকারি কর্মচারীরা (মূলত বড় কর্মচারী বা আমলারা) তো এই ‘বেশি সমান’দের দলে খুবই অগ্রবর্তী হয়ে আছেন।

ডা. জাহেদ উর রহমান : সদস্য, স্টিয়ারিং কমিটি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট

Advertisement

সরকারি চাকরিজীবী

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম