বর্তমান প্রেক্ষাপটে ছাত্র রাজনীতি কতটা জরুরি

  মনজু আরা বেগম ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাতায়ন

গত ৬ অক্টোবর বুয়েটের তড়িৎ ও প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজন আছে কিনা।

এ নিয়ে তর্ক-বিতর্কের জন্ম হলেও এ পর্যন্ত প্রকাশিত সংবাদ, প্রতিবেদন, আলোচনা, টকশো থেকে শুরু করে বিভিন্ন মাধ্যমে শিক্ষিত সমাজ, সতেচন মানুষ, অভিভাবকরা ছাত্র রাজনীতির বিপক্ষে কথা বলছেন।

এর কারণ দেশের বর্তমান চলমান রাজনীতির ধারা, শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্য, শিক্ষাঙ্গনে অস্ত্রের ঝনঝনানি, গডফাদারদের দ্বারা পরিচালিত ছাত্রসমাজ, অর্থ, অস্ত্র, ক্ষমতার লোভ, মাদকের ছোবল শিক্ষার্থীদের বিপথে পরিচালিত করছে।

আমাদের দেশের রাজনীতি এখন প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা আর দুর্নীতির আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। রাজনীতির বিষবাষ্প পরিবার, সমাজ ও দেশকে করছে কলুষিত। কলুষিত করছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে।

আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ও আস্থায় ভাঙন ধরিয়েছে। যদিও আমরা সবাই জানি, রাজনীতি হচ্ছে সমাজ ও দেশ সেবার সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম। রাজনীতিকদের মধ্য থেকেই গড়ে ওঠে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব। এরাই দেশ ও জাতিকে সঠিক নেতৃত্ব দেয়।

আমরা জানি, রাজনীতি ও রাজনীতিকদের ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়েই এসেছে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ’৭০-এর নির্বাচন এবং সর্বোপরি ’৭১-এর স্বাধীনতা।

এ দেশের ছাত্রসমাজের রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। এ দেশের স্বাধিকার আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশের সংকটময় মুহূর্ত ও ক্রান্তিকালে এগিয়ে এসেছে দেশের ছাত্রসমাজ।

ছাত্রদের প্রথম ও প্রধান কাজ লেখাপড়া ও এর মধ্য দিয়ে জ্ঞানার্জন। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কটা অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার। কিন্তু বর্তমানে আমরা কী দেখছি? আমাদের দেশের অনেক ত্যাগী ও নির্লোভ রাজনীতিবিদের অবদান জাতি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে।

আমাদের স্বাধীনতা-সংগ্রামে সমগ্র বাঙালি জাতিকে যিনি উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দেশের জন্য, দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য, নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা কখনও ভাবেননি; ছাত্রজীবন থেকে যিনি নিজের জীবনকে সাধারণ মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছেন, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ এ রকম বহু ত্যাগী রাজনীতিবিদ-ছাত্রনেতা রয়েছেন, যারা তাদের আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসের কথা কখনও ভাবেননি।

কিন্তু এখন আমরা কী দেখছি? কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলছে হানাহানির রাজনীতি। দলীয় রাজনীতি ছাত্রদের বিপথে পরিচালিত করছে। ক্ষমতা, অর্থ আর অস্ত্র পেশিশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ছাত্র রাজনীতি কোন পর্যায়ে গেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কী হাল হয়েছে, তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।

প্রতিদিনের পত্রিকার পাতা খুললেই নতুন নতুন সব তথ্য আমরা জানতে পারছি। র‌্যাগিংয়ের নামে নির্যাতনের ভয়ংকর চিত্র ছাত্র ও অভিভাবকদের মাঝে তৈরি করেছে আতঙ্ক। অভিভাবকদের নতুন করে সংকটে ফেলে দিয়েছে এটি। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, তখন দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাইবোনরা কীভাবে নতুনদের বরণ করে নিয়েছেন। কীভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ-পরিস্থিতি সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

আর এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না হতেই কে কোন দল করে, বড় ভাইয়েরা নিজেদের দল ভারি করার জন্য ক্ষমতা আর কর্তৃত্ব খাটিয়ে নিজের দলে ভিড়িয়ে মিটিং-মিছিলে অংশ নেয়ার জন্য ভয়ভীতি প্রদর্শন করে, নির্যাতন করে, সুযোগ-সুবিধা দেয়ার কথা বলে স্বার্থসিদ্ধির জন্য যা যা করার সবই করছে। এসব অন্যায়-অনাচার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জেনে-শুনেও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে; যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

একজন ছাত্রের প্রথম ও প্রধান কাজ লেখাপড়া করে জ্ঞানার্জন করা, নীতি-নৈতিকতার মধ্য দিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে পরিবার, সমাজ তথা দেশের জন্য কিছু করা। অভিভাবকদের অনেকেই নিজের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে হলেও সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠান।

শিক্ষা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসে, নীতি-নৈতিকতা জীবনকে সুস্থ, সুন্দর আর সমৃদ্ধ করে তোলে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বর্তমানে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার্থীদের নীতি-নৈতিকতা শেখানো হচ্ছে না। শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণ করা হচ্ছে। শিক্ষকরা চেষ্টা করছেন কত কম সময় দিয়ে কত বেশি অর্থ উপার্জন করা যায়।

সেজন্য তারা এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটছেন। ছাত্ররাও আর আগের মতো শিক্ষকদের ভয়, শ্রদ্ধা বা সম্মান করছে না। শিক্ষাঙ্গনগুলো পরিণত হয়েছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভয়স্থলে। অধিকাংশ রাজনীতিবিদ তাদের অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য ছাত্রদের ব্যবহার করছেন।

প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন অস্ত্র আর অবৈধ অর্থ। কোমলমতি ছাত্ররা মনে করছে, তাদের পেছনে রয়েছে গডফাদার। সেই শক্তিতেই তারা তাদের প্রথম ও প্রধান কাজ- লেখাপড়া বাদ দিয়ে নীতিবিবর্জিত কাজে লিপ্ত হচ্ছে। ছাত্র রাজনীতির নামে করছে দলাদলি, চাঁদাবাজি, মাস্তানি আর ক্ষমতার অপব্যবহার।

এ গডফাদাররা ছাত্রদের ব্যবহার করছে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য। ছাত্রদের রাজনীতির হাতিয়ার বানিয়ে এ দেশের ঐতিহ্যবাহী ছাত্র রাজনীতির গৌরবের ধারাটিকে গলাটিপে হত্যা করছে। হত্যা করছে দেশাত্মবোধ, মানবিক মূল্যবোধকে। শিক্ষাই একটা জাতির মেরুদণ্ড।

কিন্তু মেরুদণ্ডকে সোজা করার দায়িত্বে যাদের নিয়োজিত করা হয়েছে, তাদের অধিকাংশই অর্পিত দায়িত্ব পালন করছেন না। ফলে মেধাবী ছাত্ররাও তাদের মেধা বিকাশের সুযোগ পাচ্ছে না। শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশের অভাবে খালি হয়ে যাচ্ছে কত মায়ের বুক।

মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন নাম। অভিভাবকসহ সমাজের সচেতন প্রতিটি মানুষের মুখেই আজ একটি কথাই ধ্বনিত হচ্ছে আর কত মায়ের বুক খালি হলে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরে আসবে? ক্ষমতা আর অর্থের রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি সমাজ থেকে কবে দূর হবে? শিক্ষাঙ্গনে এ ধরনের রাজনীতির আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে কিনা ইত্যাদি।

ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করার পক্ষে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেখে ভালো লাগল। এতে বলা হয়েছে কানাডার প্রেসিডেন্ট জাস্টিন ট্র–ডোকে বলা হয় বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে মানবিক, স্মার্ট ও মেধাবী রাষ্ট্রনেতা। তিনি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্র রাজনীতি করে আজ এ পর্যায়ে আসেননি।

বারাক ওবামা আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট, যিনি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতির ওপর পড়াশোনা করে প্রেসিডেন্ট হননি। জার্মানির চ্যান্সেলর মার্কেল একত্রিশ বছর বয়সে কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রিতে পিএইচডি করেছেন। রাজনীতি শেখার জন্য তাকে কোথাও ভর্তি হতে হয়নি। রাজনীতি শেখার জন্য ছাত্র রাজনীতি করতে হয় না। সমাজের উন্নয়নে, দেশের কল্যাণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান বৃদ্ধি, নিজেদের জ্ঞান বৃদ্ধি, জ্ঞানার্জনের জন্য বিতর্ক প্রতিযোগিতা, যৌক্তিক দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংগঠন থাকতে পারে।

এ সংগঠনের কাজ শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন কিনা, পরীক্ষা দেরিতে হচ্ছে কেন, রেজাল্ট সময়মতো প্রকাশ হচ্ছে কিনা, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার জন্য বাজেট বৃদ্ধি, শিক্ষার মান বৃদ্ধি ইত্যাদি শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংবলিত বিভিন্ন বিষয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দাবি আদায় কিংবা আদায় না হলে আন্দোলনের মাধ্যমে তা আদায়ের নাম ছাত্র রাজনীতি। কিন্তু বাস্তবে কী হচ্ছে? ছাত্ররা লেখাপড়ার দিকটি উপেক্ষা করে ছাত্র রাজনীতির নামে দলীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি করছে।

এসব করতে গিয়েই শিক্ষাঙ্গনের সুষ্ঠু পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে; যার অশুভ পরিণতির ফসল আবরার, রাউফুন বসুনিয়া, সানি, দীপনসহ বহু হত্যাকাণ্ড। এ অবস্থা চলতে দেয়া যায় না। সময় এসেছে এসব অনৈতিক, অশুভ ছাত্র রাজনীতিকে শক্ত হাতে দমন করে এ দেশের ছাত্র রাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ফিরিয়ে আনার।

মনজু আরা বেগম : লেখক ও গবেষক; সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক

[email protected]

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×