তৃতীয় মত

পৃথিবী কি আবার বাঁক পরিবর্তন করতে যাচ্ছে?

  আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ০২ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবী কি আবার বাঁক পরিবর্তন করতে যাচ্ছে?

পৃথিবীর একটা বাঁক পরিবর্তনের সময় এসেছে। কথাটা বলছেন অনেকেই। আগামী ১২ ডিসেম্বর ব্রিটেনে সাধারণ নির্বাচন। সবচেয়ে বড় ইস্যু ব্রেক্সিট। ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা না থাকার প্রশ্নে ব্রিটিশ জাতি এখন দ্বিধাবিভক্ত। দলের মনোনয়নে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের কর্মকাণ্ডে পার্লামেন্টে পর্যন্ত চলছে তছনছ। কেউ কেউ বলছেন, বরিস জনসন যেন ব্রিটেনের ডোনাল্ড ট্রাম্প। একজন হোয়াইট হাউসে ঢুকে যা করছেন, বরিস যেন তাই করছেন হাউস অব কমন্সে ঢুকে- যেন বুল ইন চায়না টাউন।

এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর যে ইশতেহার বেরিয়েছে, তাতে দেখা যায়, টোরি পার্টি ব্রেক্সিটের পক্ষে। লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন বলেছেন, নির্বাচনে জয়ী হলে লেবার সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে নতুন চুক্তি করবে। একইসঙ্গে ব্রেক্সিট প্রশ্নে ছয় মাসের মধ্যে আরেকটি গণভোট দেবেন। লিবারেল ডেমোক্রাট পার্টিতে রয়েছে এখন নারী নেতৃত্ব। তারা নির্বাচনী ইশতেহারে সেবাখাত ও ক্লাইমেট চেইঞ্জকে গুরুত্ব দিয়ে ব্রেক্সিট প্রশ্নে আরেকটি গণভোট অনুষ্ঠানকে সমর্থন করেছেন। তবে নেত্রী সুইনসন সরাসরি ব্রেক্সিট বাতিলের পক্ষপাতী।

ব্রিটেনের সাধারণ নির্বাচনে বহু বছর ধরে প্রথাগত নিয়ম হচ্ছে, নির্বাচনী যুদ্ধটা হয় প্রধান দুটি দলের মধ্যে। লেবার ও টোরি দল। এবারও মূল লড়াইটা কেবল দুই দলের মধ্যে নয়, দুই দলের নেতার মধ্যেও হবে। তারা হলেন বরিস ও করবিন। গোঁড়া বামপন্থী করবিন যখন লেবার পার্টির নেতৃত্বে আসেন তখন টোরি নেতারা এবং বিগ মিডিয়া- বিশেষ করে টাইমস, সানডে টাইমস এবং ডেইলি টেলিগ্রাম তাকে নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছিল।

কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে করবিন গোটা ধনতান্ত্রিক বিশ্বের কাছে আতঙ্ক হয়ে ওঠেন। ব্রিটেন ও আমেরিকার বিগ মিডিয়া পাগলের মতো তাকে ‘টেরোরিস্টদের বন্ধু’, রাশিয়ার চর, তিনি ক্ষমতায় এলে ব্রিটেনের অর্থনীতি ধ্বংস হবে ইত্যাদি প্রচার করে। যারা ব্রিটেনের বাজারে মোটা অর্থ বিনিয়োগ করেন, তারা বিদেশে পালিয়ে যাবেন ইত্যাদি প্রচারণাও শুরু করেন। নির্বাচনের আগে এই প্রচারণা আরও ব্যাপকভাবে করা হচ্ছে। কিন্তু ব্রিটেনের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে করবিনের জনপ্রিয়তা প্রচুর। এই তরুণ প্রজন্ম এবং ট্রেড ইউনিয়নের সমর্থনে করবিন লেবার পার্টির নেতৃত্বে টিকে আছেন। নইলে লেবার পার্টির মধ্যে বিগ বিজনেস ও বিগ মিডিয়ার প্রিয়পাত্র যে ব্লেয়ারপন্থীরা আছেন, তাদের ষড়যন্ত্রে বহুদিন আগেই করবিনের নেতৃত্ব শেষ হয়ে যেত। বরিস জনসনও করবিনকেই তার আসল প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন। তাই প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন, তিনি এবার করবিন ফ্রি ক্রিসমাস উদযাপন করতে চান।

ব্রিটেনের এবারের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টির জয়ই স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়া হচ্ছিল। কিন্তু অধিকাংশ জনমত জরিপের আভাস হচ্ছে টোরি দল নির্বাচনে জিতবে। তার কারণ আমেরিকা ট্রাম্পের মতো বরিস জনসন ব্রেক্সিট সমর্থক অতি জাতীয়তাবাদের তাস খেলতে শুরু করেছেন। ঘোষণা করেছেন, নির্বাচনে জয়ী হলে তিনি ৩১ জানুয়ারির মধ্যে ব্রেক্সিট কার্যকর করবেন। ট্রাম্প যেমন বহিরাগতবিরোধী ভূমিকা এবং আমেরিকা ফার্স্ট এই ধ্বনি তুলে সাধারণ শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের ইমোশনাল ব্লাকমেইল করে তা দিয়ে ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন, বরিস তেমনি বহিরাগত ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নবিরোধী অতি জাতীয়তাবাদী স্লোগান তুলে নির্বাচনে জিতে আসতে চান।

আমরা জানি ধর্মান্ধতা এবং অতি জাতীয়তাবাদ দুই-ই থেকেই ফ্যাসিজমের জন্ম হতে পারে। ইউরোপে ত্রিশের দশকে এই ফ্যাসিবাদ মাথা তুলেছিল। এখন আমেরিকা ও ব্রিটেনেও এই ফ্যাসিবাদের প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা করছেন অনেকেই। বরিস জনসন যদি আগামী নির্বাচনে জয়ী হন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পও আমেরিকার আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জয়ী হন, তাহলে পশ্চিমা গণতন্ত্র যা এতদিন বিশ্বকে আলো দেখিয়েছিল তা নির্বাপিত হওয়ার পথে যেতে পারে।

সেজন্যই বলছিলাম পৃথিবীর দিক পরিবর্তন ঘটতে পারে। গত শতকের ষাটের ও সত্তরের দশকে পৃথিবীর দিক পরিবর্তন ঘটেছিল মানবতার সমাজতন্ত্রের বিজয়ের যুগের দিকে। তারপর আশির দশকেই তার দিক পরিবর্তন আবার শুরু হয়। বিশ্ব ধনবাদের বিশ্বায়নের যুগের দিকে। রেগানোমিক্স বা রেগান অর্থনীতি থেকে গ্লোবালাইজেশনের জন্ম। মানুষকে ঠকাবার জন্যই।

ব্রিটেনের টোরি প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার এর নাম দিয়েছিলেন পিপলস্ ক্যাপিটালিজম বা জনগণের ধনতন্ত্র। এই ধনবাদই সারা বিশ্বকে তার ছত্রছায়ায় আনে। নেতৃত্ব গ্রহণ করে আমেরিকা। গত শতকে ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সূচনা করেছিল। এই শতকে বিশ্বায়নের নেতা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে যুদ্ধ ও সংঘাত লাগিয়ে রেখেছে।

সে যুগে ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদের মূল নেতা ছিলেন হিটলার। তার অনুগত সহযোগী ছিলেন ইতালির মুসোলিনি। এ যুগে আমেরিকার বুশ ও ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির মাধ্যমে নি-ও ফ্যাসিবাদ মাথা তুলতে চেয়েছে। আগামী প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে যদি ট্রাম্প জয়ী হন, তাহলে তিনি তার পূর্ণরূপে আবির্ভূত হবেন এবং আগামী ১২ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বরিস নির্বাচিত হতে পারলে তিনি হয়তো হবেন ট্রাম্পের শোবয়। বিশ্ব তাহলে বিশ্ব ধনবাদের ভয়াবহ উল্লম্ফনবাদী চেহারা দেখবে।

এর কি কোনো প্রতিকার নেই? অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক বলছেন, একটা আশা হল ১২ ডিসেম্বরের নির্বাচনে টোরি দল বেশি ভোট পেলেও হয়তো সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। থেরেসা মে’র প্রধানমন্ত্রিত্বের আমল থেকেই টোরি দলের অভ্যন্তরে বিপর্যস্ত অবস্থা চলছে। টোরি এমপি-মন্ত্রীদের মধ্যেও বিদ্রোহ বাড়ছে। বরিস-নেতৃত্বেরও অনেকেই বিরোধী। তাদের অনেকে লিবারেল ডেমোক্রাট দলে চলে গেছেন অথবা ওই দলকে সমর্থন দিচ্ছেন।

লেবার পার্টিতেও তাই ঘটেছে। করবিনের বাম নেতৃত্বের বিরোধী অনেকে লিবারেল দলে গেছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলেন, টোরি ও লেবার পার্টির সমর্থক ভোটদাতাদের একটা বড় অংশ এবার নিজ নিজ দলের প্রতি বিরক্ত হয়ে লিবারেল দলকে ভোট দিতে পারে। তার ফলে নির্বাচনে যদি হাং পার্লামেন্ট হয়, তাহলে বরিস জনসনের লম্ফঝম্প কাজে আসবে না। টোরি এবং লেবার যে দলই লিবারেল পার্টিকে রাজি করাতে পারবে, তারাই কোয়ালিশন সরকার গঠন করবে। বরিস যদি কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন, তাহলে তার তীক্ষ্ণ নখর ভোঁতা হয়ে যাবে।

অন্যদিকে ট্রাম্পও যদি তার অতি জাতীয়তাবাদী নতুন ফন্দি-ফিকির দ্বারা পুনরায় নির্বাচিত হতে না পারেন, অথবা নির্বাচনের আগেই ইমপিচমেন্টে পড়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারেন, তাহলে মার্কিন গণতন্ত্রই শুধু বাঁচবে না, গোটা আমেরিকা এবং ইউরোপেই গণতন্ত্র গত শতকের ত্রিশের যুগের মতো ঘনিয়ে আসা অন্ধকার ঠেকাতে পারবে। পৃথিবীর দিক পরিবর্তন আরও ভয়াবহ অন্ধকারের দিকে নয়, শুভ পরিবর্তনের দিকে মুখ ফেরাবে। বরিস জনসন একা বিশ্ব ধনতন্ত্রের নেতা হতে পারবেন না। পেছনে ট্রাম্পের সমর্থন না থাকলে ব্রিটিশ রাজনীতিতে তিনিও তার প্রভাব টিকিয়ে রাখতে পারবেন না।

ব্রিটেন ও আমেরিকা, পশ্চিমা বিশ্বের এই দুটি দেশের নির্বাচনের ফলাফলের ওপর পৃথিবী কোনদিকে টার্ন নেবে তা অনেকটাই নির্ভর করছে। আমার আশা, গত শতকের আশির দশকের পুনরাবৃত্তি হবে না। এই শতকের কুড়ির দশকে পৃথিবী আবার শুভ নবযুগের দিকে টার্ন নেবে। ফ্যাসিবাদ চেহারা বদল করে যত আস্ফালনই করুক, তার অন্তিম দশা হয়তো এ যুগেই আমরা দেখে যাব। এটা আমার শুধু আশা নয়, বিশ্বাসও।

লন্ডন, ৩০ নভেম্বর, শনিবার, ২০১৯

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×