Logo
Logo
×
   

উপসম্পাদকীয়

অর্থনীতি

আমাদের অর্জন আশাব্যঞ্জক নয়

Icon

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের অর্জন আশাব্যঞ্জক নয়

২০১৯ সাল অর্থনীতি খাতের জন্য একটি দুর্ভাগ্যজনক বছর হিসেবে পার করেছে বাংলাদেশ। অর্থনীতি খাত বলতে আমরা ব্যাংকিং খাতসহ অন্যসব আর্থিক খাতকেই বোঝাচ্ছি।

সাধারণভাবে বলতে গেলে ২০১৯ সালে শুধু জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি ভালো এবং বাইরে থেকে আমাদের বাংলাদেশি শ্রমিকরা যে রেমিটেন্স পাঠায় সেটাও ভালোই। কিন্তু বাকি অন্যসব আর্থিক খাতই দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভালো নয়।

একেক করে যদি বলি তাহলে বলতে হয়, আমাদের আমদানি কমে গেছে, রফতানি কমে গেছে, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে গেছে। আর স্টক মার্কেটের কথা বলতে গেলে পুরো বছরটিই ছিল স্থবির। ব্যালেন্স অব পেমেন্টেও আমাদের অবস্থা যথেষ্ট ভালো নয়। তবে এখানে এখনই শঙ্কিত হওয়ারও কিছু নেই। এই হল মোটামুটিভাবে দেশের গত বছরের আর্থিক অবস্থা।

প্রথমেই ব্যাংকিং খাত নিয়ে বলছি। গত বছর সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিল ব্যাংকিং খাতের কতগুলো অনিয়ম এবং তার বিরুদ্ধে গ্রহণ করা কতগুলো অনাকাক্সিক্ষত সরকারি সিদ্ধান্ত। দেশে যখন খুব বেশি পরিমাণে খেলাপি ঋণ বেড়ে গেল তখন অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘এটি অস্বাভাবিক নয়, কারণ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১০ শতাংশের ওপর। আমাদের দেশেও তাই আছে।’

কিন্তু এ কথাটি তিনি বলতে ভুলে গেছেন, ভারতে ১০ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ হওয়াতে এবং আরও অন্যান্য বিষয় মিলিয়ে ভারতের জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি কমতে কমতে এখন ৪.৫ শতাংশের নিচে চলে গেছে। কাজেই একটি অবনতিশীল অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশকে এভাবে তুলনা করাটা আমরা মোটেই সমীচীন মনে করছি না। এটা স্পষ্ট যে, এতে করে আমাদের খারাপ অবস্থাকে ঢাকা দেয়ারই প্রচেষ্টা করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী অবশ্য বলেছিলেন, ‘ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের জন্য তিনি কিছু পদ্ধতি গ্রহণ করবেন।’ করেও ছিলেন। যেগুলো আমাদের বিবেচনায় পশ্চাৎমুখী পদক্ষেপ ছিল। তাই সেটাকে সংস্কারমূলক বলতে পারছি না। কেউ কেউ সেটাকে কুসংস্কার বলেও আখ্যায়িত করেছেন। যেমন তার প্রথম সংস্কার ছিল, খেলাপি ঋণের সংজ্ঞাকে পরিবর্তন করে নমনীয় করা। যাতে করে বর্তমানে যেসব খেলাপি ঋণ আছে সেগুলো অনেকটা কমে আসবে এবং তিনি সেটাই আশা করেছিলেন।

তার এ সংস্কার প্রস্তাবটি জারি হয়েছিল কয়েক মাস আগে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে। কিন্তু আমরা দেখতে পেলাম তার এ সংস্কার প্রস্তাব জারি হওয়ার পর থেকে খেলাপি ঋণ কমেনি বরং বেড়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই আমরা অনুসন্ধিৎসু হলাম যে, এটা কী হল? কেন খেলাপি ঋণ বেড়ে গেল? আমরা অনুসন্ধান করে দেখলাম যে, যখন যে পরিমাণ টাকা সংজ্ঞা অবনমনের ফলে কমে গিয়েছিল তার চেয়ে বেশি অঙ্কের টাকা আবার নতুন করে খেলাপি হয়েছে; যা আমাদের জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ছিল।

এরপর অর্থমন্ত্রীর দ্বিতীয় সংস্কার প্রস্তাবে আসি। অর্র্থমন্ত্রীর দ্বিতীয় সংস্কার প্রস্তাবটি ছিল ২ শতাংশ টাকা জমা দিয়ে সব খেলাপি ঋণ হালনাগাদ করা যাবে। অর্থাৎ ১৯৭২ সাল থেকে এ পর্যন্ত যত খেলাপি ঋণ আছে আমরা যেটাকে বদ্ধ খেলাপি ঋণ হিসেবে আখ্যায়িত করি, এসব বদ্ধ খেলাপি ঋণও ২ শতাংশ টাকা জমা দিয়ে হালনাগাদ করে ফেলা যাবে এবং এটি আর মন্দ ঋণ থাকবে না।

শুধু তাই নয়, হালনাগাদ করার পর ঋণের সুদের হারও কমিয়ে মাত্র ৯ শতাংশ ধার্য করা হয়। আগে যেখানে ১২-১৪ শতাংশ সুদ ছিল সেটাকে কমিয়ে ৯ শতাংশ করা হবে এবং এটি ভালো ঋণ হিসেবে আগামী ১০ বছর পর্যন্ত থাকবে। এটি বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার ইস্যু করলেও প্রচলন করতে পারেনি, কারণ বিষয়টি জনস্বার্থবিরোধী বলে মনে হওয়ায় এটাকে হাইকোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

হাইকোর্টে দীর্ঘদিন ধরে এটি নিয়ে বেশ কথাবার্তা চলছিল। তারা আইনের দৃষ্টিতে যেটা বলেছিলেন সেটা হল, এ ধরনের সংস্কার করতে হলে তো বাংলাদেশ ব্যাংক করতেই পারে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজের নিয়মকে অগ্রাহ্য করতে পারে না। সেজন্য তারা বলেছিলেন ২ শতাংশ জমা দিয়ে ঋণটি হালনাগাদ হবে, তবে ঋণগ্রহীতারা নতুন ঋণ পাবে না। যদি তারা পেতে চায় অন্তত ১৫ শতাংশ টাকা তাদের আরও জমা দিতে হবে। সেটা বাংলাদেশ ব্যাংকের স্থায়ী সার্কুলারের মতো ছিল। ফলে ২ শতাংশ টাকা জমা দিয়ে হালনাগাদ করে নতুন ঋণ নেয়ার যে প্রচেষ্টা ছিল তাতে কিছুটা ভাটা পড়ল।

কারণ নতুন ঋণ নিতে হলে ১৫ শতাংশ টাকা জমা দিয়ে নিতে হবে। এতে করে অনেকে আগ্রহী হয়েও পশ্চাৎপদ হয়েছেন, তারা নতুন ঋণের জন্য আর আবেদন করেননি। আবার যারা আবেদন করেছেন, এ পর্যন্ত আমরা যতদূর খবর পেয়েছি ব্যাংকগুলো খুব উদারভাবে এগুলো মঞ্জুরি দিচ্ছে না। কারণ ব্যাংক বলছে, এটি এখন যে অবস্থায় আছে সেখান থেকে ২ শতাংশ নিয়ে হালনাগাদ করা হয় তাহলে এটি পরবর্তীকালে পুনরায় মন্দ ঋণ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সুতরাং এতে ব্যাংকগুলো খুব একটা উৎসাহ দেখায়নি। তবে কিছু ব্যাংক এ ব্যাপারে এগিয়ে এসেছে এবং তারা মোট খেলাপি ঋণের ওয়ান থার্ড দিয়েছে বলে আমার ধারণা।

এ রকম একটি অবস্থায় দাঁড়িয়ে বছরের শেষে এসে বলব, আমরা একটা গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে সময় পার করছি। কারণ এরই মধ্যে ভালো ঋণগ্রহীতা যারা ছিলেন তারা বিভিন্ন ব্যাংকের এমডিদের কাছে ধরনা দিয়ে বলেছেন, আমরা আর কিস্তি জমা দেব না। আমরা খেলাপি হতে চাই, ভালো থাকতে চাই না। কারণ ভালো থাকলে তিরস্কার আর মন্দ থাকলে পুরস্কার। আমার সংগ্রহ করা তথ্যমতে, এরই মধ্যে অনেকেই ভালো ঋণগ্রহীতা থেকে মন্দ ঋণগ্রহীতা হিসেবে নাম লিখিয়ে নিয়েছেন।

কারণ ভালো ঋণগ্রহীতাদের ১২-১৪ শতাংশ হারে সুদ দিয়ে যেতে হচ্ছে। কিন্তু তিনি যদি মন্দ হয়ে যান তাহলে তার সুদের হার হয়ে যাবে ৯ শতাংশ। স্বাভাবিকভাবেই ভালো ঋণগ্রহীতারা এটি ছাড়বেন কেন। আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, যেটি আগামী অর্থবছরের জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক হবে। বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকার নিচে আমাদের মোট ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ কোটি টাকার ওপর খেলাপি ঋণ। ১০ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি ভালো ঋণ এখনও রয়েছে।

কাজেই এত মন্দ ঋণ হওয়ার পরও ভালো ঋণের পরিমাণই বেশি। অর্থাৎ ৯০ শতাংশই ভালো ঋণ বাকি ৯০ শতাংশ মন্দ ঋণ। যেভাবে খেলাপি ঋণের ওপর উৎসাহ দেয়া হচ্ছে তাতে উৎসাহিত হয়ে ভালো ঋণ গ্রহীতাদের মধ্য থেকে ১-২ শতাংশ খেলাপি ঋণগ্রহীতা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর এটি যদি হয়, তাহলে ব্যাংক একটা সংকটজনক অবস্থায় পড়ে যাবে। কারণ ব্যাংক চলেই জনগণের টাকায়, মালিকের টাকায় নয়।

মালিক বা শেয়ারহোল্ডাররা ব্যাংকের সম্পূর্ণ বিনিয়োগের মাত্র ১০ শতাংশ টাকা পরিশোধিত মূলধন হিসেবে দেয় আর ৯০ শতাংশ টাকাই আসে জনগণের আমানত থেকে। সেই টাকা যদি আমানতকারীকে আমরা সময়মতো ফেরত না দিতে পারি তাহলে ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যায়। যেমনটি আমরা দেখেছি ফারমার্স ব্যাংকের ক্ষেত্রে। ওই রকম অবস্থা যেন না হয় সেজন্য নতুন বছরে সব ব্যাংককে অত্যন্ত সাবধান হতে হবে।

এবারে আসা যাক এমন অবস্থা হল কেন? এর জন্য দায়ী কি ব্যাংক, নাকি অন্য কিছু? আমাদের অভিজ্ঞতার আলোকে দেখতে পাচ্ছি, যারা ব্যাংক চালান অর্থাৎ ব্যাংকের এমডি বা অন্যদের এ ব্যাপারে পুরোপুরি দায়ী করার কোনো যুক্তি দেখছি না। তবে এর জন্য ব্যাংকের মালিকদের একটি অংশ দায়ী।

ব্যাংক মালিকদের মধ্যে ৯০ শতাংশই ভালো। বাকি ১০ শতাংশ মালিক খারাপ। যে মালিকরা খারাপ তারা অত্যন্ত খারাপ। ৯০ শতাংশ মালিক যখন চুপচাপ থাকে তখন ওই ১০ শতাংশ মালিক প্রতিক্রিয়াশীল কাজ করে থাকে। এ ১০ শতাংশ ব্যাংক মালিকরা এতই চতুর যে, তারা রাজনৈতিক সরকারকে প্রভাবিত করে ফেলে। ফলে যা হওয়ার তাই হয়।

স্বাধীনতার পর থেকে দেশের অর্থমন্ত্রী হিসেবে কারা ছিলেন? জনাব তাজউদ্দীন আহমদ, ড. এআর মল্লিক, সাইফুর রহমান, এসএএমএস কিবরিয়া, এমএ মুহিত। তারা সবাই উচ্চ স্তরের অত্যন্ত মেধাবী মানুষ ছিলেন। কিন্তু একজনও ব্যবসায়ী ছিলেন না। অনেক দেশেই এভাবে হয়ে থাকে। ব্যবসায়ীদের অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয় না, কারণ বড় ব্যবসায়ীদের নিজস্ব ব্যবসায়িক স্বার্থ আছে এবং অন্যান্য ভালো ব্যবসায়ীর সঙ্গে তাদের একটা গোষ্ঠীগত সম্পর্ক থাকে। ফলে বড় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ যখন সংরক্ষণ করতে চাইবেন তখন জনস্বার্থ বিঘ্নিত হবে। আর জনস্বার্থ বিঘ্নিত হলে আমানতকারীর স্বার্থ বিঘ্নিত হবে।

এবার আমরা এই প্রথমবার একজন বড় ব্যবসায়ীকে অর্থমন্ত্রী হিসেবে পেয়েছি। তিনি ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণ করার জন্য প্রথমেই ঘোষণা দিলেন, ‘কোনো খেলাপি ঋণগ্রহীতা জেলে যাবে না’। এখন দেখা যাচ্ছে, বড় ঋণখেলাপিরা সবাই বড় ব্যবসায়ী। তারা ইচ্ছে করলেই টাকা ফেরত দিতে পারে; কিন্তু তা তারা করেন না, শক্তি দেখান, প্রয়োজনে তারা হাইকোর্টে গিয়ে স্টে অর্ডার নিয়ে আসেন। ব্যাংক মালিকদেরও তাদের পক্ষে নিয়ে আসে। এমন লোকদের পক্ষে যদি অর্থমন্ত্রীর শক্তিটিও যোগ হয় তখন তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করার কোনো সম্ভাবনা থাকে না।

এরপরও ব্যাংকিং সেক্টরে সারা পৃথিবীতে যেটি হয়নি, অর্থমন্ত্রী মহোদয় সেটি করে দেখালেন। অর্থাৎ খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের জেলে তো দেবেনই না, উল্টো উৎসাহ দেখালেন এবং তাদের নামের সঙ্গে খেলাপি কথাটি থাকবে না বলে ঘোষণা দিলেন। সেটা ন্যায়সঙ্গতভাবে নয়, আইনের বিরুদ্ধে গিয়ে। এটি সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়। কারণ রাজনৈতিক সরকার সবসময়ই জনগণের স্বার্থের কথাটি চিন্তা করেন। কারণ জনগণের ভোটে তারা নির্বাচিত হন। ব্যবসায়ীরা সবসময় তাদের ব্যবসায়ী স্বার্থ দেখে, জনস্বার্থ দেখে না। জনস্বার্থ দেখলে তাদের ওই রকম চুরি-ডাকাতির ব্যবসা হয় না।

২০২০ সালে আমরা দেখব ব্যাংকাররা কীভাবে খেলাপিদের সামলান। কারণ মন্ত্রী মানেই তো সরকার। সরকার যখন তাদের পক্ষে থাকে তখন গো-বেচারা ব্যাংকারদের তেমন কিছুই করার থাকবে বলে মনে হয় না। এমন একটি পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আমরা শুধু আশা করব, রাজনৈতিক সরকারের যেন বোধোদয় হয়।

সরকার যেন মাননীয় অর্থমন্ত্রীকে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ হানিকর পদক্ষেপ থেকে বিরত রাখেন। অথবা অর্থমন্ত্রীর নিজের যেন বোধোদয় হয়। তিনিও যেন বুঝতে পারেন তার নিজস্ব ব্যবসা বা অন্যান্য বড় ব্যবসায়ীর স্বার্থ আর আমানতকারীর স্বার্থ এক নয়। তিনি যদি বুঝতে পারেন তাহলে হয়তো তিনি এ থেকে ফিরে আসবেন বলে আমাদের বিশ্বাস। আজকের দিনে সেটাই আমাদের কামনা।

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর

অর্থনীতি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম