Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

দুর্নীতি থাকলেই পরিবর্তন আটকে থাকে না, যদি...

Advertisement

Icon

ডা. জাহেদ উর রহমান

প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্নীতি থাকলেই পরিবর্তন আটকে থাকে না, যদি...

Advertisement

শিরোনামের ‘যদি’টা আমার যুক্ত করা, শুরুর অংশটুকু এ বছর অর্থনীতিতে নোবেল (মেমোরিয়াল) পুরস্কার পাওয়া অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ ব্যানার্জির। বিবিসি বাংলার সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেছেন। শুধু এটুকু শুনলে মনে হতে পারে, দুর্নীতির পক্ষে এক ধরনের সার্টিফিকেট হিসেবে এ বক্তব্যকে ব্যবহার করা যেতে পারে। অভিজিতের বক্তব্যের পরের অংশ অবশ্য এ ধারণায় জল ঢেলে দেবে। কেন, সেই আলোচনায় পরে আসছি।

চলে যাওয়া ২০১৯ সাল আমাদের জাতীয় ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ের জন্য স্মরণ করা হবে? এর জবাব আমি দেব- নাগরিকদের রাষ্ট্রের নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি শতভাগ অনাস্থা প্রদর্শনের বছর হিসেবে। আমি জানি এটি বলার সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা প্রশ্ন করবেন কেউ। এ দেশে অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলেই বা কী? যারা ক্ষমতায় আসবে তারা দেশটাকে কীইবা করবে? দেশের নির্বাচনব্যবস্থা ভেঙে পড়া নিয়ে কথা বলেও একটা বিশেষ বাম দল এ প্রশ্নগুলো তার সঙ্গে যুক্ত করে। এ প্রবণতা ভয়ংকর।

নির্বাচনব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা কোন পর্যায়ে গেছে সেটা জানার জন্য বিরোধীদের অভিযোগকে বাদই দেই, ক্ষমতাসীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান যখন সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আজান দিয়েও আজকাল ভোটার আনা যায় না’, তখন এটি প্রমাণিত হয়, পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ। এ পরিস্থিতি কেন হয়েছে সেটাও তারই বয়ানে আমরা শুনেছিলাম কিছুদিন আগে- ‘আমি সাক্ষ্য দিয়ে বলছি, এ নির্বাচনে আমিও নির্বাচিত হয়েছি; কিন্তু জনগণ ভোট দিতে পারেনি।’

ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সামনে। এ নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জনগণকে আশ্বস্ত করার জন্য বললেন, ‘আমি আশ্বস্ত করছি, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে’। এমন জায়গায় এসে এখন পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে, নির্বাচন কমিশন নয়, সরকার এখন জনগণকে আশ্বস্ত করে।

ফিরে আসছি অভিজিৎ ব্যানার্জির কথায়। দুর্নীতি নিয়ে ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দুর্নীতি থাকলেই সবকিছু অকেজো হয়ে যাবে তা নয়। মানে দুর্নীতির ভেতরেও অনেক কিছু হয়, পরিবর্তন হয়। যে দেশে দুর্নীতি আছে সে দেশে পরিবর্তন আটকে থাকে না। ইন্দোনেশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট সুহার্তোর উদাহরণ টেনে অভিজিৎ বলেন, তিনি ‘বিখ্যাত দুর্নীতিগ্রস্ত প্রেসিডেন্ট’ ছিলেন বলে নানা লোকে বলে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ায় সবার জন্য স্কুল এবং অপুষ্টি দূর করার ওপর জোর দিয়েছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

শিরোনামের সঙ্গে আমি একটা যদি যুক্ত করেছিলাম। আসা যাক সেটার কথায়। কেন দুর্নীতি থাকলেও সমাজে পরিবর্তন হয় এবং কোন পরিস্থিতিতে এমনকি দুর্নীতিবাজ সরকারও মানুষের কল্যাণ করতে বাধ্য থাকে, তার কারণ হিসেবে অভিজিৎ বলেন, ‘লোকেরা যারা দুর্নীতিতে জড়িয়ে থাকে, তাদেরও ভোট জেতার আশা থাকে।’

ড্যারন ওসেমাগ্লু এবং জেমস রবিনসন লিখিত বিশ্বখ্যাত ‘হোয়াই ন্যাশন্স ফেইল : দ্য অরিজিন্স অব পাওয়ার, প্রসপারিটি অ্যান্ড পভার্টি’ নানা কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক বই। এ বইটির নানা দিক জাতি হিসেবে আমাদের খুব গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিতে পারে। সেই আলোচনা কখনও করব হয়তো; কিন্তু আজ এ বইয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা উদাহরণ হিসেবে আসা একটা দেশ বতসোয়ানার কথা আনছি প্রাসঙ্গিক বিষয় হিসেবে।

শ্রদ্ধেয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও বতসোয়ানার কথা তার নানা আলোচনায় উদাহরণ হিসেবে টানেন। সাব-সাহারান দেশ বতসোয়ানা স্বাধীন হয় বাংলাদেশের সামান্য আগে, ১৯৬৬ সালে। সেই সময় ওই দেশে পাকা রাস্তা ছিল ১২ কিলোমিটার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী গ্রাজুয়েট সংখ্যা ছিল ২২ জন, হাইস্কুল পাস করা মানুষ ছিল ১০০ জন।

২০১৭ সালে এ দেশটির মাথাপিছু আয় বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ৭ হাজার ৫৯৫ ডলার। একটু তুলনা করি, একই সময়ে বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৫১৬ ডলার। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক এখানে উল্লেখ করা দরকার। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির সূচকে ২০১৮ সালে বতসোয়ানার অবস্থান ৩৪; এ সালেই বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৯তম।

এ তো গেল বাংলাদেশের সঙ্গে মাত্র দুটি ক্ষেত্রে বতসোয়ানার তুলনা। আরও অনেক কিছু নিয়ে এটি দেখানো যায়, প্রায় কাছাকাছি সময়ে স্বাধীন হওয়া দুটো দেশ আজ কতটা ভিন্ন অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। আলোচ্য বইটিতে বতসোয়ানার সঙ্গে সীমান্ত থাকা জিম্বাবুয়ের সঙ্গে তুলনা করে দেখানো হয়েছে সেই দেশের তুলনায় বতসোয়ানা কতটা উন্নতি করেছে। আর সাব-সাহারান আফ্রিকার অন্যান্য অনেক রাষ্ট্রের তো কোনো তুলনাই চলে না বতসোয়ানার সঙ্গে।

বতসোয়ানার ক্ষেত্রে এ ম্যাজিক কেন হল, সেটার কারণ দেখানোর জন্য ওসেমাগ্লু এবং রবিনসন যুক্তি দেন এভাবে- এ দেশটি খুব শক্তিশালী রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। সেই প্রতিষ্ঠানগুলোই এ রাষ্ট্রকে এ রকম ঈর্ষণীয় জায়গায় নিয়ে গেছে। লেখকদ্বয় এখানেই থেমে থাকেননি, এ রাষ্ট্রটি কেন এমন সব অসাধারণ প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পেরেছে, সেটার অন্তর্গত কারণও দেখিয়েছেন তারা।

১৯৬৬ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর বতসোয়ানার প্রতিটি নির্বাচন হয়েছে অবাধ, স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য। তারা জানান, এভাবে ক্রমাগত সুষ্ঠু ক্ষমতার পরিবর্তন ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করে তোলে এবং সেই প্রতিষ্ঠানগুলোই শেষ পর্যন্ত জনগণের স্বার্থরক্ষা করেছে। তার মানে সেই রাষ্ট্রটি শুধু একটা সাম্রাজ্যে পরিণত না হয়ে একটা সত্যিকার রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পেছনে মূল ফ্যাক্টর ক্রমাগত অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করে যেতে পারা।

এর ঠিক উল্টোটা ঘটছে বাংলাদেশে। ২০০১-এর বিএনপি সরকারের সময় থেকেই প্রতিটি সরকার নির্বাচনব্যবস্থাকে ভণ্ডুল করে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। যার অনিবার্য ফল হল দেশের সব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হতে শুরু করে ২০০১-এর পর থেকেই। এরপর বিশেষ করে ২০১৪ সালে একেবারে নির্বাচনহীন একটা সরকার গঠিত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানগুলো একেবারেই ভেঙে পড়তে শুরু করেছিল। বলা বাহুল্য ২০১৮ সালের তথাকথিত নির্বাচনটির পরে এ রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান প্রায় পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।

আমাদের মতো দেশে যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আদৌ শক্তিশালী নয় এবং প্রায় ভেঙে পড়েছে, সেখানে যে কোনো সরকারের যা খুশি করার একটা প্রবণতা থাকেই। তাই সরকারের সামনে অন্তত একটা ভীতি থাকা জরুরি সেটা হচ্ছে নির্বাচন। সরকারের মাথায় যেন সব সময় অন্তত এ একটা বিষয় থাকে যে পাঁচ বছর পর জনগণ অন্তত একদিনের জন্য ‘দেশের মালিক’ হয়ে উঠবে এবং সেদিন তার হিসাব কড়ায় গণ্ডায় মিটিয়ে দেবে।

এ ভীতি তাকে যা খুশি করা থেকে কিছুটা হলেও দূরে রাখবে এবং জনগণের জন্য কাজ করতে বাধ্য করবে। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র থেকে দুর্নীতি-দুঃশাসন রাতারাতি চলে যাবে বা কমে যাবে তা নয়; কিন্তু তাতে একটা লাগাম থাকবে নিশ্চয়ই। এভাবে একের পর এক সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে, এমনকি তাতে কালো টাকা যথেষ্ট পরিমাণে ব্যবহার করা হলেও ধীরে ধীরে একটা রাষ্ট্র নাগরিকদের কাক্সিক্ষত জায়গায় পৌঁছে যাবে।

অপরদিকে একটা অবাধ-নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়া মানে সমাজে এ আলোচনাটাই প্রধান হয়ে জারি থাকে। ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি যখন বিচারপতিদের বয়সের বিষয়ে সংবিধান সংশোধন করে, তখন আর সব ছাপিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে প্রভাবিত করা নিয়ে আলোচনা প্রধান হয়ে ওঠে। এরপর সেনাবাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকার সময় ও নির্বাচন কখন হবে, কেমন হবে, কীভাবে হবে সেই আলোচনাটাই প্রধান ছিল। এরপর ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ যখন সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে থেকে বাতিল করে, তখন থেকে এ পর্যন্ত দেশে এটাই প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানে গত দু’দশকে এ দেশের একটা নির্বাচনব্যবস্থাই জনগণের আলোচনার প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

যখন মানুষ নির্বাচনটা কেমন হবে, সেটা নিয়েই সারাক্ষণ আলোচনায় ব্যস্ত থাকে তখন এ রাষ্ট্রের আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা দূরে সরে যায়। সেই আলোচনাগুলো আর প্রধান থাকে না, হয়ে যায় অপ্রধান। তাই স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি সামনে রেখে আমরা যখন এখনও একটা নির্বাচনের কতটা প্রয়োজন আছে বা নেই, প্রয়োজন থাকলেও সেটা কীভাবে হবে, কিংবা সেই নির্বাচনে কে নির্বাচিত হবে এসব আলোচনায় সময় কাটাই, তখন আমরা আদতে রাষ্ট্রের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের আলোচনার পথ বন্ধ করে দেই।

একটা রাষ্ট্রে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা, কিংবা এর পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক যদি শেষ হয় তখন নাগরিকরা রাষ্ট্রের কাছে তার অধিকার বুঝে নিতে শুরু করে এবং কোথাও যদি সেটার খামতি থাকে তাহলে তার জন্য রাষ্ট্রকে চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করে- এভাবেই ধীরে ধীরে রাষ্ট্র নাগরিকবান্ধব হয়ে উঠতে বাধ্য হয়।

একটি উল্লেখযোগ্য বাম দল ইঙ্গিতে বলার চেষ্টা করে- এখনই একটা নির্বাচন হলে আবার বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারে, সঙ্গে হয়তো নামে-বেনামে জামায়াত থাকবে। তাই একটা সুষ্ঠু নির্বাচন হলেই বা দেশের কোনো লাভ হবে কিনা এ প্রশ্ন তোলা হয়। কিন্তু এটাই গণতন্ত্র, এখানে জনগণের মতের প্রতি সম্মান জানাতে হয়। বিএনপি ক্ষমতায় এসে যদি দেশের ক্ষতি করে, খারাপ করে তাহলে বিএনপিকে হঠানোর উপায় আরেকটা নির্বাচনই। বিএনপি খারাপভাবে দেশ পরিচালনা করলে পরবর্তী নির্বাচনে জনগণের সেই হিসাব মিটিয়ে দেবেই।

তাই আমি বিশ্বাস করি, একটা নির্বাচনকে খাটো করে দেখার এবং জনগণকে দেখানোর যে চর্চা আমাদের সমাজে আছে দীর্ঘদিন থেকে সেটা থেকে সবার দূরে সরে আসা উচিত। অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আলোচনার সঙ্গে অন্য কোনো ‘যদি/কিন্তু’ যুক্ত করা উচিত নয়। এতে সেই বক্তব্য গুরুত্ব হারায়। যারা এটি করেন তারা এটি ইচ্ছে করেই করেন- নির্বাচনব্যবস্থাটিকে ধ্বংস করার মাধ্যমে কারও যেনতেনভাবে ক্ষমতায় থাকাটাকে ‘জায়েজ’ করার জন্য। সন্দেহ নেই, শুধু একটা অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হওয়া মানেই গণতন্ত্র নয়; কিন্তু তেমন একটা নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্রের কথা, মানুষের অধিকারের কথা, সুশাসনের কথা বলা স্রেফ মতলববাজি।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

 

Advertisement

দুর্নীতি

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম