Logo
Logo
×
   

উপসম্পাদকীয়

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা

Icon

ড. গৌতম সাহা

প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানসম্মত গবেষণা হচ্ছে না, গবেষণার পরিবেশ নেই, গবেষণা করার জন্য পর্যাপ্ত ফান্ড নেই, এসব অভিযোগ অনেক পুরনো। যদি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণার মান ও স্বল্পতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তাহলে অধিকাংশ শিক্ষক উল্লিখিত অভিযোগগুলো নির্দ্বিধায় তুলে ধরবেন। শুনে মনে হবে, এগুলোই একমাত্র কারণ, এ সমস্যাগুলো সমাধান করলেই যেন সব ঠিক হয়ে যাবে। উল্লিখিত বক্তব্যের সারসংক্ষেপ এমন- যদি গবেষণা করার পরিবেশ সৃষ্টি করা হয় এবং ফান্ড দেয়া হয়, তাহলেই যেন সব ঠিক হয়ে যাবে। আসলেই কি তা হবে?

একটি ছোট্ট উদাহরণ দিই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুমানিক ২ হাজার শিক্ষক বর্তমানে কর্মরত আছেন এবং অন্য শিক্ষকরা বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা ছুটিতে আছেন। যেসব শিক্ষক কর্মরত আছেন এবং শিক্ষা ছুটিতে আছেন, সেসব শিক্ষককে প্রতি মাসে ৫০০০ টাকা করে গবেষণা ভাতা দেয়া হয়। তার অর্থ হল, একজন শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বছরে ৬০,০০০ টাকা পাচ্ছেন গবেষণা করার জন্য। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি মাসে গবেষণা খাতে খরচ হচ্ছে প্রায় ১ কোটি টাকা এবং প্রতি বছর খরচ হচ্ছে প্রায় ১২ কোটি টাকা। কিন্তু ইউজিসির ২০১৮ সালের ৪৫তম বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ২ কোটি সাত লাখ টাকা খরচ করেছে গবেষণা খাতে। তার মানে হল, বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে। এটা পরিষ্কার যে, এ টাকার যদি সঠিক ব্যবহার করা হতো, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় অনেক এগিয়ে যেত। দেখা যাচ্ছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষক গবেষণা করছেন না তারাও গবেষণা ভাতা নিচ্ছেন। তারা নিচ্ছেন কারণ, তাদের গবেষণা করার জন্য ভাতা দেয়া হচ্ছে। যেসব শিক্ষক গবেষণা করছেন না, তাদের সংখ্যাটাও কিন্তু কোনো অংশে কম নয়।

খেয়াল রাখতে হবে, একেক বিভাগের গবেষণার খরচ একেক রকম। যদি গবেষণা ভাতা শুধু যেসব শিক্ষক গবেষণা করছেন তাদের মধ্যে বণ্টন করা হতো, তাহলে গবেষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আরও এগিয়ে যেতে পারত। প্রশ্ন হচ্ছে, এ পদক্ষেপ সফল করার জন্য কী করতে হবে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রতি বছর শিক্ষকদের কাছ থেকে তাদের সম্পাদিত গবেষণার তালিকা এবং নিবন্ধগুলোর একটি কপি জমা দেয়ার অনুরোধ জানাতে পারে। যেসব শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে তাদের গবেষণার ফলাফল দেখাতে পারবেন শুধু তাদেরই যেন গবেষণা ভাতা দেয়া হয়। সব শিক্ষককে গবেষণা ভাতা দেয়া হচ্ছে গবেষণা করার জন্য। যেসব শিক্ষক গবেষণা করছেন না বা করতে চাচ্ছেন না, তাদের জোর করেই গবেষণা ভাতা চাপিয়ে দেয়াটা কি ঠিক হচ্ছে? এ প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। যদি কোনো ভাতা বা সুবিধা দিতেই হয়, তাহলে কিন্তু তা অন্য কোনো খাতে দেয়া যেতে পারে। এতে আমাদের গবেষণা খাতে যে ভাতা দেয়া হচ্ছে তা যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, তার একটা সমাধান আমরা পেতে পারি।

প্রশ্ন হচ্ছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কত শতাংশ শিক্ষক গবেষণা করছেন? দেখা যাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অন্তত ৪০ শতাংশ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত নন। এ হিসাব কম-বেশিও হতে পারে। তাহলে তারা কী করছেন? এসব শিক্ষক নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস, ইনকোর্স পরীক্ষা, মিডটার্ম পরীক্ষা, মৌখিক এবং ব্যবহারিক পরীক্ষা, পরীক্ষাসংক্রান্ত অন্যান্য কাজ যেমন প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, প্রশ্নপত্র সমন্বয়, খাতা নিরীক্ষণ, পরীক্ষার ফলাফল তৈরি ও প্রকাশ ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত থাকেন। একইসঙ্গে কিছুসংখ্যক শিক্ষক নিজ বিশ্ববিদ্যালয়েই বা বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বা একাধিক বিভাগে খণ্ডকালীন চাকরি করেন। তার অর্থ দাঁড়াল, সেখানেও তাকে উল্লিখিত কাজগুলোর অধিকাংশই করতে হয়। আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাত কলেজকে অধিভুক্ত করা হয়েছে, তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছুসংখ্যক শিক্ষককে পূর্ণকালীন ও খণ্ডকালীন চাকরির পাশাপাশি সাত কলেজের পরীক্ষাসংক্রান্ত কাজগুলোও করতে হচ্ছে। এছাড়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছুসংখ্যক শিক্ষক সান্ধ্যকালীন কোর্সের সঙ্গেও যুক্ত। সেখানেও তাকে ক্লাস, পরীক্ষা এবং অন্যান্য দায়িত্ব পালন করতে হয়। একইসঙ্গে কিছুসংখ্যক শিক্ষককে পাঠদানের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে দায়িত্ব পালন করতে হয়। এসব দায়িত্ব পালন করে একজন শিক্ষক গবেষণা করার সময় কোথায় পাচ্ছেন? তাই এখন সময় হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষকদের জন্য পোস্ট তৈরি করা, যেখানে শিক্ষকদের প্রধান কাজ হবে শুধু গবেষণা করা, তাদের তত্ত্বাবধানে পিএইচডি এবং পোস্ট ডক গবেষকরা কাজ করবেন। এতে অনেক শিক্ষক গবেষণার কাজে মনোনিবেশ করবেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার পরিবেশ সৃষ্টি হবে।

আমি মনে করি, বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পর্যাপ্ত গবেষণা ফান্ডের অভাবে গবেষণা করেন না, কথাটি আংশিক সত্য। এটা অজুহাত হতে পারে, গবেষণা ফান্ডের অভাবে ভালো গবেষণা করা যাচ্ছে না। গবেষণা না করতে চাওয়ার আরেকটা কারণ হল গবেষণা যিনি করছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার গবেষণার যথাযথ মূল্যায়ন করছেন না। একজন শিক্ষক গবেষণার পেছনে সময় দেয়ার জন্য অনেক সুযোগ-সুবিধা হারাচ্ছেন, অনেকে গবেষণার জন্য সময় বরাদ্দ না করে অন্য কাজেও তা বরাদ্দ করতে পারতেন। তাহলে একজন শিক্ষক কেন গবেষণা করবেন? আরেকটা প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় কি ভালো একটা গবেষণাকে বিশেষ দৃষ্টিতে দেখে? বাস্তবতা হল, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একজন শিক্ষকের গবেষণাকে বিবেচনা করা হয় সংখ্যা দিয়ে। একটা ভালো গবেষণার কাজ শুরু করে প্রকাশ করা পর্যন্ত সময় লেগে যায় প্রায় দেড় থেকে দু বছর। অথচ কিছুসংখ্যক শিক্ষক ৩ মাসেই গবেষণা কাজ শেষ করে সেটা ২-৩ মাসের মধ্যেই আর্টিকেল হিসেবে প্রকাশের ব্যবস্থা করতে পারছেন। এই যে কাজের গুণগত মানের ভিন্নতা, এটা কি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিবেচনায় নেন? এটা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা না হলে একজন গবেষক উৎসাহ হারাতে পারেন।

এ সমস্যা থেকে উত্তরণে আমার কিছু প্রস্তাব আছে। আমার প্রথম প্রস্তাব হল, প্রমোশন নীতিমালা কঠিন থেকে কঠিনতর হওয়া উচিত। প্রমোশন নীতিমালা কেমন হওয়া উচিত তা আমি তুলে ধরছি।

প্রভাষক : প্রভাষক পদের জন্য আবেদনকারীকে অবশ্যই অনার্স এবং মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণি থাকতে হবে অথবা সিজিপিএ ৩.৫ বা তার বেশি থাকতে হবে।

প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক : প্রার্থীর অবশ্যই পিএইচডি ডিগ্রি থাকতে হবে, প্রভাষক হিসেবে অন্তত ৩ বছরের অভিজ্ঞতা এবং ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে প্রভাষক হিসেবে ৪টি প্রকাশনা থাকতে হবে।

সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক : সহকারী অধ্যাপক হিসেবে অন্তত ৪ বছরের অভিজ্ঞতা এবং ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে ৫টি প্রকাশনা থাকতে হবে।

সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক : সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে অন্তত ৫ বছরের অভিজ্ঞতা এবং ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে ৬টি প্রকাশনা থাকতে হবে।

অধ্যাপক থেকে গ্রেড ২ অধ্যাপক : অধ্যাপক হিসেবে অন্তত ৫ বছরের অভিজ্ঞতা এবং ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে অধ্যাপক হিসেবে ৬টি প্রকাশনা থাকতে হবে।

গ্রেড ২ অধ্যাপক থেকে গ্রেড ১ অধ্যাপক : গ্রেড ২ অধ্যাপক হিসেবে অন্তত ৫ বছরের অভিজ্ঞতা এবং ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে গ্রেড ২ অধ্যাপক হিসেবে ৬টি প্রকাশনা থাকতে হবে।

উল্লিখিত কোনো ধাপে শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে প্রার্থীকে যেন প্রমোশন না দেয়া হয় সেদিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে।

দ্বিতীয় প্রস্তাব হল বিভিন্ন অনুষদে গবেষক প্যানেল অনুমোদন : প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদভিত্তিক শিক্ষকদের গবেষণার গুণগত মানের ওপর ভিত্তি করে সেরা ১০ জন শিক্ষকের একটা প্যানেল করতে হবে, যেই প্যানেলের মেয়াদ হবে এক বছর। এ এক বছরে সেই প্যানেল তার অনুষদ থেকে যত শিক্ষকের যত প্রকাশনা প্রকাশিত হবে সেগুলো মূল্যায়ন করবে এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের জানিয়ে দেবে কোন কোন প্রকাশনাগুলো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বিবেচনার জন্য অনুরোধ জানাবে। একই সঙ্গে সেই প্যানেল গ্রহণযোগ্যতার একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করবে এবং সবাই সেটা মেনে নিতে বাধ্য থাকবেন। এ নীতিমালা অবশ্যই সব শিক্ষকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে যাতে তারা সেই নীতিমালার ভিত্তিতেই গবেষণার কাজগুলো করতে পারেন। এ নীতিমালা যেন পরবর্তী প্যানেল কোনোভাবেই শিথিল করতে না পারে সেটাও খেয়াল রাখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন প্রমোশন নীতিমালায় শুধু যদি গবেষণার সংখ্যার দিকে নজর না দিয়ে গুণগত মানের দিকেও নজর দিতে পারে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণার প্রতি গুরুত্ব দেয়ার প্রবণতা বাড়বে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের গবেষণার মানোন্নয়নে শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করাই যথেষ্ট নয়; এর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে সরকারি-বেসরকারি বরাদ্দও বাড়াতে হবে এবং ভালো কাজগুলোকে উৎসাহিত করতে হবে। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব যে জার্নালগুলো আছে, যেখানে শিক্ষকরা তাদের গবেষণার কাজগুলো প্রকাশ করেন, সেগুলোর মানোন্নয়নেও পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থাৎ সে জার্নালগুলোতে যাতে শুধু উচ্চমানের গবেষণা কর্মই প্রকাশের জন্য বিবেচনা করা হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবর্তন দরকার, দরকার গবেষণামুখী বিশ্ববিদ্যালয়; বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রকৃত অর্থেই জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে পরিণত হোক। এ স্বপ্ন নিয়েই শুরু হোক আমাদের আগামীর পথচলা।

ড. গৌতম সাহা : সহযোগী অধ্যাপক, গণিত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম