হাসিনা ও রেহানা : অ-রূপকথার দুই বোন
jugantor
তৃতীয় মত
হাসিনা ও রেহানা : অ-রূপকথার দুই বোন

  আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী  

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হাসিনা ও রেহানা : অ-রূপকথার দুই বোন

রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদেরও একটা ব্যক্তিজীবন থাকে। রাজনীতিটাই তাদের জীবনে বড় হয়ে ওঠে বলে রাজনৈতিক জীবনের আড়ালে তাদের ব্যক্তিজীবন ঢাকা পড়ে যায়। এই ব্যক্তি জীবনটি জানা না গেলে এই নেতা-নেত্রীদেরও আসল চরিত্রটি খুঁজে পাওয়া যায় না। আজ ২৮ সেপ্টেম্বর জননেত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন। তিনি ৭৩ পেরিয়ে চুয়াত্তর বছরে পা দেবেন। এই একই সেপ্টেম্বর মাসে শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার জন্ম। বড় বোনের চাইতে তিনি দশ বছরের ছোট। তার জন্ম ১৯৫৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর।

বাংলাদেশের রাজনীতির দণ্ডমুণ্ডের কর্ত্রী এখন এই দুই বোন। শেখ হাসিনা প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে আছেন। শেখ রেহানা থাকেন নেপথ্যে। শেখ রেহানা রাজনীতিতে নেই বলে যারা ভাবেন তারা সঠিক তথ্যটি জানেন না। শেখ হাসিনা দেশ চালান। আর শেখ রেহানা পেছনে বসে প্রতিটি সমস্যা ও সংকটে বোনকে সাহস জোগান। রাজনৈতিক জীবনের আড়ালে এই দুই বোনের ব্যক্তিজীবন। তাদের কৈশোর থেকে কিছুটা জানি বলে শেখ রেহানার নেপথ্য রাজনৈতিক ভূমিকার কথাও কিছু জানি।

বঙ্গবন্ধু যখন বেঁচে ছিলেন, তখন ৩২ নম্বরে আমার ছিল অবাধ যাতায়াত। তবু আজ কবুল করব, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দীর্ঘ সাহচর্য সত্ত্বেও তিনি, ভাবি (মুজিব পত্নী), তাদের ছেলে শেখ কামালের সঙ্গে আমার যে ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল, তা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার সঙ্গে হয়নি। বত্রিশ নম্বরে গেলে মাঝে মাঝে তাদের দেখা পেতাম, শেখ হাসিনা হয়তো বই-খাতার ব্যাগ হাতে কলেজে যাচ্ছেন। রেহানা ছোট ভাই রাসেলের সঙ্গে খেলা করছেন। এর বেশি কিছু নয়।

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর এই সর্বস্বহারা দুই বোনের সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ পরিচয় হয়। শেখ হাসিনার সঙ্গে পরিচয়টা তেমন গভীর হয়নি। কিন্তু রেহানার সঙ্গে হয়েছিল। তাকে আমি মা ডাকতে শুরু করি। ১৯৭৬ সালে আমরা বঙ্গবন্ধুর কিছু অনুসারী মিলে দেশে সামরিক শাসন উচ্ছেদের লক্ষ্যে লন্ডনে একটি সংগ্রাম পরিষদ গঠন করি এবং এই সংগ্রাম পরিষদের মুখপত্র হিসেবে ‘বাংলার ডাক’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করি। এই সময় বঙ্গবন্ধুর এক সম্পর্কিত ভাই মমিনুল হক (খোকা) লন্ডনে অবস্থান করছিলেন, তিনি আমাদের আন্দোলনে সম্পর্কিত হন। সম্ভবত তিনি লন্ডনে আমার রাজনৈতিক কার্যকলাপ সম্পর্কে শেখ হাসিনাকে জানিয়েছিলেন। কিছুদিন পর খোকা ভাই আমাদের জানালেন, শেখ হাসিনা তাকে একটি চিঠি লিখেছেন। চিঠিটা তিনি আমাকে দেখালেন।

চিঠিটা পড়ে বুঝলাম, আমরা লন্ডনে আন্দোলন শুরু করায় তিনি খুশি হয়েছেন। আমার নাম উল্লেখ করে হাসিনা তার চিঠিতে লিখেছেন, ‘তাকে জানাবেন, হত্যাকারীরা সুলতানাকে (শেখ কামালের নববিবাহিত বধূ) হত্যা করে তার সোনার অলঙ্কারগুলোও নিয়ে গেছেন।’ গোটা চিঠিটাতেই ছিল একজন পরিবার-পরিজনহারা নির্বান্ধব নারীর আর্ত-হাহাকার এবং সেই সঙ্গে শহীদ পিতার আদর্শ রক্ষায় অটল থাকার অঙ্গীকারের কথা। তিনি লিখেছিলেন, ‘লন্ডনের আন্দোলনে আমি যে কোনোভাবে সাহায্য জোগাতে রাজি আছি।’ শেখ হাসিনা তখন জার্মানিতে। সহায়-সম্বলহীন তার অবস্থা। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ছোট বোন রেহানার শোক সামলাতে পারছেন না। সেই অবস্থাতেও তার মনের দৃঢ়তা দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম।

লন্ডনে আমাদের আন্দোলন যখন তুঙ্গে, বঙ্গবন্ধুর হত্যা ষড়যন্ত্রের নেতা জেনারেল জিয়াউর রহমানের লন্ডন সফর ব্যর্থ করে দিতে পেরেছি, তখন একদিন খোকা ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ। কথা প্রসঙ্গে বললাম, আমরা বিদেশে বসে তো যথেষ্ট আন্দোলন করছি, দেশের মানুষও জেগে উঠছে। যদি সামরিক শাসনের পতন হয় এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যায়, তাহলে প্রধানমন্ত্রী হবেন কে?

খোকা ভাই সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন, কেন শেখ হাসিনা! আমার বিস্ময়ের অন্ত ছিল না। আমি ভেবেছিলাম, খোকা ভাই ড. কামাল হোসেন, আবদুস সামাদ আজাদ বা এই ধরনের কারও নাম বলবেন। তিনি ঝট করে শেখ হাসিনার নাম বললেন। তখন অল্প বয়স তার। রাজনীতি সম্পর্কে তেমন অভিজ্ঞ নন; তিনি কী করে এখনই একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন, তা আমি ভাবতে পারিনি। আরও বয়স হলে, অভিজ্ঞ হলে শেখ হাসিনা দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। যেমন, ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তবে শেখ হাসিনা এই বয়সে, এই সময়ে নয়। এটি ছিল আমার তখনকার ধারণা। আমার এই ধারণাটা অবশ্য পরে ভেঙে যায়।

আমি সেদিন খোকা ভাইকে বলেছিলাম, শেখ হাসিনার তো বয়স কম, অভিজ্ঞতা কম, তিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন কীভাবে? খোকা ভাই বললেন, রাজনীতিতে শেখ হাসিনার অভিজ্ঞতা আছে। তিনি ইডেন কলেজের ছাত্রী পরিষদের সহসভাপতি ছিলেন না? আমি বলেছি, ইডেন কলেজের ছাত্রী পরিষদের নেতা হওয়া এবং একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়া কি এক কথা? খোকা ভাই বললেন, হাসিনাকে আপনি চেনেন না। চিনলে এ কথা বলতেন না। খোকা ভাই যে সেদিন আমাকে কতটা সত্য কথা বলেছেন, সেটা পরে বুঝতে পেরেছি।

শেখ রেহানার কথায় আসি। বাংলাদেশের এক জবরদস্ত ব্যুরোক্রাট, সম্ভবত নাম ছিল মইনুল ইসলাম, আমরা ডাকতাম মামা। বঙ্গবন্ধুও তাকে ডাকতেন মামা। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তিনি ম্যানচেস্টারে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আমাদের আন্দোলনে উপদেশ ও অর্থ দিয়ে এবং আরও নানাভাবে সাহায্য করতেন। একদিন তার ম্যানচেস্টারের বাসায় বসে খোকা ভাই আমাকে বললেন, গাফ্ফার ভাই, রেহানাকে লন্ডনে আমার বাসায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। দিল্লিতে দুই বোনই নিরাপদ আছে। কিন্তু রেহানাকে নিয়ে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে।

বললাম, কীভাবে আনবেন? ইন্দিরা গান্ধী কি তাকে নিরাপত্তাবিহীনভাবে লন্ডনে আসতে দিতে রাজি হবেন? খোকা ভাই বললেন, যদি বিদেশের আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতারা ইন্দিরা গান্ধীকে রেহানার নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে চিঠি লেখেন, তিনি তাহলে রাজি হবেন। আমি ভাবছি ড. কামাল হোসেনের কাছে আপনাদের সবাইকে নিয়ে যাব। আপনারা সবাই মিলে একটা চিঠি ইন্দিরা গান্ধীর কাছে পাঠালে তিনি রেহানাকে দিল্লি থেকে লন্ডনে আসতে সম্মতি দেবেন। এখানকার স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডও বলেছে, তারা রেহানাকে নিরাপত্তা দেবেন।

হাসিনা-রেহানা দুই বোনই তখন জার্মানি থেকে দিল্লিতে চলে গেলেন। খোকা ভাই বললেন, শেখ হাসিনা এখন আসবেন না। আগে রেহানা আসবেন। আমরা ইন্দিরা গান্ধীর কাছে পাঠানোর জন্য একটা চিঠি ড্রাফট করলাম। ঠিক হল তাতে সই করবেন ড. কামাল হোসেন, গউস খান (তখন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি) এবং আমি। এক প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির দিনে আমি, গউস খান, এমআর আখতার মুকুল অক্সফোর্ডে ড. কামাল হোসেনের বাসায় যাই। তিনি নানা অজুহাত দেখিয়ে চিঠিতে সই দিতে অসম্মত হন। আমি তার ওপর অত্যন্ত রেগে গিয়েছিলাম। আমাকে শান্ত করেন ড. মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, কামাল সই না দিক। আমি দেব। আমরা তার সই নিয়ে লন্ডনে ফিরে আসি। চিঠিটা ইন্দিরা গান্ধীকে পাঠানো হয়।

এরপর শেখ রেহানা কবে লন্ডনে এসে পৌঁছেছেন, তা আমি জানি না। তার নিরাপত্তার কঠোর ব্যবস্থা করেছিলেন খোকা ভাই। রেহানা যে লন্ডনে এসেছেন এবং তার বাড়িতেই অবস্থান করছেন, তা আমাকেও জানতে দেননি। একদিন আমি কী কাজে খোকা ভাইয়ের বাসায় টেলিফোন করেছি, একটি মেয়েলি কণ্ঠ জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কে বলছেন? বললাম, আমি গাফ্ফার চৌধুরী বলছি। সঙ্গে সঙ্গে জবাব এলো, ‘চাচা, আমি রেহানা বলছি।’ আমি থ’। রেহানা লন্ডনে আছেন- এ ধারণা আমার ছিল না। বললাম, রেহানা, তুমি লন্ডনে? কবে এসেছো? রেহানা বললেন, মাসখানেক হয়। জিজ্ঞাসা করলাম, কেমন আছো? রেহানা বললেন, ‘আমরা সব হারিয়েছি। কেমন অবস্থায় থাকতে পারি আপনিই চিন্তা করুন। আপনি ছাড়া আমাদের সহায় আর কে আছে?

তার কথায় আমার চোখে পানি এসেছিল। যে নেতার ডাকে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ (তখনকার) উঠত এবং বসত; তার কন্যা কিনা আজ আমার মতো সামান্য এক সাংবাদিককে বলছেন, আমি ছাড়া তাদের কোনো সহায় নেই।

বললাম, মা, আমি যতদিন বেঁচে আছি, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে সরব না। তোমাদের পাশে সব সময় থাকব।

আজ ৯০ বছরের কাছাকাছি এসে আমার জীবনের একটাই সন্তোষ, বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাকে আমি বাংলাদেশে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকতে দেখে যেতে পারছি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধরে রাখার ব্যাপারে আমি নানা অপবাদ, দুর্নাম সহ্য করেও অঙ্গীকার ভঙ্গ করিনি।

আরও পরের কথায় আসি। লন্ডনে এক বাঙালি ছেলের সঙ্গে রেহানারা বিয়ের ব্যবস্থা অত্যন্ত গোপনীয়তা এবং দ্রুততার মধ্যে সম্পন্ন হল। এই তরুণ শফিক সিদ্দিককে দেখলাম, খুবই সুদর্শন, শিক্ষিত এবং ভদ্র স্বভাবের মানুষ। শফিক যে রেহানার মনের মানুষ হবেন, তাতে আমার কোনো সন্দেহ রইল না।

খোকা ভাই আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি শফিককে চেনেন? আমাদের জিল্লুর রহমান (পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি) ভাইয়ের আত্মীয়। আমি যে শফিক সিদ্দিককে সামনা-সামনি না চিনলেও নামে চিনি, এ কথা তাকে বললাম না। শফিক সিদ্দিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকাকালে ছিলেন কট্টর চীনাপন্থী ছাত্র ইউনিয়নের একটি অংশের সঙ্গে জড়িত। এরা ছিলেন প্রচণ্ডভাবে মুজিববিরোধী। সেই চীনাপন্থী ছাত্র ইউনিয়নের নেতা কী করে রেহানাকে বিয়ে করেন? তাহলে কি ‘বঙ্গবন্ধুর জামাই’ হওয়ার লোভে তার এই আদর্শ ত্যাগ?

আমি পরে শফিক সিদ্দিকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হওয়ার পর তাকে রেহানাকে বিয়ে করার কারণ খোলাখুলি জিজ্ঞাসা করেছি। শফিক বললেন, না, আমি বঙ্গবন্ধুর জামাই হওয়ার লোভে রেহানাকে বিয়ে করিনি। তাকে বিয়ে করার বহু আগে আমি চীনাপন্থী তথা পিকিংপন্থীদের মারাত্মক ভুল বুঝতে পেরেছিলাম। বুঝতে পেরেছিলাম, বঙ্গবন্ধুর আদর্শই হচ্ছে বাঙালির মুক্তির একমাত্র পথ। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি আমার আগ্রহের কারণ দর্শিয়ে আমি একটা বই লিখেছি। নাম ‘একজন সাবেক পিকিংপন্থীর জবানবন্দী’। আপনার বাংলার ডাক পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ছাপবেন?

আমি শফিক সিদ্দিকের লেখাটি ‘বাংলার ডাকে’ ধারাবাহিকভাবে ছেপে ছিলাম। তার লেখায় মুনশিয়ানা ছিল। তখনকার বাংলাদেশের অনেক চীনপন্থীর মুখোশ উন্মোচন করেছেন। তথ্য ও যুক্তি দিয়ে তাদের রাজনীতি যে ভুলপথের রাজনীতি ছিল, তা দেখানো হয়েছিল। এই লেখাটি বই আকারে প্রকাশিত হলে একটি চমৎকার রাজনৈতিক গ্রন্থ হতো।

বিয়ের পরও শেখ রেহানাকে কষ্টকর জীবনযাপন করতে হতো। শফিক সিদ্দিক তখনও ছাত্র। আয়-উপার্জন তেমন নেই। বন্ধুর সঙ্গে যুক্তভাবে লন্ডনের মিচাম এলাকায় ঘরভাড়া করে বাস করেন। ওই বাসায় আমি কয়েকবার গেছি। একেবারেই সাধারণ সাদামাটা জীবন। তার মধ্যেও শেখ রেহানা হাসি-খুশি।

ভেবেছিলাম, শেখ হাসিনা তো রাজনীতির দিকে ঝুঁকেছেন। শেখ রেহানা হয়তো ঝুঁকবেন না। ঘর-সংসার নিয়েই তুষ্ট থাকবেন। কিছুদিনের মধ্যেই বুঝলাম, বঙ্গবন্ধুর রক্ত যে মেয়ের শরীরে, তিনি রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে পারেন না। একদিন আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেনে সেন্ট্রাল লন্ডন থেকে এ জোয়ারে নিজের বাসায় ফিরছি, কিলবার্নে এসে ট্রেন বদল করতে হয়; দেখি শেখ রেহানা প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি বিপরীতগামী ট্রেনের অপেক্ষায় ছিলেন। তার হাতের ঝুলিতে ডজনখানেক কমলা। আমাকে দেখে কাছে এলেন। বললাম, তুমি এখানে কেন? রেহানা বললেন, আমি এখানে একটা অফিসে কাজ করি।

আমি বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকালাম। পরনে একটা আটপৌরে শাড়ি। গায়ে জ্যাকেট। দেখে আমার কষ্ট হল। বঙ্গবন্ধুর কন্যা। এখন বাস আর ট্রেনে চলাফেরা করেন। সাধারণ একটি চাকরি করেন। আমার চিন্তায় বাধা পড়ল রেহানার কথায়। কমলার থলেটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, এটা চাচিকে (আমার স্ত্রীকে) দেবেন। বললাম, তোমাদের এখন এই অবস্থা। তার মধ্যে সব কমলা আমাকে দিচ্ছ। রেহানা বললেন, আপনাকে নয়; চাচিকে দিচ্ছি।

তারপর কথা না থামিয়ে বললেন, ইস্ট লন্ডনে জিয়ার বিরুদ্ধে আপনাদের আন্দোলন কেমন চলছে। বললাম, ভালোই। রেহানা বললেন, এখন আমাদের এক হওয়া দরকার। গউস খান ও সুলতান শরিফের মধ্যে বিবাদটা মিটিয়ে দিন। বুঝলাম, পূর্ব লন্ডনে আমাদের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সব খবরই রেহানা রাখেন। তার ট্রেন তখনও আসেনি। বললেন, আপনি বাবাকে নিয়ে ইংরেজিতে (Sheikh Mujib : a commemorative) যে বইটা বের করেছেন, আমাকে কয়েক কপি দেবেন? বললাম, তুমি বই নিয়ে কী করবে? রেহানা বললেন, একটা আমার কাছে রাখব। বাকিগুলো বন্ধু-বান্ধবদের দেব। বললাম, তোমার বাসায় পৌঁছে দেব। ট্রেন এসে গিয়েছিল। রেহানা ট্রেনে গিয়ে উঠলেন। আমার ট্রেন তখনও আসেনি। আমি তার ট্রেনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বুঝতে বাকি রইল না, শেখ হাসিনা রাজনীতিতে হতে যাচ্ছেন প্রকাশ্য নায়িকা। শেখ রেহানাও হবেন রাজনীতির নেপথ্যের নায়িকা। (শেষাংশ আগামী সপ্তাহে)

২৬ সেপ্টেম্বর, শনিবার, ২০২০

তৃতীয় মত

হাসিনা ও রেহানা : অ-রূপকথার দুই বোন

 আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী 
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
হাসিনা ও রেহানা : অ-রূপকথার দুই বোন
তোশাখানা জাদুঘরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পিতার প্রতিকৃতির সামনে দুই বোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। ফাইল ছবি

রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদেরও একটা ব্যক্তিজীবন থাকে। রাজনীতিটাই তাদের জীবনে বড় হয়ে ওঠে বলে রাজনৈতিক জীবনের আড়ালে তাদের ব্যক্তিজীবন ঢাকা পড়ে যায়। এই ব্যক্তি জীবনটি জানা না গেলে এই নেতা-নেত্রীদেরও আসল চরিত্রটি খুঁজে পাওয়া যায় না। আজ ২৮ সেপ্টেম্বর জননেত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন। তিনি ৭৩ পেরিয়ে চুয়াত্তর বছরে পা দেবেন। এই একই সেপ্টেম্বর মাসে শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার জন্ম। বড় বোনের চাইতে তিনি দশ বছরের ছোট। তার জন্ম ১৯৫৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর।

বাংলাদেশের রাজনীতির দণ্ডমুণ্ডের কর্ত্রী এখন এই দুই বোন। শেখ হাসিনা প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে আছেন। শেখ রেহানা থাকেন নেপথ্যে। শেখ রেহানা রাজনীতিতে নেই বলে যারা ভাবেন তারা সঠিক তথ্যটি জানেন না। শেখ হাসিনা দেশ চালান। আর শেখ রেহানা পেছনে বসে প্রতিটি সমস্যা ও সংকটে বোনকে সাহস জোগান। রাজনৈতিক জীবনের আড়ালে এই দুই বোনের ব্যক্তিজীবন। তাদের কৈশোর থেকে কিছুটা জানি বলে শেখ রেহানার নেপথ্য রাজনৈতিক ভূমিকার কথাও কিছু জানি।

বঙ্গবন্ধু যখন বেঁচে ছিলেন, তখন ৩২ নম্বরে আমার ছিল অবাধ যাতায়াত। তবু আজ কবুল করব, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দীর্ঘ সাহচর্য সত্ত্বেও তিনি, ভাবি (মুজিব পত্নী), তাদের ছেলে শেখ কামালের সঙ্গে আমার যে ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল, তা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার সঙ্গে হয়নি। বত্রিশ নম্বরে গেলে মাঝে মাঝে তাদের দেখা পেতাম, শেখ হাসিনা হয়তো বই-খাতার ব্যাগ হাতে কলেজে যাচ্ছেন। রেহানা ছোট ভাই রাসেলের সঙ্গে খেলা করছেন। এর বেশি কিছু নয়।

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর এই সর্বস্বহারা দুই বোনের সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ পরিচয় হয়। শেখ হাসিনার সঙ্গে পরিচয়টা তেমন গভীর হয়নি। কিন্তু রেহানার সঙ্গে হয়েছিল। তাকে আমি মা ডাকতে শুরু করি। ১৯৭৬ সালে আমরা বঙ্গবন্ধুর কিছু অনুসারী মিলে দেশে সামরিক শাসন উচ্ছেদের লক্ষ্যে লন্ডনে একটি সংগ্রাম পরিষদ গঠন করি এবং এই সংগ্রাম পরিষদের মুখপত্র হিসেবে ‘বাংলার ডাক’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করি। এই সময় বঙ্গবন্ধুর এক সম্পর্কিত ভাই মমিনুল হক (খোকা) লন্ডনে অবস্থান করছিলেন, তিনি আমাদের আন্দোলনে সম্পর্কিত হন। সম্ভবত তিনি লন্ডনে আমার রাজনৈতিক কার্যকলাপ সম্পর্কে শেখ হাসিনাকে জানিয়েছিলেন। কিছুদিন পর খোকা ভাই আমাদের জানালেন, শেখ হাসিনা তাকে একটি চিঠি লিখেছেন। চিঠিটা তিনি আমাকে দেখালেন।

চিঠিটা পড়ে বুঝলাম, আমরা লন্ডনে আন্দোলন শুরু করায় তিনি খুশি হয়েছেন। আমার নাম উল্লেখ করে হাসিনা তার চিঠিতে লিখেছেন, ‘তাকে জানাবেন, হত্যাকারীরা সুলতানাকে (শেখ কামালের নববিবাহিত বধূ) হত্যা করে তার সোনার অলঙ্কারগুলোও নিয়ে গেছেন।’ গোটা চিঠিটাতেই ছিল একজন পরিবার-পরিজনহারা নির্বান্ধব নারীর আর্ত-হাহাকার এবং সেই সঙ্গে শহীদ পিতার আদর্শ রক্ষায় অটল থাকার অঙ্গীকারের কথা। তিনি লিখেছিলেন, ‘লন্ডনের আন্দোলনে আমি যে কোনোভাবে সাহায্য জোগাতে রাজি আছি।’ শেখ হাসিনা তখন জার্মানিতে। সহায়-সম্বলহীন তার অবস্থা। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ছোট বোন রেহানার শোক সামলাতে পারছেন না। সেই অবস্থাতেও তার মনের দৃঢ়তা দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম।

লন্ডনে আমাদের আন্দোলন যখন তুঙ্গে, বঙ্গবন্ধুর হত্যা ষড়যন্ত্রের নেতা জেনারেল জিয়াউর রহমানের লন্ডন সফর ব্যর্থ করে দিতে পেরেছি, তখন একদিন খোকা ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ। কথা প্রসঙ্গে বললাম, আমরা বিদেশে বসে তো যথেষ্ট আন্দোলন করছি, দেশের মানুষও জেগে উঠছে। যদি সামরিক শাসনের পতন হয় এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যায়, তাহলে প্রধানমন্ত্রী হবেন কে?

খোকা ভাই সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন, কেন শেখ হাসিনা! আমার বিস্ময়ের অন্ত ছিল না। আমি ভেবেছিলাম, খোকা ভাই ড. কামাল হোসেন, আবদুস সামাদ আজাদ বা এই ধরনের কারও নাম বলবেন। তিনি ঝট করে শেখ হাসিনার নাম বললেন। তখন অল্প বয়স তার। রাজনীতি সম্পর্কে তেমন অভিজ্ঞ নন; তিনি কী করে এখনই একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন, তা আমি ভাবতে পারিনি। আরও বয়স হলে, অভিজ্ঞ হলে শেখ হাসিনা দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। যেমন, ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তবে শেখ হাসিনা এই বয়সে, এই সময়ে নয়। এটি ছিল আমার তখনকার ধারণা। আমার এই ধারণাটা অবশ্য পরে ভেঙে যায়।

আমি সেদিন খোকা ভাইকে বলেছিলাম, শেখ হাসিনার তো বয়স কম, অভিজ্ঞতা কম, তিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন কীভাবে? খোকা ভাই বললেন, রাজনীতিতে শেখ হাসিনার অভিজ্ঞতা আছে। তিনি ইডেন কলেজের ছাত্রী পরিষদের সহসভাপতি ছিলেন না? আমি বলেছি, ইডেন কলেজের ছাত্রী পরিষদের নেতা হওয়া এবং একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়া কি এক কথা? খোকা ভাই বললেন, হাসিনাকে আপনি চেনেন না। চিনলে এ কথা বলতেন না। খোকা ভাই যে সেদিন আমাকে কতটা সত্য কথা বলেছেন, সেটা পরে বুঝতে পেরেছি।

শেখ রেহানার কথায় আসি। বাংলাদেশের এক জবরদস্ত ব্যুরোক্রাট, সম্ভবত নাম ছিল মইনুল ইসলাম, আমরা ডাকতাম মামা। বঙ্গবন্ধুও তাকে ডাকতেন মামা। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তিনি ম্যানচেস্টারে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আমাদের আন্দোলনে উপদেশ ও অর্থ দিয়ে এবং আরও নানাভাবে সাহায্য করতেন। একদিন তার ম্যানচেস্টারের বাসায় বসে খোকা ভাই আমাকে বললেন, গাফ্ফার ভাই, রেহানাকে লন্ডনে আমার বাসায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। দিল্লিতে দুই বোনই নিরাপদ আছে। কিন্তু রেহানাকে নিয়ে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে।

বললাম, কীভাবে আনবেন? ইন্দিরা গান্ধী কি তাকে নিরাপত্তাবিহীনভাবে লন্ডনে আসতে দিতে রাজি হবেন? খোকা ভাই বললেন, যদি বিদেশের আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতারা ইন্দিরা গান্ধীকে রেহানার নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে চিঠি লেখেন, তিনি তাহলে রাজি হবেন। আমি ভাবছি ড. কামাল হোসেনের কাছে আপনাদের সবাইকে নিয়ে যাব। আপনারা সবাই মিলে একটা চিঠি ইন্দিরা গান্ধীর কাছে পাঠালে তিনি রেহানাকে দিল্লি থেকে লন্ডনে আসতে সম্মতি দেবেন। এখানকার স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডও বলেছে, তারা রেহানাকে নিরাপত্তা দেবেন।

হাসিনা-রেহানা দুই বোনই তখন জার্মানি থেকে দিল্লিতে চলে গেলেন। খোকা ভাই বললেন, শেখ হাসিনা এখন আসবেন না। আগে রেহানা আসবেন। আমরা ইন্দিরা গান্ধীর কাছে পাঠানোর জন্য একটা চিঠি ড্রাফট করলাম। ঠিক হল তাতে সই করবেন ড. কামাল হোসেন, গউস খান (তখন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি) এবং আমি। এক প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির দিনে আমি, গউস খান, এমআর আখতার মুকুল অক্সফোর্ডে ড. কামাল হোসেনের বাসায় যাই। তিনি নানা অজুহাত দেখিয়ে চিঠিতে সই দিতে অসম্মত হন। আমি তার ওপর অত্যন্ত রেগে গিয়েছিলাম। আমাকে শান্ত করেন ড. মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, কামাল সই না দিক। আমি দেব। আমরা তার সই নিয়ে লন্ডনে ফিরে আসি। চিঠিটা ইন্দিরা গান্ধীকে পাঠানো হয়।

এরপর শেখ রেহানা কবে লন্ডনে এসে পৌঁছেছেন, তা আমি জানি না। তার নিরাপত্তার কঠোর ব্যবস্থা করেছিলেন খোকা ভাই। রেহানা যে লন্ডনে এসেছেন এবং তার বাড়িতেই অবস্থান করছেন, তা আমাকেও জানতে দেননি। একদিন আমি কী কাজে খোকা ভাইয়ের বাসায় টেলিফোন করেছি, একটি মেয়েলি কণ্ঠ জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কে বলছেন? বললাম, আমি গাফ্ফার চৌধুরী বলছি। সঙ্গে সঙ্গে জবাব এলো, ‘চাচা, আমি রেহানা বলছি।’ আমি থ’। রেহানা লন্ডনে আছেন- এ ধারণা আমার ছিল না। বললাম, রেহানা, তুমি লন্ডনে? কবে এসেছো? রেহানা বললেন, মাসখানেক হয়। জিজ্ঞাসা করলাম, কেমন আছো? রেহানা বললেন, ‘আমরা সব হারিয়েছি। কেমন অবস্থায় থাকতে পারি আপনিই চিন্তা করুন। আপনি ছাড়া আমাদের সহায় আর কে আছে?

তার কথায় আমার চোখে পানি এসেছিল। যে নেতার ডাকে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ (তখনকার) উঠত এবং বসত; তার কন্যা কিনা আজ আমার মতো সামান্য এক সাংবাদিককে বলছেন, আমি ছাড়া তাদের কোনো সহায় নেই।

বললাম, মা, আমি যতদিন বেঁচে আছি, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে সরব না। তোমাদের পাশে সব সময় থাকব।

আজ ৯০ বছরের কাছাকাছি এসে আমার জীবনের একটাই সন্তোষ, বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাকে আমি বাংলাদেশে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকতে দেখে যেতে পারছি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধরে রাখার ব্যাপারে আমি নানা অপবাদ, দুর্নাম সহ্য করেও অঙ্গীকার ভঙ্গ করিনি।

আরও পরের কথায় আসি। লন্ডনে এক বাঙালি ছেলের সঙ্গে রেহানারা বিয়ের ব্যবস্থা অত্যন্ত গোপনীয়তা এবং দ্রুততার মধ্যে সম্পন্ন হল। এই তরুণ শফিক সিদ্দিককে দেখলাম, খুবই সুদর্শন, শিক্ষিত এবং ভদ্র স্বভাবের মানুষ। শফিক যে রেহানার মনের মানুষ হবেন, তাতে আমার কোনো সন্দেহ রইল না।

খোকা ভাই আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি শফিককে চেনেন? আমাদের জিল্লুর রহমান (পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি) ভাইয়ের আত্মীয়। আমি যে শফিক সিদ্দিককে সামনা-সামনি না চিনলেও নামে চিনি, এ কথা তাকে বললাম না। শফিক সিদ্দিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকাকালে ছিলেন কট্টর চীনাপন্থী ছাত্র ইউনিয়নের একটি অংশের সঙ্গে জড়িত। এরা ছিলেন প্রচণ্ডভাবে মুজিববিরোধী। সেই চীনাপন্থী ছাত্র ইউনিয়নের নেতা কী করে রেহানাকে বিয়ে করেন? তাহলে কি ‘বঙ্গবন্ধুর জামাই’ হওয়ার লোভে তার এই আদর্শ ত্যাগ?

আমি পরে শফিক সিদ্দিকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হওয়ার পর তাকে রেহানাকে বিয়ে করার কারণ খোলাখুলি জিজ্ঞাসা করেছি। শফিক বললেন, না, আমি বঙ্গবন্ধুর জামাই হওয়ার লোভে রেহানাকে বিয়ে করিনি। তাকে বিয়ে করার বহু আগে আমি চীনাপন্থী তথা পিকিংপন্থীদের মারাত্মক ভুল বুঝতে পেরেছিলাম। বুঝতে পেরেছিলাম, বঙ্গবন্ধুর আদর্শই হচ্ছে বাঙালির মুক্তির একমাত্র পথ। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি আমার আগ্রহের কারণ দর্শিয়ে আমি একটা বই লিখেছি। নাম ‘একজন সাবেক পিকিংপন্থীর জবানবন্দী’। আপনার বাংলার ডাক পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ছাপবেন?

আমি শফিক সিদ্দিকের লেখাটি ‘বাংলার ডাকে’ ধারাবাহিকভাবে ছেপে ছিলাম। তার লেখায় মুনশিয়ানা ছিল। তখনকার বাংলাদেশের অনেক চীনপন্থীর মুখোশ উন্মোচন করেছেন। তথ্য ও যুক্তি দিয়ে তাদের রাজনীতি যে ভুলপথের রাজনীতি ছিল, তা দেখানো হয়েছিল। এই লেখাটি বই আকারে প্রকাশিত হলে একটি চমৎকার রাজনৈতিক গ্রন্থ হতো।

বিয়ের পরও শেখ রেহানাকে কষ্টকর জীবনযাপন করতে হতো। শফিক সিদ্দিক তখনও ছাত্র। আয়-উপার্জন তেমন নেই। বন্ধুর সঙ্গে যুক্তভাবে লন্ডনের মিচাম এলাকায় ঘরভাড়া করে বাস করেন। ওই বাসায় আমি কয়েকবার গেছি। একেবারেই সাধারণ সাদামাটা জীবন। তার মধ্যেও শেখ রেহানা হাসি-খুশি।

ভেবেছিলাম, শেখ হাসিনা তো রাজনীতির দিকে ঝুঁকেছেন। শেখ রেহানা হয়তো ঝুঁকবেন না। ঘর-সংসার নিয়েই তুষ্ট থাকবেন। কিছুদিনের মধ্যেই বুঝলাম, বঙ্গবন্ধুর রক্ত যে মেয়ের শরীরে, তিনি রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে পারেন না। একদিন আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেনে সেন্ট্রাল লন্ডন থেকে এ জোয়ারে নিজের বাসায় ফিরছি, কিলবার্নে এসে ট্রেন বদল করতে হয়; দেখি শেখ রেহানা প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি বিপরীতগামী ট্রেনের অপেক্ষায় ছিলেন। তার হাতের ঝুলিতে ডজনখানেক কমলা। আমাকে দেখে কাছে এলেন। বললাম, তুমি এখানে কেন? রেহানা বললেন, আমি এখানে একটা অফিসে কাজ করি।

আমি বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকালাম। পরনে একটা আটপৌরে শাড়ি। গায়ে জ্যাকেট। দেখে আমার কষ্ট হল। বঙ্গবন্ধুর কন্যা। এখন বাস আর ট্রেনে চলাফেরা করেন। সাধারণ একটি চাকরি করেন। আমার চিন্তায় বাধা পড়ল রেহানার কথায়। কমলার থলেটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, এটা চাচিকে (আমার স্ত্রীকে) দেবেন। বললাম, তোমাদের এখন এই অবস্থা। তার মধ্যে সব কমলা আমাকে দিচ্ছ। রেহানা বললেন, আপনাকে নয়; চাচিকে দিচ্ছি।

তারপর কথা না থামিয়ে বললেন, ইস্ট লন্ডনে জিয়ার বিরুদ্ধে আপনাদের আন্দোলন কেমন চলছে। বললাম, ভালোই। রেহানা বললেন, এখন আমাদের এক হওয়া দরকার। গউস খান ও সুলতান শরিফের মধ্যে বিবাদটা মিটিয়ে দিন। বুঝলাম, পূর্ব লন্ডনে আমাদের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সব খবরই রেহানা রাখেন। তার ট্রেন তখনও আসেনি। বললেন, আপনি বাবাকে নিয়ে ইংরেজিতে (Sheikh Mujib : a commemorative) যে বইটা বের করেছেন, আমাকে কয়েক কপি দেবেন? বললাম, তুমি বই নিয়ে কী করবে? রেহানা বললেন, একটা আমার কাছে রাখব। বাকিগুলো বন্ধু-বান্ধবদের দেব। বললাম, তোমার বাসায় পৌঁছে দেব। ট্রেন এসে গিয়েছিল। রেহানা ট্রেনে গিয়ে উঠলেন। আমার ট্রেন তখনও আসেনি। আমি তার ট্রেনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বুঝতে বাকি রইল না, শেখ হাসিনা রাজনীতিতে হতে যাচ্ছেন প্রকাশ্য নায়িকা। শেখ রেহানাও হবেন রাজনীতির নেপথ্যের নায়িকা। (শেষাংশ আগামী সপ্তাহে)

২৬ সেপ্টেম্বর, শনিবার, ২০২০