লেখক সত্তার বিকাশে যা করতে হবে
jugantor
দেশপ্রেমের চশমা
লেখক সত্তার বিকাশে যা করতে হবে

  মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার  

২৭ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবীতে অনেক নিরক্ষর মানুষ আছেন। তারা পড়তে পারেন না। কাজেই পৃথিবীর সব মানুষ পাঠক নন। তবে পৃথিবীর সব মানুষ লেখক। তাদের সবার মধ্যে লেখক হওয়ার যোগ্যতা আছে।

এমন মানুষ নেই, যার মধ্যে ভাব নেই, ভালোবাসা নেই, আবেগ ও চিন্তাভাবনা নেই। কাজেই মানুষ তার ভাবাবেগ, মনোভাব এবং চিন্তাভাবনার প্রকাশ ঘটিয়ে লেখক হতে পারেন। প্রতিটি মানুষ উচ্চশিক্ষিত না হলে বা লেখাপড়া না জানলেও তার মধ্যে একটা সুপ্ত লেখক সত্ত্বা আছে।

তিনি এ সত্ত্বাটিকে জাগ্রত ও বিকশিত করে সহজে লেখক হতে পারেন। লেখক হতে হলে শিক্ষিত বা জ্ঞানী হতে হবে, এমন কথা একেবারেই ঠিক নয়। পৃথিবীর খ্যাতিমান অনেক লেখকই বেশি লেখাপড়া জানতেন না। এ জন্য তাদের বড় লেখক হতে অসুবিধা হয়নি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীর মধ্যে লেখক হওয়ার যোগ্যতা রয়েছে। বিষয়টি অনেকে না জেনে হীনম্মন্যতায় ভোগেন। ভাবেন, আমাকে অনেক পড়তে হবে। শিখতে হবে। তারপর লেখার চেষ্টা করতে হবে। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমার লেখার অভ্যাস নেই।

আমি চাইলেই তো আর লেখক হতে পারি না। অনেকের মধ্যে এমন অব্যক্ত ভয় রয়েছে। এ ভয় জয় করে কেউ কলম ধরতে পারলে তিনি অবশ্যই একজন ভালো লেখক হতে পারবেন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক শিক্ষার্থীর লেখক পরিচয় তার নিজস্ব আইডেন্টিটিতেই বিধৃত রয়েছে। কারণ একজন অভিভাবকের কাছে তার ছেলে বা মেয়ে কী করেন জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আমার ছেলে লেখাপড়া করে। অথবা তিনি বলেন, আমার মেয়ে পড়ালেখা করে।

এ ‘পড়ালেখা’ অথবা ‘লেখাপড়া’ এ শব্দ দুটির মধ্যে শিক্ষার্থীর লেখকসত্ত্বা বিধৃত রয়েছে। শব্দ দুটির মধ্যে অর্ধেক হল ‘পড়া’, বাকি অর্ধেক ‘লেখা’। এ লেখার অর্থ পরীক্ষা পাসের জন্য শিক্ষার্থীর পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর লেখা নয়। এ ‘লেখা’র অর্থ হল তার লেখক সত্ত্বার স্বীকৃতি। শিক্ষার্থী তো পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই লিখবেন।

কিন্তু তার লেখক সত্ত্বাকে তিনি তো কেবল প্রশ্নত্তোর লেখার মধ্যে সীমিত রাখবেন না। তিনি যা খুশি স্বাধীনভাবে লিখবেন। নিজ ডিসিপ্লিনে আগ্রহী হলে লিখবেন। তবে তিনি তার লেখক সত্ত্বাকে একাডেমিক সীমানাপ্রাচীর দিয়ে আটকাবেন না। তিনি লিখবেন তার আগ্রহের এলাকায়।

একজন সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী যদি মনোবিজ্ঞানে আগ্রহী হন, তাহলে তিনি অবশ্যই মনোবিজ্ঞান বিষয়ে লিখবেন। কেউ যদি রসায়নের শিক্ষার্থী হন, আর তার আগ্রহের এলাকা হয় সাহিত্য, তাতে ওই এলাকয় লিখতে তার অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। হুমায়ূন আহমেদ তো রসায়নের শিক্ষক ছিলেন।

উপন্যাস ও নাটক লিখতে কি তার কোনো অসুবিধা হয়েছে? একইভাবে কেউ গণিতের শিক্ষার্থী হয়ে যদি কবিতা লেখেন, তাতে কোনো দোষ নেই। চর্চা অব্যাহত রেখে তিনি লেখার জগতে সাফল্যমণ্ডিত হতে পারবেন।

অনেকে মনে করেন, আমি লিখলে আমার লেখা প্রকাশিত হবে না। আমার লেখার মান ভালো হবে না। পাঠকরা আমার লেখায় আকৃষ্ট হবেন না। আমার লেখা পত্রিকায় দিলে তা প্রকাশ করা হবে না। এমন অগ্রিম ভাবনা না ভাবাই ভালো। আপনার লেখা পত্রিকায় প্রকাশিত না হলে কোনো অসুবিধা নেই।

লেখক হিসেবে আপনি যা চান তা হল আপনার লেখা সবাই পাঠ করুক। সে সম্পর্কে মতামত দিন। সে জন্য পত্রিকা আপনার লেখা না ছাপলে না ছাপুক। আপনি প্রযুক্তির যুগে ব্লগে লিখতে পারেন, ফেসবুকে লিখতে পারেন। সেখানে অনেক পাঠক আপনার লেখা পড়বেন।

মন্তব্য করবেন। সমালোচনা করবেন। এভাবে চর্চা অব্যাহত রাখতে পারলে এক সময় আপনাকে আর পত্রিকায় লেখা জমা দিতে হবে না। পত্রিকার লোকরাই আপনাকে অনুরোধ করবে তাদের লেখা দিতে। এভাবে আগ্রহ থাকলে আপনি সহজেই হতে পারবেন একজন বরেণ্য কলামিস্ট বা খ্যাতিমান লেখক।

প্রতিটি লেখার নিজস্ব কিছু নিয়ম-কানুন আছে। তেমনি আপনি যদি পত্রিকার কলাম দিয়ে লেখা শুরু করতে চান, অসুবিধা নেই। আপনি যদি নিয়ম-কানুন মেনে লেখেন তবে আপনার লেখা ছাপা হবে। যদি বড় জাতীয় পত্রিকায় ছাপা না হয়, তাহলে আঞ্চলিক পত্রিকায় ছাপবেন।

সেখানেও অসুবিধা হলে অসংখ্য অনলাইন পত্রিকা আছে তার কোনোটিতে ছাপবেন। এভাবে কোথাও না কোথাও আপনার লেখা প্রকাশিত হবে। আর এভাবে আপনি ক্রমান্বয়ে চর্চা অব্যাহত রাখতে পারলে এক সময় জাতীয় পত্রিকাও আপনার লেখা প্রকাশ করবে।

হঠাৎ করে কেউ বড় লেখক হন না। চর্চা ও অধ্যবসায় অব্যাহত রাখলে আপনার বড় লেখক হতে বাধা থাকবে না। অনেক খ্যাতিমান লেখককে বছরের পর বছর তার প্রথম গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশকের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছে। তারপর একদিন তা ছাপা হয়েছে।

বিদেশি গণমাধ্যমের বদৌলতে আমরা কয়েক বছর আগে কাসেম বিন আবু বাকার নামের একজন বাংলাদেশি ঔপন্যাসিককে চিনেছি। তিনি অল্পশিক্ষিত। তার লেখা প্রথম প্রেমের উপন্যাস ‘ফুটন্ত গোলাপ’-এর পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন।

উত্তর পেয়েছেন প্রায় একই রকম। ‘মোল্লার লেখা উপন্যাস চলবে না।’ তিনি হাল ছাড়েননি। এভাবে দীর্ঘ আট বছর পর এক প্রকাশক তার লেখার গুরুত্বের জায়গাটি উপলব্ধি করতে পেরে তার বইটি ছাপেন। লেখার মান ভালো নয়। অলংকরণ দুর্বল। ভাষা, বর্ণনা ও বিশ্লেষণও আকর্ষণীয় নয়।

কিন্তু এই ইসলামী প্রেমের উপন্যাস ছাপা হওয়ার পর গ্রাম বাংলার স্বল্পশিক্ষিত ও ধর্ম-প্রভাবিত মানুষ হটকেকের মতো সে বই কিনেছে। বছর পাঁচেক আগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী তার এ বই ২০ লাখ কপিরও বেশি বিক্রি হয়েছে।

প্রকাশিত হয়েছে তার শতাধিক গ্রন্থ, যার অধিকাংশই ইসলামী প্রেমের উপন্যাস। কাজেই তিনি যদি লেগে না থেকে হাল ছেড়ে দিতেন, তাহলে হয়তো তার বইগুলো প্রকাশিত হতো না।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য পত্রিকায় কলাম লেখার ব্যাপারটি কঠিন বিষয় নয়। একটু চেষ্টা করলেই তারা ভালো কলাম লিখতে পারবেন। কয়েকটি বিষয়ে তাদের খেয়াল রাখতে হবে। প্রথমত একটি মানসম্পন্ন কলাম লিখতে হলে তাকে একটি ‘বিষয়’ নির্বাচন করতে হবে।

বিষয়টি সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ আলোচিত বিষয় হলে ভালো হয়। তার লেখায় তিনি একটি বক্তব্য তুলে ধরবেন, অর্থাৎ লেখায় তিনি পাঠকদের একটি মেসেজ দেবেন। লেখার বর্ণনা আকর্ষণীয় করতে তাকে ভাষার ব্যবহার ও শব্দচয়নে সতর্ক হতে হবে।

বিষয়বস্তুর সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু তথ্য-উপাত্তের ব্যবহার করতে পারলে লেখার মান উন্নত হবে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর কিছু পরিসংখ্যানের ব্যবহার লেখাকে অধিকতর সমৃদ্ধ করবে। লেখার শরীরে যদি উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয় তাহলে তা যেন ছোট হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। কিছুতেই অন্যের লেখা নিজের বলে চালানো যাবে না। এ কাজ করলে প্লেজিয়ারিজম বা নকলের অপরাধে লেখক অপরাধী হবেন।

অন্য কারও সহায়তা নেয়া যেতে পারে। পরামর্শ নেয়া যেতে পারে কোনো বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিত্বের। কিন্তু কিছুতেই অন্যকে দিয়ে পুরো লেখাটি লিখিয়ে নিজের বলে ছাপানো যাবে না। লেখার মধ্যে নিজের স্বকীয়তা ও নিজস্বতা থাকলে ভালো হয়। এসব দিক লক্ষ রেখে কলাম লিখলে আপনিও হতে পারবেন পত্রিকার একজন পাঠকনন্দিত কলামিস্ট।

আপনার লেখা পড়ে অনেকে সমালোচনা করবেন। অনেকে ঈর্ষা করবেন। এসব গায়ে মাখবেন না। আপনাকে হতাশ করে দেয়ার জন্য কেউ এমনও বলবেন, ‘আরে এসব পত্রিকায় লিখে কী হবে? অযথা পণ্ডশ্রম।’ আপনি তাদের কথা শুনবেন না।

কারণ, আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আপনার লেখায় প্রদত্ত পরামর্শ সরকারের নীতিনির্ধারণীতে কাজে লাগবে। সমাজকে জাগাতে, মানবিকতা তুলে ধরতে আপনার লেখা অবদানমূলক হতে পারে। মনে রাখবেন, পত্রিকায় প্রকাশিত আপনার কলামে প্রদত্ত দিকনির্দেশনা কেবল সরকারই দেখে না, বিবেচনা করে সারা বিশ্ব। কারণ প্রতিটি রাষ্ট্রদূত অফিস কে কী লিখছেন সেগুলো স্ক্যান করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেন। কাজেই আপনি যা লিখছেন তা আপনার কাছে সাধারণ মনে হলেও ওই লেখার মধ্যে অন্যের জন্য হয়তো লুকিয়ে রয়েছে মূল্যবান দিকনির্দেশনা, যা আপনি নিজেও জানেন না।

পত্রিকায় কলাম লেখা যে অর্থহীন নয় তার হাজারো প্রমাণ রয়েছে। ২০০৩ সালের মধ্য জুনে আমার লেখা একটি কলাম প্রকাশিত হওয়ার পর ওই দিনই সরকারি পর্যায়ে দুটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল। মাত্র কিছুদিন আগে ওয়েব সিরিজের নামে নষ্টামি শুরু হলে আমি ওয়েব সিরিজের জন্য নীতিমালা তৈরি করতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটি কলাম লিখলে মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে সরকার সে উদ্দেশ্যে কমিটি গঠন করে। কাজেই পত্রিকার কলামের যে মূল্য নেই এ কথা যারা বলেন, কলাম লেখকদের সে কথা না শুনে নিজের কাজে যত্নবান হওয়া উচিত।

তবে আপনি একজন নবীন কলামিস্ট হিসেবে সবসময় চোখ কান খোলা রাখবেন। রাষ্ট্রীয় আইন-কানুন মেনে, একাডেমিক ভঙ্গিমায় সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গায় দায়িত্ব পালন করবেন। এ কাজ করতে পারলে আপনার কলামের পাঠক সংখ্যা বাড়বে।

আমি বিশ্বাস করি, আমাদের প্রতিটি শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন ভালো কলামিস্ট হওয়ার যোগ্যতা রয়েছে। আপনার কাজ হল ওই যোগ্যতার উদ্বোধন ও উপস্থাপন করা। আপনাদের প্রত্যেকের চোখ আছে। আপনি সমাজ দেখছেন। রাষ্ট্র দেখছেন। সারা বিশ্ব দেখছেন।

প্রাকৃতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তর দেখছেন। এসব পর্যবেক্ষণের ফলে আপনার বুকে যে ভাব জন্ম নেয় তা আপনি প্রকাশ না করে থাকতে পারবেন না। আপনার বুক ভাবাবেগে ভরে উঠবে। এ আবেগ লেখনীর মাধ্যমে আপনাকে অন্যের সঙ্গে শেয়ার করতে হবে।

আর এ জন্যই আপনাকে কলম ধরতে হবে। আপনিই আপনার লেখার বিষয়বস্তু ঠিক করবেন। কারও সঙ্গে পরামর্শের দরকার আছে বলে আমি মনে করি না। কারণ এ ব্যাপারে আপনিই বিশেষজ্ঞ। কাজেই কারও পরামর্শে বিভ্রান্ত না হয়ে আজই কলম ধরুন। নিজের ভাব প্রকাশ করুন।

আর অল্প সময়ের চেষ্টা আর অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়ে হয়ে উঠুন একজন বিবেকবান, পাঠকনন্দিত ও সমাজআদৃত তরুণ কলামিস্ট।

ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

দেশপ্রেমের চশমা

লেখক সত্তার বিকাশে যা করতে হবে

 মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার 
২৭ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবীতে অনেক নিরক্ষর মানুষ আছেন। তারা পড়তে পারেন না। কাজেই পৃথিবীর সব মানুষ পাঠক নন। তবে পৃথিবীর সব মানুষ লেখক। তাদের সবার মধ্যে লেখক হওয়ার যোগ্যতা আছে।

এমন মানুষ নেই, যার মধ্যে ভাব নেই, ভালোবাসা নেই, আবেগ ও চিন্তাভাবনা নেই। কাজেই মানুষ তার ভাবাবেগ, মনোভাব এবং চিন্তাভাবনার প্রকাশ ঘটিয়ে লেখক হতে পারেন। প্রতিটি মানুষ উচ্চশিক্ষিত না হলে বা লেখাপড়া না জানলেও তার মধ্যে একটা সুপ্ত লেখক সত্ত্বা আছে।

তিনি এ সত্ত্বাটিকে জাগ্রত ও বিকশিত করে সহজে লেখক হতে পারেন। লেখক হতে হলে শিক্ষিত বা জ্ঞানী হতে হবে, এমন কথা একেবারেই ঠিক নয়। পৃথিবীর খ্যাতিমান অনেক লেখকই বেশি লেখাপড়া জানতেন না। এ জন্য তাদের বড় লেখক হতে অসুবিধা হয়নি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীর মধ্যে লেখক হওয়ার যোগ্যতা রয়েছে। বিষয়টি অনেকে না জেনে হীনম্মন্যতায় ভোগেন। ভাবেন, আমাকে অনেক পড়তে হবে। শিখতে হবে। তারপর লেখার চেষ্টা করতে হবে। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমার লেখার অভ্যাস নেই।

আমি চাইলেই তো আর লেখক হতে পারি না। অনেকের মধ্যে এমন অব্যক্ত ভয় রয়েছে। এ ভয় জয় করে কেউ কলম ধরতে পারলে তিনি অবশ্যই একজন ভালো লেখক হতে পারবেন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক শিক্ষার্থীর লেখক পরিচয় তার নিজস্ব আইডেন্টিটিতেই বিধৃত রয়েছে। কারণ একজন অভিভাবকের কাছে তার ছেলে বা মেয়ে কী করেন জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আমার ছেলে লেখাপড়া করে। অথবা তিনি বলেন, আমার মেয়ে পড়ালেখা করে।

এ ‘পড়ালেখা’ অথবা ‘লেখাপড়া’ এ শব্দ দুটির মধ্যে শিক্ষার্থীর লেখকসত্ত্বা বিধৃত রয়েছে। শব্দ দুটির মধ্যে অর্ধেক হল ‘পড়া’, বাকি অর্ধেক ‘লেখা’। এ লেখার অর্থ পরীক্ষা পাসের জন্য শিক্ষার্থীর পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর লেখা নয়। এ ‘লেখা’র অর্থ হল তার লেখক সত্ত্বার স্বীকৃতি। শিক্ষার্থী তো পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই লিখবেন।

কিন্তু তার লেখক সত্ত্বাকে তিনি তো কেবল প্রশ্নত্তোর লেখার মধ্যে সীমিত রাখবেন না। তিনি যা খুশি স্বাধীনভাবে লিখবেন। নিজ ডিসিপ্লিনে আগ্রহী হলে লিখবেন। তবে তিনি তার লেখক সত্ত্বাকে একাডেমিক সীমানাপ্রাচীর দিয়ে আটকাবেন না। তিনি লিখবেন তার আগ্রহের এলাকায়।

একজন সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী যদি মনোবিজ্ঞানে আগ্রহী হন, তাহলে তিনি অবশ্যই মনোবিজ্ঞান বিষয়ে লিখবেন। কেউ যদি রসায়নের শিক্ষার্থী হন, আর তার আগ্রহের এলাকা হয় সাহিত্য, তাতে ওই এলাকয় লিখতে তার অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। হুমায়ূন আহমেদ তো রসায়নের শিক্ষক ছিলেন।

উপন্যাস ও নাটক লিখতে কি তার কোনো অসুবিধা হয়েছে? একইভাবে কেউ গণিতের শিক্ষার্থী হয়ে যদি কবিতা লেখেন, তাতে কোনো দোষ নেই। চর্চা অব্যাহত রেখে তিনি লেখার জগতে সাফল্যমণ্ডিত হতে পারবেন।

অনেকে মনে করেন, আমি লিখলে আমার লেখা প্রকাশিত হবে না। আমার লেখার মান ভালো হবে না। পাঠকরা আমার লেখায় আকৃষ্ট হবেন না। আমার লেখা পত্রিকায় দিলে তা প্রকাশ করা হবে না। এমন অগ্রিম ভাবনা না ভাবাই ভালো। আপনার লেখা পত্রিকায় প্রকাশিত না হলে কোনো অসুবিধা নেই।

লেখক হিসেবে আপনি যা চান তা হল আপনার লেখা সবাই পাঠ করুক। সে সম্পর্কে মতামত দিন। সে জন্য পত্রিকা আপনার লেখা না ছাপলে না ছাপুক। আপনি প্রযুক্তির যুগে ব্লগে লিখতে পারেন, ফেসবুকে লিখতে পারেন। সেখানে অনেক পাঠক আপনার লেখা পড়বেন।

মন্তব্য করবেন। সমালোচনা করবেন। এভাবে চর্চা অব্যাহত রাখতে পারলে এক সময় আপনাকে আর পত্রিকায় লেখা জমা দিতে হবে না। পত্রিকার লোকরাই আপনাকে অনুরোধ করবে তাদের লেখা দিতে। এভাবে আগ্রহ থাকলে আপনি সহজেই হতে পারবেন একজন বরেণ্য কলামিস্ট বা খ্যাতিমান লেখক।

প্রতিটি লেখার নিজস্ব কিছু নিয়ম-কানুন আছে। তেমনি আপনি যদি পত্রিকার কলাম দিয়ে লেখা শুরু করতে চান, অসুবিধা নেই। আপনি যদি নিয়ম-কানুন মেনে লেখেন তবে আপনার লেখা ছাপা হবে। যদি বড় জাতীয় পত্রিকায় ছাপা না হয়, তাহলে আঞ্চলিক পত্রিকায় ছাপবেন।

সেখানেও অসুবিধা হলে অসংখ্য অনলাইন পত্রিকা আছে তার কোনোটিতে ছাপবেন। এভাবে কোথাও না কোথাও আপনার লেখা প্রকাশিত হবে। আর এভাবে আপনি ক্রমান্বয়ে চর্চা অব্যাহত রাখতে পারলে এক সময় জাতীয় পত্রিকাও আপনার লেখা প্রকাশ করবে।

হঠাৎ করে কেউ বড় লেখক হন না। চর্চা ও অধ্যবসায় অব্যাহত রাখলে আপনার বড় লেখক হতে বাধা থাকবে না। অনেক খ্যাতিমান লেখককে বছরের পর বছর তার প্রথম গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশকের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছে। তারপর একদিন তা ছাপা হয়েছে।

বিদেশি গণমাধ্যমের বদৌলতে আমরা কয়েক বছর আগে কাসেম বিন আবু বাকার নামের একজন বাংলাদেশি ঔপন্যাসিককে চিনেছি। তিনি অল্পশিক্ষিত। তার লেখা প্রথম প্রেমের উপন্যাস ‘ফুটন্ত গোলাপ’-এর পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন।

উত্তর পেয়েছেন প্রায় একই রকম। ‘মোল্লার লেখা উপন্যাস চলবে না।’ তিনি হাল ছাড়েননি। এভাবে দীর্ঘ আট বছর পর এক প্রকাশক তার লেখার গুরুত্বের জায়গাটি উপলব্ধি করতে পেরে তার বইটি ছাপেন। লেখার মান ভালো নয়। অলংকরণ দুর্বল। ভাষা, বর্ণনা ও বিশ্লেষণও আকর্ষণীয় নয়।

কিন্তু এই ইসলামী প্রেমের উপন্যাস ছাপা হওয়ার পর গ্রাম বাংলার স্বল্পশিক্ষিত ও ধর্ম-প্রভাবিত মানুষ হটকেকের মতো সে বই কিনেছে। বছর পাঁচেক আগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী তার এ বই ২০ লাখ কপিরও বেশি বিক্রি হয়েছে।

প্রকাশিত হয়েছে তার শতাধিক গ্রন্থ, যার অধিকাংশই ইসলামী প্রেমের উপন্যাস। কাজেই তিনি যদি লেগে না থেকে হাল ছেড়ে দিতেন, তাহলে হয়তো তার বইগুলো প্রকাশিত হতো না।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য পত্রিকায় কলাম লেখার ব্যাপারটি কঠিন বিষয় নয়। একটু চেষ্টা করলেই তারা ভালো কলাম লিখতে পারবেন। কয়েকটি বিষয়ে তাদের খেয়াল রাখতে হবে। প্রথমত একটি মানসম্পন্ন কলাম লিখতে হলে তাকে একটি ‘বিষয়’ নির্বাচন করতে হবে।

বিষয়টি সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ আলোচিত বিষয় হলে ভালো হয়। তার লেখায় তিনি একটি বক্তব্য তুলে ধরবেন, অর্থাৎ লেখায় তিনি পাঠকদের একটি মেসেজ দেবেন। লেখার বর্ণনা আকর্ষণীয় করতে তাকে ভাষার ব্যবহার ও শব্দচয়নে সতর্ক হতে হবে।

বিষয়বস্তুর সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু তথ্য-উপাত্তের ব্যবহার করতে পারলে লেখার মান উন্নত হবে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর কিছু পরিসংখ্যানের ব্যবহার লেখাকে অধিকতর সমৃদ্ধ করবে। লেখার শরীরে যদি উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয় তাহলে তা যেন ছোট হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। কিছুতেই অন্যের লেখা নিজের বলে চালানো যাবে না। এ কাজ করলে প্লেজিয়ারিজম বা নকলের অপরাধে লেখক অপরাধী হবেন।

অন্য কারও সহায়তা নেয়া যেতে পারে। পরামর্শ নেয়া যেতে পারে কোনো বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিত্বের। কিন্তু কিছুতেই অন্যকে দিয়ে পুরো লেখাটি লিখিয়ে নিজের বলে ছাপানো যাবে না। লেখার মধ্যে নিজের স্বকীয়তা ও নিজস্বতা থাকলে ভালো হয়। এসব দিক লক্ষ রেখে কলাম লিখলে আপনিও হতে পারবেন পত্রিকার একজন পাঠকনন্দিত কলামিস্ট।

আপনার লেখা পড়ে অনেকে সমালোচনা করবেন। অনেকে ঈর্ষা করবেন। এসব গায়ে মাখবেন না। আপনাকে হতাশ করে দেয়ার জন্য কেউ এমনও বলবেন, ‘আরে এসব পত্রিকায় লিখে কী হবে? অযথা পণ্ডশ্রম।’ আপনি তাদের কথা শুনবেন না।

কারণ, আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আপনার লেখায় প্রদত্ত পরামর্শ সরকারের নীতিনির্ধারণীতে কাজে লাগবে। সমাজকে জাগাতে, মানবিকতা তুলে ধরতে আপনার লেখা অবদানমূলক হতে পারে। মনে রাখবেন, পত্রিকায় প্রকাশিত আপনার কলামে প্রদত্ত দিকনির্দেশনা কেবল সরকারই দেখে না, বিবেচনা করে সারা বিশ্ব। কারণ প্রতিটি রাষ্ট্রদূত অফিস কে কী লিখছেন সেগুলো স্ক্যান করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেন। কাজেই আপনি যা লিখছেন তা আপনার কাছে সাধারণ মনে হলেও ওই লেখার মধ্যে অন্যের জন্য হয়তো লুকিয়ে রয়েছে মূল্যবান দিকনির্দেশনা, যা আপনি নিজেও জানেন না।

পত্রিকায় কলাম লেখা যে অর্থহীন নয় তার হাজারো প্রমাণ রয়েছে। ২০০৩ সালের মধ্য জুনে আমার লেখা একটি কলাম প্রকাশিত হওয়ার পর ওই দিনই সরকারি পর্যায়ে দুটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল। মাত্র কিছুদিন আগে ওয়েব সিরিজের নামে নষ্টামি শুরু হলে আমি ওয়েব সিরিজের জন্য নীতিমালা তৈরি করতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটি কলাম লিখলে মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে সরকার সে উদ্দেশ্যে কমিটি গঠন করে। কাজেই পত্রিকার কলামের যে মূল্য নেই এ কথা যারা বলেন, কলাম লেখকদের সে কথা না শুনে নিজের কাজে যত্নবান হওয়া উচিত।

তবে আপনি একজন নবীন কলামিস্ট হিসেবে সবসময় চোখ কান খোলা রাখবেন। রাষ্ট্রীয় আইন-কানুন মেনে, একাডেমিক ভঙ্গিমায় সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গায় দায়িত্ব পালন করবেন। এ কাজ করতে পারলে আপনার কলামের পাঠক সংখ্যা বাড়বে।

আমি বিশ্বাস করি, আমাদের প্রতিটি শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন ভালো কলামিস্ট হওয়ার যোগ্যতা রয়েছে। আপনার কাজ হল ওই যোগ্যতার উদ্বোধন ও উপস্থাপন করা। আপনাদের প্রত্যেকের চোখ আছে। আপনি সমাজ দেখছেন। রাষ্ট্র দেখছেন। সারা বিশ্ব দেখছেন।

প্রাকৃতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তর দেখছেন। এসব পর্যবেক্ষণের ফলে আপনার বুকে যে ভাব জন্ম নেয় তা আপনি প্রকাশ না করে থাকতে পারবেন না। আপনার বুক ভাবাবেগে ভরে উঠবে। এ আবেগ লেখনীর মাধ্যমে আপনাকে অন্যের সঙ্গে শেয়ার করতে হবে।

আর এ জন্যই আপনাকে কলম ধরতে হবে। আপনিই আপনার লেখার বিষয়বস্তু ঠিক করবেন। কারও সঙ্গে পরামর্শের দরকার আছে বলে আমি মনে করি না। কারণ এ ব্যাপারে আপনিই বিশেষজ্ঞ। কাজেই কারও পরামর্শে বিভ্রান্ত না হয়ে আজই কলম ধরুন। নিজের ভাব প্রকাশ করুন।

আর অল্প সময়ের চেষ্টা আর অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়ে হয়ে উঠুন একজন বিবেকবান, পাঠকনন্দিত ও সমাজআদৃত তরুণ কলামিস্ট।

ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]