ভ্যাকসিনের সুখবর
jugantor
ভ্যাকসিনের সুখবর

  সুভাষ সিংহ রায়  

২৭ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভারতের সিরাম ইন্সটিটিউটের তিন কোটি ও গ্যাভির ছয় কোটি ৮০ লাখসহ মোট নয় কোটি ৮০ লাখ করোনার ভ্যাকসিন পাবে বাংলাদেশ।

দুই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এরই মধ্যে চুক্তি হয়েছে। এসব ভ্যাকসিনের দাম হবে দুই থেকে পাঁচ ডলার।

২৫ নভেম্বর স্বাস্থ্য অধিদফতরের নতুন ভবনে ‘কোভিড-১৯ এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক হালনাগাদ তথ্য অবহিতকরণ’ সভা শেষে একথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম।

তিনি বলেন, নতুন বছরের শুরুতে অর্থাৎ জানুয়ারি মাসে দেশে টিকা আসার সম্ভাবনা রয়েছে। আর এসব টিকা মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগের জন্য ২৬ লাখ স্বাস্থ্য সহকারী ও সরকারের ইপিআই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তারা এটি বাস্তবায়ন করবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে (১২ নভেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদ), বিশ্বজুড়ে করোনার ২১২টি সম্ভাব্য টিকা নিয়ে কাজ চলছে। এগুলোর মধ্যে ৪৮টি মানবদেহে পরীক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।

এগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড, যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না, ফাইজার, জনসন অ্যান্ড জনসন ও নোভাভ্যাক্স, চীনের সিনোভ্যাক, সিনোফার্ম ও ক্যানসিনো, জার্মানির কিওরভ্যাক এবং রাশিয়ার গামালেয়া রিসার্চ ইন্সটিটিউটের টিকাগুলো (স্পুটনিক-ভি) নিয়ে সবচেয়ে আলোচনা চলছে। এর সবই মানবদেহে পরীক্ষার তৃতীয় ধাপে রয়েছে এবং অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

একটু স্মরণ করলেই দেখতে পাব, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোভিড-১৯ সংক্রমণের একেবারে শুরুতে গ্লোবাল সিটিজেন তহবিলে ৫০ হাজার ডলার প্রদানের ঘোষণা দিয়েছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী প্রতিনিয়ত বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছেন।

ওষুধ কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকার সঙ্গে মিলে অক্সফোর্ডের তৈরি করা ‘চ্যাডঅক্স ১ এনকোভ-২০১৯’ ভ্যাকসিন উৎপাদনের জন্য ইতোমধ্যে বিশ্বের নানা প্রান্তের অনেক প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এটিই মূলত বাংলাদেশে বৃহৎ বা মাঝারি পর্যায়ের টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে।

আমরা অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি টিকার তিন কোটি ডোজ ক্রয় করতে সিরাম ইন্সটিটিউট অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করেছি। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভ্যাকসিন পেতে ভারতের সিরাম ইন্সটিটিউটের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকে সই করেছে বাংলাদেশের ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মা। সিরাম ইন্সটিটিউট ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের পুনেতে অবস্থিত।

এ প্রতিষ্ঠান বছরে ১৩০ কোটি ভ্যাকসিন তৈরি করতে সক্ষম। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ও ব্রিটিশ-সুইডিশ ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর হতে পারে। যুক্তরাজ্য ও ব্রাজিলে বৃহদায়তনে পরিচালিত পরীক্ষণ কার্যক্রমে পাওয়া ফলাফলের ভিত্তিতে ২৩ নভেম্বর এ তথ্য জানানো হয়। বৃদ্ধদের মাঝে শক্তিশালী প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে অ্যাস্ট্রাজেনেকা

অক্সফোর্ডের টিকা। ১৮ নভেম্বর ‘দ্য ল্যানসেট’ সাময়িকীতে প্রকাশিত দ্বিতীয় ধাপের পরীক্ষায় দেখা গেছে, কোভিড-১৯ সংক্রমণে গুরুতর অসুস্থ ও মারা যাওয়ার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা মানুষের মাঝে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে অ্যাস্ট্রাজেনেকা অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন।

অ্যাস্ট্রাজেনেকার সঙ্গে মিলে অক্সফোর্ডের তৈরি করা ‘চ্যাডঅক্স ১ এনকোভ-১৯’ ভ্যাকসিন উৎপাদনের জন্য ইতোমধ্যে বিশ্বের নানা প্রান্তের অনেক প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

সিরাম ইন্সটিটিউট মূলত বাংলাদেশে বৃহৎ বা মাঝারি পর্যায়ের টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করবে। এখন প্রয়োজন শুধু দরকারি অনুমোদনের।

সিএনএনের সূত্রে জানা যাচ্ছে, এদিকে এক সপ্তাহের মধ্যে পরপর তিনটি ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার সুখবর প্রকাশে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন বৈশ্বিক আর্থিক ও বিনিয়োগ খাতসংশ্লিষ্টরা।

বিশেষ করে ইউরোপীয় ও মার্কিন পুঁজিবাজারে সুখবরগুলোর স্পষ্ট প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিনের সফলতার খবরে আটলান্টিকের দুই পারের সব পুঁজিবাজারেই বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে।

২.

মডার্না ইনকরপোরেশন জানিয়েছে, তাদের ভ্যাকসিন বয়স্কদের শরীরেও তরুণদের মতো ‘অ্যান্টিবডি’ তৈরি করে। এ গবেষণা প্রতিবেদনটি ‘দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে’ প্রকাশ করা হয়েছে। গবেষকরা এ প্রতিবেদনে বয়স্কদের বেলায় মডার্নার ভ্যাকসিন কতটা নিরাপদ তার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরেছেন।

আগামী বছরের শুরুতেই মডার্না ৫০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন যুক্তরাজ্যে বাজারজাত করেছে বলে আশা প্রকাশ করেছেন ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রী। মডার্নার তৈরি ভ্যাকসিনের তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালে ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ সাফল্যের ঘোষণায় আশার আলো দেখছে জার্মানিও।

দেশটির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেল আশা প্রকাশ করেন, অনুমোদন পেয়ে গেলে ২৫ নভেম্বরের পরপরই বাজারে মিলতে পারে করোনার ভ্যাকসিন। আবার চলতি বছরের শেষ নাগাদ ফাইজার এনটেকের ৪ কোটি ডোজও বাজারে আসতে পারে বলে জানান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মডার্না জানিয়েছে, তাদের উদ্ভাবিত একটি করোনাভাইরাসের টিকা ৯৫ শতাংশ কার্যকর। তাদের পরিচালিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রাথমিক তথ্যে এমন ফলাফল উঠে এসেছে। সোমবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত মডার্নার পরীক্ষায় ৩০ হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। চার সপ্তাহের ব্যবধানে অর্ধেক অংশগ্রহণকারীকে দুই ডোজ টিকা দেয়া হয়; বাকিদের টিকা দেয়া হয়নি।

প্রাথমিক এ তথ্য করোনার উপসর্গ থাকা প্রথম ৯৫ জনের ফলাফলের ভিত্তিতে তৈরি। এ ৯৫ জনের মধ্যে মাত্র পাঁচজনকে টিকা দেয়া হয়; বাকিদের টিকা দেয়া হয়নি। কোম্পানি দাবি করছে, টিকাটি ৯৪.৫ শতাংশ মানুষকে সুরক্ষা দিচ্ছে। জার্মান প্রতিষ্ঠান কিওরভ্যাকের তৈরি ৪০ কোটি ৫০ লাখ ডোজ পেতে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি করেছেন ইউরোপীয় কমিশন।

৩.

অন্যদিকে তৃতীয় ধাপের পরীক্ষায় ফাইজার-বায়োএনটেক, মডার্না ও রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি- এ তিন ভ্যাকসিন ইতোমধ্যে প্রাথমিকভাবে ভালো ফলাফল দেখিয়েছে। সবগুলোর কার্যক্ষমতা ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যেখানে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ৫০ শতাংশের মতো কার্যক্ষমতার টিকা ব্যবহার করতেও রাজি আছেন।

ভ্যাকসিন এলেও সেই ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণে বিশ্ব কতটা প্রস্তুত এখন সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আমরা জানি, অ্যান্টিভাইরাল প্রায় সব ভ্যাকসিনই শীতল অবস্থায় রাখতে হয়। ফাইজারের ভ্যাকসিন ডিপ ফ্রিজে রাখতে হবে এবং তা মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়।

তাই বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন, ফাইজারের ভ্যাকসিন সংরক্ষণের পদ্ধতি যদি এতটাই স্পর্শকাতর হয়, তাহলে উন্নয়নশীল দেশগুলো কীভাবে তা সংরক্ষণ করবে।

শুধু উন্নয়নশীল দেশ নয়, এক দেশ থেকে আরেক দেশে ভ্যাকসিন পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রচলিত যে পরিবহন ব্যবস্থা রয়েছে, তাতেও কোনো কাজ হবে না। ফলে ভ্যাকসিনের গণউৎপাদনের পাশাপাশি বিশ্বের দেশগুলোকে নিজস্ব সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।

ফাইজারের ভ্যাকসিন অন্তত মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখতে হবে পরিবহনের সময়ও। অ্যাস্ট্রাজেনেকার সঙ্গে মিলে অক্সফোর্ডের তৈরি করা ‘চ্যাডঅক্স ১ এনকোভ-১৯’ ভ্যাকসিন ফ্রিজের সাধারণ তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা যাবে।

মডার্নার ভ্যাকসিন মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা যাবে এবং তা ছ’মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাবে। অপরদিকে রাশিয়ার তৈরি স্পুটনিক-ভি ফ্রিজের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণযোগ্য। মাত্র কয়েকদিন আগে ফাইজার ও মডার্না ভ্যাকসিন অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছে।

করোনাভাইরাস মোকাবেলায় বিশ্ব নেতাদের একসঙ্গে কাজ করার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেল। উন্নত রাষ্ট্রগুলোর জোট জি-২০ সম্মেলনে দেয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘করোনা মহামারী ঠেকাতে আরও অনেক কিছুই করতে হবে।

এক্ষেত্রে জাতিসংঘ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ উন্নত দেশগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’ করোনাভাইরাসের কারণে এবারের জি-২০ সম্মেলন অনলাইনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জোটের নেতারা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন।

প্রথমবারের মতো সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সৌদি বাদশাহ সালমান। সম্মেলনে দেয়া বক্তৃতায় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, এখন কোটি কোটি মানুষের জীবন হুমকির মুখে। এ পরিস্থিতি সামলাতে প্রয়োজন আন্তর্জাতিক ঐক্য ও সদিচ্ছা।’

করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের লড়াইয়ে মার্কিন কোম্পানি ফাইজারের মতো মডার্নাও সামনের সারিতে রয়েছে। এ বছর ডিসেম্বরের মধ্যেই মডার্না তাদের ভ্যাকসিন বাজারে আনতে পারে এমন সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে। এবার ভ্যাকসিনের সম্ভাব্য দাম কত হতে পারে তা-ও জানিয়েছে কোম্পানিটি। প্রাথমিকভাবে যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, তা পরে কমানো হতে পারে বলেও দাবি করা হয়েছে।

ভারতে তৈরি অক্সফোর্ডের টিকার দুটি ডোজের দাম হাজার রুপির মধ্যে থাকবে বলে ঘোষণা করেছেন সিরাম ইন্সটিটিউটের কর্ণধার পুনাওয়ালা। তিনি জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের কাছে যাতে ভ্যাকসিন পৌঁছতে পারে সেভাবেই দাম ঠিক করা হচ্ছে। ২৪ নভেম্বর সিরাম ইন্সটিটিউট জানিয়েছে, এ ভ্যাকসিনের দাম হবে প্রতি ডোজ ৪ ডলার। ডিসেম্বরের মধ্যেই ফাইজারের ভ্যাকসিনের দাম ঘোষণা করা হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন সংস্থার প্রধান অ্যালবার্ট বোরলা।

মডার্নার সিইও স্টিফেন ব্যানসেল জানিয়েছেন, করোনা টিকার একটি ডোজের দাম পড়বে ২৫ থেকে ৩৭ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় ২ হাজার ১০০ থেকে ৩ হাজার ১০০ টাকার মধ্যে। ভ্যাকসিনের দাম নিয়ে আলোচনা চলছে ইউরোপিয়ান কমিশনের সঙ্গে।

তাদের পক্ষ থেকে ভ্যাকসিনের প্রতিটি ডোজের দাম ২৫ ডলারের নিচে রাখতে বলা হয়েছে। আমাদের স্বাস্থ্য অধিদফতরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির পরিচালক ডা. শামসুল হক জানিয়েছেন, বাংলাদেশে প্রতি ডোজ ভ্যাকসিন বিতরণের জন্য ১ দশমিক ২৫ মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হবে।

সুভাষ সিংহ রায় : সাবেক সহসভাপতি, বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল

ভ্যাকসিনের সুখবর

 সুভাষ সিংহ রায় 
২৭ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভারতের সিরাম ইন্সটিটিউটের তিন কোটি ও গ্যাভির ছয় কোটি ৮০ লাখসহ মোট নয় কোটি ৮০ লাখ করোনার ভ্যাকসিন পাবে বাংলাদেশ।

দুই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এরই মধ্যে চুক্তি হয়েছে। এসব ভ্যাকসিনের দাম হবে দুই থেকে পাঁচ ডলার।

২৫ নভেম্বর স্বাস্থ্য অধিদফতরের নতুন ভবনে ‘কোভিড-১৯ এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক হালনাগাদ তথ্য অবহিতকরণ’ সভা শেষে একথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম।

তিনি বলেন, নতুন বছরের শুরুতে অর্থাৎ জানুয়ারি মাসে দেশে টিকা আসার সম্ভাবনা রয়েছে। আর এসব টিকা মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগের জন্য ২৬ লাখ স্বাস্থ্য সহকারী ও সরকারের ইপিআই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তারা এটি বাস্তবায়ন করবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে (১২ নভেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদ), বিশ্বজুড়ে করোনার ২১২টি সম্ভাব্য টিকা নিয়ে কাজ চলছে। এগুলোর মধ্যে ৪৮টি মানবদেহে পরীক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।

এগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড, যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না, ফাইজার, জনসন অ্যান্ড জনসন ও নোভাভ্যাক্স, চীনের সিনোভ্যাক, সিনোফার্ম ও ক্যানসিনো, জার্মানির কিওরভ্যাক এবং রাশিয়ার গামালেয়া রিসার্চ ইন্সটিটিউটের টিকাগুলো (স্পুটনিক-ভি) নিয়ে সবচেয়ে আলোচনা চলছে। এর সবই মানবদেহে পরীক্ষার তৃতীয় ধাপে রয়েছে এবং অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

একটু স্মরণ করলেই দেখতে পাব, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোভিড-১৯ সংক্রমণের একেবারে শুরুতে গ্লোবাল সিটিজেন তহবিলে ৫০ হাজার ডলার প্রদানের ঘোষণা দিয়েছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী প্রতিনিয়ত বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছেন।

ওষুধ কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকার সঙ্গে মিলে অক্সফোর্ডের তৈরি করা ‘চ্যাডঅক্স ১ এনকোভ-২০১৯’ ভ্যাকসিন উৎপাদনের জন্য ইতোমধ্যে বিশ্বের নানা প্রান্তের অনেক প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এটিই মূলত বাংলাদেশে বৃহৎ বা মাঝারি পর্যায়ের টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে।

আমরা অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি টিকার তিন কোটি ডোজ ক্রয় করতে সিরাম ইন্সটিটিউট অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করেছি। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভ্যাকসিন পেতে ভারতের সিরাম ইন্সটিটিউটের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকে সই করেছে বাংলাদেশের ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মা। সিরাম ইন্সটিটিউট ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের পুনেতে অবস্থিত।

এ প্রতিষ্ঠান বছরে ১৩০ কোটি ভ্যাকসিন তৈরি করতে সক্ষম। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ও ব্রিটিশ-সুইডিশ ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর হতে পারে। যুক্তরাজ্য ও ব্রাজিলে বৃহদায়তনে পরিচালিত পরীক্ষণ কার্যক্রমে পাওয়া ফলাফলের ভিত্তিতে ২৩ নভেম্বর এ তথ্য জানানো হয়। বৃদ্ধদের মাঝে শক্তিশালী প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে অ্যাস্ট্রাজেনেকা

অক্সফোর্ডের টিকা। ১৮ নভেম্বর ‘দ্য ল্যানসেট’ সাময়িকীতে প্রকাশিত দ্বিতীয় ধাপের পরীক্ষায় দেখা গেছে, কোভিড-১৯ সংক্রমণে গুরুতর অসুস্থ ও মারা যাওয়ার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা মানুষের মাঝে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে অ্যাস্ট্রাজেনেকা অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন।

অ্যাস্ট্রাজেনেকার সঙ্গে মিলে অক্সফোর্ডের তৈরি করা ‘চ্যাডঅক্স ১ এনকোভ-১৯’ ভ্যাকসিন উৎপাদনের জন্য ইতোমধ্যে বিশ্বের নানা প্রান্তের অনেক প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

সিরাম ইন্সটিটিউট মূলত বাংলাদেশে বৃহৎ বা মাঝারি পর্যায়ের টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করবে। এখন প্রয়োজন শুধু দরকারি অনুমোদনের।

সিএনএনের সূত্রে জানা যাচ্ছে, এদিকে এক সপ্তাহের মধ্যে পরপর তিনটি ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার সুখবর প্রকাশে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন বৈশ্বিক আর্থিক ও বিনিয়োগ খাতসংশ্লিষ্টরা।

বিশেষ করে ইউরোপীয় ও মার্কিন পুঁজিবাজারে সুখবরগুলোর স্পষ্ট প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিনের সফলতার খবরে আটলান্টিকের দুই পারের সব পুঁজিবাজারেই বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে।

২.

মডার্না ইনকরপোরেশন জানিয়েছে, তাদের ভ্যাকসিন বয়স্কদের শরীরেও তরুণদের মতো ‘অ্যান্টিবডি’ তৈরি করে। এ গবেষণা প্রতিবেদনটি ‘দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে’ প্রকাশ করা হয়েছে। গবেষকরা এ প্রতিবেদনে বয়স্কদের বেলায় মডার্নার ভ্যাকসিন কতটা নিরাপদ তার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরেছেন।

আগামী বছরের শুরুতেই মডার্না ৫০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন যুক্তরাজ্যে বাজারজাত করেছে বলে আশা প্রকাশ করেছেন ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রী। মডার্নার তৈরি ভ্যাকসিনের তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালে ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ সাফল্যের ঘোষণায় আশার আলো দেখছে জার্মানিও।

দেশটির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেল আশা প্রকাশ করেন, অনুমোদন পেয়ে গেলে ২৫ নভেম্বরের পরপরই বাজারে মিলতে পারে করোনার ভ্যাকসিন। আবার চলতি বছরের শেষ নাগাদ ফাইজার এনটেকের ৪ কোটি ডোজও বাজারে আসতে পারে বলে জানান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মডার্না জানিয়েছে, তাদের উদ্ভাবিত একটি করোনাভাইরাসের টিকা ৯৫ শতাংশ কার্যকর। তাদের পরিচালিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রাথমিক তথ্যে এমন ফলাফল উঠে এসেছে। সোমবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত মডার্নার পরীক্ষায় ৩০ হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। চার সপ্তাহের ব্যবধানে অর্ধেক অংশগ্রহণকারীকে দুই ডোজ টিকা দেয়া হয়; বাকিদের টিকা দেয়া হয়নি।

প্রাথমিক এ তথ্য করোনার উপসর্গ থাকা প্রথম ৯৫ জনের ফলাফলের ভিত্তিতে তৈরি। এ ৯৫ জনের মধ্যে মাত্র পাঁচজনকে টিকা দেয়া হয়; বাকিদের টিকা দেয়া হয়নি। কোম্পানি দাবি করছে, টিকাটি ৯৪.৫ শতাংশ মানুষকে সুরক্ষা দিচ্ছে। জার্মান প্রতিষ্ঠান কিওরভ্যাকের তৈরি ৪০ কোটি ৫০ লাখ ডোজ পেতে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি করেছেন ইউরোপীয় কমিশন।

৩.

অন্যদিকে তৃতীয় ধাপের পরীক্ষায় ফাইজার-বায়োএনটেক, মডার্না ও রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি- এ তিন ভ্যাকসিন ইতোমধ্যে প্রাথমিকভাবে ভালো ফলাফল দেখিয়েছে। সবগুলোর কার্যক্ষমতা ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যেখানে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ৫০ শতাংশের মতো কার্যক্ষমতার টিকা ব্যবহার করতেও রাজি আছেন।

ভ্যাকসিন এলেও সেই ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণে বিশ্ব কতটা প্রস্তুত এখন সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আমরা জানি, অ্যান্টিভাইরাল প্রায় সব ভ্যাকসিনই শীতল অবস্থায় রাখতে হয়। ফাইজারের ভ্যাকসিন ডিপ ফ্রিজে রাখতে হবে এবং তা মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়।

তাই বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন, ফাইজারের ভ্যাকসিন সংরক্ষণের পদ্ধতি যদি এতটাই স্পর্শকাতর হয়, তাহলে উন্নয়নশীল দেশগুলো কীভাবে তা সংরক্ষণ করবে।

শুধু উন্নয়নশীল দেশ নয়, এক দেশ থেকে আরেক দেশে ভ্যাকসিন পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রচলিত যে পরিবহন ব্যবস্থা রয়েছে, তাতেও কোনো কাজ হবে না। ফলে ভ্যাকসিনের গণউৎপাদনের পাশাপাশি বিশ্বের দেশগুলোকে নিজস্ব সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।

ফাইজারের ভ্যাকসিন অন্তত মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখতে হবে পরিবহনের সময়ও। অ্যাস্ট্রাজেনেকার সঙ্গে মিলে অক্সফোর্ডের তৈরি করা ‘চ্যাডঅক্স ১ এনকোভ-১৯’ ভ্যাকসিন ফ্রিজের সাধারণ তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা যাবে।

মডার্নার ভ্যাকসিন মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা যাবে এবং তা ছ’মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাবে। অপরদিকে রাশিয়ার তৈরি স্পুটনিক-ভি ফ্রিজের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণযোগ্য। মাত্র কয়েকদিন আগে ফাইজার ও মডার্না ভ্যাকসিন অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছে।

করোনাভাইরাস মোকাবেলায় বিশ্ব নেতাদের একসঙ্গে কাজ করার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেল। উন্নত রাষ্ট্রগুলোর জোট জি-২০ সম্মেলনে দেয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘করোনা মহামারী ঠেকাতে আরও অনেক কিছুই করতে হবে।

এক্ষেত্রে জাতিসংঘ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ উন্নত দেশগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’ করোনাভাইরাসের কারণে এবারের জি-২০ সম্মেলন অনলাইনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জোটের নেতারা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন।

প্রথমবারের মতো সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সৌদি বাদশাহ সালমান। সম্মেলনে দেয়া বক্তৃতায় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, এখন কোটি কোটি মানুষের জীবন হুমকির মুখে। এ পরিস্থিতি সামলাতে প্রয়োজন আন্তর্জাতিক ঐক্য ও সদিচ্ছা।’

করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের লড়াইয়ে মার্কিন কোম্পানি ফাইজারের মতো মডার্নাও সামনের সারিতে রয়েছে। এ বছর ডিসেম্বরের মধ্যেই মডার্না তাদের ভ্যাকসিন বাজারে আনতে পারে এমন সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে। এবার ভ্যাকসিনের সম্ভাব্য দাম কত হতে পারে তা-ও জানিয়েছে কোম্পানিটি। প্রাথমিকভাবে যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, তা পরে কমানো হতে পারে বলেও দাবি করা হয়েছে।

ভারতে তৈরি অক্সফোর্ডের টিকার দুটি ডোজের দাম হাজার রুপির মধ্যে থাকবে বলে ঘোষণা করেছেন সিরাম ইন্সটিটিউটের কর্ণধার পুনাওয়ালা। তিনি জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের কাছে যাতে ভ্যাকসিন পৌঁছতে পারে সেভাবেই দাম ঠিক করা হচ্ছে। ২৪ নভেম্বর সিরাম ইন্সটিটিউট জানিয়েছে, এ ভ্যাকসিনের দাম হবে প্রতি ডোজ ৪ ডলার। ডিসেম্বরের মধ্যেই ফাইজারের ভ্যাকসিনের দাম ঘোষণা করা হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন সংস্থার প্রধান অ্যালবার্ট বোরলা।

মডার্নার সিইও স্টিফেন ব্যানসেল জানিয়েছেন, করোনা টিকার একটি ডোজের দাম পড়বে ২৫ থেকে ৩৭ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় ২ হাজার ১০০ থেকে ৩ হাজার ১০০ টাকার মধ্যে। ভ্যাকসিনের দাম নিয়ে আলোচনা চলছে ইউরোপিয়ান কমিশনের সঙ্গে।

তাদের পক্ষ থেকে ভ্যাকসিনের প্রতিটি ডোজের দাম ২৫ ডলারের নিচে রাখতে বলা হয়েছে। আমাদের স্বাস্থ্য অধিদফতরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির পরিচালক ডা. শামসুল হক জানিয়েছেন, বাংলাদেশে প্রতি ডোজ ভ্যাকসিন বিতরণের জন্য ১ দশমিক ২৫ মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হবে।

সুভাষ সিংহ রায় : সাবেক সহসভাপতি, বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল